শনিবার, মার্চ ২৩

ফোনটা কাঁপল, কিন্তু কিছুই তো আসেনি! কেন হয় এমন ভূতুড়ে ব্যাপার, জেনে নিন

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ধরা যাক, অফিস যাওয়ার জন্য বেরিয়েছেন আপনি। আচমকাই ভাইব্রেট করে উঠল পকেটের মোবাইলটি। চট করে চেক করলেন, দেখলেন কিছুই আসেনি। বা ধরুন, সিনেমা হলে বসে আছেন। আচমকা পকেটে কেঁপে উঠল মোবাইল। চেক করতে গিয়ে দেখলেন, মোবাইলটি তো পকেটে রাখেনইনি। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এমনটা আপনার সঙ্গেও হয়তো ঘটেছে কয়েক বার। মনে হয়েছে, এ কী ভূতুড়ে কাণ্ড, তাই না! কখনও আবার মনে হয়েছে, বুঝতে ভুল হয়েছিল হয়তো।

কিন্তু গবেষণা বলছে, এতে ভয় বা ভুল কোনওটাই নেই। এমনকী এটা শুধু আপনার একার সঙ্গেই ঘটে, তা-ও নয়। বরং গবেষকদের মতে, মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনই কোনও না কোনও কারণে এবং কোনও না কোনও সময়ে এমন বিভ্রান্তির শিকার হন। ফোনে কল কিংবা মেসেজ না আসার সত্ত্বেও আপনার মনে হয়েছে কখনও যে ফোনটি ভাইব্রেট হচ্ছে, বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় ‘ফ্যান্টম ভাইব্রেশন সিন্ড্রোম’। গবেষকেরা বলছেন, এক রকমের প্রযুক্তিগত মানসিক বিভ্রান্তি।

তাঁদের ব্যাখ্যা, আজকাল আমাদের মধ্যে মোবাইল ফোনের ব্যবহার এতটাই বেড়ে গিয়েছে, যে দিনের অনেকটা সময়ই এই যন্ত্রটার উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, এর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি। ঘরে কিংবা বাইরে, প্রতিটা মুহূর্তে আমাদের ফোনটি সঙ্গে থাকা চাই। কাজের ফাঁকে কিংবা যাত্রা পথে সারা ক্ষণই ফোনটা হাতে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি আমরা! আমাদের অনেকেরই কিছু সময় অন্তর ফোনের নোটিফিকেশন চেক করা স্বভাব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব সময়ে যন্ত্রটি সঙ্গে রাখতে গিয়ে আমাদের এমনই অবস্থা হয়েছে, যে ফোনটি যেন আমাদের শরীরেরই একটি অংশ হয়ে উঠেছে।

এবং গবেষণা বলছে, এই মোবাইল ফোনগুলোই আমাদের শরীরে ও মনে এমন একটি অভ্যাসের সৃষ্টি করছে, যাতে শরীরের নানা রকম সংবেদনশীল ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়াগুলোকে আমাদের শরীর ফোনের কল কিংবা মেসেজ আসার ভাইব্রেশন ভেবে ভুল করছে!

আটলান্টার ‘জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’-তে প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণারত ডক্টর রবার্ট রোসেনবার্গ এই বিষয়ে জানান, ফোনের ভাইব্রেশন চিহ্নিত করা এবং তার ফলে সজাগ হওয়া আমাদের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে। তাঁর মতে, সর্ব ক্ষণ ফোন ব্যবহারকারীরা নিজেদের অজান্তেই একটি কল কিংবা মেসেজ কিংবা নোটিফিকেশন মিস করার ভয়ে এতটাই ভীত থাকেন, যে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া শুধু ফোনের সেই ভাইব্রেশনটি টের পাওয়ার জন্যই উন্মুখ হয়ে থাকে। ফলে ফোনের ভাইব্রেশনের মতো একই রকম কোনো শারীরিক অনুভূতি, যেমন পোশাকের ঘর্ষণ কিংবা হয়তো কোনও পেশির সংকোচন-প্রসারণ– এ সবকে অনেকেই ফোনের ভাইব্রেশন ভেবে ভুল করে বসেন।

ডক্টর রোসেনবার্গ এ বিষয়ে বলেন, “মনে করুন, আপনি চশমা পরেন। বহু দিন ধরে চশমা পরে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেই চশমাই শরীরের একটি অংশে পরিণত হয়। আপনি যে চশমা পরে আছেন সেটি এক সময়ে আপনি আলাদা করে বুঝতেও পারেন না। অনেক সময়েই দেখা যায়, আপনি চশমা খুঁজে মরছেন অথচ চশমাটি ঠিক আপনার চোখেই রয়েছে! ফোনের ভাইব্রেশনের ব্যাপারটিও এমনই।”

