কার্তিক-বসন্ত, বাংলা গানের একমাত্র পুরুষ গায়ক জুটি! বসন্ত কুমারের প্রয়াণে শেষ হল ইতিহাসের এক অধ্যায়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    দু’জন পুরুষ গায়কের জুটি– বাংলা গানের ইতিহাসে তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যায়না। অথচ এমনই জুটি একসময় সুপারহিট ছিল খোদ বাংলায়। তাও আবার দুই ভাইয়ের জুটি! ষাট-সত্তর দশকের কলকাতার জলসাগুলি দুই ভাইয়ের জুটির গান ছাড়া সম্পূর্ণই হতো না। তাঁদের নাম, কার্তিক কুমার ও বসন্ত কুমার।

    লক্ষীকান্ত প্যায়ারেলাল, যতীন ললিত সুরকার জুটি অবশ্য বম্বেতে আছে। কিন্তু গায়ক হিসেবে পুরুষ জুটি একেবারেই বিরল। কিন্তু এই বসন্ত-কার্তিকের নাম অনেকেই মনে করতে পারবেন। হয়তো নব্বই দশকে বা তার পরবর্তী সময়ে যাঁদের ছেলেবেলা কেটেছে তাঁরা এঁদের চিনবেন না, কিন্তু আর একটু পুরনো দিনের মানুষদের কাছে এই কার্তিক-বসন্ত জুটি খুব চেনা নাম।

    এই জুটির কার্তিক কুমার আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে। সেদিনই ভেঙে গেছিল এই জুটি। এবছর ২৬ জন বসন্তকুমারও চলে গেলেন চিরঘুমের দেশে। এই দুই ভাই যেন একটা ইতিহাস বাংলা গানের জগতে। যদিও এঁদের নিয়ে কোনও উইকিপিডিয়া খুঁজে পাওয়া যায় না। খুব কম তথ্যই রয়েছে গুগলেও।

    পুরুষ-জুটি কার্তিক-বসন্ত শুধু গায়ক নয়, পারফর্মার হিসেবে বেশি জনপ্রিয় ছিল। গানের সঙ্গে অভিনয়ও করতেন তাঁরা, যাকে এখকার ভাষায় বলে ‘কমপ্লিট এন্টারটেনমেন্ট প্যাকেজ’। তাঁদের নামেই জলসাগুলো হাউসফুল হত। প্রথম দিকে এই সহোদর জুটি অন্য আর্টিস্টের বিখ্যাত গান গাইত। আবার কখনও কার্তিক গাইতেন কিশোর কুমার, মান্না দের কণ্ঠে, এবং বসন্ত গাইতেন নারী কণ্ঠে আশা বা লতার গান। বসন্ত কুমার নারী-পুরুষ উভয় কণ্ঠে গাইতে পারতেন এবং অবিকল আশাজির মতোই পারফর্ম করে মঞ্চ মাতাতেন।

    বসন্তরা ছিলেন পাঁচ ভাই। বড়দা বলরাম দাসও ছিলেন সঙ্গীতসাধক ও গীতিকার। তাঁর কাছেই কার্তিক-বসন্তর গান বাজনার শিক্ষা। ১৯৫৫ সাল থেকে কার্তিক-বসন্ত মঞ্চে গান করা শুরু করেন। শুরুতে বেশিরভাগ সময়ই বসন্ত-কার্তিক আশা-কিশোর জুটির গানগুলো গেয়ে মঞ্চ মাতাতেন। এইভাবেই ওঁদের নাম ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পরবর্তী কালে ওঁরা ঠিক করেন, নিজেদের গানও গাইবেন। এক সময়ে নিজেদের গানের রেকর্ডও প্রকাশ করার কথা ভাবেন। তাঁদের গান লিখে দেওয়ার জন্য লোক বাছলেন অভিনেতা জহর রায়কে।

    প্রখ্যাত কমেডিয়ান জহর রায় ছিলেন তাঁদের জহরদা, পারিবারিক সম্পর্ক ছিল বন্ধু দাদা হিসেবে। কার্তিক-বসন্ত জুটির জন্য জহর রায় গান লিখলেন:

