বুধবার, আগস্ট ২১

আমি ও অটো

কৌশিক কর

নাটক ‘অটো’-র ভাবনা নিয়ে ব্যক্তিগত গদ্য লিখলেন নাট্যনির্দেশক  । 

এইবারে একটা শেক্সপীয়র করা যাক, বা ব্রেখট অথবা রবীন্দ্রনাথ, আমার কখনই নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাথায় এমন ভাবনা আসে না। কোন একটা ঘটনা বা ক্রমাগত ঘটতে থাকা ঘটনাপুঞ্জ আমার মাথায় যন্ত্রণা তৈরী করতে থাকলে আমি ছটফট করি, এবং হাতের কাছে যা পাই তাই দিয়ে একটা বক্তব্যকে গোছানোর চেষ্টা করতে থাকি। কখনো ছবি আঁকা চলে ডায়েরীর পাতায়, কখনো বন্ধুদের মাঝে জোর করে প্রসঙ্গ তুলে বকবক করি, বা ভাবি একটা ফিল্ম বানিয়ে সবার কাছে বিষয়টা তুলে ধরলে বেশ হয়, বা মাইক হাতে বেরোনোর পারমিশন পেলে সেটাই করতাম। সব দিক থেকে আমার আয়ত্তে, বাজেটে এবং ভালো লাগায় থিয়েটার নির্মাণটা আমার কাছে সহজ ও সুলভ হয়। আর তখনই আমার ভেতরে চলতে থাকা বিক্রিয়াটার একটা সাধ্যমত পরিবেশনযোগ্য, মোটামুটি শিল্পসম্মত আয়োজন তৈরী হলেই মানুষের সামনে আসি। হ্যাঁ,বক্তব্যের জন্যই আমার তথাকথিত শিল্প। না হলে অভিনয় কে আমি শিল্পের মধ্যেই ধরিনা। একজন চিত্রকর বা ভাস্কর্য নির্মাণকারীকে হাঁ করে গিলি- এইত ক্রিয়েশন, নির্মাণ চাই নির্মাণ। পরিচালক হিসাবে সে খিদে খানিক মিটলেও পাতে দেবার বেশী কিছু করে উঠেছি বলেও মনে করিনা। বরং মঞ্চ, আলো, মেক-আপে খানিক শিল্প নির্মাণের অবকাশ থাকে। তাই শিল্পের জন্য কিছু করার সাহস পাইনা। বরং বক্তব্যটা আর যন্ত্রণাটা শেয়ার করায় খানিক লঘু হয় ভেতরের আক্ষেপ আর কষ্টগুলো। নিরাময় না হলেও প্রশমিত হয় বিকারগুলোর।
বিকারের কথাই বলছিলাম আসলে। এবারে আমার বিকারের যে বহিঃপ্রকাশ তা বলার জন্য আমি সাহিত্যের স্মরণাপন্ন হই। কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা পড়েছি তার মধ্যে পেয়ে গেলে সেটাকে নিয়ে লেগে পড়ি আর না মিললে নিজে কাঁচা হাতে কলম ধরি, সে কলম খোঁচায় বেশি কারণ তাতে সাহিত্যিকের শৈল্পিক ছোঁয়া কম থাকে, পর্ণমোচীর মত বড্ড ধাক্কা মারে, আর “ডালে-ভাতে বাঙালি” সে ধাক্কা নেয় কম, ফেলে বেশী।

ভূমিকার ভণিতা এই কারণেই বড় হচ্ছে কারণ গাছের বর্ণনার আগে একটু মাটির নীচে শেকড় আর খনিজের সন্ধানটা দিতে দিতে যাই, তা হলে পরের দিকে বেশি খাটতে হবে না।

