ডুয়ার্সের জলছবি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মৃণ্ময়ী ঘোষ

    বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়নের আক্রমণের তীব্রতায় দ্রুতপদে ছুটতে ছুটতে কখনও কখনও হয়তো চোখে পড়ে একচিলতে আকাশ। ব্যালকনির টবে সবুজকে আটকে রেখে ধুলোধূসর জীবনে নিজেদের দূষণমু্ক্ত রাখার মরিয়া প্রচেষ্টা। ফাঁকহীন প্রাত্যহিকতার রাশ একটু আলগা হলেই দু’ তিনদিনের জন্য বেরিয়ে যেতে চাওয়ার ইচ্ছেটা তাই স্বাভাবিক। এরকমই এক অবসরে যাওয়া যেতে পারে ডুয়ার্সের সবুজ সংসারে। প্রচণ্ড গরমে ঘর্মাক্ত শরীর, অবসন্ন মন খুঁজে বেড়ায় সবুজ নির্জনতা। শাল ওক পাইন সেগুনের জঙ্গল, তাদের শরীরের কালো ছায়ার ঠান্ডা অথচ শান্ত নিস্তব্ধতার সঙ্গীত সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে মনের উঠোনে। সীমানা পেরনোর ডাক দিয়ে যায় বারবার। ৪২ ডিগ্রি গরম থেকে মুক্তি পেতে শরীর খোঁজে সবুজ প্রকৃতি, বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর; কর্মজীবনের একঘেয়েমিতে ক্লান্ত মন উইকএন্ড–এ মুক্তি পেয়ে ছুটে বেরিয়ে যেতে চায় সবুজের উদেশ্যে।

    ঘুরতে যাবার প্রসঙ্গ এলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড় সমুদ্র জঙ্গল। তিন চারদিনের ‘ছোট্ট ছুটি’তে আর বেড়াতে যাবার কোনও বিস্তারিত পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়া সামান্য খরচে সাধ্যের মধ্যে সাধ পূরণ হতেই পারে ডুয়ার্স ভ্রমণে।

    ডুয়ার্সের অরণ্য, সেই অরণ্যের মধ্যে উঁকি দেওয়া অতীতের চরণচিহ্ন জায়গায় জায়গায় চোখে পড়বে। স্বভাবতই জেগে ওঠবে কৌতূহল, না চাইলেও মনের মধ্যে উঁকি দেবে প্রশ্ন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোনও না কোনও নতুন দৃশ্য। জঙ্গলের নিস্তব্ধতায় পাখিদের কলধ্বনির বিশুদ্ধ সংগীত। এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে ইঙ্গিতময় ইশারায় হাতছানি দেবে অজানাকে জানার। একটি বিশাল মরচে পড়া তালা বন্ধ লোহার গেট তার প্রাচীন আভিজাত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ দু’ পাশে খোলা ঘন জঙ্গল! গেটের ওপাশে একটি সরু রাস্তা দূরে কোথাও গিয়ে মিশেছে যেন। গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে যাওয়ার কথা ভাবতেই গা ছমছম করে ওঠে অচেনা এক আতঙ্কে। টুরিস্ট স্পট না হওয়ার দরুন এ সব জায়গাগুলো কৌতূহল জাগিয়ে তোলে আরও বেশি। মনে হয়, একবার ভেতরে গিয়ে দেখে আসি। কথাটি উচ্চারণ করা মাত্রই ড্রাইভার নিরস গলায় সতর্ক করে দেবে, “ভেতরে কোনও জন্তু–জানোয়ার থাকলেও থাকতে পারে। আর এরকম নির্জন জায়গায়…”। বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না, পশু বলতে বাঘ, চিতা বা হাতির সঙ্গে ‘তেনাদের’ উপস্থিতিরও প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে সেই অসমাপ্ত বাক্যে। সেই অনুচ্চারিত অস্তিত্ব কাদের, কারা থাকে এই জঙ্গলের বুক চিড়ে চলে যাওয়া পথের আশেপাশে গভীর নির্জন জঙ্গল মহলে? ড্রাইভারের অভিজ্ঞতা অথবা সংস্কারের মধ্যবর্তী সীমারেখাটা কোথায় ভাবতে ভাবতেই পরবর্তী দৃশ্যপটে হারিয়ে যাবেন আপনি।

