সমৃদ্ধির জগৎবল্লভপুর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

হাওড়া-উদয়নারায়ণপুর পিচের সড়কে হাওড়া থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে কৌশিকী নদীর (বর্তমান নাম কানা দামোদর) তীরবর্তী জগৎবল্লভপুর থানার সদর গ্রাম জগৎবল্লভপুর। হাওড়া থেকে হাওড়া মুন্সির হাট বাসে চেপে বড়গাছিয়া বা মুন্সির হাট স্টপে নেমে ভ্যান-রিকশা বা অটোয় করে জগৎবল্লভপুর পৌঁছনো যায়। একদা রেশম, সূতিবস্ত্র, সূচিশিল্প (জরি কাজ), তালাচাবি শিল্প, পাটের তৈরি নকল চুল, শোলাশিল্প এ সব নিয়ে গ্রামটি বেশ সমৃদ্ধশালী ছিল। এ ছাড়া, বিভিন্ন পোড়ো মন্দির, জীর্ণ মসজিদ, ভাঙা অট্টালিকা এলাকার সমৃদ্ধির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে আজও।

জগৎবল্লভপুর অঞ্চলে তৎকালীন ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিল আঢ্য, পাল ও সেন বংশ। পাল পরিবার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দির রয়ে গেছে কালীতলা বাজার থেকে অল্প দূরে পাকারাস্তার পাশে। মন্দিরটি আটচালার, ভিতরের ছাদ গম্বুজাকৃতি। এক পাশ পুরো জীর্ণ। পাতলা ইট ও ছোট টালি দিয়ে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরের সন্মুখভাগের নকশাই প্রধান। টেরাকোটার অলংকরণের মধ্যে রাম-রাবণের যুদ্ধের দৃশ্য, ফুল, লতাপাতার নকশা, কৃষ্ণলীলা বিষয়ক কিছু দৃশ্য, ঘোড়া, হনুমান, রাক্ষস এগুলি পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, আবার কতগুলি এত অস্পষ্ট যে আকৃতি সঠিক বোঝা যায় না। জল-বাতাসে ও শ্যাওলার আস্তরণে প্রতিষ্ঠালিপি প্রায় অস্পষ্ট, তবুও অনুমান করা যায় মন্দিরটির বয়স ২০০ বছরের কাছাকাছি। মন্দিরের পিছনে ও পাশে কোনও নকশা নেই। মন্দিরের চূড়াতে বট, অশ্বত্থরা নিজেদের শাখাপ্রশাখা মেলে দিয়েছে। মন্দিরটি ঝড়, জল, নোনা হাওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে কতদিন টিকে থাকবে তা বলা শক্ত। এই মন্দিরের অপর দিকে রয়েছে একটি ভাঙা বড় বাড়ি। স্থানীয় অধিবাসীদের মতে, পূর্বে এটি পাল পরিবারের বাড়ি ছিল।

কালীতলা বাজারের মধ্যেও শিব ও কালীমন্দির আছে। শিবমন্দিরটি দক্ষিণমুখী ও আটচালা। এই মন্দিরের সামনেও লঙ্কাযুদ্ধের পোড়ামাটির ফলক রয়েছে, সম্প্রতি মন্দিরটির সংস্কার হয়েছে। ষষ্ঠীতলায় রয়ে গেছে আর একটি পুবমুখী সাধারণ আটচালার মন্দির টেরাকোটার অলংকরণযুক্ত।

