বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে লাইফস্টাইলে বদল আনুন, বছরে একবার চেক আপ করান

ক্যানসার নিয়ে বিশ্ব জুড়ে গবেষণা চলছে, বেরিয়েছে অত্যাধুনিক ওষুধ ও চিকিৎসা। ক্যানসার নিয়ে অনেকদিন বেঁচে থাকেন রোগীরা। তাঁদের জীবনের মানও উন্নত হয়েছে। তাও ক্যানসার শুনলেই মনে হয় সব শেষ। কিন্তু একটু সাবধানতা অনেক সময়েই বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে আমাদের। সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ও ঠাকুরপুকুরের সরোজ গুপ্ত ক্যানসার সেন্টার অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর ডিরেক্টর ডঃ অর্ণব গুপ্ত কী বললেন দ্য ওয়াল-কে।

দ্য ওয়াল: ক্যানসার হয়েছে শুনলেই মনে হয় যেন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ক্যানসার ঠেকানোর কি কোনও উপায় নেই?

ডঃ অর্ণব গুপ্ত: কিছু কারণ জানা গেলেও এই ২০১৯ সালেও আমরা সঠিক জানি না কী কারণে ক্যানসার হয়। তবে অনেক ক্যানসারের সঙ্গেই লাইফস্টাইলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। তাই লাইফস্টাইল সংশোধন করলে সেই সব ক্যানসারের আশঙ্কা অনেকাংশেই কমিয়ে ফেলা সম্ভব।

দ্য ওয়াল: লাইফস্টাইলের কোন দিকগুলির দিকে নজর দিলে ক্যানসারের আশঙ্কা কমানো সম্ভব?

ডঃ অর্ণব গুপ্ত: প্রধান তিনটি দিক হলো, খাওয়াদাওয়া, নেশা আর পরিবেশ। পরিবেশ আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও এটিও জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। খাওয়াদাওয়ার মধ্যে প্রথমেই মাথায় রাখতে হবে আমরা যেন বেশি করে শাকসব্জি ও ফল খাই। আইডিয়াল হলো, বেশি কীটনাশক ও সারবর্জিত সবজি ও ফল খাওয়া। কিন্তু সেটা কার্যত অসম্ভব। তাই ভালো করে ধুয়ে খেতে হবে। প্রিজ়ারভেটিভ, আর্টিফিশিয়াল কালার ও ফ্লেভার দেওয়া খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। ফ্রোজ়েন পিজ়া, অন্য ধরনের জাঙ্ক ফুড একদম বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে প্রসেসড মিট খাবারের তালিকা থেকে বাদ দিলেই ভালো। কিন্তু বাচ্চাদের প্রথম থেকেই এই নিয়ে সচেতন করে দিলে তারাও আর খেতে চাইবে না। জেনেটিক্যালি অলটারড ফুডের নিরাপত্তা নিয়েও একটু বিতর্ক আছে। তাই স্বাভাবিক ভাবে তৈরি খাবার খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। আর জাঙ্ক ফুড না খেলে মাত্রাতিরিক্ত ওজন বাড়ার সম্ভাবনাও কম থাকে। বেশি ওজনও অনেক রকম ক্যানসারের কারণ।

দ্য ওয়াল: বেশি ওজন থেকে কোন কোন ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়?

ডঃ অর্ণব গুপ্ত: বেশি ওজনের ফলে স্তনের ক্যানসার ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। নিয়মিত ব্যায়াম করাটা তাই জরুরি। রক্ত সঞ্চালন ভালো হলে ক্যানসার ও অন্য অনেক অসুখের সম্ভাবনা কমে। তাই ব্যায়ামকে জীবনযাত্রার অঙ্গ করে নিন।

দ্য ওয়াল: নেশা সর্বনাশা। তাও আমরা নেশা ছাড়তে পারি না। কী ভাবে নেশা ক্যানসারের বিপদ ডেকে আনে?

