মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

সেলফি-প্রেমীরা কি নার্সিসিস্ট? সেলফিমুগ্ধতা আসলে একটা অসুখ, দুনিয়া জুড়ে ডেকে আনছে অকালমৃত্যু

  • 47
  •  
  •  
    47
    Shares

দ্য ওয়াল ব্যুরো: মোবাইল ক্যামেরায় ফিল্টার মোড সেট করতেই ঘণ্টাখানেক লাগে মৌমিতার। কোন মোডে গালের বাঁ পাশের টোলটা ঠিক ঠাক আসবে, গালের মেদ কিছুটা হলেও কম লাগবে বা কপালে এসে পড়া অবিন্যস্ত চুলে বেশ একটা ওয়েট লুক আসবে, এই সব করতে করতেই রোজ কলেজ যেতে দেরি। মায়ের বকুনি। স্টেটাসে একটা জমকালো সেলফি না চিপকালে দিনের শুরুটা একেবারেই ভালো যায় না রিনার। সহকর্মীরা একটু প্রসংশার চোখে তাকাবে। মাথা ঘুরে যাবে বয়ফ্রেন্ডেরও। সেলফি ক্যামেরার কারসাজিতে বানতলার রিনা হয়ে উঠবে বলিউডের ক্যাটরিনা কাইফ।

গুছিয়ে একটা সেলফি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া। তারপর অজস্র ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’ কিংবা ‘ওয়াও’। বাস্তবের তুলনায় তরুণ প্রজন্ম এখন ভার্চুয়াল দুনিয়াতেই বেশি বাঁচে। নিজের রাগ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা-প্রেম-খুনসুটি সবকিছু প্রকাশের মাধ্যমই হলো সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, হোয়াটস্অ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য অ্যাপে নিজের এক টুকরো ছবি, সঙ্গে ক্যাপশন।  স্টাইল বা স্টেটাস স্টেটমেন্টের এটাই একমাত্র মাধ্যম। আর এতেই মজে আঠারোর তরুণী থেকে আটচল্লিশের গৃহবধূ।

সেলফি তুলে তা খুঁটিয়ে দেখা, পছন্দসই না হওয়া অবধি বারংবার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এ বার পছন্দের ছবি ফটো ফিল্টারে এডিট করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সে ছবি পোস্ট করা, ঘুরে ফিরে লাইক-কমেন্টে চোখ রাখা, এই সেলফি-সিনড্রোম কোনও আকর্ষণ নয়, বরং একটা অসুখ। এমনটাই বলছেন মনোবিদরা। ছবি তোলার থুড়ি নিজেকে ভালো দেখানোর এই দুর্নিবার হাতছানি যে কোনও ড্রাগের নেশার থেকেও মারাত্মক। যেখানে সেখানে, যখন তখন, নিজেকে ক্যামেরা বন্দি রাখার জন্য ভিতরের যে ছটফটানি, সেটাকেই ডাক্তারি ভাষায় বলা হচ্ছে ‘সেলফাইটিস’ (ঘন ঘন সেলফি তোলার প্রবণতা)। মনোবিদরা বলছেন, এর থেকেই জন্ম নিচ্ছে নানা স্নায়ু রোগ। শুধুমাত্র নিজেকে ভালো দেখাবার চক্করে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে মানুষ। বাসা বাঁধছে অপরাধপ্রবণতা।

কী বলছে সমীক্ষা

২০১১ অক্টোবর থেকে ২০১৭-র নভেম্বর পর্যন্ত শুধুমাত্র সেলফি নিতে গিয়ে গোটা দুনিয়াতে মৃত্যু হয়ছে ২৫৯ জনের। গত ১০-১২ বছরে এই অসুখ আরও বেড়েছে বলেই মত মনোবিজ্ঞানীদের।  শুধু ভারত নয়, সেলফি-ম্যানিয়াকের তালিকায় রযেছে রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের নামও। ওয়াশিংটন পোস্ট ২০১৬ সালের একটি রিপোর্টে বলেছিল, ২০১৪-২০১৫ সালের মধ্যে শুধু ভারতেই বিপজ্জনক ভাবে সেলফি তুলতে গিয়ে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।  মৃতদের মধ্যে অধিকাংশেরই বয়স ২২-২৯ বছরের মধ্যে।