বলছিলাম বিকারের কথা। প্রথম আমাকে একটি ঘটনা বা ছবি ভয়ংকরভাবে নাড়া দিয়েছিল, সমুদ্র সৈকতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ছোট্ট একটি বাচ্চার মৃতদেহ। লাল গেঞ্জি, নীল হাফ প্যান্ট। সিরিয়ায় যে ভয়ংকর তান্ডব চালাচ্ছে ভদ্র ও প্রথম বিশ্বের দেশগুলি তার সামান্যতম এক যন্ত্রণার সামান্যতম ভেসে আসা নিদর্শন। বুকের ভেতরে হাহাকার করতে থাকা ছবিটা মিলিয়ে যাবার আগেই পর পর সোশ্যাল মিডিয়া এবং পত্র পত্রিকায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিভত্স পরিণতি সহ সারা পৃথিবী জুড়ে বিপ্লব ও বদলের, ধর্ম ও অসহিষ্ণুতার, অনার-কিলিং ও যুদ্ধের  দলা পাকানো-থ্যাতলানো-রক্ত-মাংস আমার মানসিক যন্ত্রণা কে ঘুণপোকার মত কুরে কুরে খাচ্ছিল। আমি ক্রমে চারপাশ থেকে নিজেকে গোটাচ্ছিলাম। আমার আশেপাশের দৃশ্য দূষণ শুধু আমাকে নয় আমার চারপাশের বন্ধু, আত্মীয়, ভাই, সন্তানদের নার্ভকেও আক্রান্ত করছিল। কী করে একটা মানুষ আর একটা মানুষ কে ওই ভাবে মারে আমার কাছে তা বিস্ময়ের বিষয় হয়ে উঠছিল। আমি অবাক হয়ে দেখেছি মানুষ হোয়াটসঅ্যাপে দেখে, দেখায়, শেয়ার করে সেসব… ভগবানের দোহাই এ জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ভিডিও, আল্লাহর নামে আড়াই পোচে জবাই, দেখে বিপ্লবের নামে উড়ে যাওয়া ঘিলু। আহ… আমি পালাচ্ছিলাম, আমার শুধু মনে হচ্ছিল, একটা মানুষ কে ওই ভাবে আর একটা বা একদল মানুষ কি করে মারে?

যারা মারে তারা কি সবল! তাদের জান্তব প্রবৃত্তি এবং কঠোর স্নায়ুর কাছে নিজেকে কি দূর্বল, অপুরুষ বলে মনে হচ্ছিলো। আর সারা পৃথিবীতে মারার আর মার খাবার দল আমাকে প্রাগৈতিহাসিক জংলিদের কথা মনে করাচ্ছিল। নিজের পৌরুষ খুঁজে ফিরছিলাম চন্দনের মত। আর সেখান থেকেই নবারুণ ভট্টাচার্যের এই সাহিত্য আমায় রসদ দিলো।

