করিমপুরের হামলা বাংলা ও বাঙালির পেটেই পদাঘাত

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শঙ্খদীপ দাস 

    কাল সত্তরতম সংবিধান দিবস। তা উদযাপনের জন্য ঘটা করে রাজ্য বিধানসভার দু’দিনের অধিবেশন ডাকা হয়েছে। সাংবিধানিক গণতন্ত্রের আরাধনা হবে সেখানে। আর ঠিক তার আগেই সোমবার দুপুরে দেখা গেল ভয়াবহ এক ছবি!

    নদিয়ার করিমপুর বিধানসভার উপনির্বাচন হচ্ছে। বুথে বুথে কেমন ভোট হচ্ছে তা দেখতে ঘুরছেন বিজেপি প্রার্থী জয়প্রকাশ মজুমদার। কারও কারও গোঁসা হয়েছে তা নিয়েই। তাই কোনও বলা কওয়া নেই, সোজা মার। কিল, চড়, ঘুষি। এমনকি লাথিও। কোমরের কাছে এমন জোরে লাথি মারা হয়েছে যে জয়প্রকাশ ছিটকে পড়েছেন রাস্তার পাশে ঝোপের মধ্যে!
    তার পর সেই ছবি রাষ্ট্র হয়েছে। গোটা দেশ দেখেছে। আর যতবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেছে ততবারই যেন বেআব্রু হয়ে পড়েছে বাংলা।

    ক’দিন আগেই লোকসভা ভোট হল দেশজুড়ে। কই এমন তো কোথাও হয়নি। এই তো সেদিন নগরপালিকা ভোট হয়েছে কর্নাটকে। রাজ্যে শাসনক্ষমতায় থেকেও কংগ্রেসের কাছে পিছিয়ে পড়েছে বিজেপি। কই তখনও তো এমন ছবি দেখা যায়নি। তা হলে শুধু বাংলাতেই কেন?

    গত বছর পঞ্চায়েত ভোটের স্মৃতি এখনও টাটকা। সেবারও ভোটের দিন কোথাও ব্যালট পেপার পুকুরের জলে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। কোথাও গণনার দিন গণনাকেন্দ্রে ঢুকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল ব্যালট। খুন হয়েছিলেন শাসক-বিরোধী শিবিরের বহু কর্মী। তখনও মুখ পুড়েছিল বাংলার। লোকসভা ভোটেও মারধর কম হয়নি। তারপর এবার করিমপুর।

    বিজেপির অভিযোগ ‘লুঙ্গি পরা’ ওই লোকটা তৃণমূলের। আর তৃণমূল বলছে না, ও বিজেপিরই। স্থানীয় ওই ব্যক্তি কোন দলের সেটা কিন্তু কোনও সমস্যা নয়। বরং সমস্যা বৃহত্তর। নির্বাচনে এই মারধর বাংলার সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে। যা বাংলার বর্তমান ও ভবিষ্যৎকেই ক্রমশ খাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলার বাইরে কারও মুখে এই সমালোচনা শুনলে হয়তো রাগ হতে পারে, অস্বস্তি হতে পারে, অপমানিতও হতে পারেন। কিন্তু এটাই বাস্তব। পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে এমন নেতিবাচক ধারনাই কঠিন পাথরের মতো জাঁকিয়ে বসেছে ভূভারতে।

    দেখুন

    বাংলায় বর্তমানে তথাকথিত যাঁরা যুব সম্প্রদায় তাঁদের অনেকেই আশির দশকের আগে ভোট দেখেননি। দেখলেও স্মরণে নেই। তবে জ্ঞানত অনেকেই দেখেছেন, ভোটে এই সংস্কৃতির আমদানি করেছে বামেরাই। আরও স্পষ্ট করে বললে সিপিএম। পঞ্চায়েত ভোটে বিরোধীদের মনোনয়ন পেশ করতেই দেব না। মনোনয়ন পেশ করলে তাকে ভয় দেখিয়ে হোক, মেরে হোক, ধরে হোক, প্রত্যাহার করিয়েই ছাড়ব। তাও না পারলে ভোট লুঠ করব।

    দীর্ঘদিন সেই অরাজকতা চলার পর তিতিবিরক্ত মানুষ মুক্তি চেয়েছিল। রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছিল বাংলায়। কিন্তু পরিবর্তনের পরিবর্তে দেখা গেল, ভোটে চড়াম চড়াম দড়াম দড়াম শব্দে কান পাতা দায়। এমন করে গুড় বাতাসার কথা বলা হয়, আবার তাঁদের মহিমান্বিতও করা হয়, যেন যাবতীয় নিদান দেওয়ার দায়ভার তাঁদের উপর। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্যে তাঁরা এমন ভাব দেখান যে পুলিশ প্রশাসনও তাঁদের সামনে হামাগুড়ি দিচ্ছে।

    ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী, রাজ্যের সশস্ত্র পুলিশ—কুছ পরোয়া নেহি। কচু কাটতে কাটতে ডাকাত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা এক শ্রেণি। কারও কারও সেটাই নেশা, পেশা এবং রুটিরুজি! বিরোধী প্রার্থীকেই ধরে মারো। পুলিশের সামনেও পদাঘাতে দ্বিধা নেই। ভয় নেই। একে লুম্পেনরাজ বললেও হয়তো কমই বলা হয়।

    ঘটনা হল, বিপদটা শুধু করিমপুরের ওই মানুষটিকে নিয়ে নয় যাঁর কাছ থেকে পদাঘাত এসেছে। তার মতো শত সহস্র বীরপুঙ্গবকে নিয়েও নয়। আগামী দিনে বাংলায় অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে দেখা যাবে, তিনি শিবির বদলেছেন। তার পর তৃণমূলের প্রার্থীকেই লাথি মারছেন। অর্থাৎ বিপদটা সংস্কৃতির। পরিবেশের। ধারণার। যে ট্রাডিশন চলছে বাংলায়, তার।
    এবং সেটাই প্রকারান্তরে ছাপ ফেলছে বাংলার ভাবমূর্তিতেও। অনেকের মতে, করিমপুরের ওই লাথির ছবিই বুঝিয়ে দিচ্ছে বাংলায় আইনের শাসন নেই। পুলিশকেও দুষ্কৃতীরা ভয় পায় না। আর সাধারণ মানুষ তা শুধু ফ্যালফ্যাল করে দেখেন। নিত্যকার এসব ঘটনার ছবি টিভিতে দেখেন, পোর্টালে পড়েন, আর সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন। ব্যস। আর কোনও ভূমিকা নেই তাঁদের। অথবা এমন পরিবেশ নেই যাতে তাঁরা কিছু করে দেখানোর সাহস দেখাতে পারেন।

    তাহলে এমন বাংলায় কেউ বিনিয়োগ নিয়ে আসবেন কেন? কী করেই বা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে? মেধাই বা কেন পড়ে থাকতে চাইবে? আর কেনই বা শিক্ষিত বাঙালি পরিবারের বাবা-মা চাইবেন, দুধে ভাতে বেড়ে ওঠা তাঁর সন্তান এই পরিবেশে পড়ে থাকুক।

    করিমপুরের পদাঘাত, আসলে তাই বাংলা ও বাঙালির পেটেই পদাঘাত। তার ছবি, ভিডিও, ফুটেজ শুধু সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করলেই রোগ সারবে না। অনেক হয়েছে, এবার নিরাময় চাই।

    ছবি : বৃষ্টিকণা সিরাজ 

    আরও দেখুন : পঞ্চায়েতে পুড়ল বাংলা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More