শুক্রবার, জুলাই ১৯

সংকল্প কাজ করেছে মৃত্যুর প্রতি

অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়

দশম শ্রেণীর কৃত্তিকা পালের মৃত্যু নিয়ে কথা এখনও থামেনি শহরে।  কিছু কথা তো কখনোই থামেও না।  ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ এই শব্দ যখন জুড়ে যায় নামের সাথে, তখন মৃতের পরিবার নিয়ে চলতে থাকে কাটাছেঁড়া।  এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। 
অথচ, কৃত্তিকা পাল ওর বয়সী অন্য ছেলে মেয়েদের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল।  ক্লাস টেনের ছেলে মেয়েদের নিয়ে মা বাবারা কখনও বলেন “ও একেবারেই পড়ছে না”,  “সারাক্ষণ মোবাইলে ব্যস্ত, বন্ধুদের সাথে আড্ডা এসব নিয়ে থাকে, সামনে পরীক্ষা কী যে করবে বুঝতে পারছি না”।  কৃত্তিকার মা বাবাকে কখনোই ছোট থেকে এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি।  এই যে সবদিক থেকে ভীষণ ভালো একটা মেয়ে, প্রতিবেশী থেকে আত্মীয়-স্বজন জানেন, এই জানাটাই হয় তো ওর জন্য কাল হল কোথাও।

ও তো কখনও ওকে নিয়ে কোনও অভিযোগ শোনেনি ছোট থেকে।  ওর ওই অভ্যাসই তৈরি হয়ে ওঠেনি।  কখনও কখনও অভিযোগ থাকলে অনেক সময়ে বাচ্চার প্রতি নজর দেওয়াটা সহজ হয়। তার অবাধ্যতা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাহলে প্রত্যাশার পাহাড় ঘাড়ে চেপে বসে না।  এটা ওর পরিবারের তৈরি করা চাপ, মা বাবার প্রচণ্ড চাহিদা তা কিন্তু বলছি না একবারও।  ও তো নিজেও ওর উপরে পাহাড় প্রমাণ প্রত্যাশা তৈরি করেছিল এমনটাও হতেই পারে।  যে সব বাচ্চারা দুষ্টু হয়, তাদের ভিতরে বাইরে আলাদা করে ঝড়টা বোঝার কষ্ট খুব কম সময়ে করতে হয়।  কিন্তু কৃত্তিকার মতো সব বিষয়ে অসম্ভব পারদর্শী মেয়েটি তার ভিতরে চলতে থাকা ঝড় তিনমাস ধরে বয়ে বেড়িয়েছে।  অন্তত এখন সংবাদ মাধ্যমে তাই উঠে আসছে।  আমি বলব, এই তিনমাসটা কিছু নয়।  ও অনেক আগে থেকে একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করত।  সেটা বুঝতে পারেননি অভিভাবকরা।  তাই আর পাঁচটা এই বয়সী ছেলেমেয়ের মতো ওর যে ‘স্বাভাবিক খোপ’ গুলো ছিল, সেগুলোতেই ওকে দেখেছিলেন মা বাবা।  সেখানে ও স্কুল থেকে ফিরত ঘড়ি ধরে, বড়দের ক্লাসের অঙ্ক সহজে করে ফেলত, বিরিয়ানি খেতে চাইত ইত্যাদি।  কিন্তু এগুলো তো সবই ওর ভালো ভালো জায়গা।  কোনও অভিযোগ তো নেই।  তাহলে কৃত্তিকার সমস্যা কোথায় হল?