অদূরেই মহেন্দ্রশ্বর শিবের মন্দির। এটি পশ্চিমমুখী, অলিন্দবিহীন। আটচালা মন্দিরের সামনে লেখা আছে : ‘শকাব্দ ১৭২৪, সন ১২০৯ তারিখ ১৪ই ফাল্গুন।’ নীচের দিকে শ্বেতপাথরে লেখা : ‘ব্রজরাজ পাঠক, সন ১২৯৯, ৬ই বৈশাখ, রবিবার।’ এতে অনুমতি হয় যে, ১২০৯ সালে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল এবং ৯০ বছর পরে ব্রজরাজ পাঠক নামে কোনও ব্যক্তি এটির সংস্কার করেন।
সামনের দেওয়ালে কয়েকটি পোড়ামাটির পদ্মফুল ছাড়া এ মন্দিরে কোনও অলংকরণ নেই। নীচের দু’পাশে দু’জন পুরুষের মূর্তি দণ্ডায়মান অবস্থায় রয়েছে যাদের দেখে দ্বারপাল বলেই মনে হয়। মন্দিরের মাথার উপর তিনটি বেশ মজবুত ত্রিশূল এবং মোটা লোহার চেন ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। মাটি থেকে প্রায় আড়াই ফুট উঁচুতে শিবলিঙ্গের অবস্থান।
খুবই পরিতাপের বিষয় যে এত বড় ও এত সুন্দর কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ এ রকম অনাদরে, অবহেলায় পড়ে রয়েছে। এত হালকা পলকা দরজা কি দেবতাকে পারবে অপহরণের হাত থেকে রক্ষা করতে?

এর পাশেই আর একটি দৃষ্টি আকর্ষণকারী মন্দির রয়েছে। রথাকৃতি মন্দিরের মাঝখানে একটি বড় চূড়া এবং চার ধারে ছোট চারটি চূড়া। প্রত্যেকটি চূড়ার মাথায় একটি করে লোহার শিক বসানো আছে বোধহয় নিশান লাগানোর জন্য। মন্দির বিগ্রহহীন। কোন দেবতার মন্দির কেউই তার হদিশ দিতে পারেন না।
পিচের সড়কের পাশেই একটি গম্বুজযুক্ত প্রাচীন মসজিদ রয়েছে যেটি এলাকায় ‘শাহি মসজিদ’ নামে পরিচিত। জনশ্রুতি, ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে নাকি এটি নির্মিত হয়েছিল।
জগৎবল্লভপুর রাম মন্দির : জগৎবল্লভপুরের বর্মণদের রাম মন্দির লাগোয়া পুকুর, মরসুমি ফুল-ফলে ভরা বাগানবাড়িটি একটি সুন্দর পিকনিক স্পট। রবিবার ও ছুটির দিনের জন্য ভাড়া তিন হাজার টাকা। সপ্তাহের অন্য দিনগুলিতে ভাড়া কমে যায়। অগ্রিম ৫০ শতাংশ টাকা দিয়ে বুকিং করার জন্য কলকাতার ভবানীপুরে বর্মনদের ঠিকানায় যোগাযোগ করতে হবে। পিকনিকের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে হবে জগৎবল্লভপুর বাজার থেকে। যোগাযোগের ফোন নম্বর : ২৪৫৫৮০২৬ এবং ৯৮৩০৩৪৬৬৮২। পিকনিকের ফাঁকে জগৎবল্লভপুরের মন্দিরগুলি ঘুরে দেখতে ভ্রমণার্থীদের মন্দ লাগবে না।

পাতিহাল

জগৎবল্লভপুর থানা এলাকায় পাতিহাল একটি প্রাচীন ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম। জগৎবল্লভপুর থানা থেকে দক্ষিণে দেড় মাইল দূরে গ্রামটি অবস্থিত। রিকশায় বা হেঁটে গ্রামটি ঘুরে বেড়ানো যায়। এই গ্রামটি তালাচাবি তৈরির জন্যও বিখ্যাত। এই গ্রামের মজুমদারপাড়ায় দুটি আটচালা শিবমন্দির আছে। মন্দির দুটি খ্রিস্টীয় ১৮ শতকের মধ্যভাগে তৈরি হয়েছে বলে অনুমান।

