বয়স মোটে ৯! পথকুকুরদের দায়িত্ব নিয়ে, সংগঠন তৈরি করে, চমকে দিয়েছে সে!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: তখন তার বয়স ছিল মাত্র নয়। এই বয়সে যখন ছোটো ছোটো বাচ্চাদের নজর থাকে নতুন নতুন চকলেটের দিকে, কার্টুনের দিকে, খেলনার দিকে, তখন থেকেই কেন আমান্তে শুরু করেছিল এক দুর্দান্ত কাজ।রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানো বেওয়ারিশ, অসুস্থ কুকুর-বিড়ালকে নিয়ে খুলে বসে ‘হ্যাপি অ্যানিম্যাল ক্লাব’। যে ক্লাব এখন রীতিমতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে কাজ করছে ফিলিপাইনে। এবং সে সংগঠন চালাচ্ছে কেন নিজেই।

    সালটা ২০১৪। ন’বছরের কেন-কে নিয়ে আচমকাই চিন্তায় পড়ে যান তাঁর মা-বাবা। স্কুলের ব্যাগ পিঠে নিয়ে সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে, সারা দিন টিকি মিলত না তার। স্কুল থেকে ফেরার সময় পেরিয়ে যেত। প্রায় পুলিশে খবর দেওয়ার মতো অবস্থা হলে, ফিরে আসত হঠাৎ। এসে কিছু কাঁচা অজুহাত দিত, সারা দিন কোথায় ছিল তার উত্তরে। এ ভাবে এক দিন বা দু’দিন নয়, মাঝে মধ্যেই ঘটতে লাগল কেনের উধাও হয়ে যাওয়া। এক বার তো রাতেই ফিরল না সে!

    আশঙ্কায় আর সন্দেহে এক দিন কেনের পিছু নিলেন বাবা। ওইটুকু ছেলে কোথায় যায় সারা দিন! সে দিন দিনভর ছেলের অজান্তে তার পেছনে ঘুরে বেরিয়ে যেন স্তব্ধ হয়ে গেছিলেন বাবা। ভাবতেও পারেননি, বাড়ি থেকে বেরিয়ে সারা দিন ধরে এই কাজ করে বেড়ায় তাঁর ছেলে! তিনি দেখেন, তাঁর ছেলে কেন ফিলিপাইন্সের বিভিন্ন রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানো কুকুরকে খাবার দিচ্ছে, চিকিৎসা করছে! নিজের ব্যাগের টিফিনটুকুও খাইয়ে দিচ্ছে ওদের, পকেটমানি দিয়ে কিনছে আরও খাবার। সে দিনই কেনের অলক্ষে তার কিছু ছবি তুলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেন বাবা।

    বাড়ি ফিরে কেনের সঙ্গে কথা বলেন বাবা। কেনও সব খুলে বলে বাবাকে। ওইটুকু ছেলের কথা শুনে, বাবার আরও এক বার চমকে ওঠার মতো অবস্থা হয়। ২০১৪ সালে ফিলিপাইনে সরকারি ভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়, রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানো বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে মেরে ফেলার। যার অর্থ, বেশির ভাগ কুকুরকেই খুন করা হবে। 

    এই বিষয়ে কোনো পশুপ্রমী সংস্থাও এগিয়ে আসছিল না। কুকুরদের কোনও কারণ ছাড়া মেরে ফেলার এই সিদ্ধান্ত মানতে কষ্ট হচ্ছিল ছোট্টো কেনের। বাবাকে সে জানায়, সে সেগুলোকে আশ্রয় দিতে চায়। বাবা তাঁর সন্তানের এই কথা শুনে গর্ব বোধ করলেও, চিন্তায় পড়ে যান। তিনি ছেলেকে জানান, কুকুরের জন্য ঘর বানানো ও খাওয়ানোর জন্য প্রচুর টাকার দরকার। দিতে হবে অনেক সময়। তা ছাড়া কেনের মতো ছোটো বাচ্চার দ্বারা এমন কাজ সম্ভব হবে কি না, সন্দেহ ছিল বাবার।

    শেষমেশ অবশ্য কেনের আবেগই জিতে যায়। সে রাস্তা থেকে কালো, বাদামী ও সাদা রঙের কুকুরছানাকে বাড়িতে নিয়ে এসে তার বাবার গ্যারেজে আশ্রয় দেয়। তাদের নাম রাখে ব্ল্যাকি, ব্রাউনী এবং হোয়াইট পাপ্পি। ওই গ্যারেজেই শুরু হয় কেনের স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ।

