মঙ্গলবার, জুন ২৫

“আমিও তো মা”, নিগৃহীতাকে বিচার পাইয়ে বললেন পুলিশ অফিসার

মধুরিমা রায়

মেয়েটির জন্য লড়তে গিয়ে নিজের ছেলের কথাই সবসময় মনে এসেছে মেঘনার।

“আমারও তো একটা ছেলে আছে, ও যখন বিপদে পড়ে, আমি তো দৌড়ে যাই। তাই এই বাচ্চা মেয়েটির কথা শুনে নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি”,বলছেন মেঘনা কর। পেশায় লালবাজারের গোয়েন্দা শাখার স্পেশাল জুভেনাইল পুলিশ ইউনিটের সেকেণ্ড অফিসার।

২০১৬ সালের ঘটা একটি ঘটনার ফলাফল সেই মায়ের জেদের কাহিনিকেই সামনে আনছে। সে বছরের ১৪ মার্চ, একজন প্রৌঢ়া এসে চেতলা থানায় অভিযোগ জানান, তাঁর নাবালিকা নাতনিকে দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত শারীরিক নিগ্রহ করেছে তাঁদেরই এক আত্মীয়। নাম মৃন্ময় হালদার। নিগৃহীতা মেয়েটির বয়স তখন মাত্র ১২ বছর। ভয়ে টানা চার মাস ধরে মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করেছে মেয়েটি। তারপর একদিন জানাতে বাধ্য হয় দিদিমাকে। যিনি সব শুনে অবিলম্বে অভিযোগ করেন থানায়। সেই দিনই চেতলা লকগেট অঞ্চলের বাড়ি থেকে মৃণ্ময়কে গ্রেফতার করে চেতলা থানার বিশেষ টিম। ২৩ শ মার্চ,২০১৬ এ মামলার তদন্তভার নেয় কলকাতা গোয়েন্দা দফতরের স্পেশাল জুভেনাইল পুলিশ ইউনিট।


চেতলা লকগেটের কাছে বস্তিতে মায়ের সঙ্গে থাকত কিশোরী মেয়েটি। বাবাকে হারিয়েছে শৈশবেই, তখন সে মাত্র ৫ বছরের, আর তার ভাইয়ের বয়স তখন ২। মা পরিচারিকার কাজে ব্যস্ত থাকেন সারাটা দিন। মেয়েটি তাই থাকত দিদিমার তত্ত্বাবধানেই। বয়স্ক দিদিমার পক্ষে সবসময় নজর রাখাও সম্ভব হত না। ফলে, ঘরে অনেকটা সময় একাই থাকতে হত নাবালিকা মেয়েটিকে। এই অবস্থারই সুযোগ নিয়েছিল সম্পর্কে আত্মীয়, মেয়েটিরই জেঠিমার ভাই মৃণ্ময় হালদার।

প্রথমে চলত সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ, পরে সেটা পেনিট্রেটিভ অ্যাসল্টে পৌঁছে যায়। আর যেদিন এই ঘটনা ঘটে, মেয়েটির ভাই দেখে ফেলে এবং দিদিমাকে গিয়ে ঘটনা জানিয়ে দেয়। দিদিমা কিন্তু সময় নষ্ট করেননি। অথচ মেয়েটি প্রথম থেকে সবটা নিজের মাকে জানালেও , মা বিষয়টা কাউকে বলতে বারণ করেন এবং গুরুত্ব দেননি। এর পিছনে উঠে আসছে আরও কঠিন একটা আর্থসামাজিক বাস্তব। সারাদিন লোকের বাড়িতে হাড়ভাঙা খাটনি করে যে পয়সা আসত ঘরে, তাতে তাদের চলত না। মৃন্ময় তাঁদের সাহায্য করত আর্থিকভাবে, আর তাতেই মেয়েটির মায়ের সাথে একটা সম্পর্কও গড়ে ওঠে। তাই মা বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রাখত!

আসল মা আপস করলেও, পুলিশ-মা কিন্তু লড়ে গেলেন। মেঘনা বলছেন, তাঁরা যখন কেস হাতে নেন, কিশোরী মেয়েটি পুলিশকেও খুব ভয় পেত সে সময়। তার ভয় কাটিয়েছেন মেঘনার মতো মায়েরাই, মেয়েরাই। প্রথমে মেয়েটিকে রাখা হয় চাইল্ডলাইন নামক একটি সরকারি সংস্থায়, এরপর তার ঠিকানা হয় কৃত্তিকা হোপ ফাউণ্ডেশনে। সেই জায়গায় থাকাকলীন মন খারাপ হত ওই কিশোরীর। একদিন আরেক বন্ধুর হাত ধরে পালিয়েও যায় সেখান থেকে। আবারও মুশকিল আসান মেঘনা কর। এই সাব ইন্সপেক্টর তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে কিশোরী এবং তার বন্ধুকে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উদ্ধার করে আনেন। তখনই তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন মেঘনা। ঠিকানা বদল করা হয় সেই কিশোরীর। এবার তার ঠিকানা সল্টলেকের সুকন্যা হোম। সেখানেও কিছুদিন কাটানোর পর এই মুহূর্তে কিশোরী রয়েছে বেহালার কাছে একটি হোমে। এই হোমেরই স্কুলে পড়াশোনা করে ক্লাস নাইনে উঠবে এবার মেয়েটি।

মেয়েটির মেডিক্যাল রিপোর্ট সংক্রান্ত যাবতীয় হাজিরা থেকে শুরু করে আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের কথা বলা, সবকিছুতেই মেঘনা দিদিই ওর শক্তি। অভিযুক্ত মৃণ্ময়ের বিরুদ্ধে পকসো আইনে (Protection of Children from Sexual Offences Act) মামলা রুজু হয়। উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ সহ চার্জশিট জমা দেওয়া হয় যথাসময়েই। দীর্ঘ শুনানির পর সেই কেসেরই রায় দিয়েছে আলিপুরের অতিরিক্ত জেলা দায়রা আদালত । মৃণ্ময়ের ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডর নির্দেশ দিয়েছেন মাননীয় বিচারক। সঙ্গে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা। জরিমানা অনাদায়ে কারাদণ্ডের মেয়াদ বাড়বে আরও ১৮ মাস।আইন অনুযায়ী জরিমানার ৫০ শতাংশ টাকাই ক্ষতিপূরণ বাবদ যাবে নিগৃহীতা মেয়েটির কাছে। এছাড়াও, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মেয়েটিকে অতিরিক্ত ৩ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন মাননীয় বিচারক।

নিরলস পরিশ্রমে অপরাধীর শাস্তি সুনিশ্চিত করা মেঘনা লালবাজারের ডিডি অর্থাৎ ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্টে রয়েছেন ১২ বছর। ২০১২ তে পকসো আইন শুরু হওয়ার সময় থেকে স্পেশাল জুভেনাইল পুলিশ ইউনিটও শুরু হয়। ২০১৫ থেকে মেঘনা এই ডিপার্টমেন্টে যোগ দেন। আর ২০১৬ থেকে আরও অনেক কেসের সঙ্গে সঙ্গে এই কেসের দায়িত্বও নেন তিনি। তবে এখানে শুধু দায়িত্ব নয়, কাজ করেছে আরও অনেকটা গভীর বোধ। একজন মা, একজম মেয়ে, একজন মানুষের আবেগ অনেকটাই তাঁকে প্রেরণা দিয়েছে বরাবর, বলছেন মেঘনা।

Comments are closed.