    “রাবণ রাজা পেয়েছে কেমন সাজা
    সীতাহরণ আনল মরণ
    রামের মরণ বাণে রে ভাই রামের মরণ বাণে।”

    গানটির সুর করেছিলেন বড়দা বলরাম দাস। কার্তিক-বসন্ত র এই গানের রেকর্ড বেশ জনপ্রিয় হল। এই জুটি এরপর চলে এলেন মূলধারার প্রখ্যাত সব সুরকারদের স্পর্শে। এই জুটি গান করেছেন সলিল চৌধুরী, আর ডি বর্মণ, নীতা সেন, দীপেন মুখোপাধ্যায় প্রমুখের সুরে। সলিল চৌধুরীর কথায়-সুরে এই ভ্রাতৃদ্বয় জুটির নন্দলাল-দেবদুলাল বা সরস্বতী নদীতীরে গানগুলি সেইসময়কার সব বাঙালিরই শোনা প্রায়।

    নন্দলালের পাত্র দেখার গানটা পরে স্বপন বসু রিমেক করে গেয়েও খুব বিখ্যাত হন। কিন্তু বসন্ত-কার্তিকের আসল গান অনেকেই ভুলে গেছেন। দীপেন মুখোপাধ্যায়ের সুরে আর সদ্যপ্রয়াত লেজেন্ড গীতিকার লক্ষীকান্ত রায়ের কথায় এই দুই ভাইয়ের আরও একখানি জনপ্রিয় গান ছিল, ‘কপালের পাথরটাকে সরাই কেমন করে?’ এই জুটির গাওয়া ‘নাম তার মল্লিকা’ ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল মানুষের মুখে মুখে। এই গানের কথা ও সুর সলিল চৌধুরীর। এই গানটা বহু বছর পরেও শ্রোতারা মনে রেখেছেন।

    কার্তিক-বসন্তর গানের জলসা বাঁধা ছিল বাগবাজার সর্বজনীনের দুর্গাপুজোর ময়দানে। শুধু তাই নয়, এই জুটি গেয়েছিল ‘বাগবাজারের রসগোল্লা’ নামের একটি হিট গানও। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় এবং নীতা সেনের সুরে ছিল এই গানটি। এই সহোদর জুটির এত জনপ্রিয়তা হয় যে স্বয়ং কিশোর কুমার ওঁদের সঙ্গে গান রের্কড করেন। গানটি ছিল ‘ ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ কুয়োর ব্যাঙ, কুয়োকে বলে সাগর।’

    গাঁথানী রেকর্ড থেকে ওঁদের পুজোর গানও বের হত আশির দশক অবধি। আর ডি বর্মণের ‘পুরস্কার’ ছবিতে গান গেয়েছিলেন বসন্ত কুমার। গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও বসন্ত কুমারের স্নেহের সম্পর্ক ছিল। পুলকবাবু প্রায়ই বসন্ত কুমারের বাড়ি এসে থাকতেন, গান তৈরি করতেন। তখন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা চারখানা গান উষা উথ্থুপের সঙ্গে গেয়েছিলেন  বসন্ত-কার্তিক জুটি। গানটা ছিল ‘পয়সার ঝনঝন শুনি যে হরদম’। বাংলা পপ গান।

    শুধু গানই নয়, বসন্ত কুমার বিভিন্ন বাজনাও বাজাতে পারতেন। তবলা, ঢোল– সবেতেই সমান দক্ষতা ছিল তাঁর। মান্না দে একবার কার্তিক-বসন্তর ফাংশনে এসেছিলেন। কিন্তু কী করে গাইবেন, তাঁর তবলচি রাধাকান্ত নন্দী তো আসেননি! এদিকে শো হাউসফুল, দমদমের সেই অনুষ্ঠানে। তখন মান্না দেকে উদ্ধার করতে মঞ্চে নামলেন বসন্ত কুমার নিজেই। তিনিই মান্না দের সঙ্গে এক ঘণ্টা দশ মিনিট ধরে বাজালেন তবলা। আর এক বার, মহাজতি সদনে হেমন্ত-সন্ধ্যা-মান্না র সঙ্গে কার্তিক-বসন্তর অনুষ্ঠান। সেখানেও সেদিন রাধাকান্ত নন্দী আসেননি। তবলা বাজাতে বসে গেলেন বসন্ত কুমার। এমনি করে পাঁচখানা অনুষ্ঠানে মান্না দে-র সঙ্গে বাজিয়েছিলেন বসন্ত কুমার।

