বক্রেশ্বর ও পাথরচাপুড়ি

বক্রেশ্বরের মহিমা নানান কিংবদন্তিতে ভরা হলেও যে জন্য আজও মানুষ বক্রেশ্বর ছুটে যান তা হল উষ্ণ প্রস্রবণ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

    শৈব, বৈষ্ণব ও শাক্ত মতবাদের মিলনক্ষেত্র বক্রেশ্বর যেমন একদিকে বক্রনাথ শিব ও মহিষমর্দিনী দেবীর জন্য বিখ্যাত আবার অন্যদিকে উষ্ণজলের সতত প্রবাহিত প্রস্রবণের জন্যও তার খ্যাতি। বোলপুর, দুবরাজপুর থেকে বাসে সরাসরি বক্রেশ্বর যাওয়া যায় তবে সিউড়ি থেকে অল্প সময়ে মাত্র ১৮ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বক্রেশ্বর যাবার জন্য ঘন ঘন বাস পাওয়া যায়। বক্রেশ্বর এক অনাবিল আনন্দের কেন্দ্র। দুই পবিত্র নদী বরুণা ও অসি দ্বারা যেমন বারানসি বেষ্টিত, তেমনই পাপহরা ও বক্রেশ্বর নামে দুই পুণ্যতোয়ার মাঝে মহাতীর্থ বক্রেশ্বর অবস্থিত। বক্রেশ্বরের মহিমা নানান কিংবদন্তিতে ভরা হলেও যে জন্য আজও মানুষ বক্রেশ্বর ছুটে যান তা হল উষ্ণ প্রস্রবণ।

    উষ্ণ প্রস্রবণ-– বক্রেশ্বর মন্দিরের পাশাপাশি অষ্টকুণ্ডের (খর-ভৈরব-অগ্নি-জীবন-সৌভাগ্য-ব্রহ্মা-সূর্য-বৈতরণী) অবস্থান। আশ্চর্যের বিষয় কুণ্ডগুলি পাশাপাশি অবস্থান করলেও বিভিন্ন কুণ্ডের জলের তাপমাত্রা ভিন্ন ভিন্ন। অগ্নিকুণ্ড ব্যতীত অন্যান্য কুণ্ডের জলের তাপমাত্রা ৩৬০ থেকে ৭২০ সেলসিয়াস পর্যন্ত। অগ্নিকুণ্ডের জলের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি-– ৭২০ সেলসিয়াস হলেও চাল ফেলে দিলে ভাত হয় না। অগ্নিকুণ্ডটি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, এর জলে অনবরত হিলিয়াম গ্যাস বেরোচ্ছে। চারিদিকে ডিম সেদ্ধর মতো গন্ধ। বর্তমানে ভারত সরকারের আণবিক পরীক্ষা বিভাগ এখান থেকে হিলিয়াম গ্যাস সংগ্রহ করছে। কুণ্ডটি তাদের তত্ত্বাবধানে সুন্দরভাবে রক্ষিত। কাউকে জলের কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয় না। ওপর থেকে দড়িতে ঘটি বা বালতি ঝুলিয়ে জল তুলে নিয়ে বোতলে ভরে ‘তীর্থসলিল’ নামে বিক্রি হয়। বহু রোগ, বাত-ব্যাধি, হাঁপানি এমনকি অম্বলও নাকি ভাল হয়ে যায় এই জল খেলে।

    কুণ্ডগুলির জল কাচের মতো পরিষ্কার, গভীরতা দেড়-দু’হাতের বেশি। শীতল সরোবরের ঘাট বাঁধানো–- মকরমুখ থেকে গরমজল ঝরে পড়ছে। মহিলা ও পুরুষদের আলাদাভাবে স্নানের ব্যবস্থা রয়েছে। তেল ও সাবান মাখা নিষিদ্ধ। কুণ্ডসমূহের জল পাপহরা নদীতে পড়ে বক্রেশ্বর নদের সঙ্গে মিশে গেছে।

