মঙ্গলবার, মার্চ ২৬

প্রতিদিনের গোছা গোছা চুল ওঠার সমস্যায় জেরবার আপনি? সমাধান দিলেন ডারমাটোলজিস্ট সমুজ্জ্বলা দেব

ড.সমুজ্জ্বলা দেব (ডারমাটোলজিস্ট, এমডি)

হেয়ার ফল বা চুল পড়ার সমস্যা আজকাল প্রায় সব মহিলারই মাথা ব্যথার কারণ। অনেকের ক্ষেত্রেই অবস্থা বেশ সঙ্গীন। মাথায় চিরুনি দেওয়ার উপায় নেই। গোছা গোছা চুল উঠতে থাকে। আর শ্যাম্পু করার পর চুলের জট ছাড়াতে গেলে তো সমস্যা আরও বেড়ে যায়।

চুল পড়ার নিত্যদিনের এই সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় জানালেন দুর্গাপুরের ‘দ্য মিশন হসপিটাল’-এর ডাক্তার সমুজ্জ্বলা দেব (MD Dermatology, DNB, fellowship in Dermatosurgery, senior residency in pediatric dermatology)।

প্রশ্ন- কী কী কারণে হঠাৎ করেই চুল পড়ার পরিমাণ বেড়ে যায়।

উত্তর- আমাদের অনিয়মিত জীবনযাপন এর জন্য অনেকটাই দায়ী। রোজ ৫০ থেকে ১০০টা চুল পড়া স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু চুল পড়ার পরিমাণ এর থেকে বেড়ে গেলে বুঝতে হবে সমস্যা রয়েছে।

মূলত যে যে কারণে হেয়ার ফল-এর পরিমাণ বাড়ে সেগুলি হলো—-

*আজকাল সাধারণত আমরা ওজন কমানোর জন্য ডায়েট করি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ডায়েট চিকিৎসকের পরামর্শ না মেনেই করা হয়। ফলে শরীরে দেখা দেয় নানারকম উপাদানের ঘাটতি। আর এই সব পুষ্টিজাত উপাদানের ঘাটতির কারণেই চুল পড়া বেড়ে যায়।

*আয়রন এবং ভিটামিন সি আর ডি’-এর ঘাটতির ফলেই সবচেয়ে বেশি চুল পড়ে। বিছানায় রাখা মাথার বালিশ থেকে স্নানের পর মাথা মোছার টাওয়েল সবেতেই নজরে আসে গোছাগোছা চুল।

*এ ভাবে চুল পড়া বা হেয়ার ফলকে ডাক্তারির ভাষায় টেলোজেন এফ্লুভিয়াম (telogen effluvium) বলে। তবে সবসময় যে ভিটামিন বা আয়রনের ঘাটতিতেই এমনটা হয় তা নয়। দীর্ঘদিন ধরে কোনও রোগে ভুগলে যেমন- টাইফয়েড, জন্ডিস—এসব ক্ষেত্রে চুল পড়ার সম্ভাবনা থাকেই। সেক্ষেত্রে হেয়ার ফলের পরিমাণ একটু বেশিই হয়। আবার মহিলারা মা হওয়ার পরেও তাঁদের অতিরিক্ত মাত্রায় চুল ওঠে। সন্তান প্রসবের পরে বেশ কয়েকমাস এই লক্ষণ দেখা যায়।

*এ ছাড়াও মানসিক চাপ, অনেকদিনের অসুস্থতা, খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম, মুড়িমুড়কির মতো ওষুধ খাওয়া (বিশেষ করে কন্ট্রাসেপটিভ পিল বা গর্ভনিরোধক ওষুধ)—-এইসব কারণেও চুল পড়ার পরিমাণ বাড়তে পারে।

প্রশ্ন- এই সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় কী?

উত্তর- খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলুন। ডায়েট করা অবশ্যই ভালো। কিন্তু সঠিক নিয়ম মেনে হওয়া দরকার। প্রয়োজনে ডায়েটেশিয়ানের পরামর্শ নিন। রোজ পাতে একটা ফল অবশ্যই রাখবেন। হাই প্রোটিন যুক্ত খাবার যেমন- দুধ, দই, ছানা, ডিম এগুলো অবশ্যই খাওয়া দরকার। এ ছাড়া আয়রন এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া অবশ্যই দরকার।

প্রশ্ন- কী খাবো আর কী খাবো না?

উত্তর- বেশি করে শাকসবজি খান। ফল খান। দুধ-দই-ছানা-মাশরুম-পনির এগুলো খেতে পারেন। আর খাবেন সোয়াবিন এবং ডাল। যাঁরা ননভেজ খান না তাঁরা রাজমা, ডাল, ছোলা, চানা, শাকসবজি, ড্রাই ফুটস (বাদাম, কিসমিস) এগুলো খেতে পারেন। আমিষের ক্ষেত্রে মাছ, ডিম, মাংস সবই খাবেন পরিমাণ মতো। তবে রেড মিট বা পাঁঠার মাংস মাঝে মধ্যে খেতে পারেন। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল রোজ একটা করে খান। পরিমাণ মতো জল খাওয়াও অবশ্যই প্রয়োজন। এর পাশাপাশি চলুক নিয়মমাফিক ডায়েট এবং শারীরিক কসরত।

প্রশ্ন- খাওয়াদাওয়ার বাইরে চুলে যত্ন নেওয়ার অন্য কোনও উপায়?

উত্তর- অনেকেরই জন্মগত ভাবেই চুলের টেক্সচার একটু পাতলা হয়। তাদের ক্ষেত্রে যত্নের একটু বেশিই প্রয়োজন। স্নানের ভেজা চুল মোছার সময় কখনই টাওয়েল বা গামছা জোরে ঘষে ঘষে মাথা মুছবেন না। আলগা হাতে সময় নিয়ে ধীরে ধীরে মাথা মুছে নিন। গামছা বা টাওয়েল পেঁচিয়ে চুলের জল শোকাবেন না। এতে চুলের ডগা আলগা হয়ে হেয়ার ফল-এর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। চেষ্টা করবেন শ্যাম্পুর আগে চুলে তেল লাগিয়ে রাখতে।

এই নিয়মগুলো মানলেই ধীরে ধীরে কমে যাবে চুল পড়ার পরিমাণ। তবে হ্যাঁ সময় লাগবে অন্তত ৪ থেকে ৬ মাস। সেটুকু ধৈর্য রাখতেই হবে। আর সব নিয়ম মেনেও যদি ফল পাওয়া না যায় তাহলে অবশ্যই তাড়াতাড়ি পরামর্শ নেবেন কোনও ডারমাটোলজিস্টের। কারণ মাথার স্ক্যাল্পের কোনও রোগ বা অন্য কোনও রোগের কারনে চুল উঠে যাচ্ছে কিনা সেটা অভিজ্ঞ চিকিৎসক আপনাকে দেখে এবং পরীক্ষা করে বলতে পারবেন। তাই সঠিক সময়ে উপযুক্ত পরামর্শ নেওয়া উচিত।

(পরবর্তী প্রতিবেদনে কী কী কারণে ছেলেদের হেয়ার ফল-এর পরিমাণ বেড়ে যায় আমরা তা নিয়ে আলোচনা করবো) 

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সোহিনী চক্রবর্তী 

Shares

Comments are closed.