অনলাইন শিক্ষার হুজুগ নিয়ে কিছু কথা

কম্পিউটার-ল্যাপটপ ছাড়া অনলাইন শিক্ষণ বেশিক্ষণ চলতে পারে না, এই যন্ত্রটি স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছনো যেতে পারে, তার জন্য একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ লাগবে, আমাদের রাষ্ট্রের শিক্ষার প্রতি সে দায়বদ্ধতা নেই।

অশোক সরকার

গত ছয় মাসে অনলাইনে শিক্ষা নিয়ে বহু কথা শুনতে পেলাম। দেখতে পেলাম, বাড়ির গরু বেচে সন্তানের পড়ার জন্য মোবাইল কেনার ঘটনা, বাড়ির একমাত্র মোবাইল বাবা ক্লাসের জন্য ব্যবহার করতে দেয়নি বলে ক্লাস নাইনের ছাত্রীর বিষ খাওয়ার ঘটনা, গাছের ডালে সিগন্যাল পাওয়া যায়, তাই সেখানে বসে অনলাইন ক্লাস করতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে হাত ভাঙার ঘটনা, আরও অনেক কিছু। অনলাইনে পড়াশোনার খরচা না চালাতে পেরে পড়াশোনার ছেড়ে দেবার গল্পও রোজ শুনতে পাচ্ছি। ডিজিটাল বিভাজন এমনিতেই ছিল, শিক্ষার জগতেও সেই বিভাজন বড় আকারে ফেরত এল, এই অভিযোগও কম শুনিনি।
মানুষ যখন এত কিছু জেনেই গেছে তখন তাই নিয়ে কেন লিখতে বসলাম তার সাফাইটা প্রথমে দিয়ে রাখি। সাফাইটা এই যে আমি যা বলতে যাচ্ছি তার সবটাই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক’টি কোর্সে এক সেমেস্টার ব্যাপী অনলাইন ক্লাস চালানো এবং সেই সূত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যতগুলি সার্ভে করা হয়েছে তার ভিত্তিতে কথা বলা। তার সঙ্গে অনলাইনে পড়ানোর নিজের অভিজ্ঞতাও জুড়ে দেব।
প্রথমেই সাফ করা দরকার যে অনলাইনে শিক্ষকতা ও শিক্ষণের আসলে তিনটি দিক আছে, এক শিক্ষণের বা pedagogy-র দিক, দুই হল টেকনোলজির দিক, আর তিন হল সামাজিক দিক। এই তিনটি দিককে আলাদা করে না বুঝলে অনলাইনে শিক্ষার সবটা বোঝা যাবে না।
আমরা মাস্টারমশাইরা ধরে নিই যে বছর বছর ধরে ক্লাসরুমে আমরা যেভাবে পড়িয়ে এসেছি, অনলাইন ক্লাসের জন্য আমরা সেভাবেই পড়াব। এটা একটা বড় ভুল। অনলাইন ক্লাস নিয়ে সারা দুনিয়া জুড়ে যত গবেষণা হয়েছে (আমাদের দেশে কিছুই হয়নি, সেকথা আলাদা), তার সার কথা হল, অনলাইন ক্লাসের জন্য শিক্ষণ-পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন আনতে হবে; pedagogy-র মূল নিয়মগুলি বদলে যায় অনলাইন ক্লাসে। Pedagogy-র কিছু দৃশ্যমান দিক দিক আছে কিছু অদৃশ্য দিক আছে। দৃশ্যমান দিকগুলি যেমন ব্ল্যাকবোর্ড, পাওয়ার পয়েন্ট, হাত তুলে প্রশ্ন করা, কাউকে নাম ধরে ডেকে প্রশ্ন করা, ছবি দেখানো, ক্লাসে অল্প সময়ের জন্য কোনও কাজ করানো, ছবিতে ছড়ি দিয়ে দিয়ে বিশেষ কিছু বোঝানো, হঠাৎ কুইজ করা ইত্যাদি-র প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়। সাহিত্য, দর্শন, নৃত্য, গান শেখানোর নিজস্ব কিছু ধারা আছে, ছন্দ আছে সেগুলি অনলাইনে সুষ্ঠুভাবে করতে গেলে আরও ভাবনার প্রয়োজন।