    আরও কিছুটা এগিয়ে যেতেই হঠাৎ ঘাসের ঝোপ থেকে উঁকি দেবে রেল লাইন। দীর্ঘদিনের অযত্নে প্লাটফর্মের হদিশ আজ অবলুপ্ত। ভাবতে অবাক লাগে কোনওদিন এই লাইনের ওপর দিয়ে ট্রেন যেত! চোখের সামনে ফুটে ওঠে অদ্ভুত দৃশ্য। রোমাঞ্চিত মনে ঘুরপাক খাবে প্রশ্ন- কে বা কারা ব্যবহার করতেন এই লৌহবাঁধা পথ। উত্তর জানবার জন্যে অতীতের অলিগলি খুঁজে বেড়াতে হবে না। ইতিহাস তার চিহ্ন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে না। বিক্ষিপ্ত খণ্ড খণ্ড রূপে হলেও নিজেকে জাগিয়ে রাখে। তার উদাহরণ ডুয়ার্সের পথে পথে, পথের বাঁকে বাঁকে। সরকারের দীর্ঘ দিনের উদাসীনতায় ডুয়ার্স আজও নিজেকে সাজিয়ে রেখেছে নিজস্ব বৈভবে।

    ডুয়ার্স মানে শুধু জঙ্গল বা পশুপাখির সৌন্দর্য নয়। ডুয়ার্স মানে অবহেলিত ঐতিহাসিক স্থান। সংরক্ষণের অভাবজনিত দৈন্যদশার বিক্ষিপ্ত হলদে দলিল। যারা জঙ্গলের নীরবতায় অতীতের পদধ্বনি শুনতে পান, তাদের জন্যে আজও অপেক্ষা করছে বক্সা। ডুয়ার্স ভ্রমণে গেলে দেখতেই হবে ঐতিহাসিক বক্সা ফোর্ট। উত্তরবঙ্গের যে কোনও জায়গা থেকে যাওয়া যায় বক্সায়। তবে, সবচেয়ে সুবিধাজনক হল, আলিপুরদুয়ার শহর থেকে যাওয়া। খুব সুদূর অতীতে নয় যখন ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে বক্সায় কলেজের এস্কারশনে ছাত্র-ছাত্রীরা ভিড় জমাতেন বছরে এক–দুবার। সে সব কথা যদিও এখন ইতিহাস।

     

    জয়ন্তীর আকর্ষণও কিছু কম নয়। ডুয়ার্সের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে রেললাইনের অনেকটা। একসময় এই রেললাইনের ট্রেনে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছে অনেকগুলি হাতির। এখন অবশ্য রেল চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। আগে, রাজাভাতখাওয়ার ঘন অরণ্যের মধ্যে দিয়ে ট্রেনে চেপে জয়ন্তী যাওয়া যেত। এই রেলপথের অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল গা ছমছম করা অন্ধকার রাস্তা। তবে, জয়ন্তী পৌঁছে গেলে নিমেষে বদলে যায় প্রকৃতিটা। নদী পাহাড় অরণ্য– কী নেই সেখানে? প্রকৃতি যেন অকৃপণ ভাবে মেলে ধরেছে তার সব সম্ভার। প্রকৃতির এই জলছবি, চোখে না দেখলে, বিশ্বাস করাটাই কঠিন।

     

