শনিবার, মার্চ ২৩

চিনি বনাম চর্বি! কে বেশি ওজন বাড়ায় শরীরের?

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘অনাহারে নাহি খেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ’। হীরক রাজের নিদান একটু সংশোধন করলে ব্যাপারটা দাঁড়ায়,- বেশি খাওয়া যেমন সুস্বাস্থ্যের বিরোধী, তেমনই অনাহার মোটেই স্লিম-ট্রিম-ট্রেন্ডি ফিগারের উপযোগী নয়। মোদ্দা কথা, উচ্চতা, ওজন, শরীরের মতিগতি বুঝে মেপেঝুপে খাওয়াটাই দস্তুর। এখন মেপে কতটা খাবেন তার জন্য ডায়েটিশিয়ান, নিউট্রিশনিস্টরা রয়েছেন। ডায়েট চার্ট বানিয়ে নিলেই কেল্লাফতে। তবে খোদার উপর খোদগারি করার মতো ডায়েট চার্টেও তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা নানা পারমিউটেশন-কম্বিনেশন করি, তাই বলে রাখা ভালো ডায়েটে ইচ্ছামতো যতই যোগ-বিয়োগ করুন না কেন চিনি এবং ফ্যাটের ভারসাম্য থাকছে কি না সেটা দেখে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ চিনিতেও যে বাড়ে মেদ সেটা জানাটা দরকার। শুধু মেদ বাড়িয়ে থলথলে শরীর নয়, চিনি রীতিমতো নিমন্ত্রণ করে আনে আরও নানা রোগ ব্যধিকে। তার পরই আপনার শরীরে মহানন্দে পিকনিক শুরু করে তারা।

চিনি আর ফ্যাটের মধ্যে একটা বেশ টম-জেরি সম্পর্ক রয়েছে। কেউ কাওকে দু’চোক্ষে দেখতে পারে না, আবার একে অপরকে ছাড়া চলেও না। বলা বাহুল্য, এরা একে অপরের পরিপূরক। বিশেষজ্ঞরা বলেন, চিনি খেলেই আপনার কোষেরা ইনসুলিনকে ডাকাডাকি শুরু করে। ফলে ডায়াবেটিস জাঁকিয়ে বসে। এই ডায়াবেটিস আবার বন্ধুত্ব পাতায় ওবেসিটির সঙ্গে। ওবেসিটি মানেই বাড়তি ওজন, তার থেকে কিডনির সমস্যা এমনকি মারণ রোগ ক্যানসারও। অতএব ‘চেন রিয়েকশন‘-র মতো চিনি আর ফ্যাট শরীরে তাদের প্রভাব ফেলে।

২০১৫-১৬ সালের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভের (এনএফএইচএস) সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এ দেশে প্রতি পাঁচ জনে এক জন মহিলা ওবেসিটির শিকার। অর্থাৎ প্রায় ২০.৭ শতাংশ ভারতীয় মহিলা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন। এনএফএইচএস-র তরফে জানানো হয়েছে, ওবেসিটির সমস্যায় আক্রান্ত বেশির ভাগ মহিলারই বয়স ১৫-৪৯ বছরের মধ্যে। আর মেদ মানেই কোমরের চারপাশে, গলায়, থাই ও তলপেটে একরাশ থলথলে চর্বি। মারকাটারি তন্বী চেহারার দফারফা।

চিনি খেতে ভালোবাসেন?

চিনির খেলে বাড়ে ইনসুলিন। অতিরিক্ত শর্করা দেহ বার্ন করতে পারে না, ফলে মেদ বাড়ে চড়চড়িয়ে।

বেশি চিনি খাওয়ার সঙ্গে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ার সম্পর্ক আছে৷ আবার হৃৎপিণ্ডের রক্তনালীর মধ্যে চর্বি জমে যে হৃদরোগের সূত্রপাত হয়, তা ঘটাতেও অনুঘটকের কাজ করে চিনি৷

রক্তে শর্করা বেড়ে হয় ডায়াবেটিস, আর ডায়েবেটিস মানেই বাড়ে ওবেসিটির ঝুঁকি৷ আর ওবেসিটি থেকে দেখা দেয় স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, ফ্যাটি লিভার, বন্ধ্যাত্বের মতো রোগের প্রকোপ।

ফ্যাট মানেই কি খারাপ?

