রবিবার, অক্টোবর ২০

গারদ থেকে ফুটবল মাঠ, তৈরি হলো রূপকথা

অরিন্দম মুখোপাধ্যায়

ফ্ল্যাশব্যাক…. সাল ১৯৮০…..

ইটালির ফুটবলপ্রেমীদের কাছে যে সালটা মরীচিকার থেকে কম কিছু ছিলো না। বছর বছর ধরে গড়ে তোলা আজুরি ফুটবল ঐতিহ্যের গায়ে কলঙ্কের যে দাগ লেগেছিল, তাকে মেনে নেওয়া ইটালির সাধারণ মানুষের কাছে ছিলো ঈশ্বরের অভিশাপের থেকেও বেশী পীড়াদায়ক। উচিত এবং নির্মম শাস্তির কবলে প্রাণের ক্লাবদের পড়তে দেখে ভেঙে পড়েছিলো গোটা দেশ। এসি মিলান আর লাজিও রেলিগেটেড হয়ে গিয়েছিলো বি ডিভিশানে। পয়েন্ট ডিডাকশান হয়েছিলো অ্যাভেলিনো, বলোঙ্গা আর পেরুজিয়ার। আর…. একজন প্লেয়ার সাসপেন্ড হয়ে গিয়েছিলেন তিন বছরের জন্য।

উপরের গল্পটুকু পড়ে অনেকেরই মনে আসবে একটা করুণ পরিসমাপ্তির কথা। অপরাধের জালে জড়িয়ে গিয়ে এক খসে পড়া নক্ষত্রের কথা। সবার বিবেক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে কিন্তু…. কিন্তু বেরোবে না। কেন জানেন ?  কারণ প্রতিটা পদক্ষেপে জীবন ফুটবলের সাথে মিশে যায়। অনিশ্চয়তা নিশ্চয়তাকে তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে নিমেষে পরিবেশ পালটে দেয়, খসে পড়া তারাকে বানিয়ে দেয় ধ্রুবতারা। রাস্তা হারিয়ে ফেলা পথিককে পৌঁছে দেয় শ্রেষ্ঠত্বের দোড়গোঁড়ায়।

গুরুজান হ্যাপি নিউ ইয়ার সিনেমায় একটা কথা বলেছিলেন, যে জীবন প্রত্যেকটা হেরে যাওয়া মানুষকে অন্তত একটা সুযোগ দেয় বিজয়ীর আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। এখন সেই মানুষটার হাতে সে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে, না কি অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করবে বেড়ে চলা সমস্যাদের সামনে।

সেই অপরাধ জগতে তলিয়ে যাওয়া ছেলেটির সামনেও সুযোগ এলো, আর তা নিয়ে এলেন এক জাদুকর। হ্যাঁ, জাদুকরই বটে, গোটা দেশ যাকে তাচ্ছিল্য করেছিলো তিনি সেই ছেলের মধ্যে নায়ক হওয়ার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। জাদুকর যখন সেই ছেলেটিকে সাসপেনশন কাটিয়ে ওঠার পর দলে ডাকলেন, গোটা ইটালিয়ান মিডিয়াতে ঝড় বয়ে গেলো। এ কী করছেন তিনি একে বহু কষ্টে ততদিনে পরিবেশ সামলে এসেছে, কোথায় তিনি নতুন প্লেয়ারদের নিয়ে দল সাজাবেন, তা না করে তিন বছর প্র‍্যাক্টিশের বাইরে থাকা এক বখে যাওয়া ছেলেকে তুলে দিতে চাইছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের আক্রমণ ভাগের গুরুদায়িত্বে।

সাল ১৯৮২…

জাদুকর সেই ছেলের হাতেই তুলে দিলেন দায়িত্ব। বিশ্বকাপ শুরু হলো, গ্রুপ লীগের তিন ম্যাচেই ভীষণভাবে ব্যর্থ হলো সেই যুবক। আর্জেন্টিনাকে ২-১ এ কোনওরকমে হারালো দ্বিতীয় গ্রুপ রাউন্ডে। তখনও পর্যন্ত দলের খেলায় কোনওরকম প্রভাব রাখতেই ব্যর্থ সেই তরুণ। কিন্তু এবার বিপক্ষে ব্রাজিল। জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাও, জুনিয়রদের ব্রাজিল, যে ব্রাজিল কে বলা হতো সর্বকালের অন্যতম সেরা দল। শুরু হলো খেলা, আর পৃথিবী দেখলো ধুলোমাখা, অপরাধের ভারে জর্জরিত – কলঙ্কিত এক যুবকের রাতারাতি রূপকথার নায়ক হয়ে ওঠার গল্প, স্বপ্নের ব্রাজিলকে একা হাতে অনবদ্য হ্যাট্রিকের মাধ্যমে ধবংস করে দেওয়ার গল্প।