    জয়ন্তী থেকেও বক্সা যাওয়া যায়। বক্সা দুর্গে ইংরেজ আমলে বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী বন্দি থেকেছেন। ঐতিহাসিক এই দুর্গ এখন হারিয়ে যাওয়ার মুখে। তার ভগ্নাবশেষ দেখে অনুমান করা কঠিন, কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই দুর্গ। বক্সায় রাজবন্দিদের জন্য, রবীন্দ্রনাথ একবার শুভেচ্ছাবার্তাও পাঠিয়েছিলেন। কতজন যে এই বক্সার দুর্গ থেকে নিঁখোজ হয়ে গিয়েছে, ভগ্ন দেওয়াল আজও মনে রেখেছে কি তাদের কথা? আমরাই কি জানতে চাইবার চেষ্টা করেছি কোনওদিন সেই অখ্যাত নামপরিচয়হীন সংগ্রামীদের? বক্সার দেওয়ালের একটি পাথর স্পর্শ করা মাত্রই মনে হয়, তারা হারিয়ে গিয়েছে বড় বড় নামের আড়ালে। চাইলেও আর কেউ কোনওদিন জানতে পারবে না তাদের ত্যাগ, আত্মবলিদান, তাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

    বক্সা যাওয়ার পথ চিরকালই দুর্গম ছিল। এখনও দুর্গম। দু’দিকে ঘন অরণ্য, তার মাঝখান দিয়ে রাস্তা। জন্তু জানোয়ারের দেখা মেলাও অসম্ভব নয়। তবে, যারা ভ্রমণে বেরিয়েছেন, তারা এসব ভেবে পিছপা হননা। অচেনা আর অজানাকে দেখার একটা আলাদা নেশা থাকে। তার কাছে এসব বিপদ আপদ তুচ্ছ হয়ে যায়। বক্সা দুর্গ দেখবেন বলে যাঁরা পথ হাঁটা শুরু করেছেন, তাঁরা বক্সা পৌঁছে তবেই থামবেন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কে মনে আছে? একসময় রানার সত্যিই চিঠি বিলি করত বক্সায়। ঐতিহাসিক স্মৃতির রোমন্থন নয়, বক্সা যেন অতীত ইতিহাসের হলদে পাতায় আঙুল দিয়ে আলতো ছোঁয়ায় ফুটে ওঠা জীবন্ত অধ্যায়। তবে দুভার্গ্য, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এসব স্মৃতিময় ঐতিহাসিক স্থান পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে।

     

     

    মুড বদলের জন্যে চলে যাওয়া যেতে পারে জয়ন্তী। জয়ন্তী থেকে চলে যাওয়া যায় ভুটানঘাট। হাতিপোতা ভুটানঘাট। পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে এখানেও। নানা দেশ থেকে আসা টুরিস্টদের ভিড়ে জমজমাট থাকত এক সময়। শীতকালে জায়গাটা আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। অরণ্য আর পাহাড়ের সঙ্গে ডুয়ার্সের আকর্ষণ তার নদীও। অদ্ভুত সুন্দর সব নাম তাদের। তিস্তা, তোর্ষা কালজানি। লিস, ঘিস, চেল, ডায়না, জর্দা। তুরতুরি, সঙ্কোশ জলঢাকা। ডুয়ার্স মানে চা বাগানও। উঁচু নিচু ঢালু জায়গা জুড়ে বিছনো এক সবুজ চাদর। চা ফুল যদিও সব সময় দেখা যায় না। তবে একেবারেই দেখা না পাওয়ার মতো বিষয়ও নয়। সাদা নয়, ক্রিম কালারের ছোট ছোট ফুলগুলো অপূর্ব দেখতে।