সেলফি তুলতে গিয়ে খাদে পড়ে মৃত্যু হয় ‘বিকিনি ক্লাইম্বার’ গিগি উও-র

‘পার্সোনালিটি অ্যান্ড ইনডিভিজুয়াল ডিফারেন্সেস’ নামে একটি জার্নালে সম্প্রতি সেলফি সংক্রান্ত একটি অনলাইন সমীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র মহিলাদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি নয়, পুরুষদের মধ্যেও এই আসক্তি ক্রমেই বাড়ছে। অনেক সময় মহিলাদের সেলফি তোলায় সাহায্য করতে গিয়েও মৃত্যু হচ্ছে তাঁদের। এর মধ্যে জলে ডুবে মৃত্যু, পথ দুর্ঘটনা, পাহাড়ের কিনারায় বিপজ্জনক ভাবে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে গিয়ে মৃত্যু, উদাহরণ অজস্র। তাইওয়ানে গত জানুয়ারিতেই ‘বিকিনি ক্লাইম্বার’ সেলিব্রিটি গিগি উও পাহাড়ের চূড়ায় সেলফি তুলতে গিয়ে খাদে পড়ে প্রাণ হারান। সমীক্ষা বলছে, প্রতি ১০০০ জন পুরুষের মধ্যে  ৮০০ জনই সেলফির নেশায় বুঁদ।

সেলফিমুগ্ধেরা কি আসলে নার্সিসিস্ট?

প্রতিটা মানুষই কম বেশি নিজেকেই ভালবাসে। মনোবিদরা বলছেন, এ কালের নার্সিসিস্টরা আসলে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিক্টেড। বই, সিনেমা, নাটক, ছবি আঁকা, গল্প-আড্ডার চেনা অবসর পেরিয়ে মানুষ এখন সেলফি-ম্যানিয়াক। নিজেকে সকলের সামনে সুন্দর দেখানোর প্রবণতা থেকেই জন্ম নিচ্ছে একধরণের নিরাপত্তাহীনতা। আত্মপ্রেমে মগ্ন হয়ে পড়ছে মানুষ। যার থেকে আসছে আত্মরতির স্পৃহা।

আবার দেখা যাচ্ছে চূড়ান্ত মানসিক অবসাদ, একাকীত্ব থেকে জন্ম নিচ্ছে ছবি তোলার প্রতি এই আকর্ষণ। অবসাদ ও তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে অনেক সময় ব্যক্তিটি নিজের মানসিক তৃপ্তির জন্য এমন করছেন। ছবি এডিট করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে প্রচুর ভাল কমেন্ট এবং লাইক পেতে চাওয়ার এই খিদে আসলে মানুষ কতটা অসুখী, নিরাপত্তাহীন ও মনকেমনের শিকার সে দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার জোশেমাইট ন্যাশনাল পার্কে বেড়াতে গিয়ে ৮০০ ফুট নীচে পড়ে মৃত্যু হয় ভারতীয় দম্পতী বিষ্ণু বিশ্বনাথ ও মীনাক্ষি মূর্তির

মনোবিদদের কথায়, জীবন যখন একঘেয়ে হয়ে যায়, যখন কোনও লক্ষ্য থাকে না, তখন মানুষ সাময়িক আনন্দের জন্য ঝুঁকি নিয়ে ফেলে। কারও কারও ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি নেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। মানসিক বিকারগ্রস্থ হওয়ারও সম্ভবনা দেখা যায়। যা স্বাভাবিক চোখে ধরা পরে না।  নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেখানোর নেশায় ট্রেন লাইনের উপরে উঠে যাচ্ছি, নাকি ঢেউয়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছি সে খেয়াল মানুষের থাকে না। এটাও একধরনের নার্সিসিজম।

সেলফাইটিস থেকে কারপাল টানেল সিনড্রোম

কেমন ভাবে ফাটাফাটি সেলফি তুলবেন সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে গেলেই ঝাঁকে ঝাঁকে ওয়েবসাইট খুলে যায়। শুধু ‘সেলফি স্টিক’ নয়, নিজস্বী তোলার জন্য বিশেষ জুতোও এসে গিয়েছে বাজারে। সেলফি-ফ্রেন্ডলি হওয়ার উপরেই স্মার্টফোনের বিক্রি ও দাম বাড়ছে হু হু করে। চিকিৎসকরা বলছেন, সারা ক্ষণ ফ্রন্ট ক্যামেরার দিকে হাত বেঁকিয়ে ছবি তোলার স্বভাব ডেকে আনছে কারপাল টানেল সিনড্রোম। দীর্ঘক্ষণ হাতের পেশীর উপর চাপ পড়ায় সেখানে ব্যথা জমাট বাঁধতে পারে। ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা শরীরে। এমনকি, ঘন ঘন সেলফি তোলার স্বভাবের জেরে অসাড় হয়ে যেতে পারে আঙুল। বাড়াবাড়ি হলে পঙ্গুও হতে পারেন কেউ কেউ। পরবর্তী কালে অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন হতে পারে।

Comments are closed.