ডঃ অর্ণব গুপ্ত: তামাক ও তামাকজাত যে কোনও জিনিসের সঙ্গে সরাসরি ক্যানসারের সম্পর্ক আছে। সব রকম ক্যানসারের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এই নেশা থেকে হয়। সিগারেট, বিড়ি, গুটখা, পানমশলা, দোক্তা, খৈনি সবই বিপজ্জনক। এগুলোর ব্যবহারে মুখ, ফুসফুস, খাদ্যনালী ও প্যানক্রিয়াসের ক্যানসার হতে পারে। মুথে তামাক চিবিয়ে অনেকে রেখে দেয়, এটা মারাত্মক। তা ছাড়া শরীরের যে অংশ দিয়ে ওই সব জিনিসের রস নামবে, সব জায়গাতেই ক্যানসার হতে পারে। তাই খাদ্যনালী, পাকস্থলী, লিভার সব কটি অঙ্গই সমান ভাবে আক্রান্ত হতে পারে। অ্যালকোহলও সমান ভাবে বিপজ্জনক। নেশার এই সব জিনিস থেকে শুধু ক্যানসারই নয়, উচ্চ রক্তচাপ, ব্লাড সুগার ব্রঙ্কাইটিস অনেক কিছুই হতে পারে। সুতরাং নেশাকে দূরে সরিয়েই রাখুন।

শরীরে কোনও অস্বাভাবিকত্ব দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে আগে ডাক্তারের কাছে যান। শুনুন কী বললেন ডাক্তারবাবু

দ্য ওয়াল: ক্যানসার কি বংশগত? পরিবারে কারো ক্যানসার থাকলে ঝুঁকি কতটা বেড়ে যায়?

ডঃ অর্ণব গুপ্ত: সব ক্যানসারের মোটামুটি ৫ শতাংশ বংশগত। তবে বাড়িতে কারও ক্যানসার হয়েছে, মানেই বাকিদের হবে এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। যদি পরিবারে একাধিক লোকের ক্যানসার থাকে, তা হলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। যেগুলি বিশেষ করে বংশগত তার মধ্যে রয়েছে, স্তন, ওভারি, প্রস্টেট, কোলন, রেটিনোব্লাস্টোমা বা চোখের ক্যানসার ও কয়েক রকম লিউকেমিয়া বা রক্তের ক্যানসার। তবে একটু সতর্ক থাকলে ও মাঝেমধ্যে কিছু পরীক্ষা করিয়ে নিলে বিপদ এড়ানো সম্ভব। যেমন ওভারি ও ব্রেস্ট ক্যানসারের ক্ষেত্রে কিছু পরীক্ষা করিয়ে নিলে জানা সম্ভব ক্যানসারের জিন আছে কি না। সেই জিন থাকলে বিদেশে অনেকে আগে থেকেই স্তন ও ওভারি বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। তবে এ নিয়েও বিতর্ক আছে। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে জরায়ুর মুখের বা সার্ভাইক্যাল ক্যানসার হয় হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস থেকে। এর মোকাবিলায় আজকাল ভ্যাকসিন বাজারে পাওয়া যায়। এই ভ্যাকসিন নেওয়া থাকলে সার্ভাইক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

দ্য ওয়াল: পরিবেশের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক কী?

ডঃ অর্ণব গুপ্ত: পরিবেশের ভয়াবহ দূষণ থেকে ক্যানসার বেড়ে যাচ্ছে। শিল্পের দূষণ, গাড়ির দূষণে বাতাস ভারী। আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে তা প্রতিনিয়ত ঢুকছে। তার সঙ্গে রয়েছে আর্সেনিক দূষণ। যা পানীয় জলের মাধ্যমে আমাদের শরীরকে বিষাক্ত করে তুলছে। তবে এগুলোর বেশির ভাগই আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই যেটুকু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেটুকু নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। তাই নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা করান, ব্যালেন্সড ও পুষ্টিকর খাবার খান, ব্যায়াম করুন। অকারণ দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শর্মিষ্ঠা গোস্বামী নিধারিয়া

Comments are closed.