সোমবার, এপ্রিল ২২

বেস আর সুপারস্ট্রাকচারের কথা মার্ক্সের আগে বলেছে ঋগ্বেদ: কলিম খান

কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছেন কলিম খান। রবি চক্রবর্তীর সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরেই ভাষাতত্ত্ব নিয়ে এক সম্পূর্ণ অন্য ধারার কাজ করেছিলেন তিনি। তাঁর সেই কাজের সূত্র ধরেই উঠে আসছিল ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের অন্য এক বয়ান। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বললেন, তাঁদের কাজ নিয়েই লেখা বেস্টসেলার থ্রিলার উপন্যাস ‘বিন্দুবিসর্গ’-এর লেখক দেবতোষ দাশ। দুই পর্বের এই সাক্ষাৎকারের আজ প্রথম পর্ব। 

দেবতোষ দাশ

৭ অক্টোবর ২০১৭। শনিবার। লক্ষ্মীপুজোর পরদিন। চরাচর উৎসব-প্রবণ। ভরদুপুরে হাওড়া থেকে আমরা চড়ে বসলাম ব্যান্ডেল লোকালে। আমরা মানে কলিম খান, বন্ধু ফটোগ্রাফার শমীক সাহা আর আমি। উদ্দেশ্য কোন্নগর। অধ্যাপক রবি চক্রবর্তীর বাসভবন। প্রায়-নব্বই রবিবাবুর শরীর-স্বাস্থ্য বিকেলের দিকে একটু আয়ত্তে থাকে। ঠিক চারটেয় ক্যামেরা নিয়ে পজিশন নিয়ে নিল শমীক। স্মার্ট ফোনের রেকর্ডার চালু করলাম। শুরু হল দু’জনের সঙ্গে কথোপকথন। মাঝে-মধ্যে প্রশ্ন আর খেই ধরিয়ে দেওয়ার কাজ আমার। আকাশে মেঘের পরে মেঘ। শরৎ-শাদা। এদিকে কথার পিঠে জমে ওঠে কথা।

‘ভাষা ও ভাষাতত্ত্বের দর্শন নিয়ে আপনাদের ভাবনা শুনেছি। বঙ্গযান-এর তরফ থেকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। কিছু কথা ওই সাক্ষাৎকার থেকেও আমরা পেয়ে যাব। আজ অন্য কথা শুনতে ইচ্ছে করছে। আপনাদের তত্ত্বভাবনার কোনও রাজনৈতিক দিক আছে?’

কলিম খান: রাজনৈতিক দিক নিয়ে তো আলাদা করে ভাবিনি – খুঁজতে গিয়েছিলাম মানব সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাস, সেই সূত্রে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের দিকে তাকাই। কিন্তু সাধারণ ইতিহাস বইয়ের পাশাপাশি বেদ-পুরাণ, রামায়ণ-মহাভারত পড়তে গিয়ে সমস্যায় পড়ি। কিছুই বোধগম্য হয় না। কিন্তু হাল ছাড়ি না, লেগে পড়ে থাকি।

‘আমাদের নিজস্ব সম্পদ এগুলো, তাহলে পড়ে বুঝতে পারব না কেন?’

কলিম খান: ঠিক এই প্রশ্নটাই মাথায় এল! রবীন্দ্রনাথের কথা মতো, এইগুলি যদি ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস হয় তাহলে ইউরোপীয় ইতিহাসের মতো তা সহজবোধ্য নয় কেন? আর যদি গল্পগাথা বা রূপকথাই হয় তাহলে ইতিহাসের এত স্মৃতিচিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে কেন?

পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব: আসল শর্ত ছাড়া, গণতন্ত্র সবচেয়ে ঘৃণ্য, হিংস্র, নীচ সর্বনাশা তন্ত্র : কলিম খান

‘ইতিহাস জানতে গিয়ে ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞানে ঢুকে পড়লেন?’

