শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

খুন্তির জোরে তাঁরা জয় করেছিলেন শহর, ইতিহাস মলিন হলেও স্মৃতিটুকু হাঁটে রাস্তায়

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

শহর কলকাতার গলিখুঁজিতে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের সংখ্যা যে নেহাত কম নয়, তা জানা আছে অনেকেরই। তবে আবছা হয়ে আসা ইতিহাসের পাতার উপর একটু হাত বোলালেই মলিন ধুলো সরে গিয়ে যে গল্পেরা উঁকি দেয়, তা অনেকেরই অজানা। কিন্তু শহরের আনাচকানাচে একটু কান পাতলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে সেই গল্পের ইতিহাস, ইতিহাসের গল্প। গলি থেকে রাজপথের সেই ইতিহাসযাত্রায় ভেসে আসে অবাক করা তথ্যেরাও।

কলকাতা চিরকালই নানা জাতি, নানা সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্যময় একটা শহর। এই বৈচিত্র্যের প্রভাব খুব স্বাভাবিক ভাবেই পড়েছে খাবার-দাবারেও। আজ নয়, বহু বছর আগে থেকেই। কোনও খাবার এসেছে পর্তুগিজদের রান্নাঘর থেকে, আবার কোনওটা মুঘল রাঁধুনির খুন্তি থেক সোজা পড়েছে বাঙালি পাতে। কোনও রান্নায় আবার ব্রিটিশ পদ মিশে গেছে দিব্য।

আর এই রান্না যখন মিশেছে তখন আবশ্যিক ভাবেই কলকাতার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশেছেন রাঁধুনিরাও। কিন্তু সাধারণ ভাবে, ভাল রান্না যত মানুষ মনে রাখেন, ভাল রাঁধুনিদের আর ক’জন মনে রাখেন! বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামনেই আসে না তাঁদের নাম। আগে আরওই আসত না। এখন তা-ও নানাবিধ মাধ্যমের কল্যাণে শেফেদের কদর বেড়েছে, বেড়েছে পরিচিতিও। কিন্তু আগে এমনটা ছিল না। অথচ বহু প্রসিদ্ধ রাঁধুনিই রীতিমতো বংশ পরম্পরায় রসনা তৃপ্তি ঘটিয়ে এসেছেন শহরবাসীর।

তাই বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা রাঁধুনিরাও যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা শহরেরই একাত্ম হয়ে গেছেন তাঁদের সৃষ্টির মতোই, সে খবর অনেকেই রাখেননি। কিন্তু পরম্পরা ঠিকই জায়গা করে নেয়। তাই আজও কলকাতা শহরে ওড়িশা থেকে আসা রাঁধুনিদের বিশেষ চাহিদা রয়েছে। আগে যেমন বাঙালি বাড়িতে নিযুক্ত রাঁধুনি মানেই ধরে নেওয়া হতো তিনি ‘উড়ে বামুন’, তেমনি আজও বড় কোনও অনুষ্ঠানের রাঁধুনি ঠাকুরের পরিচয় জানতে গেলে প্রায়ই বেরিয়ে আসে ওড়িশার সূত্র।

কিন্তু কলকাতার খাদ্যরসিক মহল যে একেবারেই সমস্ত রাঁধুনিকে ভুলে গেছেন তা কিন্তু নয়। বরং, তাঁদের নাম মনে রাখার জন্য, রাঁধুনিদের নামেই নামকরণ হয়েছে কলকাতার বিভিন্ন রাস্তার! সাধারণত কোনও বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের নামেই রাস্তার নামকরণ হলেও, রাঁধুনির নামে রাস্তার নাম বোধ হয় কেবল শহর কলকাতাতেই সম্ভব। গুণের কদর করা বুঝি একেই বলে!

