বৃহস্পতিবার, জুন ২০

আকাশের আজ লাল চাঁদ, তৈরি কলকাতা কলকাতা অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টারও

শতাব্দীর সব থেকে বড় পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। আকাশের চাঁদ হয়ে যাবে লাল। সেই মহাজাগতিক ঘটনা নিয়ে তাঁদের প্রস্তুতির কথা শোনালেন কলকাতা অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টারের অনুপম নস্কর।

অনুপম নস্কর

জ্যোতির্বিদ্যা ঘটনাগুলো এমনই যে মুহূর্তে সাধারণ মানুষকে আকর্ষণের করে ফেলে। আকাশের বিজ্ঞান শুধু কতগুলো বিস্ময়কর আবিষ্কার আর দুঃসাহসী তথ্যের সমষ্টি নয়। তার মূল ব্যাপারগুলো সবই সাধারণ ঘটনা, যা প্রতিদিনই ঘটে। আর প্রতিনিয়ত আমাদের আশেপাশে যা ঘটে তার প্রতি মানুষ যে আকৃষ্ট হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বিজ্ঞানের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন বিজ্ঞান হল জ্যোতির্বিজ্ঞান। সভ্যতার অগ্রগতির প্রথম লগ্ন থেকেই মানুষের নিত্যপ্রয়োজনে “তারা”-রা আমাদের সঙ্গী। গুহাবাসী মানুষের রাতের বেলায় সময় নির্ধারণ থেকে, পাল তোলা জাহাজের দিক নির্ধারণ, সঠিক সময়ে শস্যবপণ, সূর্যের গতিবিধির সঙ্গে নিজেদের দৈনন্দিন কাজের তাল মেলানো… সবকিছুতেই জ্যোতির্বিজ্ঞান অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। হাজারো গল্প বানিয়েছে মানুষ এই “তারা’-দের নিয়ে। প্রাচীন ভারতীয় পুরাণ আর গ্রীস দেশের পুরাণে তার প্রমাণ অগুন্তি। গল্পের সাথে সাথেই হাত ধরাধরি করে চলে এসেছে কুসংস্কার আজেবাজে রীতি নীতি। সূর্যগ্রহণ আর চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে সেই কুসংস্কার একসময়ে অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছিলো মানুষের যুক্তিবাদ, বোধ বুদ্ধি কে। গ্যালিলিও’র মতো মানুষকে প্রাণ হারাতে পর্যন্ত হয়েছে সেই অন্ধকার যুগে। যদিও সেই তথাকথিত রাহু আর কেতু ঢেকে রাখতে পারেনি সূর্যের উজ্জ্বলতাকে, চাঁদের জ্যোৎস্নার সৌন্দর্যকে।

বর্তমানে জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। পেশাদারী সংস্থা তো আছেই, কিন্তু তার সাথে হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে এসেছে কিছু বিজ্ঞান সংগঠন, শখের জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার সংস্থা। যেমন আমাদের সংস্থা “কলকাতা অ্যাস্ট্রোনমি সেন্টার”। গত ২০ বছর ধরে বাঙালির হেঁশেলে আকাশ চর্চা ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য কখনও বইমেলায় টেলিস্কোপ নিয়ে জনগণকে বৃহস্পতি, শনি দেখানো, কখনও বিভিন্ন স্কুলে এই সংক্রান্ত তথ্যচিত্র দেখানো, আবার মহাজাগতিক দৃশ্যের সাক্ষী হওয়ার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দৌড়ে বেড়ানো। মনের জানালা-কে সবসময় খুলে রেখে মানুষের মধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞান’কে ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। সূর্যগ্রহণ আর চন্দ্রগ্রহণ বিশ্ব জগতের বিস্ময় উদ্রেককারী দুটি ঘটনা মাত্র, কোন অভিশাপ নয়, এই সহজ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারলেই আমাদের জয়।

