মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

কেউ বর্ণ বিদ্বেষের শিকার, কেউ থেকেছেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে, বাঁচার লড়াই শেখালেন সাত নারী

চৈতালী চক্রবর্তী

সাফল্য আর ব্যর্থতা একই মুদ্রার দুই পিঠ। অন্ধকার যেমন আছে, তেমনি তার অবসানে আলোর প্রকাশও আছে। পেশাগত ক্ষেত্রে হোক বা ব্যক্তিগত জীবনে, সাফল্যের সিঁড়ি যে সবসময়েই পায়ের ঠিক নীচেই ঘাপটি মেরে থাকবে এমনটা নয় মোটেও। বরং সাফল্য আর ব্যর্থতা সমান্তরাল ভাবে পাশাপাশি চলবে এমনটাই দস্তর। তাই যে পরিস্থিতিই জীবনে আসুক না কেন, মনোবল হারাবে চলবে না। এই মোদ্দা কথাটাই নানা ভাবে, নিজেদের জীবনী দিয়ে বা অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বরা।

পরিকল্পনাতেই আসবে সাফল্য। বিশ্বাস আর হার না মানার জেদ যদি দোসর হয়, তাহলে ব্যর্থতার আঁধারকেও হেলায় উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। নারী হোক বা পুরুষ, শত বাধার মধ্যেও জীবনের রস নিঙড়ে নেওয়ার মূলমন্ত্র দিলেন সাত নারী।

‘শ্যুটিংয়ের সময় একবার নার্ভাস-ব্রেকডাউন হয়েছিল, আমার সবচেয়ে খারাপ গুণ হলো অধৈর্য’

সাফল্যকে মুঠোবন্দি করার প্রাথমিক টোটকাই হলো অধৈর্যকে জয় করা। উপায় বাতলেছেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী এমা থম্পসন। অভিনেত্রী, কমেডিয়ান, স্ক্রিন রাইটার, সমাজকর্মী এমা নিজের সোশ্যাল সাইটে হোক বা সংবাদ মাধ্যমের সামনে, প্রায়শই তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে যাওযার পরামর্শ দেন।

এমার কথায় নারীরা নিজের পরিবার-পরিজনদের দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। নিজেকে অবহেলা করেন অধিকাংশ সময়েই। কিন্তু, পরিবারকে ভালো রাখতে হলে নিজের প্রতি গুরুত্ব আর যত্ন দুটোই প্রয়োজন সমানুপাতিক ভাবে। ছোট বড় যে কোনও সমস্যাই ধৈর্য ধরে আলোচনা করে সমাধান করা সম্ভব। নিজের রাগ মেটাতে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপালে মানসিক স্বস্তি কখনও মেলে না।

অভিনেত্রীর কথায়, “ছবির শ্যুটিংয়ের সময় নার্ভাস-ব্রেকডাউন হয়েছে, বহুবার ভেঙে পড়েছি, নিজের উপর রাগ হয়েছে। একসময় মনে হয়ে মৃত্যু খুব কাছে এসে। কিন্তু সেখান থেকেও ফিরে এসেছি।” মাতৃত্ব নারীদের সবচেয়ে সুন্দর উপহার, বলেছেন এমা। মাতৃত্বকে উপভোগ করুন, সন্তানকে বোঝার চেষ্টা করুন। বেশিরভাগ মহিলাদের সমস্যাই শুরু হয় পরিবার থেকে। ভেঙে পড়া নয়, ধৈর্য ধরে তার সমাধান সম্ভব।

‘আমাকে মোটা আর চওড়া বললে হাসি পেত’

ব্রিটিশ লেখিকা, অভিনেত্রী, কমেডিয়ান, প্রেসেন্টার জোসেফিন গ্রেস ব্র্যান্ড বা জো ব্র্যান্ড তাঁর কেরিয়ার শুরু করেন সাইকিয়াট্রিক নার্স হিসেবে। চেহারা নিয়ে বরাবরই নানা মন্তব্য হজম করতে হয়েছে জো-কে। ‘বডি শেমিং’-এর স্বীকার হয়েছেন একাধিক বার। তাই তাঁর কথায় বারে বারেই উঠে এসেছে ‘বডি শেমিং’-এর প্রসঙ্গ।