কলিম খান: আমাদের মহাকাব্য ও পুরাণ জানতে গিয়েই জড়িয়ে পড়লাম বাংলা ভাষার শব্দার্থ-সমস্যার জালে। খুলে বসলাম মহাকাব্য। কৃত্তিবাসী রামায়ণ। শুরুতেই খেলাম হোঁচট। প্রথম ছত্রেই যা লেখা আছে তার মানে কী? ‘গোলোক বৈকুণ্ঠপুরী সবার উপর। লক্ষ্মীসহ তথায় আছেন গদাধর।’ এইরকম অজস্র পয়ারের অর্থ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হলাম।

‘চেনাজানা বলে গল্পটুকু বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু সব পয়ার বোঝা যাচ্ছে না?’

কলিম খান: কেবল রামায়ণ নয়, ঋকবেদ হাতে নিলাম। দেখলাম লেখা আছে, ‘যমের মাতার বিবাহ হওয়ায় বিবস্বানের স্ত্রীর মৃত্যু ঘটিল।’ মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না। আরও আছে। ‘অদিতি হইতে দক্ষ জন্মিলেন, আবার দক্ষ হইতে অদিতি জন্মিলেন। হে দক্ষ! অদিতি যিনি জন্মিলেন, তিনি তোমার কন্যা। তাহা হইতে ভদ্র ও অবিনাশী দেবগণ উৎপন্ন হইলেন।’ বলুন এর মানে কী? পণ্ডিতদের টীকা, বহু অভিধান, শব্দকোষ ঘেঁটে ফেললাম।

‘পণ্ডিতরা কোনও হদিশ দিতে পারলেন না?’

কলিম খান: তাঁরা নিজেরাই কিছু বোঝেননি, আমাদের হদিশ কী দেবেন! ইনিয়ে-বিনিয়ে ভাষ্যের ওপর ভাষ্য বাড়িয়েছেন। কাজের কাজ কিছু করেননি।

‘তারপর একদিন চিচিং ফাঁক হল শেষমেশ?’

কলিম খান: আমাদের প্রাচীন দুই মহাকাব্য ও বেদ-পুরাণের প্রকৃত অর্থ উদ্ধার করতে গিয়ে হাতে পেয়ে গেলাম ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থতত্ত্ব। ভাষার সঙ্গে উঠে এল ইতিহাস, সংস্কৃতি। আমাদের কেবল দরকার ছিল মেলানোর।

‘কী মেলানোর?’

কলিম খান: ইওরোপীয় জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে আমাদের পুনরুদ্ধার করা জ্ঞানভাণ্ডারের একটা তুলনামূলক বোধ তৈরি হওয়া দরকার ছিল। সেটা মূলত রবিবাবুর সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার পরপরই শুরু হল। রবিবাবু পণ্ডিত মানুষ। শ্রীরামপুর কলেজে ইংরাজির অধ্যাপক ছিলেন। ইয়োরোপীয় ইতিহাস, দর্শন ও ভাষার ওপর গভীর জ্ঞান। আমি তো নন-অ্যাকাডেমিক লোক – ভাষাতত্ত্বের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাই আমার নেই।

রবি চক্রবর্তী: ভাগ্যিস নেই!

চুপচাপ কলিম খানের কথা শুনছিলেন। ঈষৎ হেসে হঠাৎই টিপ্পনি কাটলেন রবি চক্রবর্তী।

‘স্যার, কেন বলছেন এইকথা?’

