মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

হীড়বাঁধ বনবাংলো ও বারোঘুটু

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

সপ্তাহের ছুটিতে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছেন? কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, থাকার জায়গা আছে কি না, কী কী দেখবেন– এ সবও নিশ্চয়ই ভাবতে হচ্ছে। এবার থেকে সেই দায়িত্ব আমাদের। যাঁরা বেড়াতে ভালবাসেন, যাঁরা দেখতে চান বাংলার মুখ, তাঁদের কথা মনে রেখেই শুরু হল নতুন এই ধারাবাহিক ‘পায়ে পায়ে বাংলা’। এ হল বেরিয়ে পড়ার ভ্রমণ গাইড। এ এমন এক সোনার কাঠি, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। তা হলে আর দেরি নয়। খুঁজে নিন আপনার পছন্দের জায়গা, গুছিয়ে ফেলুন ব্যাগ, হুশ করে বেরিয়ে পড়ুন সপ্তাহের শেষে। আপনার সঙ্গে রয়েছে ‘পায়ে পায়ে বাংলা’।

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ঋতুচক্রের পালা বদল ঘটে চলে। কখনও প্রবল শীতে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া কাঁপুনি অথবা প্রচণ্ড দাবদাহে চামড়াও যেন পুড়ে যাবে এমনই প্রাণান্তকর অবস্থা। দাবদাহ শব্দটা মনে করিয়ে দিল রোদ্দুরের কথা। না, সে আপাতত মিঠে নয় বরং তার এখন অত্যন্ত চড়া মেজাজ। ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত তার রোষানলে অনেকেই ভয়ে জড়সড়। তবে সবাই যে একই দলের শরিক তা নয়, অনেকেই খুব সহজ ভাবেই প্রকৃতির এই নিজস্ব চলনকে মেনে নয়। তাই সূর্যের নরম বা কঠোর হওয়ার কারণে তাদের পায়ের নিচের সর্ষের পরিমাণে তারতম্য হয় না। দু–এক দিনের ছুটি পেলেই এমন দহনদিনেও তাই অনেকেই পিঠে বোঁচকা বেঁধে পায়ে পায়ে পাহাড়ে নয়তো অরণ্যের উদ্দেশে পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবে। আর দূর–দূরান্তে পাহাড়ে পৌঁছনর আগেই যদি পৌঁছে যাওয়া যায় ছায়াসুনিবিড় বনরাজির সবুজ অন্ধকারে তাহলে কেমন হয়! রৌদ্র যখন ব্যাধের তিরের মতো বিদ্ধ করে সর্বাঙ্গ তখন সেই উত্তাপ জর্জরিত শরীরকে তো ঠাণ্ডা করতে পারে একমাত্র আরণ্যক ছায়া।

অতএব এবারে বেছে নেওয়া হল বাঁকুড়া থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার দূরত্বে নির্জনতার সাকিন হীড়বাঁধকে। খুব বেশি ভাবনাচিন্তা করার দরকার নেই। একদম হাতের কাছেই হীড়বাঁধ। খাতড়া রেঞ্জের ১৬০০ হেক্টর বনাঞ্চল নিয়ে হীড়বাঁধ বিট।

ষাটের দশকে এ অঞ্চল অরণ্যই ছিল কিন্তু নির্দ্বিধায় ও নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে গত ত্রিশ বছরে নিবিড় অরণ্য ডাক্তার হাজরার মতোই ‘ভ্যানিশ’ হয়ে গিয়েছিল। আশির দশক থেকে চেষ্টা চলছে এই বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারের। তারই ফলস্বরূপ আজকের হীড়বাঁধ প্ল্যান্টেশন ফরেস্ট। যেহেতু প্রকৃতির নিজস্ব খেয়ালে নয়, মানুষের সচেতন উদ্যোগে নির্মিত তাই সবুজের সারির শৃঙ্খলবদ্ধতা নজর কাড়ে। শাল পিয়াল মহুয়া ইউক্যালিপ্টাস চন্দনের দৌলতে বন্ধ হয়েছে প্রবল ভূমিক্ষয়, ঊষর জমি ফিরে পেয়েছে শ্যামলতা। বেড়েছে সচেতনতা। গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে বনরক্ষা কমিটি। আজ কেউ গাছ কাটলে গ্রামবাসীরা বাধা দেয় অথবা বিট অফিসে খবর দিতে ছোটে।

বাসরাস্তা থেকে মোরাম বিছানো পথ গেছে হীড়বাঁধ গ্রামের দিকে। দেড়-দুশো ঘর নিয়ে বেশ সম্পন্ন গ্রাম। উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে আর রয়েছে গর্ব করার মত দুর্গাপূজার নাটমন্দির। এই নাটমন্দিরের নির্মাতা গাঁয়ের সম্পন্ন মহান্তি পরিবার। মন্দিরের বয়স পঁচাত্তরের ওপর। গ্রামের দুর্গাপূজা বেশ জাঁকজমক করেই হয়, সারা গ্রাম মেতে ওঠে উৎসবের এই কটি দিন।

