আদরের শুশুনিয়া

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

বাঁকুড়া জেলার ছাতনা থানার অন্তর্গত ছোট্ট, সুন্দর, সবুজ বনাঞ্চলে মোড়া শুশুনিয়া পাহাড়। বাঁকুড়া জেলার পাহাড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পাহাড় এটি। শুশুনিয়া আজ আর অপরিচিত নাম নয়, শৈলারোহণ শিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় পীঠস্থান। এখানে সারা শীতকাল জুড়ে চলে শৈলারোহণের প্রশিক্ষণ। কেবল শৈলারোহণ কেন্দ্রই নয়, এটি একটি অন্যতম উইক-এন্ড পর্যটন কেন্দ্রও বটে। প্রচুর পিকনিক পার্টি কলকাতা ও বাঁকুড়ার আশপাশের অঞ্চল থেকে পিকনিক করতে ছুটে আসে প্রতি বছর।

এবার শুশুনিয়ার একটু পরিচয় দেওয়া দরকার। বাঁকুড়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই পাহাড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪৪৩ ফুট বা ৪৪০ মিটার উঁচু, বিস্তৃতি প্রায় ৩ কিলোমিটার। বাঁকুড়া থেকে শুশুনিয়ার দূরত্ব ২২ কিলোমিটার। ছাতনা স্টেশন থেকে শুশুনিয়া যাওয়া যায়। ছাতনা ছাড়িয়ে এগোতে থাকলেই পাহাড়ের সবুজ চোখে ধরা পড়ে। আশপাশে আর কোনও পাহাড় বা টিলা নেই, কেবল উঁচু-নিচু রুক্ষ কাঁকুরে জমি। পাহাড়ের দক্ষিণ দিকে উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পুবে বয়ে গেছে গন্ধেশ্বরী নদী। গন্ধেশ্বরী ব্রিজ পেরিয়ে কিছুটা গিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ড। আরও একটু এগিয়ে গেলে গ্রাম পঞ্চায়েতের অতিথি ভবন ও যুব আবাস।

বাসস্ট্যান্ড থেকে একটা পথ চলে গেছে ‘ধারা’ পর্যন্ত অর্থাৎ চলতি কথায় ঝরনা পর্যন্ত। এখানে পাথরের তৈরি একটি সিংহের মুখ থেকে অবিরাম মোটা ধারায় জল পড়ে চলেছে। পাহাড়ের ভেতর একটি প্রাকৃতিক প্রস্রবণের জলকে স্থানীয় মানুষরা পবিত্র বলে মানেন এবং অধিকাংশ মানুষ সারা বছর এই জল পান করে থাকেন। এই জল নাকি শরীরের পক্ষে খুবই উপকারী। পানের জল ছাড়াও সমস্ত রকম পূজাপার্বণেও এই জল ব্যবহার করা হয়। ঝরনার কাছে, কিছুটা ওপরে, বেলগাছের নীচে পাথরে খোদাই সম্পূর্ণ সিঁদুরে লেপা একটি ৫ ফুট উচ্চতার শিলামূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। মূর্তিটির উপরিভাগে একটি সিংহমূর্তি খোদিত আছে বলে মনে হয়। সাধারণ মানুষ এটিকে নৃসিংহদেব জ্ঞানে পূজা করেন। ইতিহাসবিদগণ এটিকে একটি বীরস্তম্ভ মনে করেন। একটি চৌকো চাতালে রয়েছে পাথরের শিবলিঙ্গ, ছোট্ট বৃষমূর্তি আর সম্ভবত বৌদ্ধস্তূপের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। এগুলি সবই বেশ প্রাচীন।

