আন্দামান : এক ব্যয়বহুল অন্য ভারত

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপক চক্রবর্তী

    আচমকাই এক প্রস্তাব পেয়ে পৌঁছনো গেল আন্দামান৷ যে সে কথা নয়৷ সেলুলার জেল-খ্যাত ও নীলাভ-সবুজ রঙের জল-খ্যাত আন্দামান৷ খানিকটা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন তার চেহারা৷ অনেকটা কাঁচালঙ্কার মতো লম্বাটে৷ উড়োজাহাজ ব্যতীত তেমন কোনও যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই৷ আসলে জাহাজ অনেকটা সময় নেয় বলে তার নিশ্চয়তা নিয়ে কেউ কোনও রকমের প্রশ্ন তোলেন না৷ যদিও এই দ্বীপভূমির জন্য প্রয়োজনীয় অনেকটা পরিমাণ মালপত্র জাহাজেই পৌঁছয়৷ কিন্তু অসম্ভব ঝোড়ো ভ্রমণের মধ্যেও যেটা টের পাওয়া গেল, তা হল আন্দামান অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক জায়গা৷ যদিও তার ব্যাখ্যা হিসেবে এখানকার লোকজনেরা বলে থাকেন— এখানকার যা কিছু তা সবই মেইনল্যান্ড থেকে আনতে হয়, তাই দাম বেশি৷ যেমন ধরা যাক আলু ৪৫ টাকা কেজি৷ পোর্ট ব্লেয়ারের যে যে হোটেলে ছিলাম তার পরিচারকরাই তথ্যটা দিলেন৷ তার সঙ্গে এও বললেন যে, ‘এখন তো আপনাদের কলকাতায় ১০ থেকে ১২ টাকা আলুর কেজি কিন্তু এখানে এমনই৷ যেমন পেঁয়াজ ৬০ টাকা কেজি৷’

    পোর্টব্লেয়ারে দুটো দৃষ্টিনন্দন হোটেল রয়েছে৷ মেগাপট ও হর্নবিল৷ এই দুই হোটেলেই যদি ‘আন্ডাকারি’ মানে ডিমের ঝোল খেতে যাওয়া যায় তবে ২টো ডিম দিয়ে কারির দাম পড়বে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা! তাও তো পোর্টব্লেয়ার রাজধানী৷ এখানে সরকারি অতিথিশালায় আতিথ্য গ্রহণ করলে প্রাতরাশে ডিম কমপ্লিমেন্টারি মিলবে৷ কিন্তু পোর্টব্লেয়ার থেকে ‘অবশ্য গন্তব্য’ হ্যাভলক দ্বীপের সরকারি অতিথিশালায় আতিথ্য নিলে প্রাতরাশ কমপ্লিমেন্টারি হলেও ডিম সেদ্ধ কিংবা পোচ কিংবা অমলেট কিনে খেতে হবে৷ কেন এতবার দামের উল্লেখ করছি সে কথায় পরে আসছি, তার আগে আরও দু-একটা নমুনা দেওয়া যাক৷ ধরা যাক, এলিফ্যান্টা দ্বীপে খুব খিদে পেলে আপনি পেতে পারেন এক থালা ফল বা এক ঠোঙা মুড়ি৷ ফলের থালার দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আর মুড়ি মানে ঝালমুড়ি ৫০ টাকা৷ চা ২০ টাকা৷ কেন? এ কি শুধুই ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে অনেকটাই দূরের অবস্থানের কারণে? যদিও কেউ প্রশ্ন করে না কারণ টাকা ব্যয় করতেই তো সবাই এসেছে৷ ফলে এখানকার মানে এই দ্বীপভূমির হাওয়ায় টাকা ওড়ে৷

    ১৯৪৩-এ এখানেই নেতাজি প্রথমবারের মতো তেরঙ্গা উড়িয়ে‍ ছিলেন৷ ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা৷ তারপর ২০১৮৷ এই প্রতিবেদক যখন সেখানে ছিল সেই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে পৌঁছন সবিশেষ অনুষ্ঠানে৷ ১৯৪৩ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, অক্ষশক্তি মূলত জাপানের সহায়তায় প্রথম তেরঙা পতাকা উড়িয়ে ছিলেন এই দ্বীপভূমিতেই৷ তারই ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে (২০১৮) ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমন৷ কিন্তু এখনও এই দ্বীপভূমি যেন ভারতের বাইরেরই একটা অ‌ঙ্গ যাকে‍ ভারত শাসন করছে৷

