মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

কম বয়সে টাক? সামনের চুল পাতলা হয়ে স্টাইল স্টেটমেন্টে দফারফা? কারণ রক্তাল্পতা নয় তো!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: আইটি সেক্টরের ঝকঝকে তরুণ রেহান। প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল নিয়ে নানা কসরৎ করা তাঁর অভ্যাস। মাথা ভর্তি এমন ঢেউ খেলানো চুল তাঁর গর্ব। কিন্তু এখন, বসন্তের হাওয়ার মতো মাথা ভরা চুলের জায়গায় চায়গায় চকচক করছে টাক। সদ্য কলেজ পাশ করেছে বাইশের তরুণী নিশা। ইতিমধ্যেই মাথার সামনের চুল উঠতে শুরু করেছে গোছা গোছা। খুস্কির সমস্যা ভেবে বাজার চলতি নানা শ্যাম্পু, কন্ডিশনার ব্যবহার করেও ফল মেলেনি। শেষমেশ চিকিৎসকের দ্বারস্থ নিশা। কুড়ি-পঁচিশের তরুণ-তরুণী হোক বা মধ্য চল্লিশের গৃহবধূ–চুল পড়ার সমস্যাটা এখন একচেটিয়া। দুশ্চিন্তার কারণও বটে। কারণ চুলই যেখানে সৌন্দর্যের অন্যতম কারণ, সেখানে এই বিশেষ বস্তুটিকে মোটেও হেলাফেলা করা উচিত নয়। চুল পড়ার নানা কারণ ব্যাখ্যা করেন চিকিৎসকরা, তবে জানেন কি, তার মধ্যে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা একটা অন্যতম প্রধান কারণ।

রক্তাল্পতা নিজে একটি অসুখ। আবার অনেক অসুখের কারণও। শুধু মহিলারা নন, পুরুষরাও ভোগেন রক্তাল্পতার সমস্যায়। যার কারণে শরীরের নানা রোগের মতো চুল পড়ার সমস্যাও দেখা দেয়। চুলের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হলেই টাক পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। অত্যধিক চুল ঝরা, রুক্ষ চুল, মাথার ত্বকে প্রদাহজনিত নানা রোগের কারণ হিসেবে রক্তল্পতাকেই দায়ী করেছেন চিকিৎসকরা।

কেন হয় রক্তাল্পতা?

রক্তে লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে তাকেই মূলত অ্যানিমিয়া বলা হয়। হিমোগ্লোবিন হল লোহিত রক্তকণিকায় অবস্থিত একপ্রকার প্রোটিন যার মধ্যে আয়রন এবং ট্রান্সপোর্টস অক্সিজেন থাকে। ব্যক্তি বিশেষে আলাদা হলেও শরীরে স্বাভাবিকভাবে রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ হল— পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৩.৮ থেকে ১৭.২ গ্রাম/ ডেসিলিটার। মহিলাদের ১২.১ থেকে ১৫.১ গ্রাম/ ডেসিলিটার। আমাদের দেশের মহিলাদের মধ্যে অপুষ্টি ও নানা কারণে রক্তাল্পতা উদ্বেগজনক ভাবে বাড়লেও, পুরুষেরাও কম-বেশি এই রোগের শিকার হন।

সাধারণত দেখা যায়,  রক্তক্ষয়, লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন কমে যাওয়া এবং লোহিত রক্তকণিকা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণেই অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা শরীরে বাসা বাঁধে।

রক্ত  কমে গেলে প্রভাব পড়ে চুলেও

চিকিৎসকদের মতে, যে মহিলাদের ঋতুস্রাবের পরিমাণ অতিরিক্ত হয় তাদের ক্ষেত্রে অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা খুব বেশি। দীর্ঘমেয়াদি কোনও অসুখের ফলেও রক্তাল্পতা হতে পারে। আবার দুর্ঘটনা জনিত কারণে রক্তক্ষরণ, রক্ত বমি, দীর্ঘদিন ক্যানসার রোগে ভুগলে, কৃমি সংক্রান্ত রোগে ভুগলে, গর্ভাবস্থার কারণে রক্তাল্পতা হয়। এর ছাপ যেমন পড়ে চেহারায়, তেমনি চুলের গ্রন্থিগুলো শক্তিহীন হতে শুরু করে। অনেকের ক্ষেত্রে আবার, ভিটামিন সি এবং ফলিক অ্যাসিডের অভাব আবার বি ১২ এর অভাবেও হাইপোথাইরয়েড অ্যানিমিয়া হয়।