পাহাড়ের কোলে গোপিনাথ ভবতারিণী আশ্রমের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৬২ সালে। স্বামী শক্তিদানন্দ মহারাজ এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৪ সাল থেকে সম্পূর্ণ বৈদিক মতে এখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই দুর্গাপূজার আকর্ষণীয় দিক হল নবমীর ‘কুমারী পূজা’। ওই দিন নরনারায়ণ সেবার ব্যবস্থাও করা হয় এবং প্রচুর মানুষের সমাগম হয়।
বাসস্ট্যান্ড থেকে ঝরনা পর্যন্ত ছোটখাটো একটি মেলার মতো থাকে প্রায় সারা বছর। পৌষ সংক্রান্তির পুণ্য স্নানে, মাঘোৎসবে, চৈত্রের বারুণী স্নানে কিংবা সারা শীতকাল ধরে দলে দলে মানুষের যাওয়া-আসা, বেচা কেনা, পূজা-স্নানে ঝরনাতলা গমগম করতে থাকে। কানের দুল, পুঁতির মালা, বাঁশের হাতি, ঘোড়া থেকে শুরু করে পাথরের নানা মূর্তি, থালা-বাটির দোকান, খাবারের দোকান, কাঠের জিনিস, প্লাস্টিক, স্টোন ডাস্টের দোকান-– সবই আছে। তবে শুশুনিয়ার নিজস্বতা বলতে পাথরের কাজই বোঝায়। তাই পাথরের তৈরি জিনিসের দোকানই বেশি।

শুশুনিয়া অঞ্চলে ‘পাথর কাটা’ বা ‘পাথুরিয়া’ নামে লোকশিল্পীদের বাস। তাঁরা পাথর কুঁদে লোকশিল্প ভাবনায় বৃত্তাকার ‘টুসুর আলো খেলা’ তৈরি করেন। তাতে টুসুর চোদ্দোটি প্রদীপ শিল্পশোভনভাবে বসানো থাকে। জীবিকার তাগিদে তাঁরা দুর্গা, কালীর সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদার অপরূপ মূর্তি ছেনি-হাতুড়ির সাহায্যে ফুটিয়ে তোলেন। অবাক হয়ে দেখতে হয় এক ইঞ্চির দুর্গামূর্তি, আধ ইঞ্চির গণেশ, যাদের পায়ের আঙুল থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সবই আছে। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত বেশ কিছু শিল্পী রয়েছেন শুশুনিয়ায়।

পাহাড়ে চড়ার মূল রাস্তাটা ধরার দিকে সামান্য এগিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠেছে। শুশুনিয়ার সর্ব্বোচ্চ শিখরে উচ্চতা ৪৪০ মিটার। প্রথমে পড়ে একটি ছোট চূড়া, তার থেকে সামান্য নেমে, আবার উঠে মূল শিখর। এই পাহাড়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অত্যধিক। এর উত্তর-পূর্ব কোণে রয়েছে প্রাচীন শিলালিপি। আজ থেকে ১৬০০ বছর আগে এই পাহাড় ছিল পুষ্কর্ণার অধিপতি চন্দ্রবর্মণের পাহাড়ি দুর্গ। তার প্রমাণ পাহাড়ের গায়ে গুহা আকৃতির খাঁজে খোদাই করা চক্র এবং তৎকালীন হরফের লিখন। চক্রটিকে ঘিরে রয়েছে ১৪টি রেখা, অগ্নিশিখার অনুকরণে। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন এটি বৌদ্ধচক্র হতে পারে।

লিপিটিকে টিনের চালা ও লোহার জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে। শুশুনিয়া পাহাড়ের উত্তর-পূর্বে দামোদর নদের তীরে পুষ্কর্ণা। সেই পুষ্কর্ণার রাজা চন্দ্রবর্মা। লিপিটির বাংলা করলে এই দাঁড়ায়–- পুষ্কর্ণার রাজা মহারাজ সিংহবর্মার পুত্র মহারাজ শ্রীচন্দ্রবর্মণ যিনি ছিলেন চন্দ্রস্বামীর দাস শ্রেষ্ঠ কোনও কীর্তি উৎসর্গ করলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এই চন্দ্রবর্মণ বা চন্দ্রবর্মা সম্ভবত সমুদ্রগুপ্তের সমসাময়িক। আবার দিল্লির মেহেরৌলি লৌহস্তম্ভের চন্দ্ররাজ ও এই চন্দ্রবর্মণ অভিন্ন বলা হয়ে থাকে। সেই পুষ্কর্ণাই আজকের পখন্না।

শুশুনিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সাড়ে তিন বা চার কিলোমিটার হাঁটাপথ। দু’পাশে সোনাঝুরি, শালের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যায়ে অল্প চড়াই ভেঙে পৌঁছে যাওয়া যাবে এই শিলালিপির সামনে। গাড়িতে একটু ঘুরপথে অনেকটা কাছাকাছি চলে যাওয়া যায়। পাশেই একটি সুন্দর আদিবাসী গ্রাম আছে। নামটিও ভারি মিষ্টি, শিউলিবনা। অতীতে নাকি এই এলাকায় শিউলি ও মহুয়া গাছের গভীর বন ছিল, তাই এই নাম। এই গ্রামটির অবস্থান শিলালিপির কাছেই। বর্তমানে একটি সুন্দর মোরাম পথ শিলালিপির কাছ পর্যন্ত তৈরি হয়েছে। এখানে ভালুক, ভরতপুর, মারাংঢেরি নামের কিছু গুহা আছে।

শুধু ইতিহাস নয়। পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব ও জীবতত্ত্বের দিক থেকে এই অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। এই পাহাড়কে কেন্দ্র করে মোটামুটি একশো বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে অসংখ্য প্রত্নাশ্মীয় আয়ুধ। প্রাগৈতিহাসিক পেলিয়োলোক্সোডন হাতির জীবাশ্ম ও আরও নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম। শুশুনিয়া অঞ্চলে আবিষ্কৃত আদি-প্রস্তর যুগের প্রায় দুই হাজার হাতিয়ার এই অঞ্চলের ইতিহাস জানতে সাহায্য করেছে।

ঝরনাতলা থেকে পাহাড়ের মাথায় উঠতে ৩০-৪০ মিনিট সময় লেগে যায়। চূড়া থেকে নজরে পড়ে পূর্ব দিকে বিস্তৃত শুশুনিয়া পাহাড়শ্রেণি। শীতকালে পর্বত অভিযাত্রীদের শিক্ষণ দেখা আর এক অভিজ্ঞতা। নীচে নানা রঙের তাঁবু দেখতে দারুণ লাগে। পথপ্রদর্শকের সাহায্যে গুহালিপির প্রান্ত থেকে ঝরনাতলায় কিংবা উল্টো দিকে ‘ট্রান্স শুশুনিয়া’ অভিযানও করা যায়।
সময় থাকলে শুশুনিয়া মোড় থেকে লালমাটির পথে এক কিলোমিটার দূরে শুশুনিয়া গ্রামেও ঘুরে আসা যায়। এই গ্রামেই রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পীরা থাকেন। শুশুনিয়ার দক্ষিণে পারুলিয়া গ্রামে নির্মিত পাথরের বাসনপত্র ও শিলনোড়া খুবই বিখ্যাত। এছাড়া, বঁড়শি শিল্পও প্রসিদ্ধ।

মুরুৎ বাহা ইকো পার্ক : শুশুনিয়া পাহাড়ের কোলে বিশাল এলাকা নিয়ে দৃষ্টিনন্দন এক পার্ক গড়ে উঠেছে। নামটিও দারুণ–মুরুৎ বাহা ইকো পার্ক অর্থাৎ পলাশ ফুল ইকো পার্ক। পার্কের মধ্যে কেয়ারি করা বাগানে নানাবিধ ফুলগাছ ছাড়া রয়েছে নয়টি বিলাসবহুল কটেজ। পলাশের মধ্যে থাকার আনন্দই আলাদা। চারিদিক ফাঁকা হওয়াতে প্রচুর হাওয়া ও দৃষ্টি কোথাও বাধাপ্রাপ্ত হয় না। এর ভেতরে গড়ে উঠেছে আর্ট গ্যালারি, রয়েছে স্ন্যাক্স বার। কটেজগুলি খুব শীঘ্রই চালু হবে।

