বুধবার, নভেম্বর ১৩

স্টোন্‌হেঞ্জে সূর্যপ্রণাম

চান্দ্রেয়ী সেনগুপ্ত

উইল্টসায়ারের অন্তর্গত সলস্‌বেরি শহর। দিগন্তব্যাপী সবুজে ঢাকা শান্ত, স্নিগ্ধ, নিরিবিলি শহরটি জনসমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রতি বছর ২০ এবং ২১ জুন।  ২১ জুন – সামার সলস্‌টিস।

জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী, উত্তর গোলার্ধের যাত্রাপথে, সূর্যদেব আকাশের সর্বোচ্চ বিন্দুতে অবস্থান করেন ২১ জুন এবং এই দিনে উত্তর মেরুর ঢাল সূর্যের নিকটতম স্থানে পৌঁছায়। ফলে উত্তর গোলার্ধ সর্বাধিক সূর্যালোক পায়। তাই ২১ জুন এই গোলার্ধের দীর্ঘতম দিন।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এইটিই সম্ভবত মানুষের প্রথম পর্যবেক্ষণ।

সূর্যদেব প্রাণের উৎস। ফলে, যে দিনটিতে তাঁর সর্বাধিক প্রকাশ, সে দিনটি বিশেষ ভাবে উদযাপিত হওয়াই স্বাভাবিক। ঐতিহাসিকদের মতে, বহু প্রাচীন যুগ থেকেই মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই দিনটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে এবং নানা আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপিত হয়ে এসেছে।

প্রাচীন স্থাপত্যবিদ্‌রাও সচেতন ছিলেন এই দিনটি সম্বন্ধে। মিশরে, স্ফিংক্স- এর কাছে দাঁড়ালে দেখা যায় যে, প্রতি বছর ২১ জুন দুটি প্রধান পিরামিডের মধ্যবর্তী স্থানে সূর্যাস্ত হয়। মহারাজা জয়সিংহ নির্মিত দিল্লির যন্তরমন্তরের মিশ্রযন্ত্রটি বছরের দীর্ঘতম ও সংক্ষিপ্ততম দিন নির্ধারণ করে। নিউ মেক্সিকোয় এজ্‌টেক্‌ সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে একটি দেওয়াল পাওয়া  যায় যেটির পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়ালে, পুর্বপ্রান্তে সামার সলস্‌টিসের সূর্যোদয় দেখা যায়।

বর্তমানকালে ইংল্যান্ডের সল্‌স্‌বেরিতে অবস্থিত স্টোন্‌হেঞ্জে উৎযাপিত সামার সলস্‌টিস সবচেয়ে বিখ্যাত। প্রতি বছর হাজার হাজার লোক আসে এই দিনে সূর্যের প্রথম রশ্মি গায়ে মাখতে। এখানে পাথরের দুটি বৃত্ত আনুমানিক ৪৫,০০০ বছর আগে তৈরি। কারা এটি তৈরি করেছিল এবং কেন করেছিল সে বিষয়ে নানা অনুমান থাকলেও আজ পর্যন্ত কোনও সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। কেউ মনে করেন এই বিশেষ বৃত্ত তৈরি করা হয়েছিল সূর্য ও চন্দ্রের গতি পর্যবেক্ষণ করতে, কেউ বলেন এটি আরোগ্যস্থান হিসেবে ব্যবহার করা হত। আবার অনেকের মতে এটি কবরস্থান ছিল। এই পাথরের বৃত্তের রহস্য মানুষকে আজও বিস্মিত করে। তবে এটি নিশ্চিত যে স্টোনহেঞ্জের পাথরের বিন্যাস সামার এবং উইন্‌টার সলস্‌টিসের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সাথে সারিবদ্ধ।

একমাত্র সলস্‌টিসের দিন এই প্রস্তরবৃত্তের মধ্যে প্রবেশ করা যায়। অন্যান্য দিন কিছুটা দূর থেকে দেখতে হয়।  ভিতরের বৃত্তের বড় পাথরগুলি সারসন্‌ পাথর, যেগুলো এখান থেকে ১৯ মাইল উত্তরে মার্লবারো ডাউন্স্‌ থেকে সংগৃহীত। এগুলোর ওজন ৩৫ টনের মত।

বাইরের বৃত্তের পাথরগুলো অনেক ছোট এবং এখন প্রায় বিলুপ্ত। এগুলো ব্লু স্টোন্‌ এবং ওজনে ৩ টনের কাছাকাছি। এগুলি আনা হয় ওয়েলস্‌ থেকে।

এই দুটি বৃত্ত থেকে কিছুটা দূরে দুটি বড় সারসন্‌ পাথর ছিল (এখন একটি বর্তমান), এদুটি হল ‘হিল স্টোন্‌। সামার সলস্‌টিসের সূর্যোদয়ের প্রথম রশ্মি এই দুটি পাথরের মাঝখানে পড়ে।

পেগান পদ্ধতিতে সলস্‌টিস উৎসব উদযাপন এখানে ১৯০৫ সাল থেকে শুরু হয়। যারা এখানে আসেন, তাদের অনেকের কাছে স্টোন্‌হেঞ্জ একটি পবিত্র স্থান এবং সামার সলস্‌টিস একটি বিশেষ মুহুর্ত্ত।  পেগান, ড্রুইড্‌ ছাড়া অন্য বহু ধর্মাবলম্বী মানুষ সামার সলস্‌টিসের বিশেষ মুহূর্তে এখানে আসে প্রাণের উৎসকে প্রণাম জানাতে।

লন্ডন্‌ থেকে স্টোন্‌হেঞ্জের দূরত্ব ৮৮ মাইল। গাড়ীতে যেতে লাগবে ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। ট্রেনে যেতে লাগবে ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। লন্ডন্‌ থেকে প্রচুর ট্যুর কোম্পানি পর্যটকদের নিয়ে যায় স্টোন্‌হেঞ্জে। শুধু স্টোন্‌হেঞ্জ ট্যুরের খরচ পরবে ৫০০০ টাকা। সময় লাগবে আধ-বেলা, সকাল অথবা বিকেল, দু বেলাই এই ট্যুর পাওয়া যায়। তবে জনপ্রিয় ট্যুর হোল ১ দিনের, ৩টি প্রসিদ্ধ স্থান দেখা – স্টোন্‌হেঞ্জ, উইন্ডসার্‌ ক্যাসেল ও বাথ্‌ শহর (যেখানে বিখ্যাত রোমান বাথ্‌ অবস্থিত)। সকাল ৮:০০টায় লন্ডনের ভিক্টোরিয়া বাস স্টেশন থেকে বাস ছাড়ে। রাত ৯:০০ টায় ফেরত।  এই ট্যুরটির খরচ ৯৫০০ টাকা।

লেখিকা লন্ডনের সেন্ট মেরি হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ

Comments are closed.