অটো পড়েছি যখন তার অন্তর্নিহিত যন্ত্রণাটা আমার তখনই মনে গেঁথে ছিল। বলাই বাহুল্য ফেলুদা বা ব্যোমকেশ আমি মাধ্যমিক পাশ করার পর আর ছুঁয়ে দেখেছি বলেও মনে হয়না। বাঙালী কি একটা বালখিল্যতায় এখনো কৈশরে আটকে আছে। একটা গুপ্তধন পাবো এই আশা, অথবা নিশুত রাতে কোন এক জেমস বন্ড এসে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে… এই বয়সটার কচি ভাবনা আজো তাকে মোহগ্রস্ত করে রাখে। মাঝে মাঝে গিটারটা বন্দুক হয়ে যাবে চে’র মত এটাও তার মস্ত কল্পনা। যদিওবা একটা লোডেড সেভেন বা নাইন.এম.এম হাতে ধরলে কেমন হাগু হাগু পায় তা অধিক বাঙালী জানেই না।গুলির আওয়াজ শুনে সেদিকেই ধেয়ে যায় এমনও দেখা মেলাও ভার। আসলে তার হয়ে কেউ না কেউ লড়ে দেবে ফেলুদা বা ব্যোমকেশ এই তার আশা। এদ্দূর অবধি দৌড়। আমারো। কিছু বাঙালী ধরেছিল এক উত্তাল সময়ে, আর কিছু বেইমান তাদের মেরেছিল কোন এক উত্তাল সময়ে। সে হিসাব থাক। আপাত আমার আর তোমার হাতে কচি শিশুপাঠ্য কাহিনি তুলে দেওয়া ছাড়া আর কোন কাজ নেই। রোমান্টিক বাঙালীর লড়াই হোক ফুটবল মাঠে চিংড়ি ইলিশে। এর বেশী কিছু হলেই ছকবাজি ধরা পড়ে যাবে।
নবারুণ বললেন সব ছক। আমি ঘাঁটলাম ছকের ইতিহাস। আদিম কাল থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা জঙ্গল আর আর তার সম্পদ ভাগাভাগি করে এসেছে। সমান ভাগ না হলে লড়েছে। মেরেছে জিতেছে হেরেছে। একটা করে বড় দুনিয়া আসে আর একটা ছোট দুনিয়াকে গিলে খায়। ওই বড় মাছ ছোট মাছের মত। এ তো প্রকৃতি ভায়া ! ভৌত আর জীবন বিজ্ঞানের নিয়মে চক্রটা না চললে পৃথিবী ব্যালেন্স হারাবে। অগত্যা ডারউইন।

আবার তলিয়ে যাওয়া মানুষদের ইস্তেহার, এক হয়ে লড়াই দেবার জোট, সেও ফেলনার নয়। এই লড়াইয়ে এক দল মারার আর এক দল মার খাওয়ার থেকেই যাবে। এ ছক শুধু মানুষে নয়, পিঁপড়ে মৌমাছি থেকে শুরু করে ভাইরাসদের দুনিয়া দখলেও বিরাজমান। শ্রেণি ও তার সংগ্রাম। এমতাবস্থায় দুটোকেই স্বীকার করে যোগ্যতমের উদবর্তনবাদকেই মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। সত্য অন্য আর এক বিকল্প সত্যের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত সত্য। গ্যালিলিও দূরবিন আবিষ্কারের আগে কয়েক হাজার বছরের সত্যে কোন পাপ নেই। গুরু বা পুরুষ তার শিষ্য বা উত্তরপুরুষ কে তাই শিখিয়েছে। অসত্য শেখায়নি। যদি ভুল বা অসত্য হত তাহলে দূরবিন আবিষ্কারের পর দিন থেকেই জ্ঞানের পরিধি অনুযায়ী গাছের পাতার রঙ, বা জোয়ার বা ভাঁটা বা খাদ্যের স্বাদ বা জীবনচক্র বদলে যেত। বদলায়নি যখন তখন ওই হাজার বছরের পূর্ব পুরুষ দের অস্তিত্ব মিথ্যা নয়। মিথ্যা হলে আমাদের উপস্থিতি আজ মায়া ছাড়া কিছু না। আজো পৃথিবী বা প্রকৃতির গতিপথ, শক্তির অবিনাশী রুপান্তর কায়েম থাকত না। মূল ভর থেকে সরে এসে একটি আলপিনের ওজন ও আমরা বাড়তি যোগ করিনি। আর এটাই সত্য।