যে ছেলেকে দুদিন আগে পর্যন্ত টিমের বাইরে করার জন্য ঝড় তুলেছিলো ইটালিয়ান মিডিয়া, তাঁরই জয়গানে সেদিন মেতে উঠেছিলো তারা। ভাগ্য, অদৃষ্ট এভাবেই বদলে যায়। কেউ এসে বদলে দেয় না, নিজের ভাগ্যের দায়িত্ব তুলে নিতে হয় নিজের কাঁধে, পালটে ফেলতে হয় দৃষ্টিভঙ্গি আর করতে হয় সুযোগের সদ্ব্যবহার আর হয়ে যেতে হয় নায়ক, অপরাধের গলিপথ থেকে উঠে এসে দেশকে সম্মানের চরম সীমায় পৌঁছে দিয়ে ফেলে যেতে হয় নিজের ছাপ। এরপর পোল্যান্ডের সাথে সেমিফাইনালে জোড়া গোল করে দলকে ফাইনালে তোলা, তারপর ফাইনালে  জার্মানির সাথে  ৩-১ জয়ে প্রথম পেরেকটা পুঁতে দেওয়া। সবটাই যেন রূপকথা। এইভাবেই নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছিলো সেই যুবক। দেশকে সেরার আসনে বসিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলো সে। আর এই  দৃশ্য দূর থেকে দেখে  হেসেছিলেন একজন। সেই ম্যাজিশিয়ান।

জীবন বদলায়, ভাগ্য বদলায়, নিজেকে চেষ্টাও করতে হয় তার জন্য। তবে সব থেকে বেশী দরকার পড়ে সেই মানুষের যে তোমাকে জীবন পাল্টানোর সেই সুযোগটা দেবে, তোমার প্রতি বিশ্বাস রাখবে, তোমার ভুল ত্রুটি সারিয়ে দিয়ে তোমাকে নিয়ে যাবে পূর্ণতার শিখরে, করে তুলবে নিখুঁত। তাই এই জয় রূপকথার গল্প, এই জয় বিশ্বাসের গল্প, এই জয় দেখিয়ে দেওয়ার গল্প যে ইচ্ছেশক্তি সব কিছুকে হারাতে পারে, এই জয় বোঝার গল্প যে ঈশ্বর তার উপরেই ভাগ্যবৃষ্টি ঘটান যে কাদামাখা রাস্তায় চলার সাহস রাখে। এই জয় জীবনের গল্প, এক হেরে যাওয়া ছেলের জীবনের রাজা হয়ে ওঠার গল্প।

আর এক মানুষের গল্প, যাকে কেউ বিশ্বাস করেনি। ভরসা রাখেনি কেউ তার উপর। শুধু তিনি রেখেছিলেন নিজের আর নিজের সিদ্ধান্তের উপর। তাই সমালোচনায় বিদ্ধ সেই জাদুকরকে দেশে ফেরার পর ভালোবাসায় মুড়ে দেওয়া হয়।

আর তিনি আন্দ্রে বেয়ারজোট, আকাশের দিকে তাকিয়ে চুরুট টা মুখে নিয়ে মুচকি হাসেন, আর  বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়ে যান ফুটবলে কোচ শব্দের মাহাত্ম্য টা কী…

কিন্তু, ঐ যে পরিবর্তন, সে পিছু ছাড়ে না সহজে। কৃষ্ণ পক্ষের পর যেভাবে শুক্ল পক্ষ আসে, উজ্জ্বলতার আবহে মেতে উঠে মন ঠিক সেভাবেই আবার ফিরে আসে কৃষ্ণের ঘনঘটা। এভাবেই জীবন তার সমীকরণের ব্যালেন্স মেনটেন করে। সমান রেখে দেয় সুখ – দুখের দাঁড়িপাল্লা। তাই তো এইভাবে ঘুরে দাঁড়ানো, চারবারের চ্যাম্পিয়ানরা যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন না ২০১৮ র বিশ্বকাপে। কিন্তু… তবুও চেষ্টা করতে হয়, চেষ্টা করতে হয় ঘুরে দাঁড়ানোর। দাড়িপাল্লাকে সুখের দিকে ঝুঁকিয়ে দেওয়ার জন্য করতে হয় লড়াই। আর এই লড়াই আজুরিদের রক্তে সহবাস করে। তাঁরা ধসে যেতে থাকা ফুটবল সভ্যতাকে বাঁচিয়ে তোলে বিশ্বকাপের স্পর্শ দিয়ে, তাঁরা অ্যাটাকিং ফুটবলের জয়গানের দিনেও ক্যাত্তানেচিয়ো স্টাইলে ডিফেন্স দিয়ে রূপকথা লেখে, তাঁরা দেল পিয়েরো, ইনজাঘির আগে মালদিনিকে পুজো করে। তাই ঘুরে দাঁড়ানো, রুখে দাঁড়ানো তাঁদের মজ্জাগত। তাঁদের ছোঁয়াতেই ডিফেন্স হয়ে উঠেছিলো শিল্প, সেই তাঁদেরই আবার ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু। লড়াই শুরু আজুরি সভ্যতাকে আবার বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার, সমস্ত বাধাকে নিজেদের নিপুণ ডিফেন্স দিয়ে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার, ঠিক রোসির ঐ হ্যাট্রিকের মতোই….

Leave A Reply