রবি চক্রবর্তী: যদি থাকত, রামায়ণের মানে জানতে গিয়ে ভাষার দুনিয়ার চলমান অসঙ্গতি তাঁর চোখে পড়ত না, যেমন আমাদের চোখে পড়েনি, ভাষাতত্ত্বের মহা মহা পণ্ডিতের চোখে পড়েনি। কলিম যখন রামায়ণ পাঠ করতে যান, তখন দু’দিক থেকেই তিনি মুক্ত ছিলেন – একদিকে তিনি ছিলেন মেদিনীপুরের গণ্ডগ্রামের সন অফ দ্য সয়েল এবং প্রতিবেশী হিন্দু, আদিবাসী প্রভৃতি সম্প্রদায়ের সমবয়সীদের সঙ্গেই বড় হয়ে ওঠার কারণে তাঁর মনে দেশীয় পুরাণাদির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ গড়ে উঠেছিল। আবার জন্মসূত্রে সুফি মুসলমান হওয়ার কারণে, পুরাণ নিয়ে হিন্দুদের যে বোধ ও মুগ্ধতা, তার থেকেও উনি মুক্ত ছিলেন।

‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকেও তো মুক্ত ছিলেন!’

রবি চক্রবর্তী: অ্যাকাডেমিতে ভাষাতত্ত্ব না-পড়ার কারণে পাশ্চাত্য ভাষাতত্ত্ববিদ্যার প্রভাবও তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। এই দুই বিশেষত্ব নিয়ে এর আগে কেউ রামায়ণাদি গ্রন্থ পাঠ করতে যাননি। কেউ গিয়েছেন পাশ্চাত্ব্য প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে, কেউ বা তথাকথিত মুগ্ধতা নিয়ে। উনি মুক্তমনে গিয়েছিলেন বলেই আমরা শাব্দার্থবিধি পেলাম। পুরাণাদির মানে জানতে পারলাম। তাই বলে তিনি পাশ্চাত্ব্য ভাষাতত্ত্ব পাঠ করেননি তা নয়, ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থতত্ত্ব আবিষ্কারের বেশ কিছুদিন পর উনি পাশ্চাত্ব্য ভাষাতত্ত্বের বিভিন্ন গ্রন্থ একের পর এক পাঠ করেন।

কলিম খান: রবিবাবুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরই এটা ঘটল। আমরা তখন যুগলবন্দী বাজাতে লাগলাম।

রবি চক্রবর্তী: কলিম খান হাঞ্চ-এ বোঝেন। অসম্ভব ইন্টিউশন! সেখানে আমি ফ্যাক্টের বাইরে নড়ি না। ফ্যাক্টের মাটিতে দাঁড়িয়েই আমি লড়াই দিয়েছি।

কলিম খান: দু’জনে মিলে এই চর্চা করতে গিয়েই আমাদের দৃষ্টি খুলে গেল। কেবল ভারতবর্ষের নয়, সার্বিক মানব সভ্যতার বিকাশ, প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত দেখতে পেয়ে গেলাম। তার ভাষা কী, তার অর্থনীতি কী, রাজনীতি কী, সবকিছুর বিকাশের ইতিহাস আমরা পেয়ে গেলাম।

আরও পড়ুন: কলিম খান নেই, তাঁর ভাবধারা আছে

‘রাজনীতির কথা বললেন, এই রাজনীতিটাই শুনতে চাইছি। একটু সূত্র দিচ্ছি, কী জানতে চাইছি বোঝাতে সুবিধা হবে। আপনারা সম্প্রতি গণতন্ত্রের গরিমা-হনন নিয়ে বলছেন, লিখছেন। গণতন্ত্রকে নিকৃষ্টতন্ত্র বলছেন, কেন বলছেন?’

কলিম খান: আচ্ছা, বুঝেছি কী জানতে চাইছেন। একটু বিশদে বলি?

ইশারায় রবি চক্রবর্তীর থেকে অনুমতি নিয়ে কলিম খান শুরু করলেন। নিজস্ব বিষয় পেলে এক অক্লান্ত মগ্নতায় বলে যেতে পারেন তিনি। তখন যেন বাহ্যজ্ঞান লোপ পায় তাঁর।

‘বিশদেই শুনতে চাইছি।’

কলিম খান: সমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ভাষা, দর্শন কেমন হবে, তা মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। সামাজিক উৎপাদন কর্মযজ্ঞ কাদের নেতৃত্বে এবং কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেই স্বভাবের ওপর নির্ভর করে।

‘সে তো মার্ক্সই বলেছেন! বেস আর সুপারস্ট্রাকচারের কথা!’