প্রতিটি ছকে তার নিজস্ব একটি সত্য আছে। একটি শুক্রাণু আর ডিম্বানুর সত্যের মতই একটু ফুলের পরাগরেণু ও প্রজাপতির পায়ে লেগে নিষেকের সত্যের মত। ফুল তার মধু, তার রূপ সবই লাগায় ওই চরম সত্যের পরম ফলাফলের দিকে। প্রতিটি কণা তার সত্যে পৌছায় মাত্র। মানুষ শুধু জানার মধ্যে দিয়ে যেতে পারে। শরীরের বাইরে সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে নয়। প্রকৃতির মধ্যে যা আছে তার রকমফের করে নতুন মজা করে মাত্র। আর এই মজার ইতিহাসে কিন্তু ওই বড় ছকের লোকগুলো অনেক অনেক এগিয়ে গেছে।
বড় ছকের কি দোষ?? সেতো ক্ষেত ভরা ধান আর পেট ভরা নদী জল দেখে ক্ষান্ত হয়নি। সে প্রকৃতির শক্তি গুলি নিয়ে সাহস দেখিয়েছে। কোন এক সাহেব, তার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই বজ্র বিদ্যুতে ঘুড়ি ঊড়িয়ে ছিটকে পড়ল ইলেক্ট্রিক শকে। কোন এক সাহেব আবার বিদ্যুতের তাপ শক্তিকে করে দিল আলো জ্বালিয়ে, কোন এক সাহেব বাতাসের ভেসে বেড়ানো শব্দ কে দিল শুনিয়ে, আবার কোন এক সাহেব জল ফুটিয়ে দিল লম্বা গাড়ি চালিয়ে,আবার কোথায় কারা বসে বসে বস্তুকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে তার শক্তিকে একত্র করে দিলো বর্গ মাইল ঝলসে,গুঁড়িয়ে। এরা কিছুতেই শান্ত হবে না। প্রকৃতির সাথে চ্যালেঞ্জ করে সত্য উন্মোচনে পাল্লা দিয়েছে। এরা বদ্ধ ঘরে না থেকে অচেনা উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়ে ফিরবে কি ফিরবে না, না জেনেই ঝড় কুয়াশা ভেদ করে দেশ দেশান্তর খুঁজে ফিরেছে। কোথায় কোন সম্পদ আছে জেনেছে। তাদের প্রয়োজনে চেয়েছে, বুঝিয়েছে, যাদের দখলে সেসব সম্পদ, ওই ছোট ছকের, মত্ততায় ব্যস্ত, ধর্ম আর ভোগে তুষ্ট লোকেরা দেয়নি, কাজেও লাগায়নি সম্পদ কে। তাদের কাছে ছিনিয়ে নিতে হয়েছে। আর এখান থেকেই যুদ্ধ বিগ্রহ বিতণ্ডা শান্তি সম্মেলনের খেলার ইতিহাস রচিত হয়েছে। কিন্তু এসবের মাঝে বাজার দখল আর ছকের ঊপর নীচ তৈরী হতে হতে গেছে। মজার কথা হল ছোট ছকের লোকেরা যারা বড় ছককে একদম মানতে পারেনি, তাদের ছকবাজির কায়দা কানুন সুযোগ সুবিধা কিচ্ছু গ্রহন করতে বাদ রাখেনি। শুধু তাদের কাছে চেয়েছে। বিনিময়ে বিপ্লব আর শ্লোগানের শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে। টাইটানিক ডোবার সময় ভায়োলিন না বাজিয়ে একটা ভাঙ্গা দরজা মানুষের জন্য পাটাতন হিসাবে এগিয়ে দেওয়াই প্রকৃত শিল্পীর কাজ এও বোঝাতে হয় ওই বড় ছকের লোকেদের।

