ছেলেমেয়ে ইন্টারনেটে আসক্ত? এখনই সাবধান হোন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছেলের জেদের কাছে হার মেনে তাকে দামি মোবাইল কিনে দিয়েছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী দেবাঞ্জনা। নামী ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে ছেলে। ফটাফট ইউটিউব থেকে গেম নামিয়ে সারাদিনই খেলায় মগ্ন থাকত সে। প্রথমদিকে তেমন আমল না দিলেও, পরে দেবাঞ্জনা দেখে ছেলের আচরণে বিস্তর পরিবর্তন আসছে। আগের চেয়ে সে অনেক বেশি চুপচাপ, ঘরের এক কোণায় সারাদিনই মোবাইল পর্দায় চোখ, স্কুল থেকে অভিযোগও আসছে অজস্র। শিক্ষিকারা জানিয়েছেন, ক্লাসে লুকিয়ে ভিডিও গেম খেলে সে, এমনকি একদিন পর্নোগ্রাফি দেখতে গিয়েও ধরা পড়েছে। শুধু দেবাঞ্জনা নয়, নিজের সন্তানদের নিয়ে এই সমস্যায় ভুগছেন অধিকাংশ বাবা মায়েরাই। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইন্টারনেট বা সোশ্যাল সাইটে অতিরিক্ত আসক্তি আসলে একটা রোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে Internet Addiction Disorder।

    বি়জ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সপ্তাহে ২৫ ঘণ্টারও বেশি সময় যাঁরা ইন্টারনেটে ব্যস্ত থাকেন তাঁরা একটা সময়ের পর একাকীত্বে ভোগেন। পরিবারের মধ্যে থেকেও তাঁরা একা। আমেরিকার জনবসতির ১৫% এর উপর এই গবেষণা চালিয়েছেন কয়েকজন গবেষক। দক্ষিণ কোরিয়ার নোরি মিডিয়া এডুকেশন সেন্টারের গবেষণাতেও উঠে এসেছে এমনই তথ্য।  আমাদের দেশে ন্যাশনাল মেন্টাল হেল্থ সার্ভের রিপোর্ট বলছে, ১৮ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে থাকা ছেলেমেয়েদের মানসিক ভাবে অবসাদগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৭.৩৯ শতাংশ বেড়েছে। অতিরিক্ত ইন্তারনেটে মজে থাকার জন্য দেশের যুব সম্প্রদায়ের ২০ থেকে ২৫ শতাংশই কোনও না কোনও ভাবে মানসিক বৈকল্যের শিকার হয়ে পড়ছেন।

    কী ভাবে ছড়াচ্ছে ইন্টারনেট-আসক্তি?

    স্কুল, কলেজের ক্লাস, প্রাইভেট টিউশন, পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে, বই পড়ার নেশাকে গুড বাই জানিয়ে অথবা বাড়ির অন্যান্য কাজে অনীহা দেখিয়ে দিন-রাত শুধুই ইন্টারনেটে ডুবে থাকতে দেখা যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে। শিশুদের মধ্যেও উত্তরোত্তর বাড়ছে এই নেশা। বিভিন্ন গেমিং কনসোল, জুয়া বা পর্নোগ্রাফিক সাইটগুলিতে আকণ্ঠ ডুবে থাকার নেশা পেয়ে বসছে ছেলেমেয়েদের। অল্পবয়সী ছেলেদের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরাও এই ভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছেন ইন্টারনেটে।

    কী বলছে সমীক্ষা?

    মনেবি়জ্ঞানীরা বলছেন, সাধারণ মানুষ দিনে দু’ঘণ্টা ইন্টারনেটে কাটান। আসক্তি বাড়লে সেই সময় বেড়ে দাঁড়ায় ৫-৯ ঘণ্টা। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩১০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। যার মধ্যে প্রায় ২১০ কোটিরও বেশি ইন্টারনেট অ্যাডিকশন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত। ২০১৮ সালের সমীক্ষা বলছে, কমবয়সীদের ৫৮ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত। দিনে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি তারা ইন্টারনেটে কাটান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,  ইন্টারনেটে অ্যাকসেস করাটা এখন জলের মতো সহজ হয়ে গিয়েছে। দামে সস্তা হয়েছে বলে এখন ঘরে ঘরে কম্পিউটার। ব্রডব্যান্ডের সুবিধা ও গতি বাড়ছে উত্তরোত্তর। অন্য দিকে, পেশাগত ও অন্যান্য কারণে, মা, বাবা, অভিভাবকরাও এখন আগের চেয়ে অনেক কম সময় দেন তাঁদের সন্তানদের।

    যে সমস্ত কারণে ইন্টারনেটের প্রতি দুর্বলতা বাড়ছে তরুণ প্রজন্মের?

    অতিরিক্ত কৌতুহল ও উৎসাহ বাড়াচ্ছে ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি।

    মানসিক অবসাদ ও একাকীত্ব থেকেও ইন্টারনেটের প্রতি মোহগ্রস্ত হচ্ছে কমবয়সীরা।

    পর্ন সাইট ও সাইবার সেক্সের অবারিত দ্বার ইন্টারনেট। সমীক্ষা বলছে, সেখানেই বেশিরভাগ সময় কাটান ছেলেমেয়েরা।

    কম্পিউটার গেম, ভিডিও গেম, ভার্চুয়াল চ্যাটিং ইন্টারনেটে আসক্তির অন্যতম বড় কারণ।

    Status Update Anxiety ইন্টারনেটে আসক্তির অন্যতম বড় কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল সাইটের নানা ব্লগ বা ওয়েবপেজে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা কমবয়সীদের মধ্যে অনেক বেশি। খুব অল্পেতেই নিজের কমিউলিটি তৈরি করে জনপ্রিয়তা লাভের প্রচেষ্টা। যার ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফেসবুক বা নানা চ্যাট সাইটে দিবারাত্র অনলাইন থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

    কী ভাবে মোকাবিলা করবেন অভিভাবকরা?

    অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে একাকীত্ব বেড়েই চলেছে, বলছেন মনস্তত্ত্ববিদরা। তা কাটানোর একটা প্রধান উপায় যদি হয় সিগারেট, মদ খাওয়া বা অন্যান্য মাদকের নেশায় ডুবে থাকা, তা হলে আর একটা উপায় হল ইন্টারনেটে আকণ্ঠ ডুবে থাকা। যাকে ফলেই ইন্টারনেট-আসক্তি। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মা, বাবা, অভিভাবকরা আরও বেশি সময় দিন তাঁদের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের। বয়ঃসন্ধির সময় তাঁদের ছেলেমেয়েরা কী কী করছে, তার ওপর তাঁদের কড়া নজর রাখা উচিত। ইন্টারনেট থেকে মুখ ফেরাতে বিকল্প সমাধান কী হতে পারে সেটা খুঁজে বার করতে হবে অভিভাবকদেরই। ছবি আঁকা, গান শোনা, গল্পের বই পড়ার মতো অভ্যাসগুলোকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। ছেলেমেয়েরা কোনও কারণে মনমরা থাকলে তাদের সঙ্গে বসে কথা বলাটা খুব দরকারি। সে ক্ষেত্রে একসঙ্গে ডিনার করা বা বেশ কিছু সময় ছেলেমেয়ের সঙ্গে আলাদা কাটালে তাদের মনোভাব বুঝতে সুবিধা হবে অভিভাবকদের। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের সমাজের মূল স্রোতে আনার জন্য, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মেলামশা বাড়ানোর জন্য মা, বাবা, অভিভাবকদেরই উদ্যোগী হতে হবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More