জো-এর কথায়, “চেহারা নিয়ে নানা কথা শুনতে হয়েছে। শুরুতে ভেঙে পড়তাম, তবে পরে নিজেকে বিশ্বাস করাতে শিখে গেছি যে, অন্যেরা আমার সম্পর্কে কী ভাবছে বা বলছে তাতে কিছুই যায় আসে না। আমি নিজেকে ভালোবাসি এবং মনে করি আরও পাঁচজনেও আমাকে ভালোবাসে।”

জো জানিয়েছেন তাঁর জীবনের এক অভিজ্ঞতার কথা। বলেছেন, ‘‘তখন সবে বিয়ে হয়েছে। এক সংবাদ মাধ্যম আমাকে নিয়ে হেডলাইন করে, এই যে নববিবাবিতা বধূ, মোটা এবং চওড়া।’’ নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তে এই হেডলাইন নিয়ে নাকি তিনি আর তাঁর স্বামী খুব হেসেছিলেন। জো বলেন, এই ভাবে সবকিছুর মধ্যেই হাসি আর প্রাণ খুঁজে নিতে হয়। তাহলে যে আপনাকে ছোট করতে চাইছে, সে নিজেই অবাক হয়ে পিছু হটে যাবে।

‘সত্যি কথা খোলাখুলি বলতে আমরা ভয় পাই, চুপ করে থাকলে ভয় আরও চেপে বসে’

ব্রিটিশ-নাইজেরিয়ান অভিনেত্রী এবং ফিটনেস এক্সপার্ট কেলেচি ওকাফর নিজেকে শক্ত করে গড়েপিঠে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর কথায়, ফিটনেস এক্সারসাইজের মতোই জীবনও হবে শক্তপোক্ত, সামান্য দুর্বলতাও যাতে তার ভিত নড়বড়ে করে না দিতে পারে।

কেলেচির কথায়, ‘‘আমরা সত্যি আর স্পষ্ট কথা খোলাখুলি বলতে ভয় পাই। অনেক সময়েই পরিণতির কথা ভেবে সংকোচ করি। কিন্তু, কথা চেপে রাখলে ভয় আরও বেশি চেপে বসে। মানসিক শান্তি কখনও আসে না। যা কিছু ঠিক, যেটা ন্যায্য সরাসরি বলতে শিখুন। অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন না কখনও।’’

নিজের গায়ের রঙ নিয়েও কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি কেলেচিকে। কিন্তু, তাতে তাঁর মানসিক স্থিতি কখনও টলেনি। অভিনেত্রী বলেছেন, সুপ্ত বীজ থেকেই নতুন গাছের জন্ম হয়। তাই অসাফল্য, ব্যর্থতা থেকেই মানুষ সাফল্যের রসদ খুঁজে নেয়।

‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে ফিরে এসেছি, মৃত্যুকে ভয় পাই না’

১৯৪৪ সাল। হাঙ্গেরির বাসিন্দা এডিথ ইভা এজের তখন কিশোরী। ইহুদি পরিবার হওয়ার সাজা মিলল হাতে নাতে। নাৎসি জার্মানিদের নারকীয় অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন ইভা ও তাঁর পরিবার। গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করা হয় ইভার মা, বাবাকে। অত্যাচার সত্ত্বেও বুদ্ধির জোরে বেঁচে থাকেন ইভা ও তাঁর বোন। পরে মৃতদের স্তূপে ফেলে রাখা হয় তাঁদের। কিন্তু মরেননি তিনি। ১৯৪৫ সালের মে মাস। হাতের সামান্য সঞ্চালন দেখে তাঁকে ও তাঁর বোনকে উদ্ধার করেন এক আমেরিকান সেনা। সেখান থেকেই ফের জীবনের মূলস্রোতে ফেরেন তিনি।

প্রথমে চেকোস্লোভাকিয়া, সেখান থেকে ১৯৪৯ সালে পাড়ি দেন আমেরিকা। সাইকোলজির উপর ডিগ্রি নিয়ে খ্যাতনামা মনোবিজ্ঞানীর শিরোপা পান। মৃত্যু পথ থেকে ফিরে আসা ইভা বরাবরই তরুণ প্রজন্মকে লড়াই করে বেঁচে থাকার পরামর্শ দেন।