নীচ তলার ছকের জীবন চর্যাও বড় সুন্দর। আডভেঞ্চার কম, রোমান্স বেশী, রোমান্স সর্বস্ব বলা চলে। রাজ রাজারা ভোগ বিলাসে আর প্রাকৃতিক সম্পদের দৈহিক ব্যাবহারেই অতিবাহিত করেছে। চাষী মজুরেরা খাদ্য বস্ত্র জুগিয়েছে। দু এক নিঁখুত কারিগরি ওই ঈশ্বরের প্রেরিত দূত দের সেবাতেই নিয়োজিত হয়েছে ।এরা বড় ছকের পাল্লায় পড়ে কখনো দেশপ্রেম কখনো বিপ্লবের বুলি আওড়ে শেষরক্ষার চেষ্টা করেছে। সে রক্ষা হয়নি। ছকের দুনিয়ায় যে যেমন করে এগিয়ে গেছে সে তেমন করে দুনিয়ার প্রতিটি রুপ রস গন্ধ বর্ণকে লাভ করেছে। আর যারা পারল না, তারা আক্ষেপ করেছে, মারামারি করেছে নিজেদের মধ্যে, নেশা করেছে, দমন করেছে দূর্বল কে, ধর্ষণ করেছে অসহায়কে। ক্রমে একটা নীচু তলার জন্ম দিয়েছে।একটা অস্বাস্থ্য, একটা অশিক্ষা, একটা ঘিনঘিনে নির্বাচন, একটা অসুস্থ গণতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। সেখানেও ভয়ে থেকেছে। শুধু পোশাক বদলেছে রাজারা আর সৈন্যরা, মন্ত্রী আর ক্যাডারের ছদ্মবেশে।আর নিজের ক্ষুন্নিবৃত্তির স্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে গেলে লে লে করে দখল নিয়েছে উঁচু ছকের ক্লাবঘরে।

গোটা বিশ্ব জুড়ে এই ছকবাজির লড়াই আদিম কালের থ্যাতলানো মৃত মানুষের ছবির কথাই মনে করায়। বার বার একজন মানুষ হিসাবে শ্রেনীর উপস্থিতি কে অস্বীকার না করতে পারলেও ভেতরে কেঁপে উঠি ঘটনা দেখে। মিডিয়ার যুগে সত্যের এই বিভৎস  রূপ দেখে বিকার জন্ম নেয় যে চন্দন দের-অটো তাদের নাটক। চন্দনের ধ্বজত্ব আসলে প্রতীক। গল্পের নায়কের সাথে একাত্ম হয়ে ওঠা দর্শক মনের চাহিদা। তার দুঃখ, তার কান্নাই দর্শকের ক্যাথারসিস ঘটায়। আর এই ফাঁকেই সাহিত্য বা থিয়েটারের স্রষ্টা মুন্সীয়ানা দিয়ে বুঝিয়ে দেন, হে শ্রোতা, হে পাঠক, হে দর্শক, তুমি কি অনুভব করতে পারছো এই ধ্বজত্ব? তোমার মালা তোমার প্রেম, ভালোলাগা, জীবনের প্রতীকগুলি একে একে চলে যাচ্ছে জীবন থেকে? সবটাই প্রতীক। কিছু সমালোচক বা দর্শক বা পাঠক আধা শিক্ষিত মস্তিষ্ক নিয়ে গল্প দেখতে বা পড়তে বসেন, এরা ঈশপ বা পঞ্চতন্ত্রটাও শেয়াল কুকুরের জীবনী ভেবেই পড়েছিলেন আজ বুঝছি। তারা ইরেক্টাইল ডিস্ফাংশানের গল্প ভেবে এটিকে পুরুষ হাহাকার ভেবে একবজ্ঞা মতামত তৈরী করেন। তাদের প্রতি এক লাইনের বেশী আক্ষেপ করাও শব্দ নষ্ট। মজার কথা হল, এরা পান্ডিত্য ফলাতে  এত উদগ্রীব থাকেন যে শিল্পীদের দিনের পর দিন ধরে অভ্যাস, নানান প্রশ্ন উত্তর পেরিয়ে নানান মুহুর্ত নির্মাণ, নানান সংলাপের সূক্ষতা, নানান অভিব্যক্তির অন্তর্বেদনা সবটাই কি এক অমোঘ শক্তিতে এক বার দর্শনে, এক ঝলকেই বুঝে যান।একটিও প্রশ্ন আসেনা, বার বার অন্ততপক্ষে কয়েকবার দেখে, নির্দেশকের কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করে নিজের দেখাটা ঝালিয়ে নিতে চাননা। হাস্যকর এই রিভিউকারদের বাড়াবাড়ি আমাকে বিরক্ত ও ক্লান্ত করে দেয়। তবুও ওই একটা মানুষের আশায় পালা বাঁধি, যে আসলে ইতিহাসের ডগায় ভুগোল দেখেছে,দর্শনের ভেতরে বিজ্ঞান দেখেছে,সাহিত্যের অন্তরে মহাকাল দেখেছে।