এই যে ওর সব ভালো, এতে ওর ভিতরে ভিতরে আরেকটা জগৎ তৈরি হয়েছিল কোথাও একটা।  বলা যায়, ও মৃত্যুর সাথে দীর্ঘদিন ধরে একটা সহাবস্থান করেছিল।  অমোঘ আকর্ষণ বোধ করত ওই মৃত্যুর প্রতি।  যা কিন্তু ওর বাকি স্বাভাবিক খোপগুলো দেখে স্বাভাবিকভাবে বোঝা হয় তো সত্যিই যেত না।

এখানেই আমি খুব সহমর্মিতার সাথেই ওর মা বাবার যে জায়গাটা, সেখানে একটাই কথা বলব—ওনারা দোষী কখনওই নন, তবে দায়িত্বশীল হতে হত আরও অনেকটা।  কারণ তাঁদের মেয়েটা আর পাঁচজনের মতো করে খেলত না, সোশ্যাল সাইটে সময় অপচয় করত না, তার কোনও আলাদা সম্পর্কও ছিল না, হতে পারে সে যেই বইগুলো মুখে নিয়ে সারাদিন থাকত, সেগুলো তার বয়সী আর কেউ পড়ে বুঝত না, বা যে সিনেমাগুলো দেখত, সেগুলো অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝত না।  এই জায়গা থেকেই তার মা বা বাবা যদি বুঝতে চেষ্টাটা করতেন, কী পড়ছে সে, কী ভাবছে সে, তাহলে হতেই পারে এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটাই ঘটত না।  আমরা অনেক সময়েই বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করি সারাদিনে স্কুলে কী হল, সে কী কী করল—কিন্তু সহজ করে কখনও জানতে চাই কি কেমন আছে সে? এটুকু আমরা করতে পারি কি? এই যে তিনমাসের কথা হচ্ছে, তাতে ও যে বলছে ও তিনমাস ঘুমোয়নি, তাতে ওর চোখের নীচে কালি থাকার কথা, শরীর খারাপ করার কথা ইত্যাদি খুব টুকরো টুকরো বিষয়ে একটু সজাগ হতে পারতেন অভিভাবকরা। মা বাবার সাথে ওর সংলাপ তৈরি হয়নি, সেই দূরত্বটা খুব স্পর্শকাতর।

অনেকেই বলছেন, ও তাইকোণ্ড শিখত।  খুব দৃঢ়চেতা ছিল নিশ্চয় তাও কী করে এটা করল! আমি একটাই কথা বলব, ও তো দৃঢ়চেতাই ছিল।  তাই তো এভাবে নিজের মৃত্যুযন্ত্রণাকে কাছে ডেকে নিল।  এই যে তিনপাতার চিঠির কথা উঠে আসছে, মানে সে তো বহুদিন ধরে এই মৃত্যুর প্ল্যান করছিল।  ওর মৃত্যুর প্রতি দৃঢ় চেতনা কাজ করেছে।  আমরা সাইকোলজির ভাষায় বলি জীবনীশক্তি যেমন একটা শব্দ, তেমনি মারণীশক্তিও।  এক্ষেত্রে পরেরটা কাজ করেছে ওর ক্ষেত্রে।  ওর সংকল্প কাজ করেছে মৃত্যুর প্রতি।  আরেকটা কথাও বলতে চাইব, অনেকেই মনে করেন কেউ তাইকোণ্ড বা এজাতীয় অ্যাক্টিভিটির সাথে যুক্ত মানেই তার কখনও অবসাদ কাজ করতে পারে না।  ভুল ধারণা।  মনের সমস্যাটা মনেরই।  ওটা অন্যকিছু দিয়ে সাময়িকভাবে দূরে রাখা যায়, পুরোটা পারা যায় না।