অদৃশ্য দিকগুলি নিয়েও অনেক গবেষণা হয়েছে, এবং তার দৌলতে বেশকিছু শিক্ষা সামনে এসেছে। দেখা যাচ্ছে ক্লাসরুমে ছাত্রদের মনোযোগের তুলনায়, অনলাইন ক্লাসে মনোযোগ কম থাকে। ক্লাসরুমে একটা নিয়ম বা তত্ত্ব বা ধারণা বোঝাতে যত সময় লাগে, অনলাইনে তার চেয়ে বেশি সময় লাগে, ক্লাসে যে সব ছাত্র সাধারণত চুপচাপ থাকে তারা অনলাইন ক্লাসে আরও চুপ মেরে যায়। অনেক ছাত্রী ক্লাসে ও ক্লাসের বাইরে ক্লাস-বন্ধুদের থেকে অনেক কিছু সহজে বুঝে যায়, অনলাইন ক্লাসে তা হবার সুযোগ থাকে না। দুর্ভাগ্যবশত গত ছয় মাসে এত যে আলোচনা শুনছি তার মধ্যে শিক্ষককুলকে কি পাল্টাতে হবে তা নিয়ে একেবারেই কোনও কথা হতে দেখছি না। কেন? আমরা আসলে ধরেই নিয়েছি, যে শিক্ষককুলের কিছু পাল্টানোর দরকার নেই, সবটাই শুধু সিগন্যাল, ফোন আর ল্যাপটপ–এর সমস্যা।
আমরা যখন দেখলাম অন্যলাইনেই ক্লাস নিতে হবে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ভাবতে শুরু করেছিলাম, আমাদের কী প্রস্তুতি লাগবে। নানা রকম পরামর্শ-প্রস্তাব উঠে আসে। তার কয়েকটা উল্লেখ করছি। প্রতিটা ক্লাসের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়, সিলেবাসের ২০-২৫ শতাংশ অংশ ছেঁটে ফেলা হয়, প্রতিটি শিক্ষক দায়িত্ব নেন, যে তিনি অনলাইন ক্লাস করতে ছাত্রদের কী কী অসুবিধা হচ্ছে, তা ছাত্রদের প্রতি সপ্তাহে ফোন করে জানবেন, শনিবার দিন বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা হয়। অনলাইন মাধ্যমগুলিতে ক্লাস-হাজিরা রেকর্ড করার ব্যবস্থা, অনলাইন মাধ্যমেই ক্লাসকে ছোট গ্রুপে ভেঙে কাজ করানোর ব্যবস্থা, অনলাইন মাধ্যমে যাতে ব্ল্যাকবোর্ড তৈরি করে লেখা যায় তার ব্যবস্থা, এবং সিগন্যাল দুর্বল হলেও কীভাবে তারই মধ্যে সব ছাত্রছাত্রীকে দেখা যায় তার ব্যবস্থা করা হয়। আরও কিছু ব্যবস্থা করা যেত, কিন্তু লকডাউনের জন্য করা যায়নি। প্রতিটি শিক্ষক অনলাইনে ক্লাস কী করে জীবন্ত রাখা যায় তার কিছু কিছু প্রশিক্ষণ নেন।
এক সেমেস্টার ধরে ক্লাস নিতে গিয়েও অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রতিটি শিক্ষকের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করা হয়েছে। তাই নিয়ে শিক্ষকদের জন্য সাজেশন বই তৈরি করা হচ্ছে। পরের সেমেস্টারে তা কাজে লাগবে।
যে কোনও নতুন পরিস্থিতিকে সাময়িকভাবে মেনে নিয়েও যদি শিক্ষার কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে শিক্ষককুলের বড় দায়িত্ব আছে, আমরা তাকে এড়িয়ে যেতে পারি না।