এই পাড়াতে একটি পঞ্চরত্ন শিবমন্দির আছে যেটি মজুমদার পরিবারের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। এই মন্দিরে কিছু পোড়ামাটির অলংকরণ রয়েছে। গ্রামের মহেশতলায় বা মণ্ডলায় কালীনাথ জীউয়ের আটচালা মন্দির (১৮ শতক), সাহাপাড়ায় রাসমঞ্চ, রায়পাড়ায় দোলমঞ্চ (১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ) রয়েছে। মণ্ডলায় এক দিঘির পাশে জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালী পূজা হয় ও বিরাট মেলা বসে।

নিজবালিয়া

হাওড়া থেকে হাওড়া মুন্সির হাট বাসে চেপে বড়গাছিয়া বা মুন্সির হাট স্টপে নেমে ভ্যান-রিকশা বা অটোয় করে জগৎবল্লভপুর পৌঁছনো যায়। জগৎবল্লভপুর থানার পাতিহাল গ্রামপঞ্চায়েতের অধীন এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম নিজবালিয়া। অনেকগুলি মন্দির নিয়ে নিজবালিয়া সমৃদ্ধ কিন্তু কিছু যদি নাও থাকত তবু ইতিহাসে নিজবালিয়া স্থান করে নিতে পারত একমাত্র দেবী সিংহবাহিনী মন্দিরের জন্য। এখানকার অন্যতম পুরাকীর্তি হল সিংহবাহিনী মন্দির।

দেবী সিংহবাহিনী : দেবী সিংহবাহিনী পূজার প্রচলন হাওড়া জেলার অনেক স্থানে থাকলেও প্রাচীনত্বের দিক থেকে নিজবালিয়ার সিংহবাহিনীই সর্বাগ্রে। এই দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায় কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ এবং কবিশেখর বলরাম চক্রবর্তী লিখিত ‘কালিকামঙ্গল’ কাব্যে।
কিংবদন্তি যে, এই সিংহবাহিনী দেবী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন এখানকার কোনও এক ভূস্বামী রণসিংহ দ্বারা। কিন্তু ওই ভূস্বামী সবংশে পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন বর্ধমান রাজ কৃষ্ণরামের দ্বারা। কৃষ্ণরাম প্রচুর ভূসম্পত্তি দেবী সিংহবাহিনীর নামে দান-দেবোত্তর করেছিলেন। মন্দিরটি প্রাচীন হলেও আধুনিকতার মিশেল ঘটে গেছে। প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া মার্বেল বাঁধানো সিঁড়ি পেরোলেই মন্দিরের সিংহদ্বার। মাথার ওপরে দু’পাশে দুটি সিমেন্টের সিংহমূর্তি খোদাই করা হয়েছে। দরজার সামনে প্রোথিত লাল রঙের যূপকাষ্ঠ। উপযুক্ত দরজা থেকে দেবীমূর্তি দর্শন করা যায়। এর পর নাটমণ্ডপ যেটি দৈর্ঘ্যে ২০ ফুট এবং প্রস্থে ১২ ফুট। মণ্ডপ পেরিয়ে খোলা চত্বর। তারপর দেবীর লাল রঙের মন্দির। মন্দিরটি আটচালা হলেও মন্দির সংলগ্ন জগমোহনের পরেই গর্ভগৃহ।

