রবিবার, ডিসেম্বর ১৫
TheWall
TheWall

জাভা যাত্রীর পত্রের পরে

অংশুমান পাল

”এ মন্দিরটা এত দিনের, ওটা অমুক রাজা অমুক সনে যুদ্ধের পর ভেঙেছিলেন বা স্থাপন করেছিলেন, শুধু এইসব জানলেই মন্দিরের সব কথা জানা হল না– মন্দিরের কথা কোনদিন সম্পূর্ণ হবে না।” অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবশ্য জাভা বা ইন্দোনেশিয়ায় আসেননি। এসেছিলেন তাঁর রবিকা ১৯২৭ সালে আর তারও প্রায় ৮০ বছর পর এসেছিলেন আমেরিকার ভ্রমণ লেখিকা এলিজাবেথ গিলবার্ট। দুজনেই মুগ্ধ হয়েছিলেন বালির সুগঠিত মন্দির এবং মন্দিরকেন্দ্রিক পরিচ্ছন্নতা দেখে। তাই যাওয়ার আগে আমি শুধু ওঁদের দুজনের লেখা পড়ে এবং মন্দিরগুলি সম্পর্কে ঐতিহাসিক কোনও লেখা না পড়েই পাড়ি দিলাম ইন্দোনেশিয়ায়।

জাভা বাটিক

অবনীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন মন্দিরের কথা কোনওদিন সম্পূর্ণ হয় না, তাই আমি তার প্রয়াসও করিনি। আর শুধুমাত্র মন্দির দর্শনই আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। যেমন বালি দ্বীপের সুখবতী নামে জেলায় উবুদ শহরে সেপ্টেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন মন্দিরকেন্দ্রিক অন্তেষ্টিক্রিয়া। আর আমরা দেখলাম উবুদের বিখ্যাত বালিনিস চিত্রকলা এবং বাটিক। মন্দিরের স্থাপত্য কলা ও হস্তশিল্প ইন্দোনেশিয়ার সর্বত্র ব্যাপ্ত– কত নাম করব। ৩০০–র বেশি জাতি এবং ৭০০–র বেশি ভাষা নিয়ে পাঁচটি বৃহত্তর দ্বীপে বিরাজমান ইন্দোনেশিয়া। আর সেখানকার মন্দিরের ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব এবং নৃবিদ্যা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে কিন্তু রাবীন্দ্রিক রসবোধ দিয়ে দেখলে  পর্যটক থেকে পথিক হওয়ার পথ হয় সহজ। তাই ‘জাভা যাত্রীর পত্র’ পড়ে জাভা দিয়েই যাত্রা শুরু।

জাভা–যোগাকর্তা সোনোবুদ্ধ যাদুঘর

সোনোবুদ্ধ যাদুঘরের প্রবেশ দ্বার

আশ্চর্যরকম ভাবে বালির তুলনায় জাভা বা সুমাত্রায় ভারতীয়রা কম যায়। আর গেলেও যাদুঘর তাদের কাছে ব্রাত্য। ইতিহাস থাকলেই মিউজিয়াম বা যাদুঘর থাকবেই। কিন্তু ওই যে বললাম, রবীন্দ্র রসবোধ দিয়ে দেখলে নীরস ইতিহাসেও আসে সুরের মূর্ছনা। জাভা বা যবদ্বীপের যোগাকর্তা শহরের সোনোবুদ্ধ যাদুঘরে ঢুকতেই শোনা যায় ঐতিহ্যবাহী ‘গামেলন’ (Gamelan) বাদ্যযন্ত্র যা এসেছে জাভা ও বালি সংস্কৃতির সংমিশ্রণে। প্রাচীন এই বাদ্যযন্ত্র নিবিষ্টচিত্তে বাজিয়ে চলেছেন আধুনিক কালের দুই যন্ত্রী। মনে পড়ে যায়, এই যবদ্বীপে এসে ২১ অগস্ট ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ”তোমায় আমায় মিল হয়েছে কোন যুগে এইখানে / ভাষায় ভাষায় গাঠ পড়েছে, প্রাণের সঙ্গে প্রাণে।/ ডাক পাঠালে আকাশপথে কোন সে পুবেন বায়ে/ দূর সাগরের উপকূলে নারিকেলের ছায়ে।”