    ডুয়ার্স মানে আরও কত জায়গা– মাল মেটেলি চালসা নাগরাকাটা। বীরপাড়া বানারহাট সান্তারাবাড়ি মাদারিহাট। ডুয়ার্স মানে জলদাপাড়া অভয়ারণ্যও। জঙ্গল গভীর অরণ্যে ঘেরা। তবে, প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্যে এই গভীর জঙ্গল বিশেষ নিরাপদ নয়। জঙ্গলের মধ্যে দেখা মিলতে পারে একশৃঙ্গ গন্ডার, হাতি, গাউর। ভাগ্য ভালো থাকলে দেখা মিলতেও পারে হঠাৎ উড়ে যাওয়া ময়ূর। তবে গভীর জঙ্গল বাঘ দৌড়ে আসবার সম্ভাবনা তেমন নেই। হাতি বা অন্যান্য পশুদের উপস্থিতি বিষয়ে অবশ্যই একটু সচেতন থাকতে হবে। কারণ তাদের আগাগোনা চলে ঘোরের আবেশে। নিজস্ব ভারিক্কি চালে মৃদু ছন্দে। তাদের যাতায়াতের পথে নতুন কিছু দেখলে অনেকটা আমাদের মতোই এই বন্য পশুগুলোও নিজেদের কৌতূহল দমন করতে না পেরে ছুটে আসে। তাদের সঙ্গে ‘হাই’, ‘হ্যালো’ বলে ভাব বিনিময় করতে না যাওয়াটাই মঙ্গল।

    ডুয়ার্স মানে লাটাগুড়ি পেরিয়ে ঘন অরণ্য আর কাঠামবাড়ির অরণ্যও। মাঝেমাঝে লাটাগুড়ি থেকে মালবাজার যাওয়ার রাস্তায় হঠাৎ চলে আসে একটা বা দুটো হাতি। জলদাপাড়া অভয়ারণ্য, বেঙ্গল সাফারি এসব জায়গায় ঘুরতে গেলে অবশ্যই গন্তব্যস্থল স্থির রেখেই বেরোতে হয়। যদি গন্তব্যস্থল নির্দিষ্ট না থাকে, তাহলে ডুয়ার্সের এক একটি রাস্তা পৌঁছে দেবে নতুন কোনও জঙ্গল, নদী, অদ্ভুত কোনও স্থান, দূর দূরান্ত বিস্তৃত চা বাগানের আঙিনায়। জঙ্গলে ঢুকলে দেখা যায়, রাস্তার পাশে বা ভেতরে স্থাপিত একটি লৌকিক দেবীর পাথুরে মূর্তি। যদিও ভামরী দেবীর মন্দিরের সঙ্গে পুরাণ মিথ, দেবী চৌধুরানীর মন্দিরের সঙ্গে ইতিহাস জড়িয়ে আছে। কোনও পর্যটক মন্দির বা লৌকিক দেবতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে স্হানীয় কোনও মহিলা বা পুরুষ হাসিমুখে জানিয়ে দেবে, আসলে তিনি শিব বা বিষ্ণুরই এক রূপ, অনার্য নয়, দেবতা আর্য ।

    এইসব মিলিয়েই ডুয়ার্স। ডুয়ার্স মানে দরজা। পর্যটকদের জন্যে প্রকৃতির এই দরজা সবসময়ই খোলা। ঋতুভেদে ডুয়ার্সের ভিন্ন রূপ লাবণ্য যা আকৃষ্ট করে, অবাক করে, হতবাক করে। ডুয়ার্সের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের বসতি, পোশাক পরিচ্ছদ, সহজ সরল অথচ কষ্টসহিষ্ণু জীবনযাপন, ধর্মীয় বিশ্বাস, রীতিনীতি, খাদ্যাভ্যাস, আচারব্যবহার সব মিলিয়ে যে চিত্র তা এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র্য অধ্যায়। আধুনিকতা তাদের গ্রাস করে নিতে পারেনি। যদিও, পর্যটকদের সান্নিধ্যে তাদের পরিবর্তন এখন সবদিক দিয়েই লক্ষ্য করবার মতো। তাহলেও প্রকৃতির খোলা হাওয়ায় লালিতপালিত মানুষগুলো আজও যে নাগরিক দূষণ মুক্ত তা তাদের সহজ সরল হাসিতে ফুটে ওঠে। তাই তো প্রকৃতির কোলে, নিবিড় জঙ্গলে আজও তারা বিনা বাক্যব্যয়ে অতিথিকে বরণ করে নিতে পারে অসীম উদারতায়। অর্থের লেনদেনের বাইরে যথার্থ অর্থে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More