বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৩
TheWall
TheWall

এই হিন্দুত্বের একটা রাষ্ট্রবাদী ঢং আছে! আপনি মোড়ল ভাব!

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

‘প্রিয় বন্ধু’, ‘বন্ধু স্বজন’ বা ‘কাছের মানুষ’, এই সব হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যখন সমস্যাটা নেমে আসে, তখন কলম ধরতেই হয়! ওটা হাতিয়ার! রাজনৈতিক মেরুকরণের কুফল সর্বনাশী! বন্ধু, বন্ধু থাকে না! সেই সব গল্পকথা, যখন স্বামী-স্ত্রী আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় বহন করে, একই বিছানায় ঘুমোয়। এখন ঘৃণার বাষ্প এমন ছড়িয়েছে যে, ভিন্নমতের মানুষ মুখ দেখাদেখি করে না বা করতে ভয় পায়। এমন মনে হয়, যাদের সাথে একসাথে খেলা করে বড় হয়েছি, তারা এখন লাঠির আঘাতে মাথা ফাটিয়ে দিতে পারে, কারণ আমার পছন্দ আর তার পছন্দ মিলছে না। এত নির্মম বাস্তবতা।

কোনও মহান আদর্শের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল কখনওই ছিল না। মানুষের মর্যাদা নিয়ে ভাবার মত প্রচেষ্টা কোনও রাজনৈতিক দলই মন থেকে করেনি! তবু স্বাধীন ভারতে, সচ্ছল পরিবারে জন্ম– সবাইকে নিয়ে চলার মানসিকতা নিয়ে বড় হওয়া! ভাল-মন্দ সব কিছুর স্বাদগ্রহণ করতে করতে পথচলা! প্রায় কিছুই করতে না-পারা, মধ্যবিত্ত– দুধে-ভাতে সাধারণত্ব– এ সব নিয়ে দিব্বি দিন কেটে যায়! জাত-ধর্মজনিত বিপত্তি মাথাব্যথার কারণ হয়নি কখনও!

গত তিন-চার বছর ধরে হঠাৎ এই পরিবর্তনটা চোখে পড়ছে, প্রতিবার ভাবছি আমার ভাবার ভুল– কিন্তু চোখে আঙুল দিয়ে একটার পর একটা ঘটনা দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে– দেশটার মেরুদণ্ড ধরে টান পড়েছে! আমি নিশ্চিন্ত হয়ে, উপেক্ষা করব এমন শান্তি আর থাকবে না! এইটা তথাকথিত হিন্দু ভাবধারার রাজনীতির দাপাদাপির দাপট! এই দাপাদাপি জনসমর্থন পাচ্ছে, কারণ মুসলিমরা চিরকাল ভারতীয় রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন– তারা তাদের ধর্মীয় পরিচয়তার ঊর্ধ্বে উঠতে চাননি! আজ তাই সেই সংকটকাল, যখন মুসলিমকে তার মৌলবাদী সত্তা পরিবর্তন করতে হবে, অথবা এই হিন্দুত্বজনিত ধর্মীয় বিভাজন ভারতবর্ষকে ছারখার করে দেবে!

এই হিন্দুত্বের একটা রাষ্ট্রবাদী ঢং আছে! আপনি মোড়ল ভাব! কেউ জানে না, কেন তারা হিন্দুত্বের রক্ষাকর্তা– তবু গা-জোয়ারি! কারণ ভোট! বিবেকানন্দ তীব্রভাবে ধৰ্ম ও রাজনীতির সমাপতনের বিরোধী ছিলেন– কিন্তু কে শোনে কার কথা! বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর, সুভাষচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ– এঁরা সবাই ব্রাত্য! কারণ শিক্ষার প্রভাবই ব্রাত্য! ভীষণ অশিক্ষিত একটা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে এই হিন্দুকরণ রাজনীতির হাত ধরে! যা অসম্মান করতে শেখায়, শিক্ষার মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করে না, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য! যাদের চরিত্রে বিদ্যাজনিত বিনয় বর্তমান, তারা এদের অশালীনতার দ্বারা আক্রান্ত! এরা মনে করে, রামনামের জোরে সব কিছু করা যায়! মানুষ খুন অবধি! কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশ কয়েকটি নামমাত্র! বিপদ আরও উত্তরোত্তর বেড়ে চলছে– কারণ সুস্থ, উন্নত চিন্তাভাবনার লোকেরা এদের থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছেন, অথবা এরা জ্ঞানী লোকেদের এমন অত্যাচার করছে যে, তারা সিস্টেম ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন– ফিনান্স মিনিস্ট্রি থেকে অরবিন্দ, রঘুরাম কয়েকটি উদাহরণ!