বলেন, ‘‘জীবনে পতন যেমন আছে, তেমনি আছে উত্থানও। যন্ত্রণার মুহূর্তগুলো অভিশাপ নয়, বরং এগিয়ে চলার প্রেরণা। জীবনের পথে শক্তি যোগায়।’’ ইভার কথায়, জীবনে কী হতে চলেছে, কেউ জানে না। ভবিষ্যতে কী ঘটবে সেটাও বলা সম্ভব নয়। কিন্তু তুমি তোমার মনের মধ্যে যে শক্তি জমা রাখবে সেটা কখনও কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।

‘‘কনসেন্ট্রেশনের ক্যাম্পের প্রথম সপ্তাহে আমি শিখেছি কী ভাবে বেঁচে থাকতে জানতে হয়। সেনার থেকে রুটি ছিনিয়ে নেওয়া মানে তুমি হিরো, আর সহবন্দির থেকে মানে তুমি স্বার্থপর। প্রতিযোগিতা, সাহস, মৃত্যুভয় একই সঙ্গে খেলা করে আমাদের মনে। তাকে বশে আনতে পারলেই জীবনে তুমি জয়ী।’’

‘মহিলাদের বড় গুণ তাঁরা সহমর্মী, সহযোগী, হাত ধরে চলতে পারে’

বিখ্যাত রিটেল কনসালট্যান্ট এবং ‘পোরটাস’ এজেন্সির কর্ণধার মারি পোরটাস। ব্যবসার জগতে যে মহিলারা তাঁদের কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম মারি।

ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেন মারি পোরটাস। তাঁর কথায়, হীনমন্যতায় ভুগলে কখনও সাফল্য পাওয়া যায় না। ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগোলেই যে কোনও সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

মারি বলেন, সাফল্য হলো একরকম ভারসাম্য। পেশা এবং ব্যক্তিগত জীবনকে যারা সমান গুরুত্ব দিয়ে চলতে পারে তারাই সাফল্যের অধিকারী হয়।

‘প্রতিদিন একটা নতুন দিন’

প্রতিদিন আমরা নতুন করে বাঁচি, রোজ নতুন করে জন্ম হয় আমাদের, এমনটাই বিশ্বাস করেন অস্ট্রেলিয়ান কমেডিয়ান, লেখিকা এবং টিভি সঞ্চালিকা মেশেল লোরি।

তাঁর কথায়, ‘‘আমি ভোর সাড়ে ৪টেয় ঘুম থেকে উঠি। সারাদিনের কাজের তালিকা বানাই। নতুন উদ্যোম নিয়ে কাজ শুরু করি। রোজই যে সব কাজ সঠিক ভাবে করি তা নয়, দিনের শেষে সে সবের মূল্যায়ণ করি। পরের দিন কী ভাবে সেই খামতি পূরণ করবো সেটা ভাবি।’’

আত্মবিশ্লেষণে বিশ্বাসী মেশেল। জানিয়েছেন, প্রতিদিনই আমাদের নবজন্ম হয়। কাজেই অতীতে কী হারালাম, কী ভুল করলাম সেটা বড় কথা নয়, সেই নিয়ে চিন্তা করারও কারণ নেই।সবসময় সামনের দিকে তাকিয়ে চলার প্রয়োজন। নতুন দিন কী ভাবে নতুন করে শুরু করা যায় সেই ভাবনাই হলো সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

‘ব্যর্থতা মানেই ফুলস্টপ নয়’

শেষ থেকেই শুরু করা উচিত। এমন কথাই বলেন আমেরিকান অভিনেত্রী-মডেল লিলি কলিন্স।

তাঁর কথায়, ‘‘ব্যর্থতা মানেই জীবনে ফুলস্টপ পড়ে যায় না। সঠিক সময়ের অপেক্ষা করা প্রয়োজন। হচ্ছে না মানে সেটা হওয়ার সময় আসেনি। সবকিছুই সময় এবং ধৈর্যের উপর নির্ভর করে।’’

Comments are closed.