অতিরিক্ত ফ্যাট যেমন ভালো নয়, তেমনি শরীরের রোগ প্রতিরোধ গড়তে পরিমিত ফ্যাট দরকারি। কোষ প্রাচীরের হাই-কোয়ালিটি ফ্যাট ইনসুলিন বিপাকে সাহায্য করে। রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।

সব ফ্যাটই যে খারাপ তা মোটেও নয়। ট্রান্স ফ্যাট যেমন শরীরে ক্ষতি করে, তেমনি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হেলদি ডায়েটের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ফ্যাটের রকমফের আছে, বুঝে ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে খেলে সেটা সবসময় ক্ষতির কারণ হয় না।

চিনি না ফ্যাট, কার পাল্লা ভারি

গবেষণা বলছে চুলচেরা বিচার করলে দাঁড়াবে, ক্ষতির পাল্লা চিনির দিকেই বেশি ঝুঁকছে। সব রোগের উৎস ঘুরেফিরে সেই চিনি বা রক্তে অধিক শর্করার দিকেই যাচ্ছে।

শুধু যে খাবারে চিনি মেশালে বিপদ হয় এমন নয়, প্রক্রিয়াজাত খাবারও সমান বিপজ্জনক৷ কারণ তাতে অ্যাডেড সুগার থাকে, তা সে ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল হোক কি পাউরুটি, প্যাকেটের ফলের রস হোক কি বিয়ার, সস, কেচাপ, কুকিস, ক্যান্ডি, মেয়োনিজ ও অন্যান্য স্যালাড ড্রেসিং, ঠান্ডা পানীয়৷ হিসেব বলছে, একটি ১২ আউন্সের ঠান্ডা পানীয়তে থাকে ৯ চামচের মতো চিনি৷এক স্কুপ চকলেট আইসক্রিমে ৫ চামচ৷ এর সঙ্গে চা–কফিতে বা রান্নায় চিনি মেশালে তো হয়েই গেল৷ চিনি ও কার্বোহাইড্রেট মিশে গিয়ে আবার ডায়াবেসিটি (ডায়াবেটিস+ওবেসিটি)হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সবই খান তবে বিপদসীমার নিচে

‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’-র নির্দেশ অনুযায়ী, পুরুষদের দিনে ৯ চামচ ও মহিলাদের ৬ চামচের বেশি চিনি খাওয়া উচিত নয়৷ সারা দিনে ২০০০–২৫০০ ক্যালোরি খেলে ২০০–৩০০ ক্যালোরির বেশি কোনও ভাবেই আসা উচিত নয় মিষ্টি থেকে৷

কোয়ালিটি ফ্যাট ডায়েটে রাখার চেষ্টা করুন৷ একস্ট্রা ভার্জিন ওলিভ ওয়েল, একস্ট্রা ভার্জিন ককোনাট ওয়েল, বাদাম, ডিম ও মাছ৷

চিনির বদলে খাবারে মেশান আখের গুড়, খেজুর গুড় বা ঝোলা গুড় কিংবা তাল পাটালি৷ ভিটামিন বি-৬, আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম পাবে শরীর৷

দুপুরে বা রাতে খাওয়ার পর মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছে হলে, খান খেজুর৷ পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি-৬ পাবেন প্রচুর৷ কিসমিস বা অন্য শুকনো ফলও খেতে পারেন৷ খেতে পারেন বিভিন্ন টাটকা ফল৷

চায়ে চনির বদলে মেশান টাটকা মধু৷ চা–কফিতে ম্যাপ্ল সিরাপ৷ ক্যালোরি চিনির মতো অত বেশি নয়৷ উপরি পাওয়া অ্যান্টি অক্সিডেন্টের গুণাগুণ৷

Shares

Comments are closed.