এইরকম একটি জায়গায় সপ্তাহান্তিক ছুটি কাটানোর ইচ্ছে অবশ্যই হতে পারে কারণ থাকার জন্য রয়েছে হীড়বাঁধ বনবাংলো। একেবারে রাজকীয় ব্যবস্থা। বিরাট এলাকা নিয়ে বনবাংলোর চৌহদ্দি। বিশাল বিশাল শাল, পিয়াশাল, মহুয়া, বহেরা, আকাশমণি, ইউক্যালিপ্টাস আর গোটা কতক চন্দন গাছ সর্বদা অতিথিকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত। ক্যাম্পাসের কেন্দ্রে রয়েছে ছিমছাম লাল টালিতে ছাওয়া বাংলো। চারিদিক নিস্তব্ধ। শ্যামা দোয়েল বেনেবউ আর ফিঙের ডাক আলস্যকেই যেন আরও প্রশয় দেয়। ভারী চমৎকার আধুনিক উপকরণে বাংলোটি সজ্জিত। যদিও লোডশেডিংয়ের দৌরাত্ম্য এখানে প্রবল। তার জন্য অবশ্য বিশেষ চিন্তা নেই, ইনভার্টারের ব্যবস্থাও আছে। তবে নেই পর্যাপ্ত বা চাহিদামতো আনাজপত্র। বাঁকুড়া থেকে খাদ্যসম্ভার কিনেই হীড়বাঁধে ঢোকা শ্রেয়। বাংলোর পিছনে পায়ে চলা পথ গিয়ে ঠেকেছে স্বচ্ছ সবুজ ঝিলের পাড়ে। নীল আকাশের ছায়া তার গায়ে। তিন চার বিঘার বিশাল ঝিল। বর্ষায় ফুলে ফেঁপে একাকার, গ্রীষ্মে হা হা করা শূন্যতা। তাই মাছচাষের জন্য বরাদ্দ মাত্র ছ’মাস।

শীতকালে গেলে হীড়বাঁধ থেকে যদি একদিন বনভোজন করার ইচ্ছে থাকে তাও সম্ভব হতে পারে। কারণ চার কিলোমিটার দূরে রয়েছে চমৎকার পিকনিক স্পট দেওলাগোড়া। বাংলোর ঠিক সামনে মসৃণ পিচপথে খাতড়ার দিকে দুই কিলোমিটার এগিয়ে ডানদিকে যেতে হবে আরও খানিকটা, তবেই পৌঁছানো যাবে স্বপ্নিল সেই দেওলাগোড়াতে। দু’প্রান্তে দুটি ঝিল দিয়ে বাঁধা, ৩০-৪০ একর জমিতে বালি পাথরের ছোট ছোট টিলা, উঁচু উঁচু বোল্ডার ছড়িয়ে রয়েছে ইতিউতি। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে শাল, পিয়াশাল, মহুয়ার সারি। শহরের ধুলো ধোঁয়া এড়িয়ে সবুজের মাঝে টাটকা অক্সিজেন বুক ভরে নিতে হলে একবার আসতেই হবে হীড়বাঁধে। সপ্তাহের শেষে ছুটি কাটানোর একেবারে আদর্শ জায়গা। এখানে আসতে গেলে দৈনন্দিন কাজকর্ম সেরে রাতের হাওড়া–আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে বাঁকুড়া ষ্টেশন। আর সেখান থেকে জিপে বা ট্রেকারে হীড়বাঁধ। খাতড়ার একটু আগে মূল পথ ছেড়ে হীড়বাঁধে পথ গেছে ডানদিকে। এই পথই আবার হীড়বাঁধ ঘুরে খাতড়ার ঠিক আগে মূল পথে মিশেছে। সে পথ গেছে খাতড়া হয়ে মুকুটমণিপুর।

হীড়বাঁধ বনবাংলোর বুকিং— ডি.এফ.ও, বাঁকুড়া সাউথ ডিভিশন, বাঁকুড়া। দূরভাষ-০৩২৪২-২৫০৩০৭।

       বারোঘুটু

সারা পৃথিবী জুড়েই সম্প্রতি গ্রামীণ পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়েছে। পর্যটনের মধ্যে দিয়ে জীবিকার সন্ধান খোঁজার চেষ্টাকে সব দেশ স্বাগত জানিয়েছে। An Indigenous Tourism Project–এর মধ্য দিয়ে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়া গেছে বাঁকুড়ার বারোঘুটুতে। এর  পরিচালনার দায়িত্বে আছে মুকুটমণিপুর গ্রামীণ পর্যটন পরিচালন সমিতি। গ্রামের মানুষদের নিয়ে এই কমিটি তৈরি হয়েছে। এই প্রকল্পটিকে সহায়তা করছে ভারত সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও জেলা পরিষদ। হীড়বাঁধ থেকে ভেতরের রাস্তা দিয়ে কয়েক কিলোমিটার গেলেই পড়বে পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা অভূতপূর্ব গ্রাম জামবেদিয়া ও বারোঘুটু হিল। ঘুটু অর্থে পাহাড় অর্থাৎ বারোটি পাহাড়ের অজানা ঠিকানা। কোলাহলবিহীন নির্জন প্রকৃতির কোলে এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণের ঠিকানা পঞ্চপল্লী টুরিস্ট কমপ্লেক্স। ফুলে ফলে সুদৃশ্য কটেজগুলি প্রথম দর্শনেই মন কেড়ে নেবে। ছোট টিলার মধ্যে এখানে ওখানে ছড়িয়ে থাকা কটেজগুলি এককথায় অসাধারণ। একটু উপরে রয়েছে মুক্তমঞ্চ সহ পাহাড়ের ধাপে বসার আসন। থাকার জন্য রয়েছে ডাবল বেড ও ডাবল বেড এসি সহ ঘর।

বারোঘুটুতে থাকার জন্য যোগাযোগের চলভাষ- ৯৪৩৪৫৯০৩৯৯ ও ৯৯৩২৮০০৯৩১।

Comments are closed.