সত্যিই কি এতটা অপমান, অসহযোগিতা প্রাপ্য আমাদের শিক্ষকদের

আমার বাড়ি এবং কর্মস্থলের দূরত্ব ৮৯.৯ কিমি। হয়তো অনেকেই নাক কুঁচকোবেন, এই দূরত্ব কিছুই না বলে। কিন্তু আজ শুধু আমার নিজের না, আমার সঙ্গে জড়িত সবটা নিয়েই ভাবছি।

একজন শিক্ষিকা নাকেমুখে গুঁজে খেয়ে বা না-খেয়ে, সাড়ে তিন ঘণ্টার জার্নি করে স্কুলে এসে পড়াতে ঢুকে যান, তিনি ঠিক কতটুকু সেরা নিজের ছাত্রছাত্রীদের দিতে পারেন? গোটা দিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু শতাংশ কার্যকারিতা দিয়ে, বাকিটা সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে যখন বাড়ি ফেরা হয়, তখন অপরাধপ্রবণতা গ্রাস করে। কারণ, অবশিষ্ট কিছু কার্যক্ষমতাই আর বাকি থাকে না।

প্রত্যেকটা মানুষ আমাদের বর্ধিত বেতনের ঘোষণা এবং ছুটির ঘোষণা সম্বন্ধে শুনলে এত প্রতিক্রিয়া দেন, যতটা নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাতেও দেন না। প্রথমেই বলি, শিক্ষা দেওয়া এবং নেওয়া একেবারেই কথার কথা নয়। পারিপার্শ্বিক এবং মনের পরিবেশ সুস্থ না হলে আমরা না-পারি ভাল ভাবে শিক্ষা দিতে, না-পারি ভাল ভাবে শিক্ষা নিতে।

এবার আসি বদলির কথায়। আমার বর্তমান কর্মক্ষেত্রে ছ’বছরের বেশি কিছু সময় কাটিয়ে ফেললাম। আমি বিশেষ বদলির ঘরের কাছের সুবিধা নিতে পারিনি, আমার সন্তান বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও। কারণ, আমার স্কুলে আর কোনও ভূগোল শিক্ষিকা নেই। তাই ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবেই NOC-র আবেদনই করতে পারিনি। আটকেছে মানবিকতায়।

প্রায় বছরখানেক আগে আমি একটা আপস বদলির সুযোগ পাই। ৩ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে আমার হিয়ারিং ডেট ছিল, সেদিনই আমি এবং আমার বদলির পার্টনার অর্ডার কপিও হাতে পাই। আমাদের বলা হয়, নিবেদিতা ভবন থেকে মাত্র কয়েক দিনেই মিলবে রেকমেন্ডেশন লেটার, তার পরই জয়েন করা যাবে।

প্রসঙ্গত, জানিয়ে রাখি, এ কথা শুধু আমাদের নয়, দফায় দফায় হিয়ারিং ডেটের ক্যান্ডিডেটদেরকেই বলা হয়। অপেক্ষার মেয়াদ একমাস অতিক্রম করলে এসএসসি অফিস যাওয়া হয়, ওনারা দেখছি-দেখব করেন। ৬ জানুয়ারি ওয়েবসাইটে নোটিস আসে, এই মর্মে, যাঁরা জয়েন করেননি কিছু অসুবিধাবশত, তাঁদের জয়েনিংয়ের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হল ৩০ দিন। যার শেষ তারিখ ৪ ফেব্রয়ারি।

এবার রেকমেন্ডেশন না-পাওয়ায় আমার বদলির স্কুলটির শিক্ষক মহাশয়কে তাঁর স্কুলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কার্যনিবাহী শিক্ষক মহাশয় রিলিজ দিতে চাইছেন না এবং হুগলি ডিআই-ও অ্যাপ্রুভাল দেবেন না বলেছেন নিবেদিতা ভবন থেকে ফার্দার নোটিফিকেশন না আসা অব্দি। এ দিকে, ৪ তারিখ হতে আর কয়েক ঘণ্টা বাকি।

নিবেদিতা ভবন গেলে বলা হচ্ছে, বিকাশ ভবন যান। বিকাশ ভবন বলছে, ফাইল আসেনি। আচার্য সদন বলছে, বলতে পারব না। আমরা দফতরে দফতরে ঘুরছি। সত্যিই কি এতটা অপমান, অসহযোগিতা প্রাপ্য আমাদের শিক্ষকদের? কেন একটা সদুত্তর মেলে না? একটা আপস বদলি, যাতে কিনা নতুন পোস্টও তৈরি করতে হয় না, সেটা কি এত জটিল? এতই গোলমেলে?

আজ হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে, যাদের করা প্রশ্নের উত্তর আমি গতানুগতিক ভাবে দিতে শুরু করেছি, যে আমি সেরাটা দেব বলে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও। আমি হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছি আমার সন্তানের কাছে, যাকে প্রতিদিন আদরযত্ন, ভালবাসা, সুরক্ষায় ভরে দেওয়ার কথা ছিল আমার, কিন্তু তা দিতে পারছি না।

আজ ক্ষমা চাইছি নিজের কাছে, এত অসহযোগিতা অব্যবস্থা থেকে নিজেকে রেহাই দিতে পারছি না বলে। হতাশ হয়ে পড়ছি, অসম্মানিত বোধ করছি, এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিং ছুটে ছুটেও কোনও সদুত্তর না পেয়ে।

পারমিতা মজুমদার
আলমবাজার (দক্ষিণেশ্বর)

পাঠকের চিঠি। এই বিভাগে আপনার সুচিন্তিত মতামত জানান। আমাদের মেল করুন, [email protected] এই অ্যাড্রেসে।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.