অরণ্য ঘেরা ছেঁদাপাথর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এখন ঘরের বাইরে বেরোতেও মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। শুয়ে, বসে, গার্হস্থ্যকর্ম সেরেও সময় যেন কাটছে না। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।

বাঁকুড়া থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে হলেও রানিবাঁধ থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে ছেঁদাপাথর গ্রাম। অরণ্য, পাহাড়, জলাশয় নিয়ে ছেন্দাপাথর কথ্য ভাষায় ছেঁদাপাথর। এক অপরূপ লাবণ্যময়ী গ্রাম। গ্রামের সৌন্দর্য পাগল করা। কেবলমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই এই গ্রামের অলংকার নয়, এই গ্রাম গর্ব করতে পারে এর ইতিহাসের জন্য। সে ইতিহাস বিনা চর্চায় খানিকটা বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেলেও পুরোপুরি গরিমা হারায়নি। কারণ এই গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপ্লবী ক্ষুদিরামের স্মৃতি।

উল্টে দেখা যাক অতীতের পাতা-– ক্ষুদিরামের গোপন অস্ত্রভাণ্ডার ছিল এখানকার দুর্গম পাহাড়ে। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, নরেন গোস্বামী, বিভূতি সরকার প্রমুখ বিপ্লবী এখানে গভীর জঙ্গলে আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রাখার জন্য সুড়ঙ্গ কেটে গভীর আস্তানা তৈরি করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। বোমা তৈরির জন্য জায়গাটি ছিল নির্জন ও নিরাপদ। বিপ্লবীদের বিপ্লবের প্রশিক্ষণস্থলও ছিল এটি। সমগ্র অঞ্চলটি ব্রিটিশের নজর থেকে আগলে রেখেছিলেন অম্বিকানগরের রাজা রাইচরণ ধবলদেব। অম্বিকানগর থেকে বিপ্লবীরা গভীর রাতে ঘোড়ায় চেপে যেতেন দুর্গম ছেঁদাপাথরে। সেই সময় অম্বিকানগর থেকে ছেঁদাপাথরে যাওয়ার কোনও রাস্তা ছিল না, ছিল শুধু জঙ্গল আর পাহাড়। আজকের পিচঢালা রাস্তা, যানবাহনের যাতায়াত দেখলে অতীতের ছেঁদাপাথরকে কল্পনাও করা যাবে না। ঘোড়ায় চড়ে যাবার পথে মাঝে মাঝে কেশরার তেঁতুলগাছে ঘোড়া বেঁধে বিশ্রাম নিতেন বিপ্লবীরা। বছরখানেক আগে ইতিহাসের সাক্ষী তেঁতুলগাছটি ঝড়ে উপড়ে যায়। ঠিক অনুরূপভাবে আগুন লেগে ভস্মীভূত হয়ে গেছে ছেঁদাপাথরের প্রাচীন এক আমগাছ, যে আমগাছের তলায় এক আদিবাসী মহিলা পাকা আম খাইয়েছিলেন ক্ষুদিরামকে।
পুরীর পাণ্ডার ছদ্মবেশে এক ব্রিটিশ গুপ্তচর অম্বিকানগরের রাজবাড়ির সিংহদ্বারের কুঠুরিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিপ্লবীদের গোপন কর্মকাণ্ডের নানা তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। শেষে একদিন চার্লস টেগার্ট নিজে দলবল-সহ ঘাঁটিটির উদ্দেশে অভিযান চালায়। কাঁসাই ও কুমারী নদীর সঙ্গমের কাছে ছিল লাউলাপাড়া বস্তি। সেখানে এসে টেগার্ট তার দল নিয়ে থামতে বাধ্য হয় কারণ বর্ষায় আক্রান্ত দুই নদীতেই ছিল তখন প্রবল বন্যা। খেয়া পারাপারের নৌকো সহজলভ্য ছিল না। এদিকে রাজার অনুগত পানু রজক নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে, ভরা নদী সাঁতার দিয়ে পার হয়ে ব্রিটিশ পুলিশবাহিনী আসার খবর রাজার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এই সুযোগে সমস্ত আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র নদী তীরবর্তী এলাকার মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়। অভিযান নিষ্ফল বুঝে টেগার্ট সে যাত্রায় ফিরে গিয়েছিল। ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের অস্ত্রাগারের খবর ফাঁস হয়ে যায়।

এখানে রয়েছে গাছপালায় ঘেরা শহীদ ক্ষুদিরাম উদ্যান। সেখানে রয়েছে ক্ষুদিরামের আবক্ষ মর্মরমূর্তি আর রয়েছে সেই গাছ, যে গাছতলায় বসে ক্ষুদিরামের সঙ্গীসাথিরা বিশ্রাম নিতেন। উদ্যানের ভেতর সাধুরাম চাঁদ মুর্মু আদিবাসী সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্রের একটি বড় মঞ্চও রয়েছে। রানিবাঁধ পঞ্চায়েত সমিতি ও বারিকুল গ্রামপঞ্চায়েত এই উদ্যানটি পরিচালনা করে থাকে।

বাঁকুড়ার এই অঞ্চল জল, জঙ্গল, টিলা, লাল মাটির অঙ্গরাগে ভূষিত। পূর্ণিমার রাতে জায়গাটি হয়ে ওঠে মোহময়ী। এরকম জায়গায় থাকতে হলে থাকতে হবে শহীদ ক্ষুদিরাম স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ে। কর্তৃপক্ষের অনুমতিও লাগবে। হালকা বিছানা নিয়ে যেতে হবে সেক্ষেত্রে। এখানে পর্যটক আবাস নির্মাণ করা হয়েছিল কিন্তু বর্তমানে তা বন্ধ আছে। যাদের ট্রেকিংয়ে উৎসাহ তারা ছেঁদাপাথর থেকে মুকুটমণিপুর বা রানিবাঁধ ট্রেক করে যেতে পারেন, এটি খুবই আকর্ষণীয় পথ। ৭ কিলোমিটার দূরে বীরকাঁড় বা জাঁতাডুমুর ড্যাম ঘুরে নেওয়া যায় অনায়াসেই।
কলকাতা থেকে সিএসটিসি-র বাসে ফুলকুসমায় নেমে ট্রেকারে বা বাসে যেতে হবে। ঝিলিমিলি থেকে বাসেও এখানে পৌঁছানো যায়।

জাঁতাডুমুর

ছেঁদাপাথর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে এক আকর্ষণীয় স্থান হল জাঁতাডুমুর ড্যাম। ভৈরববাঁকি নদীটি বছরের অন্য সময়ে শান্ত থাকলেও বর্ষায় ফুলেফেঁপে উঠে আঁকাবাঁকা গতিপথের দু’ধারের গ্রামগুলিকে গ্রাস করতে চায়। তাই তার গতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে দেওয়া হয়েছে বাঁধ এবং তৈরি হয়েছে জাঁতাডুমুর ড্যাম। জলাশয় ঘিরে রয়েছে বড় বড় গাছ। গাছগুলি মুখরিত থাকে পাখপাখালির কূজনে। ড্যামের শান্ত জলে প্রতিফলিত হয় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য। অনাবিল আনন্দে মন ভরে ওঠে। ছেঁদাপাথর থেকে অনায়াসেই ড্যামটি ঘুরে নেওয়া যায়, যদিও পথের বেশিরভাগটাই কাঁচারাস্তা। তবুও ভাল জিনিস আহরণ করতে গেলে এটুকু কষ্ট তো স্বীকার করে নেওয়াই যায়। তবে কাঁচারাস্তার কারণে বর্ষাকাল বাদ দিয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয় হবে। কাছাকাছি থাকার জায়গার অভাব। ফিরে যেতে হবে সেই রিমিলেই।

রাইপুর

বাঁকুড়া থেকে ৭২ কিলোমিটার দূরে, ছেঁদাপাথর থেকে বাঁকুড়া আসার পথে কংসাবতী নদীর ধারে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রাচীন দুর্গ, প্রাসাদ, মন্দির, চূয়াড় বিদ্রোহের ইতিহাস প্রভৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাইপুর থানা এলাকা। বাঁকুড়া থেকে তালডাংরা, সিমলাপাল হয়ে রাইপুর। এর পরের রাস্তা চলে গেছে মটগোদা, ফুলকুসমা হয়ে শিলদা, তারপর সোজা ঝাড়গ্রাম অথবা ডান দিক ধরে বেলপাহাড়ি হয়ে ঝিলিমিলি, বান্দোয়ান ও রানিবাঁধের দিকে।
এখানকার মহামায়া মন্দিরটি প্রাচীন হলেও প্রাচীনত্বের চিহ্ন অবলুপ্ত, কারণ গ্রামের শেষপ্রান্তে কূর্মপীঠের আকার যুক্ত উঁচু জমির ওপর নতুন এক ইটের দালান মন্দির গড়ে উঠেছে। মন্দিরের অভ্যন্তরে রয়েছেন মহামায়া দেবী, সিংহবাহিনী ও মহিষাসুরমর্দিনী। সিঁদুরলেপা শিলামূর্তিটি দুটি চোখ ও দুটি হাতবিশিষ্ট। দেবীর বাম দিকে রয়েছেন ষড়ভুজা সর্বমঙ্গলা ও ডানদিকে তুঙ্গবিদ্যা নামে আর এক দেবী। এছাড়া, ষড়ভুজ গণেশমূর্তিও মন্দিরে রয়েছে।
মন্দির প্রতিষ্ঠার কিংবদন্তি হল, রাইপুরের শাঁখারিয়া পুকুরের পাড়ে দেবী মহামায়া এক কিশোরীর বেশ ধরে শাঁখারির কাছ থেকে দু’গাছি শাঁখা পরে নিজেকে ব্রাহ্মণকন্যা রূপে পরিচয় দিয়ে স্থানীয় এক ব্রাহ্মণের থেকে শাঁখার দাম নিতে বলেন। ব্রাহ্মণের কোনও মেয়ে ছিল না। শাঁখারির কাছে কাহিনি শুনে ব্রাহ্মণ ও শাঁখারি পুকুরের পাড়ে এলে সদ্য শাঁখা পরা দুটি হাত জলের ওপর জেগে ডুবে যেতে দেখেন। সেই রাতে ব্রাহ্মণ স্বপ্নাদেশ পান এবং পুকুরের পাড় থেকে এক শিলাখণ্ড এনে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবী মহামায়া ধীরে ধীরে সেই শিলাপটে আবির্ভূত হন।