    বক্রেশ্বর ধাম-– কুণ্ডগুলি ছেড়ে কয়েক পা এগোলেই বক্রেশ্বরনাথের মন্দির। মন্দিরটি বেশ বড়। মন্দিরের আদলটি বাংলার মন্দিরের মতো নয়, জগমোহনসহ ওড়িশার রেখ-দেউল রীতিতে নির্মিত। মন্দিরের গর্ভগৃহে ধাতুমণ্ডিত শিলাটি অষ্টাবক্রমুনির, পাশে গৌরীপটের নীচে ছোট শিলাটি বক্রেশ্বর মহাদেবের। অষ্টাবক্রমুনি নাকি এখানে শিবের আরাধনা করেন। তপস্যায় তুষ্ট শিবের আশীর্বাদে মুনি আরোগ্য লাভ করেন। সেই থেকে মুনির সাধনপীঠ বক্রেশ্বর হয়ে ওঠে সিদ্ধপীঠ বক্রেশ্বর। মহাদেব নাকি তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন-– এই তীর্থে আজ থেকে তোমার পুজোর পর ভক্তেরা আমার অর্চনা করবে এবং তোমার নামেই এখানে হবে আমার স্থিতি। ভগবান নিজে ছোট হয়ে ভক্তকে বড় করে তোলার এমন সুন্দর উদাহরণ খুব কমই আছে।

    সুবৃহৎ বক্রনাথ শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে চারিদিকে বিভিন্ন আকারের অসংখ্য শিবমন্দির আছে। এগুলির বেশিরভাগ বাংলা চারচালা মন্দির। একস্থানে একত্রে এত ছোট, বড়, মাঝারি শিবমন্দিরের সমাবেশ পশ্চিমবঙ্গে অন্যত্র কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। এত মন্দিরের সমাবেশ দেখে সাহিত্যিক বিনয় ঘোষ বক্রেশ্বরকে ‘দেবতার গ্রাম’ বলে উল্লেখ করেছেন।

    মহিষমর্দিনী মন্দির-– বক্রেশ্বরনাথ মন্দিরের ডান দিকে হল দশভুজা মহিষমর্দিনীর মন্দির। মূর্তিটি ছোট এবং পিতলের। একান্ন পীঠের মধ্যে বক্রেশ্বর একটি মহাপীঠ। এই পীঠস্থানের উল্লেখ আছে পীঠমালা, কালিকা পুরাণ এবং তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থে-–
    “বক্রেশ্বরে মনঃপাত বক্রনাথস্থ ভৈরবঃ
    নদী পাপহরা তত্র দেবী মহিষমর্দিনী।’’

    বক্রেশ্বরে পড়েছে সতীর ভ্রূ-সন্ধি বা মনঃস্থান। মহামায়া সতী এখানে মহিষমর্দিনী নামে বিরাজিতা। ভৈরব বক্রনাথ। মন্দিরটি অত্যন্ত সাধারণ। অনেকেই মনে করেন এই মূর্তি প্রকৃত পীঠদেবী নয়, কারণ সমস্ত পীঠস্থান দেবীঅঙ্গ বা দেবীমূর্তি বলে যে প্রতীককে তুলে ধরা হয় তা প্রস্তরীভূত। তবে জনশ্রুতি, কালাপাহাড়ের আক্রমণের সময় পূজারীরা আসল পাথরের মূর্তিটিকে পুকুরের জলে ফেলে দেন। পরে বিগ্রহটি তুলে পাশের গ্রামে ডিহি বক্রেশ্বরে নিয়ে যান কারণ ততদিনে বক্রেশ্বরের ধাতুমূর্তিটি স্থাপিত হয়ে গেছে।

    পাপহরা নদী-– ক্ষীণস্রোতা পুণ্যতোয়া পাপহরা নদী বয়ে যাচ্ছে মন্দিরের পিছনে শ্মশানের পাশ দিয়ে। পাশেই অক্ষয়বট, যে বটের ঝুরি নদীর ওপাশ পর্যন্ত বিস্তৃত। গাছের ছায়াছন্ন পরিবেশ গা ছমছম করা। অক্ষয়বট নীচে রয়েছে কালাপাহাড়ের হাতে বিনষ্ট করা হরগৌরীর সুন্দর মূর্তি। বিপরীতে মহাপ্রভু নিত্যানন্দের স্মৃতিমন্দির। জনশ্রুতি, শৈবধাম দর্শন হেতু নিত্যানন্দ এখানে এসেছিলেন। এই মন্দিরে নিত্যানন্দ প্রভুর পদচিহ্ন খোদিত শিলা স্থাপিত রয়েছে।