কলিম খান: মার্ক্সের বহু আগেই ঋগ্বেদে এই কথা লেখা হয়ে গেছে!

‘ঋগ্বেদে!’

কলিম খান: যজ্ঞই ভুবনের নাভি – এই কথা ঋগ্বেদে বলা আছে। এক্ষুণি গুগল করে দেখে নিতে পারেন।

রবি চক্রবর্তী: কলিম কোথাও একটা পড়েছিলেন এই কথা যে যজ্ঞই ভুবনের নাভি। কিন্তু কোথায় পড়েছিলেন মনে করতে পারছিলেন না। যজ্ঞ ইজ দ্য ন্যাভাল অফ দ্য ওয়র্ল্ড লিখে আমিই গুগল করলাম, দেখলাম ঋগ্বেদেই এই কথা লেখা আছে।

নব্বই ছুঁতে আর কয়েক মাস আছে রবি চক্রবর্তীর। হাতে স্মার্ট ফোন। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টও আছে। টেবিলে ল্যাপটপ। নিয়মিত মেল বক্স চেক করেন। কেউ মেল করে কিছু জানতে চাইলে বা লিঙ্ক পাঠিয়ে কিছু পড়তে দিলে উৎসাহ নিয়ে কেবল পাঠ করেন না, প্রতিক্রিয়া দিয়ে পাল্টা মেলও করেন।

কলিম খান: এই যজ্ঞকে কেবল হোম বা যাগযজ্ঞ ধরলে হবে না, এই যজ্ঞ হল কর্মযজ্ঞ। আচ্ছা, এই যে বললাম না, সভ্যতা বিকাশের ইতিহাস দেখতে পেয়ে গেলাম, এই ইতিহাস খুব সংক্ষেপে বলব?

‘বলুন না!’

কলিম খান: একটা ত্রিশুল কল্পনা করুন। মানুষের সভ্যতা ত্রিশুলের মতো এগোয়। এর মাঝের ফলাটা কর্মযজ্ঞ বা কর্মযজ্ঞের ধরন। প্রোডাকশন সিস্টেম। তার ডানদিকের ফলাটা হল রাষ্ট্রশক্তি বা শাসনযন্ত্র। কর্মযজ্ঞের ধরনটা এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ করে। আর বামদিকের ফলাটা হল অ্যাকাডেমি। শিক্ষাব্যবস্থা।

‘তখনও অ্যাকাডেমি ছিল?’

কলিম খান: এ হচ্ছে আমাদের টোল-চতুষ্পাঠির একদম আদিরূপ। এই তিনটে একত্রে চলে।

‘ত্রিফলা ব্যবস্থা?’

কলিম খান: হ্যাঁ।

‘কীভাবে এই ব্যবস্থা কাজ করছে?’

কলিম খান: কর্মযজ্ঞের কথা বলি, তাহলেই বুঝতে পারবেন। কর্মযজ্ঞের স্বভাব অনুযায়ী মানব সমাজের শুরুতে ছিল চয়ন। চয়ন একটু পুরনো বলে বুঝতে অসুবিধে হতে পারে। তাই আমরা চয়নের পরের ধাপ কৃষি থেকে শুরু করি। কৃষি যখন কর্মযজ্ঞের ধরন তখনই আমাদের প্রাচীন পুরুষরা বুঝে গিয়ে ছিলেন সেই সত্য, কর্মযজ্ঞই ভুবনের নাভি!

‘সেই সূত্রে ত্রিশুলের বাকি দুই ফলাও বদলাবে।’

কলিম খান: অবশ্যই! চয়নের পরে কৃষি। কৃষির পরে কুটীর শিল্প। মাঝের ফলা কর্মযজ্ঞ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তার দুই দিকের দুই ফলাও অবশ্যই বদলে বদলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলাচ্ছে। বদল হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থাও। এই ত্রিফলাই প্রাচীনকাল থেকে কয়েক হাজার বছর সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।

‘এখন আর করছে না?’