২৭’শে জুলাই, রাতে সেই অবিস্মরণীয় মহাজাগতিক ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম একটি ঘটনা আবার ঘটতে চলেছে। এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চন্দ্রগ্রহণ দেখতে পাবো আমরা এবং অবশ্যই পূর্ণগ্রাস। চাঁদ পৃথিবীর উপচ্ছায়া হয়ে প্রচ্ছায়াতে পৌঁছলেই আমাদের অতি প্রিয় চাঁদ তার স্বাভাবিক রং পরিত্যাগ করে পুরো লাল হয়ে যাবে (অনেকটা চেরী লাল), বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্লাড মুন’। এই লাল রং থাকবে পুরো ১ ঘণ্টা, যতক্ষণ পূর্ণগ্রাস চলবে। আবার প্রচ্ছায়া থেকে যেই ১ ঘণ্টা বাদে টুক করে উনি উপচ্ছায়াতে ঢুকবেন লাল রং ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাবে। অনেকের কিন্তু ধারণা পূর্ণগ্রাসের সময়ে চাঁদকে বোধহয় দেখাই যাবেনা। সূর্যগ্রহণের মতো সে পুরো কালো হয়ে যাবে। তা কিন্তু নয়। কিন্তু এর কারণ কি?

ধরুন আপনি চন্দ্রগ্রহণের মুহূর্তে চাঁদে দাঁড়িয়ে আছেন। মহাকাশযানে করে চলে গেছেন আর কী। সেখান থেকে চাঁদের আকাশে পৃথিবী অতি বিশালাকার দেখায় এবং সেই তুলনায় সূর্যকে ছোট দেখায়। পৃথিবী কতটা বিশালাকার দেখাবে সেটাও বুঝে নিন। পৃথিবী থেকে চাঁদকে একটি গোলাকার বল দেখায়, তার ব্যাস ধরুন “১”, তাহলে চাঁদে বসে পৃথিবীর ব্যাস মনে হবে “৪”, অর্থাৎ চারগুণ বড় একটা বল, যদি পরিধি মাপেন তাহলে “১৪’ গুণ বড় পরিধি মনে হবে।

স্বভাবতই সূর্য তুলনায় ছোট দেখাবে। পৃথিবী থেকে যেমন মাপ দেখায় প্রায় তেমনই দেখাবে চাঁদ থেকে। যেই মুহূর্তে সূর্য–পৃথিবী-চাঁদ একই সরলরেখায় আসবে মনে হবে বিশালাকার পৃথিবী তুলনায় ছোট সূর্যকে ঢেকে দিল। কিন্তু সূর্য অত্যন্ত উজ্জ্বল, তাই পৃথিবীর পরিধি বরাবর লালচে আলো দেখা যাবে, যেহেতু লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশী। অর্থাৎ লালচে বর্ডার দেওয়া একটি কালো চাকতি মনে হবে পৃথিবীকে। এই লালচে আলোটাই পৃথিবীর গা থেকে ঠিকরে পূর্ণগ্রাস চাঁদের উপরে পড়ে। ফলে আমরা সেই সময়ে চাঁদকে লালচে দেখি।

২৭’শে জুলাই রাত রাত ১১’টা থেকে ২৮’শে জুলাই ভোর ৪’টে অবধি এই রঙের খেলা দেখতে আমরা কলকাতার উত্তরপূর্ব কোণে ‘ঐকতান হাউজিং কমপ্লেক্সে’র মাথায় জড়ো হবো অনেক কচি-কাঁচা’দের নিয়ে। সঙ্গে বড়ো’রাও থাকবে। আর থাকবে টেলিস্কোপ। যদিও এই ঘটনা খালি চোখেই দেখা যাবে। তবে চাঁদের বুড়িকে ভালো করে দেখতে হলে টেলিস্কোপ চাই-ই চাই। আর সাথে আছে মঙ্গল, সে এখন পৃথিবীর অনেক কাছে এসেছে, দেখা যাক টেলিস্কোপ দিয়ে কোন এলিয়েন (মাঙ্গলিক প্রাণী) ধরা যায় কিনা…

Leave A Reply