    মহিষমর্দিনী মন্দিরের দক্ষিণে ক্ষেত্রপাল বটুক ভৈরবের মন্দির অবস্থিত। এছাড়া, দর্শনীয় মন্দিরের মধ্যে অন্যতম হল ‘হরিশ্বরী কালী মন্দির’। খানিকটা হেঁটে গেলেই বৈতরণী নদী। নদীর পাড়ে মহাশ্মশান ও দেবী রুদ্রচণ্ডীর মন্দির। গুহ্যতান্ত্রিক সাধনার স্থান হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই বক্রেশ্বরের খ্যাতি রয়েছে। এখানকার মহাশ্মশানে কত প্রসিদ্ধ সাধক যে সিদ্ধিলাভ করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাধক হলেন অঘোরীবাবা। অঘোরীবাবার সমাধিটি মহাশ্মশানের মধ্যস্থলে অবস্থিত। এছাড়া আছে খাকিবাবা এবং প্রমথ চক্রবর্তীর সমাধি। বস্তুত, শ্মশানের কাছে-ভিতে আরও অনেক সাধকের সমাধি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

    তীর্থক্ষেত্র, মন্দির, নদী, শ্মশান, উষ্ণ প্রস্রবণ এসবের মোহ না থাকলে বক্রেশ্বর গ্রাম নিজেই নিজের পরিচয়। সুন্দর, শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনের টলটলে ছবি নিয়ে বক্রেশ্বর সদাই প্রস্তুত দর্শনার্থীদের জন্য। অজস্র হোটেল, থাকার কোনও অসুবিধা নেই। খাওয়াদাওয়ার রেট অবিশ্বাস্য রকমের কম। ফাল্গুনের শিব চতুর্দশীতে বক্রনাথ শিব ও চৈত্রের শিবরাত্রি বক্রেশ্বরের বরণীয় উৎসব। উৎসবের সময় মেলা বসে এবং বহু দূরদূরান্ত থেকে যাত্রীদের আগমনে বক্রেশ্বর গমগমিয়ে ওঠে।

    পাথরচাপুড়ি

    বক্রেশ্বর থেকে কাছে, সিউড়ি থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে পাথরচাপুড়ি দাতাবাবার জন্য বিখ্যাত। দাতাবাবা মেহবুব শাহওয়ালি বড় দানী ছিলেন, অকাতরে তিনি সব দান করতেন বলে তিনি দাতাবাবা-– ভক্তদের এমনটাই বিশ্বাস। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কুসমাশুল গ্রামে আসেন দাতাবাবা, সেখান থেকে আসেন পাথরচাপুড়িতে। তাঁর বংশপরিচয় আজও সঠিক জানা যায়নি। কারও মতে তিনি ব্রাহ্মণ সন্তান, কেউ বলেন তিনি বাঁকুড়া বা নদীয়া জেলার কৃষক সন্তান, আবার কেউ বলেন তিনি ছিলেন সিপাহি বিদ্রোহের পলাতক সৈনিক। তিনি মারফতি সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে পাথরচাপুড়িতে আসেন ১৮৬৫-৬৭ সালে। কঠোরভাবে তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতেন। আদমসুমারির সময় নিজের নাম বলেছিলেন ‘মেহবুব শাহ’।