বোরোবুদুর মন্দির

সমভিব্যাহারে (সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের মতন পণ্ডিতেরাও ছিলেন সে দলে) রবীন্দ্রনাথ এই যাদুঘরে আসেননি কারণ তখন এই যাদুঘর তৈরিই হয়নি। তবে তাঁকে মুগ্ধ করেছিল এখানকার নৃত্য। এই নাচ এবং পুতুলনাচ ‘ওয়াং কুলিটি’ (Wayang Kuliti) খুব সুন্দর করে সংরক্ষিত হয়েছে যাদুঘরটিতে। চামড়ার তৈরি এই পুতুল নাচ দেখা চিরাভিলষিত আর তা দেখে সন্ধ্যাবেলা চলে গেলাম অন্য নাচ দেখতে। সে কথায় পরে আসছি, আগে বলি কিসে করে গেলাম সেই নাচ দেখতে। গেলাম ‘বেচাক’ (Bechak) নামে স্থানীয় রিক্সায় আর যাওয়ার পথে দেখলাম পরিষ্কার, সুগঠিত যোগাকর্তা শহরকে।

মহাভারতে খাণ্ডববন দাহন বা রামায়ণের হরধনু ভঙ্গের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের আভাস আছে ‘জাভা যাত্রীর পত্র’–এ। ইন্দোনেশিয়া থেকে কবি লিখেছেন: ”রামায়ণ–মহাভারতের মধ্যে ভারতবর্ষের যে মূল ইতিহাস নানা কাহিনীতে বিজড়িত, তাকে স্পষ্টতর করে দেখতে পাব যখন এখানকার পাঠগুলি মিলিয়ে দেখার সুযোগ হবে।” রামায়ণ–মহাভারতের যে সকল পাঠ ইন্দোনেশিয়াতে প্রচলিত আমাদের দেশের সঙ্গে তার অনেক প্রভেদ।

সীতা এখানে সীন্তা আর সন্ধ্যাবেলা যোগাকর্তার মুক্তমঞ্চে দেখতে গেলাম নৃত্যনাট্যে রামায়ণ। রাম–সীতা এখানে ভাই–বোন আর বালির উলুয়াটু মন্দির প্রাঙ্গণে ঐতিহ্যবাহী কেচাক নৃত্যে (Kechak Dance) রাম–সীতার বিবাহও দেখানো হয়। তবে দুই নৃত্যেই আমাকে মুগ্ধ করেছিল হনুমানের (ওদের ভাষায় white monkey) লঙ্কা দহন দৃশ্যটি।

জাভাতে মুসলমান বেশি হলেও বালিতে হিন্দুরাই সংখ্যাগুরু। আমাদের দেশের হিন্দু ধর্মানুরাগী অনেকেই বালিদ্বীপের অধিবাসীদের আপন বলে স্বীকার করে নিতে উৎসুক হবেন। বিশেষ করে উল্লেখ্য যে বালিদ্বীপের সব মন্দির হিন্দু মন্দির এবং দক্ষিণ–পশ্চিম এশিয়ার সর্ববৃহৎ হিন্দু মন্দির প্রামবানান মন্দির জাভাদ্বীপে অবস্থিত।

বোরোবুদুর থেকে বালি

আমরা এবার পৌঁছে যাই শান্তির প্রতীক বুদ্ধের বোরোবুদুর মন্দিরে। এই প্রাচীন মন্দিরে, দেওয়ালে উৎকীর্ণ চিত্রে বুদ্ধজীবন কথা অতীব মনোরম। ১৮১৪ সালে এই মন্দিরটি আবিষ্কার করেন স্ট্যানফোর্ড রায়েলস, যিনি পরবর্তীতে জাভার ইতিহাস নিয়েও বইও লেখেন। স্তূপ পরিবৃত্ত এই মন্দিরটিতে একটিই খোলা স্তূপ আছে যার সামনে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সপরিবারে ছবি তুলেছিলেন বলে তা এখন ‘ওবামা স্পট’ নামে পরিচিত। আমাদের পরের গন্তব্য বালিদ্বীপ।

বালি মন্দিরের স্তম্ভের কারুকাজ

বাটাভিয়া থেকে জাহাজে করে বালিদ্বীপে পৌঁছেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আমি গেলাম ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় বিমানসেবা ‘গরুর’–এ করে। বিষ্ণুর বাহন গরুর বালির সর্বত্র বিরাজমান। এই বালি দেখেই রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ”দেখলেম ধরণীর চিরযৌবনা মূর্তি। এখানে প্রাচীন শতাব্দী নবীন হয়ে আছে।” প্রাচীন শতাব্দীকে নবীন করে ধরে রেখেছে বালির ‘টামা নুসা’ (Taman Nusa) নামে একটি বৃহৎ পার্ক যেখানে ৬০টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি তৈরি হয়েছে একটি গ্রামের পরিবেশে।