আর এমনই শারীরিক অভ্যাসবশত ফোনটিও চশমার মতোই শরীরের একটি অংশে পরিণত হয়ে যায় বলে মনে করছেন গবেষকেরা। আর সেই ফোনে ভাইব্রেশন হলেই ধরে নিতে হবে কোনও কল কিংবা মেসেজ এসেছে– এমনটা আমাদের শরীর শিখে নেয় সহজাত ভাবেই। ফলে এমন একটি অভ্যাস গড়ে ওঠার ফলে খুব সহজেই আমাদের শরীর একই ধরনের কোনও ভাইব্রেশন বা কম্পনকে ফোনের ভাইব্রেশন ভেবে ভুল করে বসে।

তবে এই সমস্যা আজকের নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, একদম প্রথম দিকে যারা পেজার ব্যবহার করতেন, তাঁদের মধ্যেই প্রথম এই ‘ফ্যান্টম ভাইব্রেশন সিন্ড্রোম’টি ধরা পড়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে স্মার্টফোনের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মার্টফোনের বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং অ্যাপের ব্যবহার বাড়তে থাকলে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যেও এই ফ্যান্টম ভাইব্রেশন সিন্ড্রোম ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে।

আরও একটি মজার বিষয় হল, এই সমস্যা কিন্তু শুধু ভাইব্রেশনে নয়। যাঁরা ফোনের ভাইব্রেশন অফ করে শুধু ‘রিং’ মোডে ফোন ব্যবহার করেন, তাঁরাও ঠিক একই ধরনের একটি সিনড্রোমে ভোগেন। আর সেটির নাম হল ‘রিংজাইটি’ (ringxiety)। একটু ভিড় কিংবা কোলাহল পূর্ণ এলাকায় হঠাৎই তাঁদের মনে হয়, এই বুঝি ফোনটা বেজে উঠল। তাঁদের মনে হয় তারা ফোনের রিংটোন শুনতে পেয়েছেন। কিন্তু ফোন হাতে নিয়ে দেখা যায় আসলে কেউই ফোন কিংবা মেসেজ করেনি।

অনেক গবেষক এই সমস্যাটিকে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা বিষয়ক সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও ডক্টর রোসেনবার্গ মনে করেন, এই সমস্যার জন্ম আসলে প্রযুক্তির ডাকে সাড়া দেওয়া থেকে। ‘কম্পিউটার ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার’ নামের একটি জার্নালে প্রকাশিত তাঁর একটি লেখায় তিনি জানান, খুব বেশি সমস্যা না হলে এ নিয়ে খুব একটা ভাবার প্রয়োজন নেই। তবে এই সমস্যাটি যদি তার প্রতিদিনের জীবনযাপনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে অবশ্যই সেটি চিন্তার বিষয়। সে ক্ষেত্রে মোবাইলের ব্যবহার কমাতে হবে তাঁকে। প্রয়োজনে মনোবিদের সাহায্য নিতে হবে।

এছাড়াও গবেষকেরা এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কিছু উপায় জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রতি ৯০ মিনিট অন্তর প্রত্যেক স্মার্টফোন কিংবা প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারকারীর ১০ মিনিটের একটি বিরতি নেওয়া উচিত। এই ১০ মিনিটের বিরতি তাঁকে প্রযুক্তিগত উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করবে। শুধু তা-ই নয়, এই ১০ মিনিটে কী করণীয়, তাক একটি তালিকাও দিয়েছেন গবেষকেরা। যেমন–

১) এই ১০ মিনিটের জন্য প্রকৃতির কাছাকাছি কোনও জায়গা থেকে ঘুরে আসুন। সে বাড়ির পাশের বাগান হোক বা অফিসের পাশের লেক। যদি এ সব কিছু না থাকে, তবুও ১০ মিনিটের জন্য বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। এই ১০ মিনিট ফোনের দিকে না তাকিয়ে প্রকৃতির দিকে তাকান।
২) এই ১০ মিনিটে আপনি ছোটখাটো একটি মেডিটেশন করে নিন। আপনার মন শান্ত হবে, দুশ্চিন্তাও কমবে।
৩) হাল্কা কিছু ব্যায়াম করে নিতে পারেন ১০ মিনিটে। এতে শরীরের জড়তা দূর হবে।
৪) যদি উপরের কোনওটিই সম্ভব না হয়, তবে এই ১০ মিনিটে আপনার পছন্দের কোনও গান শুনুন। এ ক্ষেত্রে রিল্যাক্সিং কোনও গান কিংবা মিউজিকও শুনতে পারেন।
৫) গান শুনতে ভাল না লাগলে, নিজেই এই ১০ মিনিটে নিজেই একটু গান গেয়ে নিন। আপনার গানের গলা ভাল হোক কিংবা খারাপ, তা নিয়ে ভাববেন না। কারণ কোনও অনুষ্ঠানে অন্যকে শোনানোর জন্য নয়, বরং নিজের ক্লান্তি দূর করার জন্য গান গাইছেন।
৬) হাতের কাছে মজার কোনও বই রাখুন। এই ১০ মিনিটে দু’-একটি একটুখানি পড়ে ফেলুন। মন ভাল হয়ে যাবে।

গবেষকেরা বলছেন, এই নিয়মগুলো মেনে চললে ধীরে ধীরে আপনি কমিয়ে আনতে পারবেন এই সমস্ত সমস্যা।

Shares

Comments are closed.