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, অ্যানিমিয়ার ফলে রোগী যে কোন কাজেই অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করেন। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি মানসিক অবসাদের কারণও হতে পারে। এই অবসাদ অনেক সময়েই চুল পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। তা ছাড়া অ্যানিমিয়া থেকে শরীরে হরমোনজনিত নানা সমস্যা দেখা দেয়, তার থেকেও চুল পড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। পিরিয়ডের সমস্যা থাকলেও কিন্তু মেয়েদের চুল উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগে দরকার পিরিয়ডের সমস্যা মেটানো। রক্তে হিমোগ্লোবিন আর ফেরিটিনের মাত্রা কমে গেলে বা থাইরয়েডের গোলমাল থেকে চুল উঠতে পারে।

চুল তার কবেকার…

শেক্সপিয়র বা গাঁধীজির টাক ছিল মানেই আমার-আপনার টাক হতে হবে বা টাককে প্রশ্রয় দিতে হবে তার তো কোনও মানে নেই। কারণ অমন ব্যক্তিত্ব তো আর সবার থাকে না। তাই মাথা জোড়া টাক নিয়ে আজকাল চিকিৎসক বা বিউটিশিয়ানদের কাছে ছুটতে দেখা যায় হালফিলের তরুণদের।চুল পাতলা হওয়ার সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ হন তরুণীরাও। কারণ অনেকটা একইরকম, লুকের দফারফা তো হচ্ছেই, বিয়েও হচ্ছে না।

চিকিৎসকেরা বলেন, একটি চুলের জীবনচক্রের তিনটি দশা। প্রথম তিন বছর হল অ্যানাজেন দশা। নতুন চুল বেড়ে ওঠার সময়। এর পরে ২-৪ সপ্তাহের একটা স্বল্পস্থায়ী পর্যায় হল ক্যাটাজেন। এর পরে ৩-৪ মাসের টেলোজেন দশা শেষ করে চুল পড়ে যায়। আবার নতুন করে শুরু হয় এই চক্র। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যানাজেন দশার সময় কমে যায়, একজন প্রৌঢ় কখনও কিশোর বয়সের মতো চুলের ঘনত্ব আশা করতে পারেন না। অধিকাংশ সময় যে টাক পড়া নিয়ে চর্চা শোনা যায় তা আসলে অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া বা পুরুষসুলভ টাক পড়া। অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের দ্বারা চুল ওঠা প্রভাবিত হয়ে থাকে।

স্বাস্থ্যবান পুরুষ ও মহিলাদের চুলের গ্রন্থি পাতলা হয়ে চুল পড়ে যেতে দেখা যায়। যাকে বলে সিকাট্রিসিয়াল অ্যালোপেসিয়া। ওজনের বৃদ্ধি, হরমোনের সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা এবং রক্তাল্পতা যার অন্যতম কারণ।

ওজন কমানোর ইঁদুর দৌড় রক্তাল্পতার কারণ, তার থেকেও হয় ঝরতে পারে চুল

বিশেষজ্ঞরা বলছেন দ্রুত ওজন কমানোর জন্য জিমে নানা রকম ভারী এক্সারসাইজ করেন মহিলা ও পুরুষরা। অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ না মেনেই এই সব ব্যায়াম শুরু করেন। যার কারণে অস্থিসন্ধিতে ফ্লুইডের পরিমাণ কমতে থাকে, যা রক্তাল্পতার অন্যতম কারণ। তা ছাড়া, নেট ঘেঁটে লিকুইড সাপ্লিমেন্ট নিয়ে ওজন কমানোর চেষ্টা করেন অনেকেই। তাতে চটজলদি মেদ কমলেও, উপযুক্ত প্রোটিন, ভিটামিনের অভাব দেখা দেয় শরীরে। চুলের গ্রন্থিগুলিকে মজবুত রাখার জন্য যে ধরনের প্রোটিন দরকার তার অনেকটাই আসে সুষম খাদ্য থেকে। কাজেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না মেনে ডায়েট বা ব্যায়াম সেখানে ক্ষতি করে অনেকটাই।

ক্যালোরির কথা ভেবে আজকাল অনেকেই রেড মিট খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন, বিশেষত মহিলারা। চিকিৎসকদের মতে, সপ্তাহে একদিন অন্তত দুই থেকে চার আউন্স পরিমাণ যদি রেড মিট খাওয়া যায়, তাহলে শরীরে আয়নের ব্যালান্স ঠিকঠাক থাকে। পাশাপাশি, দুধ, ডিম, পালং শাক, বেদানা, খেজুর, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খেলে আয়রনের ঘাটতি অনেকটাই মেটে। বাচ্চা হওয়ার পর চুল পড়তে থাকলে প্রোটিন ( ডাল, সয়াবিন, ছানা) ফল, সব্জি  বেশি করে খেতে হবে।

Comments are closed.