বইমেলার জয়! আসছে বছর আবার হবে

দেশভক্তি আর জাতীয়তাবাদ যেমন এক নয়, তেমনই প্রতিবাদ আর রাজনীতি মিশে গঙ্গা-যমুনা হয়ে গেলে তার দুর্ভোগ বইমেলাকে পোয়াতে হবে না তো?

২৭

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

গৌতমকুমার দে

দশমীর আবহে প্রথামাফিক ঘণ্টা বাজিয়ে তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে দিয়ে শেষ হল ৪৪তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। একদিকে টানা ১২ দিনের বইয়ের গন্ধমাখা আনন্দযজ্ঞ সমাপনের বিষণ্ণতা, অন্যদিকে আগামী বছরে আবার বই-পার্বণ হওয়ার দূরাগত হাতছানি– দু’য়ের টানাপোড়েনে দোদুল্যমান বইপ্রেমীদের হৃদয়-মন।

নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন-বিরোধিতার আঁচ ভালই পাওয়া গেল এ বছরের বইমেলা প্রাঙ্গণে। দেশভক্তির নামে উগ্র জাতীয়তাবাদীপন্থীদের ভবিষ্যতে মেলায় স্টল দিতে দেওয়ার আগে একবার অন্তত ভাবা উচিত বইমেলা কর্তৃপক্ষের। তাঁদের মেরুদণ্ডের ঋজুতা প্রমাণের এ-ও এক পরীক্ষা।

বইচুরি দিবস পালন করার কথাও ভাবতে পারেন মেলা কর্তৃপক্ষ। এই দিবস পালনের জন্য তৈরি সাব-কমিটিতে প্রয়োজনে রাখা যেতে পারে বিশিষ্ট পেশাদার বইচোরবিশেষকে। ব্যাপারটা অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মত।

গতকাল বইমেলা সাক্ষী থাকল বিশিষ্ট লেখক-সাংসদ শশী থারুরের উজ্জ্বল বাক্যালাপের। কলকাতা সাহিত্য উৎসবের মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বারবার ঘুরে ফিরে আসছিল বহুত্বের স্বর-স্বীকৃতির প্রসঙ্গ। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তো বিজেপিকে ‘সংখ্যালঘুর নয়, কুচিন্তার গুরু’ বলে চিহ্নিত করলেন।

গতকাল ও আজ– এই দু’দিনই মেলা ভাসল জনজোয়ারে। খাবারের স্টলে হামলে পড়ছিল যত রাজ্যের ভিড়। সে জনসমাগম দেখলে কে বলবেন, এটা বইমেলা! রীতিমত খাদ্যমেলা!

সেই সঙ্গে বসন্ত যে জাগ্রত দ্বারে! সুতরাং যুগলে হাজির তাঁরা বইমেলায়। ভিড়ের মাঝে নিশ্চয়তার খোঁজ। হৃদয়ের দোলায় বেশিরভাগই সমুদ্রতীরে ভেসে আসা ‘বোতল ডাক’-এর মত হলেও ব্যতিক্রমও আছে বৈকী! যেমন নৈহাটি থেকে আসা শেফালি-সৃজন। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পড়ুয়া-যুগল গত চারবছর ধরে একসঙ্গে অন্তত দু’দিন আসেন বইমেলায়। দু’জনের কিছু সাধারণ পছন্দের বই তো কেনা হয়ই, সেই সঙ্গে পরস্পর পরস্পরকে উপহার দেওয়ার বইও কেনেন এবং দেন বইমেলার মাঠেই। অবশ্যই এঁরা বিরল প্রকৃতির।

গড় ছবিটা অন্তত নন-অ্যাকাডেমিক বই কেনাবেচার ক্ষেত্রে মোটেই প্রশ্নাতীত নয়। যত মানুষ আসেন, তাঁদের প্রতি-দু’জনে যদি একটা করেও পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়ার বাংলা বই কিনতেন! তা হলেই বাংলা বই-চিত্র অনেকটা বদলে যেতে পারত।

অনুরূপ আক্ষেপের সুর শোনা গেল বালুরঘাট থেকে আসা দুই বন্ধু অনিকেত ও সাম্যর কথায়। মধ্যতিরিশের দুই যুবক বই কেনেন সারাবছর ধরেই। তা হলে বইমেলায় আসা কেন? আসা মূলত বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের লিটল ম্যাগাজিন এবং ছোট ও নবীন প্রকাশক যাদের বই-খবর সহজলভ্য নয়, তাদের জন্য। হ্যাঁ, এই অন্তর্জালের যুগেও এটা সত্যি। সত্যই, আমরা আশাবাদী এমন পাঠকদের জন্য।

গতকাল বইমেলার অশান্তি গড়াল বিধাননগর উত্তর থানা পর্যন্ত। দেশভক্তি আর জাতীয়তাবাদ যেমন এক নয়, তেমনই প্রতিবাদ আর রাজনীতি মিশে গঙ্গা-যমুনা হয়ে গেলে তার দুর্ভোগ বইমেলাকে পোয়াতে হবে না তো? ভয় হয়, ঘরপোড়া মানুষ আমরা, সিঁদুরে মেঘ দেখলে একটু হলেও বুকটা তো দুরুদুরু করবেই! ভাগ হয়ে যাবে না তো বইমেলা!