ছাতনা

বাঁকুড়া স্টেশনের পরবর্তী স্টেশন ছাতনা। বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার পথে পড়ে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ এই গ্রাম। গ্রামের খ্যাতি প্রধানত প্রাচীন বাঙালি কবি বড়ু চণ্ডীদাসের জন্য। কথিত আছে, একদা ছাতনা ছিল সামন্তভূমের রাজধানী। ছাতনার নামকরণ নিয়ে অনেক মত প্রচলিত আছে। যেমন, শ্রীক্ষেত্র তীর্থযাত্রী জনৈক রাজপুত ছাতনায় রাজধানী স্থাপন করে রাজকার্য পরিচালনা করতেন। ক্ষত্রিয় অর্থাৎ ছত্রিদের নগর ছিল বলে নাম হয় ছত্রিনগর। পরে সেটাই অপ্রভংশ হয়ে ছাতনা হয়েছে বলে অনেকে অনুমান করেন। আবার মতান্তরে, এই অঞ্চলে অতীতে ছাতিম গাছের বন ছিল বলে গ্রামের নাম ছাতনা হয়েছে।

এখানে ছিল বিশালাক্ষী বা বাসুলী দেবীর মন্দির। রাজা হাম্বীরের স্বপ্নাদিষ্ট এই বাসুলী দেবীই ছিলেন বড়ু চণ্ডীদাসের আরাধ্য দেবী। তিনি ছিলেন এই মন্দিরের পুরোহিত। বর্তমানে যে মন্দিরটি দেখতে পাওয়া যায় সেটি আদি মন্দির নয়। আদি মন্দিরের ভিতের ওপর গড়ে উঠেছে বর্তমানের নতুন মন্দির যেটি আকারে ছোট, উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট। এই মন্দিরের প্রধান উৎসব বাসুলী দেবীর বার্ষিক পূজা ও গাজন উৎসব। বার্ষিক পূজা হয় প্রতি বছর চৈত্র-শুক্লা সপ্তমী তিথিতে। মন্দিরের পেছনেই রয়েছে রাজবাড়ি সংলগ্ন ধ্বংসস্তূপ।

চণ্ডীদাসের আসল পরিচয় নিয়ে যতই মতবিরোধ থাক, ছাতনা কিন্তু চণ্ডীদাসকে ভোলেনি। মোড়ের মাথায় চণ্ডীদাসের একটি মর্মরমূর্তি রয়েছে যার নীচে লেখা সেই শাশ্বত বাণী-– ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তার উপরে নাই’। বাসুলী দেবীর বার্ষিক পূজার সময় চণ্ডীদাসের জন্মোৎসবও পালিত হয় মহাসমারোহে। এই মূর্তি থেকে কিছুটা গেলেই বাসুলী দেবীর অন্য একটি মন্দির রয়েছে। ছাতনায় আর একটি দারুণ দ্রষ্টব্য জিনিস রয়েছে। তা হল ছাতনার বীরস্তম্ভ। বাঁকুড়া-ছাতনা-শালতোড়া হাইরোডের ধারে নতুন বাসুলী মন্দিরের কাছে বড়জোর ঘটি ডোবে এমন এক পুকুরের পশ্চিম পাড়ের মাটিতে বসানো আছে তিনটে বুকসমান উঁচু প্রাচীন প্রস্তরখণ্ড। প্রস্তরখণ্ডের গায়ে যুদ্ধরত মানব মূর্তি। পণ্ডিতদের মতে, প্রাচীন ‘মেগালিথিক’ বা প্রস্তর স্মৃতিস্তম্ভ।
ইতিহাস, সাহিত্য, পুরাকীর্তি, গ্রামীণ সৌন্দর্য সব কিছু নিয়ে ছাতনা সত্যি সুন্দর এবং বৈচিত্র্যময়। পর্যটকদের হতাশ হতে হবে না ছাতনা ঘুরতে গেলে।
শুশুনিয়ায় রাত্রিবাসের ঠিকানা-– আরণ্যক গেস্ট হাউস, চলভাষ : ৯৪৩৪৬৫১১৮৮, ৯৬৩৫২৩৩০৪০।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More