    এই দ্বীপভূমির সবচেয়ে‍ ‘সম্মানীয়’ মাছের নাম সুরমাছ৷ এখানকার লোকজনের বক্তব্য ”আপনাদের ইলিশের মতোই এর স্বাদ৷” আর আছে অ–কুলীন জোনা মাছ৷ আঞ্চলিক মাছ৷ কিন্তু তার স্বাদ-টাদ নিয়ে কোনও কথা না বলাই ভালো৷ এর দামই কেজি প্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা৷ পোর্টব্লেয়ার হোক বা হ্যাভলক দ্বীপ, ১০ টাকার প্যাকেটের ম্যাগি সেদ্ধ করে মশলা দিয়ে পরিবেশিত হলে অবধারিত দাম ৪০ টাকা৷ নাগা, রাম, রাজু-র মতো ড্রাইভাররা বলছিলেন, ”শসা, আনারস, পেঁপে বাদে আমাদের এখানে কিছু নেই৷ ভালো করে ধান চাষও হয় না৷ সব আসে ম্যাড্রাস (এঁরা চেন্নাই বলেন না) বা ক্যালকাটা থেকে। আমাদের এখানে রুই-কাতলাও পাবেন না৷” চারদিকে গভীর সমুদ্র। জলের অসামান্য বর্ণ বৈচিত্র্য আর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু একই সঙ্গে মূল ভূখণ্ড থেকে যাতায়াত যথেষ্ট ব্যয়সাধ্য বলে এখানে তাঁরাই আসতে পারেন যাদের বেড়াতে গিয়ে হিসেব করার তেমন কোনও প্রয়োজন নেই। এই সত্যটি বিলক্ষণ জানে গাড়ির ড্রাইভার থেকে নামী অনামী হোটেল মালিক মায় পথের ধারের ধাবাওয়ালারা। সে কারণেই আমাদের গাড়ির সারথি দাম নিয়ে আমার বিরক্তি লক্ষ্য করে নিতান্তই নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে জানায়, ”এখানে পয়সাওয়ালা কাস্টমাররাই আসে৷” অর্থাৎ যুক্তিটা এই, পর্যটকদের পয়সা যখন আছে তখন তাদের কাছ থেকে অন্যায্য দাম নেওয়ার হকও আছে দ্বীপের ছোট থেকে বড় সব মাপের ব্যবসায়ীদের।

    অন্যান্য ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ থেকে আন্দামান আর একটি বিষয়ে স্বতন্ত্র। এখানে যাঁরা বেড়াতে আসেন তাঁদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ মানুষ আসেন ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে। ফলে দু’বেলা খাবার বা ঘোরার অর্থ যেহেতু তারা আগেই গচ্ছিত করে দেন, এখানকার অস্বাভাবিক দামের ব্যাপারটি তাঁরা তেমন ভাবে বুঝে উঠতে পারেন না। আসলে এখানে এটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে‍ যে, এখানে বেড়াতে এসে ৪০ টাকা দিয়ে একটা তন্দুরি রুটি খে‍তে হবে‍৷ পথের ধারে ধাবায় টমেটো আলু কড়াইশুটি‍ ফুলকপির তরকারির দাম ১৭০ টাকা৷ কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল অ–পর্যটকদের জন্য জিনিসপত্রের দাম আবার অন্যরকম। অর্থাৎ একই জিনিসের দু’রকম মূল্যের বাজার রয়েছে আন্দামানে।

    হ্যাঁ, আন্দামানের শহুরে চরিত্ৰে এটাই বাস্তব৷ একই সঙ্গে দুই চরিত্রের সহাবস্থান এই দ্বীপভূমিতে।  অসম্ভব সৌন্দর্য যেমন এই দ্বীপভূমির এ পাশে‍ ও পাশে ছড়িয়ে আছে, ঠিক তেমনই আকাশছোঁয়া দামও ছড়িয়ে আছে৷ জারোয়াদের ­­­­­বনাঞ্চল পেরিয়েই সরকারি চেকপোস্ট৷ মাথার ওপর ত্রিপল দেওয়া দোকানে ধোসা মিলবে ৬০ টাকায়৷ বার বার এই টাকার কথা ওঠার কারণ একটাই৷ সাধারণ মানুষের বেড়াতে‍ আসার জন্য নয় আন্দামান৷ কেন্দ্রে এতবার এত রকমের সরকার এসেছে কিন্তু তারা কেউই মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে এই দ্বীপের সাধারণ মানুষ, প্রতিদিনকার মানুষজনের কথা  ভাবেনি৷ অতএব যা হয়, ভাত থেকে শুরু করে কারণবারি‍— সবেতেই অদৃশ্য আগুনের উত্তাপ। দামের উত্তাপ।

    মাত্র তিন রাত্রি বাস করে একটা বিষয় স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি, এখানকার মানুষজন রাস্তায় নেমে‍ ‘দিতে হবে দিতে‍ হবে’ টাইপের নয়৷ বলা যেতে পারে বহুলাংশেই শান্তিপ্রিয় মানুষজন। মূল ভারত ভূখণ্ড নিয়ে আদৌ চিন্তিত নয়৷ অনেকটা বঙ্কিমের ভাষায়, ‘মরুক রামা লাঙ্গল চষে, আমার ফাউলকারি সুসিদ্ধ হইলেই হইল৷’ যে কোনও ধরনের অপরাধের পরিমাণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী কম৷ হাতে গোনার চেয়েও কম৷ অতএব মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন শান্ত নিরিবিলি এই জনপদের বাজারে‍ আগুন লাগলেও আজও যেন সেই উত্তাপ মনে জ্বালা ধরায় না৷ কেননা যত দামই হোক না  কেন এখানকার মানুষ জানে এই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে পর্যটক আসবেই সৌন্দর্যের টানে এবং ফিরে যাবে অপূর্ব সবুজ বনরাজি আর বর্ণময় সমুদ্রের স্মৃতি নিয়ে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More