বাগমুন্ডি ও মুখোশ গ্রাম চড়িদা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রত্না ভট্টাচার্য্য
    শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

    সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।  খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

    অযোধ্যার পশ্চিম দিকের প্রবেশদ্বার হিসাবেই বাগমুন্ডির পরিচিতি। পুরুলিয়া জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত সংলগ্ন থানা বাগমুন্ডি। পাহাড়ের শ্রেণি দূরে দেখা গেলেও আগের আরণ্যক বাগমুন্ডি এখন আর নেই। পুরুলিয়া পাম্পড স্টোরেজ প্রকল্পের কল্যাণে এখন দিনে দিনে শহুরে মেদ বাড়ছে বাগমুন্ডির। বড় বড় বাড়ি, হোটেল, গাড়ি নিয়ে বাগমুন্ডি বেশ উজ্জ্বল। তবুও বাগমুন্ডিতে বুধ ও শনিবারে হাট বসে, পাহাড় ও অন্য আদিবাসী গ্রাম থেকে মানুষ এসে রঙিন হয়ে ওঠে। এখনও অনেক দোকানে কাঠের জ্বালে রান্না হয়।

    অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাগমুন্ডি গ্রামে একটি রাজবংশের উত্থান হয়। রাজপরিবারের কুলদেবতা রাধাগোবিন্দ। বাগমুন্ডিতে পায়ে পায়ে দেখে নেওয়া যায় গ্রামের একেবারে উত্তরাংশে পাহাড়ের পাদদেশে রাজবাড়ি। রাজবাড়ির উত্তরে টেরাকোটার কাজসহ ভগ্ন রাধাগোবিন্দ মন্দির, রাজবাড়ির সামনে টেরাকোটার রাসমন্দির, মুসলমানপাড়ায় ভগ্ন পঞ্চরত্ন শিবমন্দির। এছাড়া, পাহাড়ের কোলে চারিধারে গাছের সারির মধ্যে সুন্দর শোভা নিয়ে রাজবাড়ির পুষ্করিণী কমলাবাঁধ, রানিবাঁধ প্রভৃতি।

    এখান থেকে পায়ে হেঁটে আশপাশের গ্রামগুলি ঘুরে বেড়াতে মন্দ লাগে না। বাগমুন্ডির অযোধ্যা মোড় থেকে পায়ে পায়ে পাথরডিহি হয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় টুর্গা বাঁধে। পাহাড়ের কোলে এই বাঁধের সৌন্দর্য অনিন্দ্যসুন্দর। টুর্গা ফলসের জল এসে জমা হচ্ছে এখানে। শীতে পিকনিক পার্টির আসর বসে যায়। টুসু উৎসবে টুর্গা বাঁধে টুসুর ভাসান ঘিরে মেলা বসে। বাগমুন্ডিতে রাত্রিবাসের জন্য অনেক হোটেল আছে।

    বাগমুন্ডি থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে লহরিয়া গ্রাম। ছোট্ট, শান্ত, নিঝুম গ্রামের পরিবেশ এখন আর লহরিয়াতে নেই। পাম্প স্টোরেজ প্রকল্প লহরিয়া থেকেই শুরু। লহরিয়া বাঁধ ও তার কোলে শিবমন্দিরের এখন খুব সুনাম। বাঁধের জলে স্নান করে মন্দিরে পুজো দিতে প্রতিদিনই বহু মানুষ আসেন। শিবরাত্রি ও চৈত্রে গাজন মেলা খুব বিখ্যাত। বহু সন্ন্যাসী এখানে গাজন উৎসব পালন করেন, সে সময় বাণফোঁড়া, চড়ক প্রভৃতি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। শিবমন্দির ছাড়া এখানে রয়েছে টুর্গামন্দির, লক্ষ্মীমন্দির ও রাধাকৃষ্ণের মন্দির। অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নানাবিধ গাছগাছালির মধ্যে এক পবিত্র পরিবেশে মন্দিরগুলি অবস্থিত। বাগমুন্ডি গেলে লহরিয়া বাঁধ ও এই মন্দিরগুলি দেখে নেওয়া যেতে পারে। ইচ্ছে করলে বাঁধের ধারে প্রকৃতির কোলে চড়ুইভাতিও করা যেতে পারে।

     

    বাগমুন্ডি থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে একটি ছোট গ্রাম চড়িদা। গ্রামটি ছোট হলেও গ্রামের নামটি আজ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পাড়ি দিয়েছে বিদেশে, ছো নাচের হাত ধরে। এই ছো নাচ ঐহিক পারত্রিক শুভাশুভের ভারতীয় বার্তা বিদেশের বাজারে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ২০০ বছর আগে বাগমুন্ডির রাজারা অনতিদূরের চড়িদা গ্রামে নিষ্কর জমি দিয়ে প্রতিমা নির্মাণের জন্য এনে বসিয়েছিলেন সূত্রধরদের। তাঁদের প্রধান কাজ ছিল পুরাণে বর্ণিত  চরিত্রানুগ মুখোশ তৈরি করা। রাজবাড়ির প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে এরাই মুখোশ নির্মাণের কৌশল আবিষ্কার করেন। ছো নাচের সঙ্গে মুখোশের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক। মুখোশ ছাড়া ছো নাচ হয় না। মুখোশ ভেতরের সত্তার প্রকাশক যাকে চরিত্রের মুখের নকল বা প্রতিচ্ছবি বলা যেতে পারে। চড়িদায় মুখোশ শিল্পে নিযুক্ত আছেন প্রায় ৭০টি পরিবার। ঘরে ঘরে মুখোশ তৈরির ব্যস্ততা। ঘরের দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে বাস্তবধর্মী হরেক রকমের ছোট বড় মুখোশ। বাঘ, সিংহ, হরিণ থেকে রাম, রাবণ, সীতা, সাঁওতাল দম্পতি থেকে আধুনিক স্পাইডারম্যান পর্যন্ত। ছো নাচের প্রয়োজনে মুখোশ বানানো শুরু হলেও বর্তমানে ঘর সাজাতেও মুখোশের চাহিদা বেড়েছে। বিভিন্ন মুখোশের বিভিন্ন দাম।