এবার আসি টেকনোলজির কথায়। ছয় মাসে অনেক কথা শুনলাম মোবাইল, সিগন্যাল আর ল্যাপটপ নিয়ে। তাহলে নতুন কথা কী বলব? একটা-দুটো কথা বলতে চাই। টু-জি কেলেঙ্কারির কথা মনে আছে? কী অভিযোগ ছিল? সরকারের মন্ত্রী টাকা খেয়ে, লাইসেন্স ফি, সার্ভিস ফি ইত্যাদি থেকে সরকারের সম্ভাব্য ১ লক্ষ ৫৬ হাজার কোটি টাকা রোজগার থেকে সরকারকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণ হয়নি, সেটা অন্য কথা, কিন্তু এটা তো পরিষ্কার যে সরকার যদিবা বঞ্চিত হয়েও থাকে, কিন্তু সেই সুবাদে সারাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা মোবাইল সার্ভিস মানুষ পেয়েছেন। তুলনায় থ্রি-জি’র বেলায় সরকারের রোজগার বাঁচাতে গিয়ে ৭০ ভাগ ঘরে থ্রি-জি আর পৌঁছয়নি। অনলাইন শিক্ষা চালু করতে গেলে থ্রি-জি লাগে, ফোর-জি, ফাইভ-জি’র কথা ছেড়েই দিন। আর একটা কথা। সিগন্যাল কোম্পানিগুলোর মধ্যে অসাধু প্রতিযোগিতার ফলে, এবং একটা বিশেষ কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে, বেশিরভাগ সিগন্যাল কোম্পানি গত কয়েক বছরে মুখ থুবড়ে পড়েছে, যার ফল হল, মোবাইল পরিষেবা যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে, সেই টাওয়ারের সংখ্যা গত কয়েক বছরে বাড়েনি, অন্য দিকে গ্রাহক বেড়েছে। ফলে সিগন্যাল আরও দুর্বল হয়েছে। এসব আমাদেরই ভুল নীতির পরিণাম। এগুলো ঠিক করা কিছু এমন কঠিন ব্যাপার নয়।
সিগন্যালের অন্য একটা সম্ভাবনাও ছিল, তার অবস্থা আরও করুণ। সারাদেশে স্কুল-কলেজ, গ্রামপঞ্চায়েত, ব্যাঙ্ক, দোকান ইত্যাদি পরিকাঠামোয় অপটিক্যাল ফাইবার এবং wi-fi বসে যাবার কথা ছিল। ভারত-নেট নামক এই পরিষেবা নাকি ৬০ শতাংশ গ্রামে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করা হয়। সরকারি কোম্পানি বিএসএনএল বহু জায়গায় এরকম কেবল এবং wi-fi বাক্স বসিয়ে দিয়েছে। এই কেবল আর বাক্সগুলি গ্রামাঞ্চলে সৌন্দর্যবৃদ্ধির কাজে লেগেছে কিনা জানি না, তবে গ্রামপঞ্চায়েতের কাজে লাগেনি, ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার কাজে তো নয়ই। ইতিমধ্যে বিএসএনএল কোম্পানি প্রায় ডুবে যেতে বসেছে।
এবার আসি মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপের কথায়। যদি মোবাইল দিয়েই নেট সিগন্যাল পেতে হয়, তাহলে এদিকে যেমন থ্রি-জি লাগে অন্যদিকে স্মার্টফোন লাগে। স্মার্টফোন দেশের অধিকাংশ স্কুল-কলেজ পড়ুয়ার কাছে নেই। আর ল্যাপটপ? ওটা একেবারেই বিলাসিতা। দেশের প্রতি ছাত্রছাত্রীর কাছে স্মার্টফোন থাকবে অথবা ল্যাপটপ থাকবে সেদিন এখন অনেক দূরে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৪০০ ছাত্রছাত্রী ২২-২৩টা রাজ্য থেকে আসেন। ১৫ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবার পর তারা সবাই বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। আমাদের ৪৫ ভাগ ছাত্রছাত্রী ছোট শহর বা গ্রাম থেকে আসেন, এবং ৪৭ ভাগ ছাত্রছাত্রীর বাড়ির অবস্থা ভাল নয়, তাই তারা বৃত্তি পান। অনলাইন ক্লাস চালু করার আগে সব ছাত্রকে সার্ভে করা হল। দেখা গেল : ১. ২০ ভাগ ছাত্রছাত্রীর স্মার্টফোন নেই, ২. ৪২ ভাগ ছাত্রছাত্রী-র বসবাস এলাকায় থ্রি-জি নেই, শুধুই টু-জি। ৩. ল্যাপটপ সবার আছে কারণ সেটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া হয়, আর ৪. সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, প্রায় ৬০ ভাগ ছাত্রছাত্রীদের বসবাস এলাকায় বাড়িতে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না এবং ৫. ৩২ ভাগ ছাত্রছাত্রীদের এলাকায় ৭-৮ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। ৬. প্রায় ৭০ ভাগ ছাত্রছাত্রীর প্রিপেড কনেকশন, এবং ডাটা প্ল্যান মাসিক সামান্য ১৫০—২০০ টাকার। অল্প যে ক’জন ছাত্রছাত্রী কাশ্মীর থেকে পড়তে এসেছিলেন, তাদের সঙ্গে তো কোনও যোগাযোগ করাই সম্ভব হল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষমতা ও কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলেও এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সবটা সম্ভব নয়। তবু কিছুটা চেষ্টা করা হয়েছিল। অনেক ছাত্রছাত্রীকে এক সেমেস্টারের জন্য ৪০০ টাকা করে ৫ মাস অনুদান দেওয়া হয়, ডাটা প্ল্যান-এর জন্য। অনুরোধের ভিত্তিতে অল্পকিছু ছাত্রছাত্রীকে নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে স্মার্টফোন কেনার জন্য লোন দেওয়া হয়। যেখানে শুধুই টু-জি, সেখানে ছাত্রছাত্রীদের বলা হয় কাছাকাছি কোথাও কম্পিউটার সেন্টার থাকলে সেখানে গিয়ে ক্লাস করতে, তার জন্য কিছু অর্থসাহায্য করা হয়। কেউবা আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে গিয়ে থেকে পড়াশোনা করার চেষ্টা করেন।
এসব ও অন্যান্য কিছু চেষ্টায় কিছুটা সুরাহা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিদ্যুৎ পরিষেবা না থাকার কি সুরাহা হবে? কাশ্মীরের ছেলেমেয়েদের কি সুরাহা হবে? থ্রি-জি, ফোর-জি থাকলেও সিগন্যালের অবস্থা যেখানে বড় শহরেই শোচনীয় সেখানে ছোট শহরে বা গ্রামে কী অবস্থা সহজেই অনুমেয়। বিদ্যুৎ ও সিগন্যাল এই দুইয়ের সমাধান করা কোনও একটা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু বিদ্যুৎ থাকা না-থাকার ব্যাপার নয়, একটু জটিল হবে তাও বলছি, ছোট শহরে ও গ্রামে বিদ্যুতের ভোল্টেজ ও frequency এতটাই খারাপ যে ল্যাপটপ-মোবাইল খারাপ হয়ে যাবার ঘটনাও দেখতে পেলাম, যার কোনও সমাধান সম্ভব নয়।
এইমুহূর্তে দেশে ৪৬ শতাংশ জায়গায় ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে, ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে এমন জায়গা সারাদেশে ২০ শতাংশও নয়। ৬ লক্ষের মতো মোবাইল টাওয়ার আছে, থাকার কথা ১০ লক্ষের মতো। দেশে মাত্র ৩২ শতাংশ মতো মানুষের স্মার্টফোন আছে, অনলাইন শিক্ষা চালু করতে হলে যদি মোবাইলকে তার সিগন্যাল বাহন হতে হয়, তাহলে এই সংখ্যাটা প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছতে হবে। কম্পিউটার-ল্যাপটপ ছাড়া অনলাইন শিক্ষণ বেশিক্ষণ চলতে পারে না, এই যন্ত্রটি স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছনো যেতে পারে, তার জন্য একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ লাগবে, আমাদের রাষ্ট্রের শিক্ষার প্রতি সে দায়বদ্ধতা নেই।