কলিম খান: করছে, কিন্তু সেইভাবে নয়। ইন্ড্রাস্ট্রি আসার পর, মূলত বৃহৎ শিল্প আসার পর ব্যবস্থা বদলে গেল।

‘সে তো বহু বহু বছর পরে! ইন্ড্রাস্ট্রি মানে নিশ্চয়ই শিল্পবিপ্লব বলছেন?’

কলিম খান: হ্যাঁ, শিল্পবিপ্লব। ইন্ড্রাস্ট্রি আসার পরই সব আমূল বদলে গেল। তারা এসেই বলল সামাজিক বিন্যাস পুরো বদলাতে হবে।

‘এতদিন এই বিন্যাস কেমন ছিল?’

কলিম খান: এই সামাজিক বিন্যাস পুরো মানুষের ‘হাঁটার’ মতো। হাঁটার সময় সবার ওপরে যেমন আমাদের মাথা, সমাজের মাথাতেও ছিল জ্ঞানচর্চাকারীরা। কর্মযোগচর্চাকারীরা থাকত হৃদয়রূপে মাঝে। আর কর্মীজনগণ হাত-পা হিসেবে কাজ করত।

‘ইন্ড্রাস্ট্রি এই বিন্যাস মানল না?’

কলিম খান: সম্পূর্ণ উল্টে দিল! বলল সবার ওপরে থাকব আমরা। বৃহৎ শিল্প। জ্ঞানচর্চাকারীকে সরিয়ে সমাজের মাথা হয়ে গেল ইন্ডাস্ট্রি।

‘কৃষি বা কুটিরশিল্পের সময় জ্ঞানচর্চাকারীর মর্যাদা ছিল?’

কলিম খান: সম্পূর্ণ ছিল।

‘ইন্ড্রাস্ট্রি এসে কি অ্যাকাডেমিকে তার মতো করেই গড়েপিটে নিল?’

কলিম খান: অ্যাকাডেমিকে মাথা থেকে নিচে নামিয়ে দেওয়ার ফলে সমাজ দেখতে কেমন হল? মাথা উঁচু করে মানুষ যেন আর হাঁটছে না, হামাগুড়ি দিচ্ছে। মাথা-বুক-পেট সব সমান করে দেওয়া হল। কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করছে কিছুতেই বাইরে থাকে বোঝা যাবে না।

‘জ্ঞানচর্চা ও বিদ্যার্জন অনেক সঙ্কুচিত হয়ে গেল?’

কলিম খান: কেবল সঙ্কুচিত নয়, শেষ হয়ে গেল। অ্যাকাডেমি হয়ে গেল ‘গাধা’ তৈরির কারখানা। তার কাজ ‘গাধা’ তৈরি করে ইন্ড্রাস্ট্রিকে যোগান দেওয়া।

‘গাধা?’

কলিম খান: গাধ-এর আধার হল গাধা।

‘গাধ মানে?’

কলিম খান: অগাধ কথাটা শুনেছেন?

‘হুঁ। অগাধ জ্ঞান বা অগাধ পাণ্ডিত্য?’

কলিম খান: অগাধ হল গভীর। তাহলে গাধ হল অগভীর। ‘আ’ অর্থ আধার। অগভীরতার আধারই হল গাধা। অগাধ জ্ঞান নয়, সারফেস জ্ঞানের জন্যই তার নাম গাধা। মূর্খ। স্টুপিড। ইয়োরোপের মতো নয়, আমরা আত্মাবাদী দেশ। তাই আমাদের দেশে সব শব্দেরই দুটি অর্থ থাকে, অদৃশ্য অর্থ আর সাদৃশ্য অর্থ। এখানে গাধার অদৃশ্য অর্থ হল ‘অগভীরতার আধার’ আর সাদৃশ্য অর্থ হল ‘চতুষ্পদ জন্তু।’ গাধা কখনও দেখেছেন?