    এই মুখোশ নির্মাণের পদ্ধতিটি বেশ চমকপ্রদ এবং ধাপে ধাপে বিন্যস্ত। প্রথমে কাদা মাটিকে মূর্তি গড়ার উপযুক্ত করে তুলতে হয়, তার পর সেই মাটি দিয়ে কাঠের পাটাতনের ওপর মূর্তি তথা ছ্যাঁচা বা ছাঁচ বানাতে হয়। এই ছাঁচগুলি রোদে আধশুকনো করে নিয়ে এর ওপর মিহি ছাই বা পাউডার ছড়িয়ে একে একে আট / দশ পরতে পুরনো খবরের কাগজ চিটানো হয় আঠা দিয়ে। কাগজের ওপর কাদামাটির প্রলেপ দিয়ে তার ওপর টুকরো কাপড়ের আস্তরণ দেওয়া হয়। তারপর আবার কাদামাটি লেপে দেওয়া হয়। মাটি একটু শুকোলে কর্নিকের মতো কাঠের সরঞ্জাম ‘থাপি’ দিয়ে মূর্তির চোখ, নাক, কান ইত্যাদি স্পষ্ট করে চাঁছা করা হয়। আঞ্চলিক ভাষায় এই পদ্ধতিটিকে ‘চিকণ করা’ বলা হয়।

    এর পরের পর্ব খুঁসনি খোঁচা অর্থাৎ মডেল থেকে মুখোশটিকে বার করে নিতে হবে এবং চোখ, নাক, কান ইত্যাদি নরুণ বা কাঠি দিয়ে ঠিকঠাক করে নিতে হবে। চোখ, নাক ফুটো করার পর রং লাগানোর পর্ব। প্রথমে খড়িমাটি গুলে সাদা রং, তার ওপর অন্য রঙে চোখ-মুখ-ঠোঁট আঁকা। মুখোশে চড়া রঙের ব্যবহারই বেশি। তার পর মূর্তির চুল-দাড়ি বা চূড়া বানানোর পালা। মুখোশের সঙ্গে তার ও কাঠির ফ্রেম জুড়ে তাতে নকল চুল (শন বা নাইলনের), পাখির পালক, ময়ূরপুচ্ছ, রাংতা, রঙিন পুঁতি, প্লাস্টিকের নানা উপকরণ, জরি, চুমকি দিয়ে মুখোশের অলংকরণ শেষ হয়। সব শেষে মুখোশটি এক বর্ণাঢ্য চেহারা নেয়।

    নাচের মুখোশগুলি মুখের চেয়ে বড় হয় এবং এক একটির ওজন হয় প্রায় ৪ কেজির মতো। মুখোশের চোখের মণি ও নাকের জায়গায় ছিদ্র থাকে দেখার আর শ্বাস নেওয়ার জন্য। লোহার শিক গরম করে এই ছিদ্র করা হয়।

    আর এক ধরনের মুখোশ চড়িদায় পাওয়া যায় যেগুলি সাধারণত ঘর সাজাতে কাজে লাগে। সেগুলি নানা মাপের হয়।

    ‘ছো’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন, অনেকের মতে এর উৎপত্তি ছাউনি শব্দ থেকে। সৈন্য সামন্তের আবাসস্থলই হল সেনা ছাউনি। ছো নৃত্য যুদ্ধনৃত্য অর্থাৎ সৈন্যদের অবসর বিনোদনের সময় যে নাচ আনন্দের জোয়ার এনে দিত তাই ছো নাচ।

    কারুর মতে এর অর্থ মুখোশ। নাকাড়া ও ঢাকের আওয়াজে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি সহকারে এই নাচকে কৌতুকাবহ করে তোলার কারণে এই নাচের প্রয়োগ। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ ভাগবতের বিভিন্ন কাহিনি এই নাচের মূল বিষয়বস্তু।

    ছো নৃত্যকে বিদেশের দরবারে তুলে ধরবার কৃতিত্ব গম্ভীর সিং মুড়ার। ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ছো দলের মধ্যমণি গম্ভীর সিং মুড়ার বীরত্বব্যাঞ্জক নৃত্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে রাঢ় মাটির শিল্পভাবনা বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। এক লাফে চড়িদা প্রচারের আলোকে উঠে আসে। বাগমুন্ডি যাবার পথে চড়িদায় নেমে ঘরে ঘরে কী ভাবে শিল্পকর্ম তৈরি হচ্ছে তা অবশ্যই দেখে নিতে হবে পর্যটকদের।

    বাগমুন্ডিতে থাকার ঠিকানা

    দুর্গা লজ, অযোধ্যা মোড়, বাগমুন্ডি, চলভাষ – ৯৭৩২২৭২৭৭২
    রেনুকা লজ, অযোধ্যা মোড়, বাগমুন্ডি, চলভাষ – ৯৭৩২০৮৯০৪১

    কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেড়িয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

    পায়ে পায়ে বাংলা 

     

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More