শেষ প্রসঙ্গ হল অনলাইন শিক্ষার তৃতীয় দিক নিয়ে, অর্থাৎ সামাজিক দিক নিয়ে। ইতিমধ্যেই কথার মধ্যে তা এসে গেছে, কিন্তু তবু আলাদা করে চিহ্নিত করা দরকার। ভারতের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভাগ জনসংখ্যা দুই ঘরের বাড়িতে থাকে; না দুই বেডরুম-কিচেন নয়, দুটি ঘর মাত্র। এই দুই ঘরেই শোয়া, বসা, বাচ্চাদের খেলা, সবজি কাটা, টিভি দেখা সব কিছু, বহু ক্ষেত্রে এই দুই ঘরের একটিতেই রান্না হয়। পরিসংখ্যান স্পষ্ট নয় তবে এই পরিবারগুলিতেই স্মার্টফোনের অভাব, এবং থাকলে একটিমাত্র, সেটি কর্তার কাছে। যদিবা দ্বিতীয় একটা ফোন থাকে তাহলে তা ছেলের কাছে, মেয়ের কাছে তো নয়ই, কুসঙ্গে পড়বে না! এই পরিবারগুলির মধ্যে ৬৫ শতাংশ ভাগ মতো পরিবার থাকে গ্রামে, বাকিরা ছোট শহরে বা বড় শহরের বস্তিতে। যারা গ্রামে থাকে তাদের অনেকেই এই লকডাউনের সময়ে কোনও কাজ না থাকায় ১০০ দিনের কাজে হাত লাগিয়েছেন। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের কয়েকজন তার মধ্যে আছেন। অনলাইন ক্লাস নিতে গিয়ে দেখেছি, অনেক ছাত্রছাত্রীই ল্যাপটপের ক্যামেরা অন করতে চাননি, ঘরের অবস্থা তারা বাকি সবাইকে দেখাতে চান না। এই পরিবারগুলিতেই ছেলেরা, এবং বেশি করে মেয়েরা বাড়ির কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য পড়াশোনা করতে পারেননি, বিদ্যুৎ যখন এসেছে, তখনি তো বাড়ির কাজ বেশি। ওই দুই ঘরের একটিতেও বসে পড়াশোনা হয় না, তাই বাইরে কোথাও বসে তারা ক্লাস করেছেন, কিন্তু বাইরে সাধারণ আওয়াজ অনেক বেশি, কাজেই তাও খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি।
সামাজিক দিকগুলি আসলে আমাদের সমাজের মূল অসাম্যগুলিকে সামনে নিয়ে আসে। আমরা শিক্ষকরা পাল্টালেও, আর টেকনোলজির সুবিধা তৈরি করলেও, অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর পক্ষে নিজেদের বাড়ি পড়াশোনার জায়গা নয়, সংসারের জায়গা। মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি করে খাটে। তার জন্যই স্কুল, তার জন্যই কলেজ, তার জন্যই হস্টেল, লাইব্রেরি, কলেজের বারান্দা, কলেজের সামনের লন। কাজেই অনলাইনে পড়াশোনা করার পরিকাঠামো করতে গেলে এই ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে হবে। কে ভাববে সেসব কথা?

ড. অশোক কুমার সরকার ব্যাঙ্গালোরের আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয়ে, যেমন পঞ্চায়েতিরাজ, মহিলা ক্ষমতায়ন, জমির অধিকার, নাগরিক সমাজ এবং জীবন ও জীবিকা নিয়েও কাজ করেন। মতামত নিজস্ব।

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More