এই মহাকাল আমায় অটোর ডিজাইন করিয়েছে। কালের খেলা দেখাতে গিয়ে আমায় অটোকে টাইম মেশিন বানাতে হয়েছে। কালের খেলায় কখনো অতীত, কখনো অতীতের মধ্যে বর্তমান, কখনো বর্তমানের মধ্যে অতীত, কখনো অতীতের অতীত(বিড়ি পাকানোর দৃশ্যটি), আবার কখনো বর্তমান ও অতীত একসাথে পাশাপাশি (চন্দনের অনুপস্থিতে নন্দদার বন্দুক লুকানোর দৃশ্যটিতে চন্দনের উপস্থিতি), কখনো কাল পেরিয়ে পরকাল ইহকাল একসঙ্গে (চন্দনের ঘরে গণপ্রহারে মৃত ব্যক্তির আগমন), আবার কখনো সময়কে টেনে দীর্ঘ করে প্রতিটি মুহূর্তের যন্ত্রণা কে অনুভব করানো (টানা ৩ মিনিট গণধোলাই এর দৃশ্য)। এই কাল, মানুষ, ছক, ডারউইন, মার্কস, ধনিক, বণিক, নীচু, উঁচু, প্রেম, প্রতিশোধ সব কিছুকে নির্বিকার ভাবে অটোর আলোতে দেখে যাওয়া ছাড়া সিদ্ধান্ত দেবার কে আমি? আমি বড়জোর যার গল্প বলছি তার পক্ষ নিতে পারি সেই সময় টুকু।আমার গল্পে ভিকি বা চন্দন বা মালা কেউই মুখ্য নয়। একটাই চরিত্র অটো, ও বেচারা বলতে পারে না,তা ই ওর চালক কে দিয়ে কথা বলাই। সময়টাকে চালায় যে চালক… অটোবালা… চন্দন ও তার গল্প। পক্ষ নিতে পারি বড় জোর, সিদ্ধান্ত তো ঈশ্বরেও দেয় না।

আমার গল্পের ছকে চন্দনের যান অটো। বড়ো লরি বাস চটকে দিলে কিছু আস্ত থাকবে না চন্দনের মত অটোটারও। আমার নায়ক আসলে নায়ক নয়। নিচু তলার ছকের এক হেরে যাওয়া মানুষ, যার হেলদোল নেই কে কোথায় মরল, বাজারে কী ঝামেলা হল, সে বৌ নিয়েই সুখী। অথচ সেই বাজারের সিন্ডিকেট সমস্যায় এক অচেনা লুঠেরার গণপ্রহার দেখে সে যা থেকে এড়িয়ে সুখে বাঁচবে ভেবেছিল, তাও গেল। এরফান তাই তো বলে ” দোষ আমাদেরো আছে চন্দন ভাই…  নিজেকে একা বোধহয় ভালো রাখা যায় না, রাখাটাও অন্যায় ”

তবুও আমরা দোল খেলি, সিনেমা দেখি, শিল্প করি। চারিপাশের মরতে মরতে আসা মানুষ গুলো আমাদের থেকে অনেক দূরে যেন। কোন হাই নেই,হুই নেই। নিজেকে এসব থেকে বাঁচিয়ে রাখা যে বড় দুষ্কর তা বোম পড়তে পড়তে আসা ভূগোল বলে দেবে আমাদের বাংলা থেকে আর কত দূর সিরিয়া, কত দূর রোহিঙ্গারা। তবুও মাঝ রাতে যুদ্ধ বিমানের আওয়াজ না পাওয়া অবধি আমরা জাগব না। জেগেই বা কি করব। আমাদের থ্যাতলানো শরীরের ছবি দেখে প্রতিবেশী কেউ ‘ইস আস’ করবে।

