বর্ধমানের সাপের দেশে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

বর্ধমান-কাটোয়া রাস্তায় একটি ব্যস্ত জনপদ নিগন। এখান থেকে বাবলাডিহি হয়ে একটি রাস্তা মঙ্গলকোট চলে গেছে। এই অঞ্চলের মণ্ডা খুব বিখ্যাত। এখানে রাজা চন্দ্রসেনের ঢিপি আছে। এলাকাটি প্রত্নসমৃদ্ধ। মূল রাস্তা ছেড়ে গ্রামের মধ্যে নিগমেশ্বর শিবলিঙ্গ আছে। শান্ত পরিবেশে গ্রামের মধ্যে মন্দিরের অবস্থানটি বেশ মনোরম। শিবরাত্রি, গাজন প্রভৃতি উৎসব হয়। হুগলি জেলার তেলিনিপাড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় জমিদাররা ঠাকুরের নামে কয়েক বিঘা জমি উৎসর্গ করেছিলেন। এই শিবলিঙ্গ ক্ষীরগ্রামের মা যোগদ্যার অন্যতম রক্ষক।
কাটোয়া-বর্ধমান বাসে নিগন স্টপে নেমে পশ্চিম দিকের রাস্তা ধরে বাবলাডিহি গ্রামে পৌঁছানো যায়। এখান থেকে মেঠোপথ ধরে যাওয়া যায় শঙ্করপুর গ্রামে। নতুনহাট বাসে নপাড়া স্টপে নেমে কিছুটা পূর্বে এগোলেই গ্রামটি পাওয়া যাবে।

এই গ্রামের খ্যাতির উৎস হল ‘ন্যাংটেশ্বর বিগ্রহ’। শিবরূপে ন্যাংটেশ্বরের নিত্যপূজা হয় এবং শিবরাত্রি উপলক্ষ্যে মেলা বসে। ন্যাংটেশ্বর শিব আসলে কালোপাথরে খোদিত ৩ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট দিগম্বর তীর্থঙ্কর। মূর্তিটি সদানন্দ নামক এক ব্রাহ্মণ মঙ্গলকোটের একটি পুকুরে পেয়েছিলেন। মতান্তরে, মূর্তিটি অজয়ের ভেতর থেকে পাওয়া। জৈন তীর্থঙ্কর শান্তিনাথ শঙ্করপুরে ‘ন্যাংটেশ্বর’-এ রূপায়িত হয়েছেন। প্রাচীন মন্দির ভেঙে যাওয়ার সাঁওতানিবাসী জমিদার প্রয়াত রাধাবল্লভ কোঙার নিজ ব্যয়ে দেবগৃহ নির্মাণ করে দেন। চৈত্র মাসে গাজন উৎসব মহা সমারোহে পালিত হয়ে আসছে।

গ্রামে মনসা পূজা প্রতি বছর আষাঢ় মাসের প্রথম পঞ্চমীতে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামে দুটি বিষ্ণুমন্দিরের মধ্যে একটি প্রাচীন ও টেরাকোটায় সজ্জিত।

ছোট পোষলা

পোষলা গ্রামটি নিতান্ত সাদামাঠা হলেও বৈচিত্র্যে ভরপুর। গ্রামটিতে জীবন্ত সাপের অবস্থান ও বিচরণ অন্যতম বিস্ময়কর ব্যাপার। এই ছোট পোষলা ছাড়াও মঙ্গলকোট থানার আরও দুটি গ্রাম মুসুরি, পলসোনা ও বর্ধমান সদর উত্তর মহকুমার ভাতাড় থানার বড় পোষলা গ্রামে আকারে বৃহৎ ও অত্যন্ত বলশালী ঝাঁকলাই নামক এক শ্রেণির সাপেদের অনায়াস বিচরণ কৌতূহলের উদ্রেক করে। সংলগ্ন গ্রামগুলি কাটোয়া-বর্ধমান রাস্তার পশ্চিমে বলগোনার কাছে অবস্থিত।

বর্ধমান জেলায় শিব, ধর্মঠাকুর ও দেবী চণ্ডীর সঙ্গে লৌকিক দেবী মনসা বহুকাল ধরে পূজা পেয়ে আসছেন। এই জেলায় মনসা বিভিন্ন নামে বিভিন্ন গ্রামে অধিষ্ঠাতা আছেন। কোথাও তিনি বিষহরি, কোথাও আবার কর্কটনাগ, নন্ননাগ ও জগৎগৌরী রূপে তিনি পূজিতা। ছোট পোষলা গ্রামে তিনি ঝঙ্কেশ্বরী বা ঝাঁকলাই নামে পূজা পেয়ে আসছেন।
কেন তিনি ঝঙ্কেশ্বরী তার কোনও প্রামাণ্য ইতিহাস নেই। তবে লোকমুখে যেটুকু শোনা যায় তা হল, এই গ্রামগুলি বর্তমান ধৈঞ্চা পরগনায় অবস্থিত। ধৈঞ্চা পরগনার প্রাচীন নাম ছিল ঝঙ্ক, তাই হয়তো দেবী ঝঙ্কেশ্বরী।