আর একটা কায়দা হল, অন্যদের কোনও একটা বিরোধিতায় ট্যাগ করে দেয়া– তাকে দাগিয়ে দেওয়া– তুমি বা আপনি নয়– তুই কমিউনিস্ট, তুই মাওবাদী, তুই গান্ধী পরিবারের মাসতুতো ভাই– ইত্যাদি ইত্যাদি! আর তাও না পারলে, তোর মা-বোনকে এসে মোল্লারা খেয়ে যাবে! এই ভয়টা আমায় যিনি প্রথম দেখাতেন, আমার এক মাস্টারমশাই, গত হয়েছেন– মাঝখান থেকে প্রায় কুড়ি বছর কেটে গেছে! আমার হিন্দুভাইরা মুরগি, বিরিয়ানির ব্যবসা করে, টোটো-অটো চালিয়ে যা হোক করে দিনযাপন করছে! হা হতোস্মি! একটা সহজ কথা বোঝানো কত কঠিন– ধর্ম একটা অস্ত্র, যাকে ব্যবহার করে অত্যাচারীরা যুগে যুগে অন্যায় করেছে, ধ্বংসলীলা চালিয়েছে! শিক্ষার প্রসার ছাড়া যাকে প্রতিরোধ করার অন্য কোনও অস্ত্র নেই! নতুন যে রাজনীতির আনয়ন হল, তাতে অশিক্ষার প্রসার ঘটবেই ঘটবে– আর মুসলিম বা হিন্দু গুন্ডা মেয়ে-বৌকে দু’বেলা ভয় দেখাবে– এটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়াবে!

আমি এই অশিক্ষিত হিন্দু জাগরণের ঢংকে প্রতিবাদ করি এবং বুক বাজিয়ে করি! কারণ আমি হিন্দু পরিচয়ে গর্বিত ও এদের জন্য আমার সেই গর্ব খণ্ডিত হয়! তাই জীবনে প্রথমবারের মত আমিও এই ঘৃণার রাজনীতির শিকার! আমার একাগ্রতা বিঘ্নিত হচ্ছে! বন্ধুদের অনুভূতিহীনতায় ও অসংবেদী আচরণে কষ্ট হচ্ছে! চেনা মানুষকে বোঝাতে পারছি না– স্বৈরতান্ত্রিকতার ভয়ংকরতা! ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘর আমার মাতৃভূমি– আমি তাই রোজ নিভৃতে চোখের জল ফেলি, পরবর্তী প্রজন্মের মুখের দিকে তাকাতে নিজেকে অপরাধী মনে হয়! লজ্জা লুকোতে পারি না! কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী বলেন– এ সব লিখে শত্রু বাড়াও কেন! আমি বলি– বন্দুকের গুলিটা আমার কপালের মাঝখানে লাগুক– পালিয়ে গিয়ে পিছনে নয়! এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করার অঙ্গীকার– মিথ্যা মনে হয়!

দীর্ঘায়িত হচ্ছে লেখাটা, কিন্তু একটা আঘাতের মোকাবিলা না করে কলম থামাতে পারছি না!

‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ বলে একটা শব্দবন্ধ তৈরি হয়েছে! ছাত্রদলকে জব্দ করার ফন্দি! ছাত্রদল একটা সমাজের পরিবর্তন ও অগ্রগমনের গতিপথ! ছাত্রদের এমন ন্যাক্কারজনক বিশেষণে ভূষিত করার চেষ্টা কেন হচ্ছে, একটু তলিয়ে ভাবুন! আমার আপনার ছেলেমেয়ে, যারা কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাবে বা যাচ্ছে– তাদের এ রকম তকমা দিতে চাইছে রাষ্ট্র স্বয়ং! তখন বলতে ইচ্ছে করে, এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়! যারা দেশের শিক্ষা, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক হাল রোজ টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনযাপন অসহনীয় করে তুলেছে– টুকরো করে দিচ্ছে মানুষে মানুষে বিশ্বাসের বাঁধন– তারা টুকরে টুকরে গ্যাং নয়!

একটা কথা, জানি না কারও মাথায় ঢুকবে কি না– অতীতের কোনও অত্যাচারের বদলা বর্তমানে নেওয়া যায় না (মুসলিমদের বিরুদ্ধে হলেও না)! কোনও সমাধান কোনও দিন ঘৃণা থেকে উৎপত্তি হয়নি! ভালবাসা থেকে হয়েছে। সেটাই একমাত্র পথ! পৃথিবীর ইতিহাস, যুদ্ধের ইতিহাস! আমার এ লেখা মূল্যহীন! তবু শ্রীচৈতন্য, বুদ্ধের দেশে আমার জন্ম হয়েছিল– আমি হয়তো শেষপ্রজন্ম, যে বিশ্বাস করে– অহিংসা আমার ধৰ্ম! পরমধৰ্ম! যত মত তত পথ– রামকৃষ্ণের বাণী আমার আশ্রয়! আমরাই উচ্চারণ করেছিলাম মন্ত্র– বসুধৈব কুটুম্বকম্!

অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

বারুইপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

পাঠকের চিঠি। আপনার সুচিন্তিত মতামত পাঠাতে আমাদের মেল করুন। [email protected] এই অ্যাড্রেসে।

Share.

Comments are closed.