আমার গল্পে ভিকি ভিলেন নয়। নন্দ দা,এরফান, মালা কেউ নয়। এমনকি ওই চায়ের দোকানে বসে পেছনে লাগা লোক গুলোও নয়। ছকের বাজারে আমরা একে অপরের সাথে লড়ছি। আর এই লড়াই এও আলাদা ছোট বড় ছকের বিন্যাস আছে। লড়াই ত আবহমানকাল ধরে চলেইছে। আমরা সামান্য সম্পদের ভাগ বাঁটোয়ারায় লড়ে মরছি। একজন নিচু তলার লোককে আর এক জন নিচু তলার লোক মারছে, এই কি নির্দেশকের বলতে চাওয়া? নাহ… এ এক পরিণতি। তাই ত আলো থাকাকালীন গুলি চলে না। অন্ধকার, এক দুই তিন, গুলির শব্দ। আলো। মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা কেউ একজন। ভিকি নয়। এ কে বা কেন আমি জানি। জানলেও বলিনি। পোশাকের রঙে গুলিয়ে ফেললে বড়ই কাঁচা দর্শক ধরে নেব তাকে।
যেদিন ভিকির গল্প বলব সেদিন অন্য রকম আর একটা গুলি চলবে।সেদিনের সংলাপ এরকম হবে শেষ দৃশ্যে…

ভিকি – কি বলবে বলো, সময় নেই।
চন্দন – মালার বাচ্চা হবে।
ভিকি – তো?
চন্দন – বাচ্চাটা আমার।
ভিকি – ধ্বজর বাচ্চা হয়?
চন্দন – (বন্দুক দেখায়) হয়।

এক মুহূর্ত নিরবতা। আলো জ্বলে আছে তখনো।
ভিকি – তোমার সাথে আমার পার্সোনাল দুশমনি নেই।
চন্দন – জানি তো। বাচ্চাটা দিয়ে যাস হয়ে গেলে। ওটা আমার।
ভিকি – বেশ। কিন্তু মালা কে নিও না। ও আমাকে হেব্বি ভালোবাসে। আমিও।
চন্দন – জানি,মালা তোর। আমি ফুটবল খেলতাম। অফসাইডে গোল চাইব না জোর করে।
ভিকি – চন্দনদা, সরি..।  মাইরি কী সব ছকবাজি বলোতো। আমরা নিজেরা লড়ছি। মাইরি শালা গরীবের ঘোড়া রোগ। শালা দুনিয়ার যা কিছু ভালো, সব পেলে কেউ নিজেরা লড়ে বলো?
চন্দন – সব শালা ছক।
ভিকি – কে করেছে ছক? নামটা বলো না গুরু… শালা দানাই ভরে দেব কপালে দুটো।
চন্দন অটোর হেডলাইটটা বন্ধ করে। অন্ধকার হয়। দূর থেকে কারা যেন ফিরছে উল্লাস করতে করতে… এদের ভরা পেট, ভরা পকেট… হয় এরা উপরের ছকের লোক বা বিক্রি হয়ে যাওয়া নীচু তলার দালাল। বা সব দেখে চুপ করে থাকা সেয়ানার দল। গুলি চলে অন্ধকারে।

আলো আসে। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে এদেরই কেউ। কাকে মেরেছে চন্দন সে’তো কার্টেন কলের পরে থানাতেও সে বলে না। বলে, কিন্তু শোনা যায় না হাততালির চক্করে।
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

কৌশিক কর অটো নাটকের পরিচালক। কিছুদিন আগেই মুক্তি পেয়েছিল তাঁর ফিল্ম পর্ণমোচিনির্দেশনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও মঞ্চে অভিনয়ও করেন নিয়মিত।

Leave A Reply