ইতিহাসের অনেক ঘটনার সাক্ষীও এই গ্রাম। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-– মোগল আমলে এক চৌহান রাজপুত এই অঞ্চল দখল করে শিখর রাজা উপাধি নিয়ে বাস করতেন। মারাঠা আক্রমণের সময়ে রাজপরিবারের সকলে সন্মানরক্ষার্থে প্রাণ বিসর্জন দেন শিখরসায়রের জলে। শিখররাজের সেনাপতি মীরণ সাহা মারাঠা আক্রমণে নিহত হলে শিখরসায়রের ধারে মীরণ সাহাকে সমাধিস্থ করা হয়। পুরনো ঘটনা স্মরণ করে স্থানীয় মানুষেরা এই সমাধিতে পুজো দেন, মানত করেন।
রাইপুর হাসপাতালের পাশের রাস্তা দিয়ে গিয়ে গড় এলাকা নামে একটি বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গা এখনও পড়ে রয়েছে, তবে সেখানে ধ্বংসাবশেষ বলেও কিছু নেই। গড়ের মাঝে একটি মন্দির রয়েছে। এই গড়ের জন্য রাইপুরকে অনেকে গড় রাইপুরও বলে থাকেন।

মটগোদা

বাঁকুড়া থেকে প্রায় ৭৭ কিলোমিটার দূরে রাইপুর থানার মটগোদা বিখ্যাত তার বনবাংলো ও মাঘের শনি মেলার জন্য।
ধর্মরাজের মন্দির-– কথিত আছে, আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে মটগোদার বর্তমান ধর্মরাজ মন্দিরের উত্তর দিকে ভগবানবাঁধ নামক এক জলাশয় থেকে একটি ধর্মশিলা ও একটি তাম্রপত্র পাওয়া গিয়েছিল। শ্যামসুন্দরপুরের রাজা সুন্দরনারায়ণ দেও স্বপ্নাদেশ পেয়ে এগুলি উদ্ধার করেছিলেন। ধর্মশিলাটির নাম ছিল স্বরূপনারায়ণ আর তাম্রপত্রে ছিল ধর্মরাজের পূজাবিধি। মটগোদা গ্রামের মাঝে ধর্মরাজ মন্দির সমতল ছাদবিশিষ্ট ইটের তৈরি। এই মন্দিরের লাগোয়া নাটমন্দির রয়েছে। কূর্মাকৃতি চারটি ধর্মরাজ শিলা স্বরূপনারায়ণ, বাঁকুড়া রায়, বেচা রায়, ক্ষুদি রায় মূল বেদিতে রয়েছেন। স্বরূপনারায়ণের ডান পাশে রয়েছেন দেবী সর্বমঙ্গলা ও তার পাশে দেবী ষড়চক্রবাসিনী, বাম পাশে কালীর ধ্যানে পূজিতা দেবী বিগ্রহ। প্রতিদিন সকালে ধর্মরাজের পূজার সময় বিগ্রহ দর্শন করা যায়। মাঘ মাসের শেষ শনিবারে ধর্মরাজের বার্ষিক পূজা হয়। সেই সময় বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, বর্ধমান-সহ অনেক জায়গা থেকে বহু মানুষ পূজা ও মানতের জন্য আসেন। বিরাট মেলা বসে। এক সপ্তাহ ধরে পূজাপাঠ, যাত্রা, গান ও আমোদপ্রমোদের জন্য বহু মানুষের সমাবেশে ভরে ওঠে মটগোদা।
বনবাংলো-– মটগোদা বাজার থেকে একটু এগিয়েই ফরেস্ট অফিস আর তার পাশেই পাঁচিল দিয়ে ঘেরা প্রশস্ত জায়গায় গাছপালায় ঘেরা আধুনিক ঝাঁ-চকচকে ফরেস্ট বাংলো। মূল রাস্তা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। পুরনো নোনা ধরা দেওয়াল বা টিনের চালের বাংলো নয়, তবু ভাল লাগবে মটগোদা। পাশের রাস্তা সোজা চলে গেছে রানিবাঁধের দিকে। থাকার জন্য যোগাযোগ-– ডিএফও, বাঁকুড়া সাউথ ডিভিশন। দূরভাষ : ০৩২৪২-২৫০৩০৭।
রিমিল পর্যটক নিবাসে রাত্রিবাস করে জায়গাগুলি দেখে নেওয়া সুবিধার হবে, যোগাযোগের দূরভাষ : ০৩২৪৩- ২৪০২১৭,২৪০৩০০।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More