এমন কোনও রাস্তার কথা আপনার জানা নেই? তা হলে দেখুন তো, এই নামগুলোর মধ্যে কোনওটা চিনতে পারেন কি না! ছক্কু খানসামা লেন, চামারু খানসামা লেন, পাঁচু খানসামা লেন, করিম বক্স খানসামা লেন, নিমু খানসামা লেন, মিসরি খানসামা লেন, পিরু খানসামা লেন বা গদাই খানসামা লেন।

ষাটের দশকে যাঁরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাড়িতে গিয়ে রান্না করতেন, তাঁদেরকে ঠাকুর বা খানসামা বলা হতো। কেউ আবার বাবুর্চিও বলতেন। ঠাকুর বা বাবুর্চি রয়ে গেলেও, খানসামা ডাকটা প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছে সময়ের সঙ্গে। কিন্তু সময় যেন স্থির হয়ে আছে এই নামের রাস্তাগুলিতে। আর এই প্রতিটি রাস্তার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে তার নামের ইতিহাস।

যেমন আমহার্স্ট স্ট্রিট এলাকায় একটি গলির নাম ছক্কু খানসামা লেন। শোনা যায়, কলকাতার সে সময়ের এক বিখ্যাত রাঁধুনি ছক্কু, এই গলিতেই তাঁর ডেরা বেঁধেছিলেন। তাঁর হাতের রান্নায় মুগ্ধ হয়ে রাস্তার নামই বদলে দিয়েছিলেন বাবুরা। সময় চলে গিয়েছে, চলে গিয়েছেন মানুষটাও। নাম রয়ে গিয়েছে। এই গলিরই ১৯/৩ নম্বর বাড়ির সামনে বসানো একটি শ্বেত পাথরের ফলকে লেখা রয়েছে, ওই বাড়িতে ১৯০৭ সালে কিছু দিন বাস করেছিলেন ঋষি অরবিন্দ।

ঠিক তেমনই পার্কসার্কাস এবং বালিগঞ্জের সংযোগস্থলে চামরু খানসামা লেন। জানা যায়, চামরু রাঁধুনি এই রাস্তার একটি বাড়িতে বসবাস করতেন। বড় বড় অনুষ্ঠানে মোগলাই খাবার রান্না করতে হলে ডাক পড়ত এই চামরু খানসামার। তাঁর নামেই ওই রাস্তার নাম হয়েছে চামরু খানসামা লেন।

বিহারি রাঁধুনিদেরও কদরও কম ছিল না পুরনো কলকাতায়। সে রকমই এক জন রাঁধুনি ছিলেন মিসরি খানসামা। তাঁর নামেও একটি রাস্তা করা হয়েছিল। রাস্তা ছিল গদাই খানসামার নামেও। তবে বর্তমানে এই রাস্তাগুলো খুঁজতে গেলে, কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে বেগ পেতে হবে। কারণ বেশ কয়েকটি রাস্তার নাম পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেমন আমহার্স্ট স্ট্রিটের কাছে পাঁচু খানসামা লেন হয়ে গেছে ডাক্তার ডি মুখার্জী রো।

দক্ষিণ কলকাতার মুদিয়ালি এলাকার আগের নামই ছিল খানসামা পাড়া। কারণ ওই এলাকায় ভিন্ রাজ্য থেকে আসা বিভিন্ন রাঁধুনিদের একাধিক ডেরা ছিল বলে জানা যায়। তবে নতুন সময়, নতুন চর্চা সব সময়েই দখল করে নেয় পুরন ইতিহাসের অধ্যায়গুলো। পাতা উল্টে যায় নিঃশব্দে। তাই নানা কারণে বদলে যায় পাড়ার নাম, গলির নাম, এমনকী বাড়ির নামও।

এশিয়াটিক সোসাইটির প্রাক্তন পাবলিকেশন অফিসার নির্বেদ রায় বলেন, সেই সময় এই খানসামাদের এলাকায় এতটাই প্রভাব ছিল যে তাঁদের নামেই লোকজন সেই রাস্তাটিকে চিনতেন৷ এখন অনেক রাস্তারই নতুন নামকরণ হচ্ছে তাতে মহানগরের ইতিহাসে কিছুটা আঁচড় পড়ছে৷

সেই আঁচড়েই অনেক রাস্তার নাম বদল হয়েছে। আর সেই সঙ্গেই স্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গেছে খানসামাদের নানা জানা-অজানা গল্প। কথায় বলে, একটি শহরের ইতিহাস ছড়িয়ে থাকে পথের বিভিন্ন বাঁকে। ঠিক তেমনই, কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গেও অবিচ্ছেদ্য ভাবে জুড়ে রয়েছে এই পথগুলো। যারা কলকাতার বিখ্যাত রাঁধুনি বা খানসামাদের মনে রেখেছে এত বছর পরেও।

Shares

Comments are closed.