    কার্তিক কুমারের মৃত্যুর পরে জুটিটা ভেঙে যায়। তবে নব্বই দশক থেকেই জীবনমুখী গান যখন শুরু হল, তখন এই ভাইদের জুটির বাজার পড়ে যেতে শুরু করেছিল। পাড়ায় পাড়ায় জলসা কমে এল। বাগবাজারের মাঠের মতো কিছু পুরনো জায়গায় সুযোগ পেতেন তাঁরা। একসময়ে তাও বন্ধ।

    এই জুটি বিখ্যাত সুরকারের সুরেও যেমন গেয়েছে, তেমন অনেক গানের মিউজিক ভিডিও-ও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে করেছিলেন। কিন্তু বাস্তব সত্যি হল বসন্ত কুমারের শেষের গানগুলোর মান নেমে গেল অনেকটাই। মঞ্চ পারফরমেন্সও ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেল, চড়া কমেডিতে পরিণত হল। বসন্ত কুমারের গান আর হিট হতো না। শেষে শরীরও দিত না, তাই কমিয়ে দিয়েছিলেন গান। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেল সব।

    তবে পার্কসার্কাসের বাড়িতে ছাত্রছাত্রীদের গান শেখাতেন বসন্ত। শ্যামল মিত্রর ছেলে সৈকত মিত্র, চুমকি-ঝুমকি জুটির ঝুমকি রায়, তবলা বাদক দীপঙ্কর আচার্য– অনেকেই তাঁর গানের ভক্ত ও শিষ্য। বসন্ত-কার্তিকের সঙ্গে ফাংশনও করেছেন এঁরা একসময়।

    সাম্প্রতিক লক ডাউনে খুব খারাপ অবস্থায় ছিলেন বসন্ত কুমার। মনের ভিতরে ছিল অনেক অভিমানও। এত শিল্পীর সঙ্গে গান করেও শেষটা ছিল অপ্রাপ্তির। বাংলা আধুনিক গানে একমাত্র বিখ্যাত পুরুষ গায়ক জুটি তাঁরা, কিন্তু সময়ের দলিলে তাঁদের নামের পাশে পুরস্কারের বাহার নেই। নেই কোনও স্বীকৃতি। বসন্ত-কার্তিক অনেক নতুন শিল্পী বাজনদারদেরও ফাংশনে সুযোগ করে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের বাড়িতে পৌঁছায়নি এ যুগের অভিজাত অনুষ্ঠানের একটাও আমন্ত্রণ পত্র।

    প্রচারের আলো থেকে সরে গেলে সবটাই যেন হারিয়ে যায়। অথচ একটা পুরো প্রজন্মর কৈশোর-যৌবন জুড়ে ছিল এই সহোদর জুটি। লকডাউনের মাঝেই অনেক অভিমান নিয়ে পার্কর্কাসের বাড়িতে নীরবে চলে গেলেন বসন্ত কুমার। শেষ বিদায়েও একাই গেলেন। বাংলা গানের একটা পর্ব মুছে গেল বসন্ত কুমারের মৃত্যুতে। এই জুটি হয়তো হারিয়েই যাবে। তবে এখনও প্রচুর রেকর্ড গান পাওয়া যায় তাঁদের আজও, একদিন হয়তো আর পাওয়া যাবে না। তবু ইতিহাসে, মানুষের মনে আর গানে গানে রয়ে যাবেন কার্তিক-বসন্ত জুটি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More