জাভা সুমাত্রা বোর্নিও বা কালিমাথানের মতন বৃহৎ দ্বীপের পুতুলনাচ, বাটিক এমনকি বংশানুক্রমিক ভাবে চলে আসা স্থপতিদের সঙ্গেও কথা বলা যায় টামা নুসার গ্রামীণ পার্কে। পরিচিত হলাম গম্বুজের আকারে তৈরি পাপুয়া দ্বীপের বাড়ি ‘হোনাই’–এর সঙ্গে বা ‘বাজয়া’ (Bajwa) বাড়ি যেখানে এসেছিলেন এলিজাবেথ গিলবার্ট।

বালি শহরটি নিখুঁতভাবে পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন এবং সর্বত্র পঞ্চপাণ্ডবের মহাভারত বা রামায়ণের প্রভাব বিরাজমান। শহর থেকে একটু দূরে, ভারত মহাসাগরের তীরে একটি ছোট্ট টিলায় অবস্থিত ‘উলুয়াটু’ মন্দির। সেখান থেকে সমুদ্রের দৃশ্য অপার্থিব সৌন্দর্য রচনা করেছে। মন্দিরে প্রবেশ করতে হলে পরতে হয় ‘সারাং’ নামে স্থানীয় পোষাক যাতে পা ঢাকা থাকে।

বালির বিষ্ণু মন্দিরের সামনে

হিন্দু ভাবের ও রীতির সঙ্গে এদের জীবন কিরকম জড়িয়ে গেছে ক্ষণে ক্ষণে তার পরিচয় পেয়ে বিস্ময়বোধ হয়। আর রবীন্দ্রনাথ এদের দেখে মন্তব্য করেছেন, ”অথচ হিন্দু ধর্ম এখানে কোথাও অমিশ্র ভাবে নেই; এখানকার লোকের প্রকৃতির সঙ্গে মিলে গিয়ে সে একটা বিশেষ রূপ ধরেছে, তার ভঙ্গীটা হিন্দু, অঙ্গটা এদের।” উলুয়াটু মন্দিরে সূর্যাস্ত দেখে এদিনের অবসান হল। পরের দিন দেখে নেওয়া হবে কান্টিক গ্রামের কৃষিক্ষেত্র।

কান্টিক গ্রাম বিখ্যাত তার কফি চাষের জন্য। গ্রামীণ পথ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেতে যেতে অবশ্য সালাক ও রামাবুতান ফলের গাছ চোখে পড়ে যা আমাদের যথাক্রমে কাঁঠাল ও লিচু প্রজাতির সঙ্গে মেলে। এই অফুরন্ত গ্রামীণ ফলের চাষের কথা উল্লেখ করেছেন গিলবার্টও। আমাদের গাইড রেনে বলেছিলেন সমগ্র ইন্দোনেশিয়াতে ৬৩ রকমের কলা ও অনেক রকমের কাঁঠাল পাওয়া যায়। কাঁঠালের তৈরি ‘গুডেগ’ নামে একটি স্থানীয় খাবারও খেয়েছিলাম। ফিরে আসি লুয়া কফির কথায়। লুয়া ‘বেজি’ ধরনের একটি স্তন্যপায়ী জীব, যে কফি বিনস খেয়ে ফেলে এবং তাদের হজম করা বস্তু থেকেই তৈরি হয় লুয়া কফি। বিষয়টি আমাদের কাছে খুব একটা প্রীতিকর বস্তু না হলেও ভালো লেগেছিল কোকো কোনা চাষ দেখে। জিনসেঙ গাছের শেকড়ও কফির সঙ্গে মিলিয়ে এক দারুণ উপাদেয় পানীয় তৈরি করা হয়।

গুডেগ

কফি গাছ শোভিত মনোজ্ঞ কাননের বিহার সম্পন্ন করে এরপর যাত্রা কিন্তামণির পরমরমনীয় আগ্নেয়গিরি পাহাড় দর্শন করতে। ধান খেতের মাঝ দিয়ে সাইকেল করে ফিরে আসার সময় বালির দোলনাও চড়ে নিতে পারেন। এরপর শহরে ঢোকা আর বালি থেকে বের হতে গেলে বিমানবন্দরের চোখে পড়বে কর্ণের ঘটোৎকচকে সংহার করার বিরাট মূর্তি। মহাভারতের ঘটোৎকচের সঙ্গে যারা পরিচিত তারা পরিচিত এই মূর্তি তাদের ঘটোৎকচের প্রতি মায়া বাড়াবে। সমগ্র ইন্দোনেশিয়া মায়াময়। সেই ‘মায়ার খেলা’ থেকে যখন ফিরলাম তখন শীত শুরু হয়ে গেছে যদিও ইন্দোনেশিয়ার মায়ায় তখনও উত্তপ্ত হয়ে রয়েছি।

Comments are closed.