    এ দিকে কেনের বাবা তার ছেলের কুকুরের প্রতি যত্নের যে ছবিগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছিলেন, ইন্টারনেট জগতে দ্রুত ভাইরাল হতে থাকে সেগুলিও। রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুরকে খাবার দেওয়া শিশু কেনের ছবি দ্রুত ভাইরাল হতে থাকে। বিশ্বের নানা প্রান্তের পশুপ্রেমীরা ছোট্টো কেনের এই কাজে মুগ্ধ হয়ে সহায়তার হাত বাড়ান। খুব তাড়াতাড়ি জোগাড় হয়ে যায় কয়েক লক্ষ টাকা।

    ২০১৪ সালের ১ মে। অনুদানের টাকা থেকে দেড় হাজার ডলার খরচ করে এক বছরের জন্য ১০ হাজার বর্গফুটের একটা জমি ভাড়া নেয় কেন। তৈরি করে দু’টি বড় ঘর। নিয়ে আসে খাবার, শুরু করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। পরিচর্যা তো আছেই।

    একটা দু’টো করে কুকুর বাড়তে থাকে কেনের। রাস্তায় কোনও কুকুরকে অসুস্থ দেখলে বা একা ঘুরতে দেখলেই কেন তাদের নিয়ে আসত নিজের কাছে। হঠাৎ করেই এক দিন কেন তার কাজের নাম দেয়, ‘হ্যাপি অ্যানিম্যাল ক্লাব’। এই নামের বোর্ড লিখেও ঝুলিয়ে দেয় সে।

    এই ‘হ্যাপি অ্যানিম্যাল ক্লাব’-ই কয়েক বছরের মধ্যে হয়ে ওঠে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। এটিই দক্ষিণ ফিলিপাইনের দ্বীপ মিন্দানাওয়ের দাবাও শহরে অবস্থিত প্রথম কোনও পথকুকুরকে আশ্রয় দেওয়া প্রতিষ্ঠান। এখন সেখানে কেন ছাড়াও রয়েছেন বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী কর্মী।

    ‘হ্যাপি অ্যানিম্যাল ক্লাব’-এ প্রয়োজনীয় কারণ ছাড়া কুকুরদের খাঁচায় বন্দি রাখা হয় না। নিজের মনেই খোলা জমিতে খেলে বেড়ায় তারা। তাদের আনন্দের জন্য সপ্তাহে এক দিন করে কেন সেগুলোকে পার্কে অথবা খেলার মাঠে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের মহানন্দ। প্রতিটি কুকুরকে সপ্তাহে অন্তত এক বার গরম জল দিয়ে স্নান করাতে ভোলে না কেন। এই সব কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারলেও, খেলাধুলোর জন্য সময় কমে গিয়েছে তার। কিন্তু তাতে অবশ্য কেনের কোনও আফশোস নেই। তার কথায়, “আমি খেললে এদের কে দেখবে।”

    কেনের প্রতিষ্ঠানে আশ্রিত কুকুরগুলোকে দত্তকও দেওয়া হয়, কেউ চাইলে। যদিও পথকুকুরদের অ্যাডপ্ট করা নিয়ে ফিলিপাইনের মানুষদের আগ্রহ তত বেশি নয়, তবু কেন সম্পূর্ণ হতাশ হয় না। সে স্বপ্ন দেখে, তার হ্যাপি অ্যানিম্যাল ক্লাব আরও বড় হবে, আরও অনেক কুকুরকে আশ্রয় দেবে সে। আরও অনেক মানুষ এই অবোলা প্রাণীদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। এ ছাড়াও সারা দুনিয়ার নানা প্রান্তে ‘হ্যাপি অ্যানিম্যাল ক্লাব’-এর শাখা খোলার ইচ্ছে রয়েছে কেনের। কোনও পথকুকুরেরই যাতে অকালমৃত্যু না হয়, এটাই কেনের একমাত্র চাওয়া।

    রাস্তার প্রাণীদের ভালোবেসে একটি ছোটো শিশুর তৈরি করা প্রতিষ্ঠান হয়তো সত্যিই এক দিন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। ছড়িয়ে পড়বে সচেতনতাও। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীই মানুষের ভালবাসা পাবে, স্বপ্ন দেখে কেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More