দেবী সিংহবাহিনীর মূর্তিটি নিম কাঠের তৈরি। এটি প্রাচীন দারুভাস্কর্যের এক অত্যুৎকৃষ্ট নিদর্শন। দেবীমূর্তি যেহেতু নিমকাঠের সে কারণে পাশাপাশি গ্রামগুলির কোনও বাড়িতে নিমকাঠ পোড়ানো হয় না। মূর্তিটি অষ্টভুজা, কাঞ্চনবর্ণা, ভারি সুন্দর হাস্যমুখ, উচ্চতা প্রায় দেড় মিটার। ডান দিকের হাতগুলিতে ধরা রয়েছে অসি, বাণ ও পাশ আর বাঁ দিকের হাতে ধরা রয়েছে ঢাল, ধনুর্বাণ ও শঙ্খ। অবশিষ্ট দু’পাশের দুই হাতে বর ও অভয়মুদ্রা। পায়ের নীচে বাহন শ্বেতসিংহ, কোনও অসুরের মূর্তি নেই। মর্মর পাথরের সিংহাসনে দেবী অধিষ্ঠিতা। দেবীর দুই পাশে নকশা করা দশমহাবিদ্যার রূপ।
এই মন্দিরে একটি কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তিও রয়েছে যেটির অবস্থান দেবীর বাম দিকে। মূর্তিটিকে বাসুদের জ্ঞানে পূজা করা হয়। মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় পৌনে তিন ফুট, প্রস্থে দেড় ফুট। মূর্তিটি সত্যই দৃষ্টিনন্দন। খুঁটিয়ে দেখলে চোখে পড়বে ডানা প্রসারিত গরুড়ের ওপর প্রস্ফুটিত পদ্মাসনে দণ্ডায়মান চতুর্ভুজ বিষ্ণু। বিষ্ণুর হাতে ধরা রয়েছে যথাক্রমে গদা পদ্ম চক্র ও শঙ্খ। কানে, গলায় নানাবিধ অলংকার, মাথায় মুকুট। মূর্তির দুই পাশে ভিত্তির ওপর খোদিত নকশা। নিঃসন্দেহে এটি প্রস্তর শিল্পের একটি সুন্দর নিদর্শন। তারাপদ সাঁতরার মতে, আনুমানিক এগারো শতকের এমন একটি সুগঠিত পুর্ণাবয়বা মূর্তির নিদর্শন হাওড়া জেলায় একান্তই বিরল।
এই দেবীর নিত্যসেবার নিয়ম হল সকাল দশটায় পূজা, বারোটায় ভোগ, সন্ধ্যাকালে শীতল এবং আরতি। ভোগে মাছ আবশ্যক। দেবীর মূল উৎসব হয় শ্রীরামনবমীর ঠিক এক মাস পরে বৈশাখ মাসের সীতা নবমীতে। দেখার মতো উৎসব। পূজার তিন দিন আগে থেকে কুড়িজন পণ্ডিত চণ্ডীপাঠ করেন। মূল মন্দিরে দু’জন, জগমোহনে দু’জন, নাটমণ্ডপে দু’জন এবং বাঁধানো চত্বরে প্যান্ডেলের নীচে চোদ্দোজন সমাবেতভাবে স্তোত্রপাঠ করেন ও হোমযজ্ঞও হয়। সন্ধ্যায় বাজি পোড়ানো হয় এবং বহু লোক সমাগম হয়। পরের দিন অন্নকূট উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

অন্নকূট উৎসব ১৩৪৭ সনে গ্রামের অধিবাসীদের সন্মিলিত উদ্যোগে শুরু হয়েছিল। অন্নকূটে ভোগ নিবেদনের পদ্ধতিটিও দর্শনীয়। নাটমণ্ডপে মূল ভোগ চূড় করে রাখা হয় দেবীর জিহ্বা সমান যাতে করে তিনি গর্ভগৃহ থেকে সরাসরি দৃষ্টি দিতে পারেন। মণ্ডপের সিলিংয়ে একটি ঘি-ভর্তি স্টিলের পাত্র ঝোলানো থাকে। তার তোলার ছোট ছিদ্র দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঘি পড়তে থাকে। বর্তমানে তার ওপরে বৈদ্যুতিক আলো নিক্ষেপ করে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। এই উপলক্ষ্যে মেলা বসে এবং সপ্তাহব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে।
সিংহবাহিনী মন্দিরের উত্তর-পূর্বে বালিয়া বাজার এলাকায় স্বয়ম্ভু শিব পিপুলেশ্বরের মন্দির অবস্থিত। মন্দিরটি সপ্তরথ শিখর বিশিষ্ট। স্থাপত্যের বিচারে মন্দিরটি উনিশ শতকের শেষ দিকে নির্মিত বলে অনুমান।
হাওড়ায় রাত্রিবাস করে জায়গাগুলি দেখে নেওয়া সুবিধার হবে।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More