হতেই পারে ওর কাছে ওর মা বাবা কোনও প্রত্যাশা করেননি ওর সাফল্য নিয়ে।  কিন্তু সে নিজের কাছে চেয়েছে সাফল্যের চরম শিখরে নিয়ে যেতে।  এখানে সাফল্য মানে কী, তার সংজ্ঞাটা ঠিক কী, এটার জন্য মা বাবাকে আরও অনেকটা দায়িত্ব নিতেই হবে।  এক্ষেত্রেও হতে পারে ওর কাছে সাফল্য মানে শুধু ওর ভবিষ্যতের চাকরি, লেখাপড়া এগুলোই ছিল।  এতদিন সে স্কুলের গণ্ডিতে ছিল, তাই একরকম ছিল।  হতেই পারে এবার ও যে স্কুলের বাইরে পা রাখতে যাচ্ছিল, তাতে ওর একটা ভয় কাজ করছিল, ও পারবে তো সাফল্য পেতে।  এই ভয় কোথাও ওকে হয় তো খুব কুরেকুরে খাচ্ছিল, হতেই পারে।

আমরা তো অনেকগুলো ভূমিকা নিয়ে একটা মানুষ তৈরি হই।  ছাত্র বা ছাত্রী হিসেবে কেমন, মেয়ে হিসেবে কেমন, কারও বন্ধু হিসেবে কেমন, নাতনি হিসেবে কেমন এই সবকটা সত্তাই তো তার মাথায় সমানভাবে থাকতে হত।  হতে পারে সেটা ছিল না।  হতে পারে ও শুধুই ওর ভবিষ্যতে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চাওয়াটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছিল।  এখানে মা বাবা হয় তো প্রত্যাশার চাপ দেননি, কিন্তু তার সাথে তাকে বুঝিয়ে উঠতেও পারেননি, সবচেয়ে বেশি সফল না হলেও চলে, মাঝামাঝি হলে জীবন বৃথা একেবারেই নয়। আমরা বোধহয় বাচ্চাদের হতাশা সহ্য করার শক্তিটুকুই আজকাল জোগাতে পারছি না।

ওর চিঠির যে প্রসঙ্গ আসছে, তাতে ও এমন কিছু লিখেছে বলে শোনা যাচ্ছে, তাতে প্রশ্ন করছেন কেউ কেউ, ও কি ডুয়াল পার্সোনালিটির শিকার ছিল? আমি বলব একেবারেই না।  ও এখন আর নেই, তাই কথা বলা সম্ভব নয়।  তাই জানাও সম্ভব না ওর কোনও ডিসঅর্ডার ছিল কি না! তবে নিশ্চিত ওর ভিতরে একটা ভ্রান্তির জগৎ তৈরি হয়েছিল।  তাই ওর মনে হত ওকে অনেকে বিরক্ত করছে বা কষ্ট দিচ্ছে।  এই জায়গাটাও ও কখনও ওর মা বাবাকে বুঝতে দিতে চায়নি।  তাই বলাই যায়, ও হয় তো আগেও চেষ্টা করেছে আত্মহত্যার , কিন্তু সেটা নিয়ে মা বাবার সাথে সরাসরি কোনও সংলাপ হয়নি।  বড়রা অনেক সময়ে কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে নির্দেশ দিয়ে দেন।  সেটা কিন্তু সংলাপ হয় না।  ছোটদের বুঝতে হলে তাদের সাথে সংলাপ গড়ে তুলতে হবে তো।  সেখানে বিচারকের ভূমিকা নয়, এমনি আড্ডা দেওয়া যেতে পারে।  এই আড্ডাটা দিলেই ওর মা বুঝতে পারতেন, ও কেন আগেও মেট্রো স্টেশনে হলুদ দাগ পেরিয়ে মৃত্যু কেমন দেখতে চাইত।  অনেকটা সচেতন হতে পারতেন তাহলে সেদিন থেকেই।

ও যেভাবে মৃত্যুকে কার্যত বরণ করে নিয়েছে মুখে প্লাস্টিক বেধে, সেটা কোথাও যেন কিছু দমবন্ধ মানুষের একটা প্রতীক মনে হয়েছে।  তাই ও যে কতটা অস্থির ছিল, ভিতরে ভিতরে সেটা আমরা কেউই বুঝে উঠতে পারিনি, তার দামই দিতে হল হয় তো।

মতামত মনোবিদের নিজস্ব

Comments are closed.