‘কোন গাধা? সারফেস জ্ঞানের আধার এমন মনুষ্য নাকি চতুষ্পদ জন্তু?’

কলিম খান: (হেসে) জন্তু গাধা।

‘দেখেছি। কর্মরত অবস্থায় দেখেনি।’

কলিম খান: একবার ট্রেনিং দিয়ে দিলে এমন দক্ষতায় যে কাজটা করবে, আপনি ভাববেন এটা একটা যন্ত্র। একটা কন্সট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করতাম যখন রাজস্থানে, আমি গাধা দেখেছি। এক জায়গা থেকে মাটি বয়ে নিয়ে গিয়ে তারা আরেক জায়গায় ফেলছে। না-দেখলে বিশ্বাসই হবে না এমন নিখুঁত শৃঙ্খলায় কাজটা তারা করছে! একদম যন্ত্রের মতো। একেবারে চেনের মতো, মাঝখানে কোনও ঝঞ্ঝাট নেই। স্লোগান-টোগান তো দেয়ই না, নিজেদের মধ্যে হাসি-মস্করাও করে না।

গাধারা হয়ত হাসে না। কিন্তু এই কথায় আমরা হাসি চাপতে পারলাম না। কলিম খানও। তবে মৃদু হেসেই কথাপুরুষ আবার ডুবে গেলেন। আমরাও।

কলিম খান: এই হচ্ছে গাধা। অ্যাকাডেমিতে পড়াশোনা করলে মানুষ খানিকটা যন্ত্র হয়। তার মনুষ্যত্বের ক্ষয় হয়। তাকে ইশকুলের প্রথমদিনেই বলে দেওয়া হয়, তোর পাশে যে বসে আছে, তোর বন্ধু, তাকে দেখাবি না, উত্তর বলে দিবি না। ভাবুন, ছোটবেলার থেকে যার সঙ্গে সে ধুলোখেলার সাথী, সে না-পারলে তাকে আমি এই উত্তরটা দেখিয়ে দেব না? উত্তর বলে দেব না! একি রে বাবা! প্রথমেই মনুষ্যত্বে ঘা লাগে! ঘা লাগলে মনুষ্যত্ব খর্ব হয়। মনুষ্যত্বকে যদি আপনি একটা শালগ্রাম শিলা ধরেন, ক্রমাগত ঘা পেতে পেতে ওটা সরু হতে থাকে, ক্ষয় হতে থাকে। যত উচ্চশিক্ষিত, যত ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ, তার ওই শালগ্রাম শিলা তত ক্ষয়প্রাপ্ত।

‘উচ্চশিক্ষিতদের মনুষ্যত্ব নেই বলছেন?’

কলিম খান: আছে, কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে মনুষ্যত্ব নামক সেই শালগ্রাম শিলা ক্ষইতে ক্ষইতে একসময় পটলের মতো বা কুঁদরির মতো হয়ে যায়।

‘এটা কেন হয়?’

কলিম খান: আজকের অ্যাকাডেমি-শিক্ষায় আমরা যত বেশি ডিগ্রিধারী, নিজেদের অজান্তেই আমরা তত প্রকৃতি-প্রদত্ত স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা হারাই। সুনামিতে তাই আন্দামানে একজন জারোয়ারও মৃত্যু হয় না। একটি প্রাণীও মারা যায় না।

কলিম খান: উচ্চশিক্ষা মাত্রই আমাদের প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন করে?