    দাতাবাবা যখন পাথরচাপুড়িতে আসেন তখন এই অঞ্চল ছিল জঙ্গলাকীর্ণ ও অশিক্ষা-কুশিক্ষায় ভরা। এখানে এসেই তিনি একটি মাদ্রাসা চালু করেন। চাঁদপুরের মৌলানা সিরাজুল মনির হায়দরাবাদ থেকে এসে মাদ্রাসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষ ছাড়াও বহু জ্ঞানী-গুণী ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব দাতাবাবার কৃপা লাভ করেছিলেন। বর্ধমানের জমিদার বনবিহারীবাবু দাতাবাবার কৃপাপ্রার্থী হয়ে পিরের সমাধিক্ষেত্রের জমি দান করেছিলেন। ১২৯৮ সালের ১০ চৈত্র দাতাবাবা দেহ রাখেন। কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনের ডক্টর আবদুল আজিজ সর্বপ্রথম দাতাবাবার মাজার তৈরি করেন। মৃত্যুবার্ষিকীতে অসংখ্য মানুষের আগমন উপলক্ষ্যে ১৯১৮ সালে জেলাশাসক গুরুসদয় দত্ত একটি মেলা কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির প্রথম সভাপতি হন সেকেড্ডার জমিদার খান বাহাদুর। খান বাহাদুর প্রথম এ মেলার পত্তন করেন।

    বর্তমানে বাসস্ট্যান্ডের কাছে সুদৃশ্য তোরণদ্বার, ৩০ বিঘের মতো জায়গায় সুদৃশ্য সৌধ নিয়ে দাতাবাবার মাজার। কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয়ে পানীয়জলের ব্যবস্থা, যাত্রীনিবাস, অতিথিনিবাস, দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র প্রভৃতি তৈরি হয়েছে। ট্রাস্টির সহায়তায় আল-আমীন মিশনের শাখা বিদ্যালয় গড়ে উঠতে চলেছে এই তীর্থক্ষেত্রে। দাতাবাবা এস্টেটের এখন ৭০ বিঘে চাষের জমি আছে, মেলা থেকে আয় হয় ভালই, নগদের পরিমাণও প্রায় ৫০-৬০ লক্ষ টাকা। বর্তমানে এখানের মনোরম সুন্দর পরিবেশকে আরও সুন্দর করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তর গ্রামের মানুষ আর বহু মানুষের সমাগমের সুবিধার্থে মাজার সংলগ্ন পুকুরটিকে সৌন্দর্যায়নের মাধ্যমে আরও মনোরম করে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।

    দাতাবাবার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রতিবছর ১০-১২ চৈত্র তিন দিনের মেলা বসে। হিন্দু-মুসলমানের সন্মিলিত উপস্থিতি কয়েক লক্ষ। আসেন সুফি, ফকির সহ বহু পুণ্যার্থী আর আসেন শয়ে শয়ে কুষ্ঠ রোগী। আসেন নানান ক্রেতা-বিক্রেতা, এটি বীরভূমের বড় মেলারগুলির অন্যতম। মেলার সময় মাজারে লক্ষাধিক চাদর চাপান ভক্তেরা, ভক্তদের দানের টাকা গোনার জন্য লোক নিয়োগ করতে হয়। দাতাবাবার উরসে সাত বার যেতে পারলে হজ করার সমান পুণ্যলাভ করা যায় বলে মুসলমান সমাজের অনেকে বিশ্বাস করেন। দাতাবাবার কাছে এলে কুষ্ঠ রোগ সারে, মনের নানান ইচ্ছাপূরণ হয়, সন্তানহীনা সন্তান লাভ করেন, মৃতবৎসার সন্তান বাঁচে। তাছাড়া পাথরচাপুড়িতে গেলেই নাকি পুণ্য হয়, তাই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ দাতাবাবার কাছে যান আর পাথরচাপুড়ি এই ক’দিনের জন্য এক মহাতীর্থে পরিণত হয়।

    পাথরচাপুড়িতে সুন্দর অতিথিনিবাস তৈরি হয়েছে, এখানেও রাত্রিবাস করা যেতে পারে। সিউড়িতে রাত্রিবাস করে দেখে নেওয়া সুবিধার হবে। সিউড়ির অভিনন্দন লজ, হেড পোস্ট অফিসের কাছে, দূরভাষ: ০৩৪৬২ ২৫৬৪১০।

    কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

    পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More