ছোট পোষলা গ্রামের মধ্যস্থলে দেবীর এক বিরাট মন্দির রয়েছে। মন্দিরের চারপাশে সাপ খোদিত রয়েছে। অভ্যন্তরে দেবীর মূর্তি কালোপাথরের। বংশপরম্পরায় দেবীর পূজারী চক্রবর্তী পদবিধারী ব্রাহ্মণরা। তাঁদের এবং গ্রামবাসীদের কাছ থেকে জানা যায় যে, এই চারটি গ্রামে যত্রতত্র চৈত্র মাস থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত জীবন্ত সাপেরা নির্বিবাদে ঘোরাফেরা করে। এদের বলা হয় ঝাঁকলাই। আকৃতি গোখরো সাপের মতো কিন্তু প্রকৃতিতে নয়। লম্বায় তিন-চার হাত, ফণাধারী, পদ্মের চিহ্ন এদের মাথায় নয়, ঘাড়ে আছে। প্রকৃতি ধীরস্থির, স্লথগতি, কিছুটা নিস্তেজ ধরনের। সচরাচর এরা কাউকে কামড়ায় না কিন্তু যদি কখনও কামড়ায় ও বিষ ঢালে তাহলে তারপরেও বিষক্রিয়ায় কেউ মারা গেছে এমন খবর পাওয়া যায় না। এ এক পরম বিস্ময়। গ্রামবাসীরা দেবী বিবেচনায় এদের মারে না, এমনকী স্পর্শ পর্যন্ত করে না। হয়তো কারও শোবার খাটে সাপ শুয়ে রয়েছে, সরানোর দরকার পড়লে মন্দিরের পুরোহিত এসে লাঠি দিয়ে সরিয়ে দেবেন।

সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, এই ঝঙ্কেশ্বরী বা ঝাঁকলাই মনসামঙ্গলে বর্ণিত বিষধর কালনাগিনী যার কামড়ে লখিন্দরের মৃত্যু হয়েছিল। সতী বেহুলার অভিশাপে সে নির্বিষ হয়। ঠিক কবে থেকে মানুষজন এই সাপেদের সর্পদেবী হিসাবে পুজো করতে শুরু করল তা কেউ সঠিক বলতে পারে না। তবে শোনা যায়, মুসারু গ্রামের অধিবাসী মুরলীমোহন চক্রবর্তী মহাশয় স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে বঙ্গাব্দ দশম শতাব্দীর প্রথম ভাগে পূজা শুরু করেন।

গ্রামগুলিতে এ পর্যন্ত অনেক সর্পবিজ্ঞানী এসেছেন এবং সাপগুলিকে দেখে গেছেন। জিএসআই-এর কলকাতা শাখার ডি পি সান্যাল ১৯৯২ সালের অক্টোবরে সাপ্তাহিক বর্তমানের এক প্রতিবেদনে লেখেন, ‘গ্রামগুলির প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কেউটে সাপের এমন অবাধ বিচরণ এবং মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বসবাসের ঘটনা ভারতের অন্য কোথাও ঘটে বলে আমার জানা নেই। বিগত ৩৩ বছর ধরে সাপ নিয়ে নাড়াচাড়া করছি কিন্তু এমন নজিরবিহীন ঘটনা আগে দেখিনি।’

ঝঙ্কেশ্বরীকে সর্পদেবী হিসেবে মানা হলেও মনসার সঙ্গে পূজার রকমফের আছে। আষাঢ় মাসে কৃষ্ণা প্রতিপদেই একমাত্র ঝঙ্কেশ্বরী দেবীর পূজা হয়। মনসা পুজোয় ধূপধুনোর ব্যবহার একেবারেই নিষিদ্ধ কিন্তু এখানে পূজার বিশেষ উপকরণ ধূপধুনো। পূজার নৈবেদ্য বা উপাদানের মধ্যে দুধ, কলা, চিঁড়ে ও সন্দেশের সঙ্গে একটুকরো উচ্ছে দেওয়া হয়। প্রসাদ মুখে দেওয়ার আগে উচ্ছের টুকরোটি খাওয়াই হল রীতি। বাৎসরিক পূজার সময় শাক ও কলাইয়ের ডাল আহার করা নিষিদ্ধ। বাৎসরিক পূজা উপলক্ষ্যে বিশেষ উৎসব ও মেলা বসে। মেলার সময় নানা স্থান থেকে ঝাঁপানের দল আসে। জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দুরা অবাধে এই পূজায় অংশগ্রহণ করেন। নির্দিষ্ট চারটি গ্রামে ঝাঁকলাই দেবীর পূজা ছাড়া অন্য কোনও পূজা সাড়ম্বরে হয় না।
আরও একটি বিষয় বলা দরকার যে, এই সাপেদের অবস্থানের জন্য কোনও বিষধর সাপ এখানে দেখতে পাওয়া যায় না।
বর্ধমানে রাত্রিবাস করে এগুলি দেখে নেওয়া সুবিধার হবে। রাত্রিবাসের ঠিকানা : পান্থশালা, তিনকোনিয়া বাসস্ট্যান্ডের কাছে, দূরভাষ : ০৩৪২ ২০৪০১৯৫।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More