সোমবার, নভেম্বর ১৮

নীল-নির্জন দারিংবাড়িতে কাটুক ক’দিন

ডা. রিয়া দাস

সিকিম, দার্জিলিং তো হলো, এ বার গরমে ওড়িশার কাশ্মীর দারিংবাড়ি ঘুরে এলে কেমন হয়?

বৈচিত্র্যে ঘেরা একসময় ইংরেজদের প্রিয় গ্রীষ্মাবাস ছিল এই পাহাড়ি শহর। আদিবাসী অধ্যুষিত এই জায়গায় সবুজ গালিচার মাঝে লাল টিলার সমাহার। লালচে পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর নির্জনতার মাঝে ছুটি কাটানোর বেশ ভালো ডেস্টিনেশন হতে পারে এই পাহাড়ি শহর। সমুদ্র থেকে ৩০০০ মিটার উঁচুতে কন্ধমল জেলায় অবস্থিত দারিংবাড়ি।

ওড়িশা বলতে সমুদ্র চোখে ভেসে ওঠে কিন্তু পাহাড়ময় ওড়িশা দেখার জন্যে আসা চাই দারিংবাড়ি। জঙ্গলের বুক চিরে পিচকালো রাস্তা গিয়েছে বেঁকে, শুনশান রাস্তা মাঝে ইতিউতি গ্রাম পর্যটক মানচিত্রে তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও প্রকৃতির আকর্ষণে চলে আসা যায় পাহাড়তলিতে। দূর থেকে চোখে পড়ে পাহাড়চূড়াগুলো, দুধারের নয়নাভিরাম গ্রাম্য পরিবেশ, ক্ষেতের সোনারঙা ফসল, স্নিগ্ধ পরিবেশ মাঝে খানিক প্রশস্তিতে বিছিয়ে রয়েছে পাহাড় অরণ্য এর প্রাচীন সভ্যতা। চারিদিকে শাল, মেহগনি, সেগুন আর বাহারি গাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, আকাশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনে মত্ত তারা; যাদের ফাঁক দিয়ে একফালি আকাশ দেখা যায় কোথাও কোথাও। শীতল ছায়া ঘেরা পাহাড়ি পিচের রাস্তা গেছে এঁকেবেঁকে। টিলা টিলা সবুজ পাহাড় আর চন্দন, কফি, গোলমরিচ চাষের ক্ষেত্রভূমি।

ভুবনেশ্বর থেকে ২৫০ কিমি আর বেহরামপুর থেকে ঘণ্টা চারেক গাড়িতে প্রায় ১৩৫ কিমি রাস্তা অতিক্রম করলে এসে পৌঁছানো যায় শহরে। এখানে হাতেগোনা হোটেলে থাকায় আগেভাগে বুকিং করে আসাই শ্রেয়। ডিয়ারস ইকো ট্যুরিস্ট লজটি অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে অবস্থান। দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে ঘুরে দেখে নেওয়া যায় আশপাশটা। লাল পাহাড়ি রাস্তা গেছে বেঁকে ছোট্ট বাজার বসেছে মূলকেন্দ্রে। পসার সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা, দৈনন্দিন জিনিসপত্র বিকোচ্ছে তারা। এখানে কফি গার্ডেন থাকায় কফি রপ্তানি হয় নানা জায়গাতে। চা এর বদলে লোকজন রাস্তা মোড়ে ভেজিটেবল স্যুপ খাচ্ছে, সেই তো কবে দেশ স্বাধীন হয়েছে তবু মানুষের মধ্যে ইংরেজ জমানার রেশ রয়ে গিয়েছে। খ্রিস্টধর্মের প্রভাব রয়েছে এখানে, তাই ইতিউতি গীর্জা রয়েছে।

ট্যুরিস্ট লজের ছাদ থেকে সূর্যাস্ত দেখা যায়, শেষ বিকেলের আভা এসে পড়ছে পাহাড়ের গায়ে, ঠিক সন্ধ্যে নামার মুখে কমলাভ সূয‍্যিটি ঝুপ করে মুখ লোকায় পাহাড় কোলে, নিমেষে অন্ধকার নেমে আসে।

পরের দিন গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরা যায় আশপাশের দেখবার জায়গাগুলো দেখে নেবার জন্য। লাভারস পয়েন্ট, পাথুরে রাস্তা মাঝে খানিক চললে মেলে তিরতির করে বয়ে চলা পাহাড়ি নদী, সবুজ মাঝে প্রাণবন্ত জলপ্রপাত, গুরুগম্ভীর শব্দে নেমে আসছে সে।

ফিরতি পথে দেখে নেওয়া যায় এমু ফার্ম। পাখির চাষ ও অতিকায়  ডিমের রপ্তানি হচ্ছে দেশ বিদেশে। সবুজ রঙের বড় বড় ডিম দেখে মনে হতে পারে পাথুরে টুকরো।  আসলে এমু পাখির ডিম। খানিক শহরএর গিকে এগোলে আছে নেচার পার্ক, রংবেরঙের বাহারি গাছ আর মাঝে মাঝে পাথুরে কিছু মূর্তি বাটারফ্লাই পার্কের মধ্যেই। সকালবেলা দারিংবারির বিভিন্ন পাহাড় থেকে প্রজাপতিরা আসে ওই রংবাহারি ফুলে মধু খেতে।

এর পর শহর থেকে বাঁ দিকে এগোলে মেলে কফি গার্ডেন। সুউচ্চ কফি গাছগুলোর গা বেয়ে উঠে গেছে গোলমরিচ গাছ। বিভিন্ন ধরনের কফি গাছের দেখা মেলে এই বাগানে। কফি বাগান থেকে বেরিয়ে বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করে মেলে আরও এক জলপ্রপাত। অনেকখানি সিমেন্ট বাঁধানো সিড়ি বেয়ে নিচে নামলে দেখা মেলে ঝর্ণাটি। পাথুরে জমির উপর আছড়ে পড়ছে নির্জনতার বেড়াজাল ভেদ করে। ঘোলাটে রঙের জল দেখে মনে হতে পারে গুচ্ছ গুচ্ছ বালিরাশি, আদতে  তা নয়; রঙের বাহারই এমনতর। নাম ড্যাসিংবারি, হয়তো কোনও এক সাহেবের দেওয়া নাম। বেশ রহস্য রোমাঞ্চে ঘেরা জায়গাটা শীতকালীন পিকনিক স্পটও। ফিরতি পথে পরে হিল ভিউ পয়েন্ট। দারিংবারির সব চাইতে উঁচু জায়গা যেখান থেকে উপভোগ করা যায় দারিংবারি নৈসর্গ। টুকটুকে লাল রঙের সূর্য  মুখ লুকোয় দিনের শেষ আলো গায়ে মেখে, যেটা দেখতে দেখতে  মনে হবে দারিংবারি এমনই থাক প্রকৃতি আদিবাসী আর নিঃসঙ্গতা নিয়ে। দুদিন কাটিয়ে পরের দিনের  ফিরতি পথ , গাড়িতে করে একইভাবে ফেরা।

কী ভাবে যাবেন?

ট্রেনে গেলে ভুবনেশ্বর কিংবা বেহেরামপুর স্টেশনে নেমে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যায়।

প্লেনে গেলে ভুবনেশ্বর এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি ভাড়া  নিয়ে  যাওয়া যায়।

তবে গাড়ি ওই কদিনের জন্য বুক করে নিয়ে যাওয়াই ভালো।

Leave A Reply