কলিম খান: অতি উচ্চশিক্ষিত মানে সে সম্পূর্ণভাবে একই কর্মের পুনরাবৃত্তিমূলক যন্ত্রগুণসম্মন্ন হয়। ঢেঁকি দেখেছেন? সেইরকম। একই কাজ বারবার করে চলেছে। বঙ্গমানস উচ্চশিক্ষিতের এই ‘গুণ’কে চিহ্নিত করতে পেরে ‘বুদ্ধির ঢেঁকি’ শব্দবন্ধ তৈরি করেছিল। ‘বুদ্ধির ঢেঁকি’ হয়ে গেলেই আমি-আপনি কোনও বিষয়কেই অখণ্ড ও গভীরভাবে অনুভব করতে পারব না। খণ্ডজ্ঞান নিয়ে তখন আমরা শাখা-প্রশাখায় বিরাজ করি, ‘কাণ্ড’জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এই বাসি ও পচা ‘স্থির’ বিদ্যাবুদ্ধির রূপটাই আজকের অ্যাকাডেমিক বিদ্যা। ‘জ্ঞানের শুটকি’ বলতে পারেন। ‘স্থির’ বা ‘বদ্ধ’ বিদ্যার জেরক্সের জেরক্সের জেরক্স বা তার জেরক্স বললেও কম বলা হয়। নাসিরুদ্দিনের গল্পের মতো। বন্ধুর বন্ধুর বন্ধুকে নাসিরুদ্দিন হাঁসের ঝোলের ঝোলের ঝোল খাইয়েছিলেন! এই শিক্ষা নিয়েই আমরা ‘গাধা’ হই, পাদোদক-মূঢ় হই।

‘পাদোদক-মূঢ় মানে?’

কলিম খান: আমাদের প্রাচীন মহর্ষিরা কবিতার বা শ্লোকের চরণে চরণে বা পদে পদে কী লেখা আছে, সেই অমৃত আস্বাদন করার কথা বলে গেছেন। আমরা না-বুঝে ওটাকে গুরুর বা মূর্তির চরণামৃত বানিয়ে ফেলেছি। ব্রাহ্মণের পা-ধোয়া জল পর্যন্ত খেতে দ্বিধা করিনি! কবিতার চরণ বা পদকে মানুষের পা বানিয়ে ফেলেছি। জ্ঞানের অমৃতসুধাকে পা-ধোয়া জলে পরিণতে করেছি। এই মূঢ়তাকে আমরা বলি পাদোদক-মূঢ়তা।

অ্যাকাডেমিক টার্মিনোলজি প্রায় থাকেই না তাঁদের লেখায়। কথায়। দেশীয় ভাষা ও দর্শন থেকেই তাঁরা আহরণ করেন পরিভাষা। সচেতনভাবেই। বহু ‘পণ্ডিত’-এর তাই কলিম খান আর রবি চক্রবর্তীর লেখা বুঝতে ‘অসুবিধা’ হয়। রবি চক্রবর্তী মনেই করেন ‘টার্মিনোলজি’র সমস্যাটা আমাদের বড় সমস্যা। আমাদের ‘ধর্ম’ কখনোই ‘রিলিজিয়ন’ নয়। এমনকী পার্থক্য আছে আমাদের ‘ব্যাকরণ’ আর ইংরেজির ‘গ্রামার’-এ। তাঁদের মতে, পরিভাষার এই বিভ্রাটের ফলে আমাদের আদি অভিধানকার যাস্কের শব্দার্থতত্ত্ব বোঝাই যায়নি। পাণিনির ব্যাকরণকে খাটো করে ইংরেজি গ্রামারের সমতুল করা হয়েছে।

বাকি আগামী পর্বে

ছবি : শমীক সাহা 

দেবতোষ দাশ এই সময়ের একজন উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর গবেষণার ওপর আধারিত তাঁর উপন্যাস ‘বিন্দুবিসর্গ’। লেখকের উল্লেখযোগ্য অন্যান্য উপন্যাস ‘বিয়োগপর্ব’ ও ‘হলুদ কোকাবুরা’। গল্পগ্রন্থ ‘ধর্ষণের ১৮ দিন পর’।

Shares

Leave A Reply