মেলার শেষ দু’দিনে প্রকাশিত হল বেশ কিছু বই-পত্র-পত্রিকা। আমিনুল ইসলামের ‘নবজাগরণে বাংলার মুসলিম নারী’-তে (অক্ষর প্রকাশন) তুলে ধরা হয়েছে বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতিতে মুসলমান নারীর শিক্ষা ও ভাবনাচিন্তার পরিসর কতটুকু, সে প্রসঙ্গ। বিশিষ্ট কবি-সাংবাদিক মৃদুল দাশগুপ্তর ‘কবিতা সহায়’ বেরিয়েছে বোধশব্দ থেকে। টুকরো-টুকরো লেখায় জলছবির মত উঠে আসে কবিতার হয়ে ওঠার কথা। ‘বোধশব্দ’ পত্রিকার বইমেলা সংখ্যার বিষয় ‘কবিতার মেরামতি’। কবিতার কাটাকুটি, পরিমার্জন, সম্পাদন বিষয়ক একগুচ্ছ চমৎকার লেখার আয়াজন। সাদাত হোসেন মান্টোর আটটি গল্প সরাসরি উর্দু থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন মবিনুল হক। ‘স্ফুলিঙ্গ’ শীর্ষক বইটির প্রকাশক ভাষাবন্ধন। হারুকি মুরাকামি সংখ্যা বের করেছে ‘কবিতীর্থ’। ‘পরম’ পত্রিকায় সাম্প্রতিকতম সংখ্যা বাংলার পুতুলকে নিয়ে। ছোঁয়া থেকে বেরিয়েছে একটি জরুরি বই, পুণ্য বাস্কের ‘বাংলা কথাসাহিত্যে সাঁওতাল’। সুবীর ভট্টাচার্যের ‘সত্যি অ্যাডভেঞ্চার’ এবং ‘আরও সত্যি অ্যাডভেঞ্চার’ বই দু’টি নবকলেবরে বেরিয়েছে একুশ শতক থেকে। রোমাঞ্চকর অন্য রকমের অ্যাডভেঞ্চার কাহিনির সম্ভার।

সূত্রধর প্রকাশিত মইনুল হাসানের ‘কাশ্মীর: যা সত্যি যা সত্যি নয়’ আর এক উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। ‘দুই চার দুই’ (ছড়া) এবং ‘সালভাদর দালি আপনি কোথায়?’– বই দু’টি বিশিষ্ট প্রবন্ধকার এবং ভ্যান গগ অন্তঃপ্রাণ অনির্বাণ রায় (ছদ্মনাম; আসল নাম অরুণ দে)-এর অন্যতম বই। সুপরিচিত কবিতার লাইনবিশেষ বা তার অংশ অবলম্বনে লেখা কবিতা, প্যারডি নয়। দু’টি বইয়েরই প্রকাশক লেখার কালি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘হারিয়ে যাওয়া লেখা’ পাওয়া যাবে পত্রভারতীতে। হারানো লেখার পাশাপাশি গ্রন্থিত হয়েছে লেখা নিয়ে লেখকের নিজস্ব বক্তব্য।

বিক্রি নিয়ে মোটামুটি সন্তুষ্ট লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকরা। ছোট স্টলের মালিকদের থেকে পাওয়া গেল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। স্টলের অবস্থান, প্রতিবেশী স্টলের আচরণ, গিল্ডকর্তাদের অমনোযোগিতা ও অর্থগৃধ্নুতা, পাঠকের চরিত্র (বিশেষত পাঠের ধরন, বৈদ্যুতিন বইয়ের প্রতি ঝোঁক)– এমন নানা ফ্যাক্টরকে দায়ী করতে শোনা গেল, খারাপ বিক্রির প্রতিক্রিয়ায়। লক্ষণীয়, বাংলা থ্রিলার নিয়ে পাঠকের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।

এ দিকে বইমেলার সমাপ্তি অনুষ্ঠানে বইমেলা ছেড়ে যাওয়ার শোকে কেউ কেউ এক্কেরে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। কোলাকুলি, সুযোগ বুঝে গলাগলি, মায় বিলিতি বদমাইশিও চলল। মাটির কাছাকাছি বোঝাতে একজনকে দেখা গেল, ফ্লাস্ক থেকে খাঁটি দেশজ গলায় ঢালতে। নারীদের জন্য আলাদা স্মোকার্স কর্নারের দাবি খুব শীঘ্রই উঠলেও অবাক হওয়ার কিচ্ছুটি নেই।

হাইল্যান্ডবাসী শখের লেখক-লেখিকাদের ফের এক বচ্ছরকাল হাপিত্যেস করে বসে থাকতে হবে। একদল চ্যাংড়া বইমেলা বিসর্জনের মুখে সোল্লাসে ফিরিয়ে আনল শারদোৎসবের আমেজ– বইমেলা থাকবে কতক্ষণ, মেলার হবে বিসর্জন। তাই শুনে ভ্রূ-পল্লবে ঢেউ উঠল কারও কারও। পরক্ষণেই একমাইল শান্তিকল্যাণ!

ফের রব উঠল– বইমেলা কি জয়, আ-স-ছে ব-চ্-ছ-র আ-বা-র হ-বে…!

পুনশ্চ: হদ্দ হেরি বইমেলাখানি, ভিতর ভাঙা ভড়ং খানি!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More