শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

জল

সুজন ভট্টাচার্য

– আ রে সরযূ, তোর চেহারার হাল এ কী হয়েছে রে! মুখিয়ার বড়বউ নিজেই ওর উঠোনে এসে হাঁকডাক শুরু করেছিল দেখে সরযূ প্রথমে অবাক হয়নি। এমন অনেক ঘরের দেমাকি বউরাই ওর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। রাস্তায় মুখোমুখি হলে যারা ওকে চিনতেও পারে না, ঠ্যালায় পড়লে তারাই আবার এসে সাধাসাধি করে। মাইলদশেক হাঁটার পর পাদুটো খুব টনটন করতে থাকে। সরযূ তাই মেঝেতেই চিৎ হয়ে শুয়েছিল। মুন্নিও ঘুমিয়ে পড়েছে। অবশ্য ওকে আর দোষ দিয়ে লাভ কি? বয়েস তো সবে সাড়ে ছয়। ঘরে একা রেখে গেলে কোত্থেকে কী হয়ে যাবে ভেবে সরযূ রোজই ওকে সঙ্গে নিয়ে যায়। রাত শেষ হবার আগেই মায়েঝিয়ে উঠে হাঁটা লাগায়। মুন্নি আগে খুব বেগড়বাই করতো; উঠতেই চাইত না। তারপর খানিকবাদেই – মাঈ, কোলে নে, বলে ঘ্যানঘ্যান শুরু করে দিত। যতই মন খারাপ হোক, পাত্তা দিলে সরযুর চলবে না। তাই কখনো সোনামনা করে, আবার কখনো এক ধমক লাগিয়ে সরযূ ওকে দিয়ে ঠিক হাঁটিয়ে নিত।

সে অবশ্য বছরদেড়েক আগের কথা; জগমল হঠাৎই বেপাত্তা হয়ে গেল যখন। রেগিস্তানের বালিয়াড়ির মধ্যে এই ফোগেরা গ্রামে অবশ্য মরদদের দুমদাম হারিয়ে যাবার রেওয়াজ আছে। জগমল যেদিন বেপাত্তা হয়ে গেল, শেওয়ের থানায় দৌড়তেও সরযূ বাকি রাখেনি। জগমল পালিয়ে যাবার লোক নয়। গ্রামের অন্য মরদেরা ওকে তো জরুকা গোলাম বলে পিছনে লাগতো। অন্যবাড়ির বউরাও হিংসে করতো সরযূকে। নিশ্চয়ই কেউ কিছু করেছে।

– তোমার লজ্জা করে না? সরযূ সেদিন ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়েছিল জগমলকে। – রাজ্যের লোক তোমাকে টিটকিরি দেয়। তোমার ভাল লাগে?

– ধুর, ছাড় তো ওদের কথা। আরে, নিজের বিয়ে করা বউয়ের পিছনে লেগে থাকি। তাতে ওদের বাপের কী? ওদের মতো তো বাঈয়ের পিছনে দৌড়োই না।

– তাই যাও; আমি একটু দম ফেলে বাঁচি।

– আমি যদি বাঈকুঠিতে যাই, তুই সহ্য করতে পারবি? জগমল মুচলি হেসে বলেছিল।

জগমল যে কথার ফাঁদে ওকে আটকাচ্ছে বুঝতে না পেরে সরযূ দাঁতে দাঁত ঘষে বলে উঠেছিল – কাটারির এক কোপে তোমার মুন্ডুটা নামিয়ে দিয়ে নিজেও মরে যাব।

হোহো করে হেসে উঠে জগমল ওকে জাপটে উপরে তুলে ধরে বলেছিল – মুন্ডু তো আমি তোর পায়েই দিয়ে রেখেছি রে।

লজ্জায় জিভ কেটে সরযূ জগমলের চুলগুলো টানতে টানতে বলেছিল – এমন বললে আমার পাপ হয় না!

– হুম, তা হয় বটে। তাহলে এক কাজ কর। একটা চুমু দিয়ে দে। পাপ কেটে যাবে।

– যাও, বলে সরযূ নিজেকে জগমলের হাতের শক্ত বাঁধন থেকে ছাড়াবার চেষ্টা করেছিল। লোকটা এমনই। গাওনা বা রেয়াজ না থাকলে বউয়ের আশপাশেই ঘুরঘুর করবে। রাতে মদের ঠেকে যাবে না, ভবানী মন্দিরের পাশের সমাজে বসবে না।

জগমল ছিল আসলে গুণী কলাকার, ঢোলক ওর হাতে যেন কথা বলতো। ঢোলকের উপর ওর হাতের চাটি পড়লেই সবার পা যেন আপনা থেকেই নেচে উঠতে চায়। অবশ্য ফোগেরা গ্রামের মরদ মানেই কলাকার। কেউ গান গায়, কেউ বাজায় ঢোলক বা মন্দিরা; বাকিরা হল নাচনি। শাড়ি পরে মেয়ে সেজে, ঘোমটার আড়ালে গোঁফ লুকিয়ে নাচবে। থরের বালির ছোঁয়ায় ক্ষেতি এখানে হয় না বললেই চলে। হবে কোত্থেকে? একটা মকাই বা বাজরার চারা বানাতে জল লাগে না? আরে, ফোগেরায় মানুষেই জল পায় না, তো ক্ষেতি। তিনটে কুয়ো আছে বটে; কিন্তু জল নেই। বছরদশেক হয়ে গেল। উঁকি মারলে নিচের পাথরগুলো দাঁত ভেঙচে হাসে। তাই গ্রামের সমর্থ মেয়েরা ভোর হতে না হতেই মাথায় মটকার উপর মটকা সাজিয়ে হাঁটতে শুরু করে। একদল যায় আরাং, কেউ যায় আকালি, কেউবা শেও। ফোগেরায় মরদ মানেই কলাকার, আর মেয়ে মাত্রেই পানিকর। আর সেই জলটানার কাজে সরযূর ধারেকাছে কেউ নেই।

– তুই তো আমার জলপরীরে, রাতে পাদুটো দাবিয়ে দিতে দিতে জগমল বলতো। বলবে নাই বা কেন? আর সবার ঘরে যখন তেষ্টা পেলে বাড়তি একঢোক জল খাবার উপায় নেই; তখন জগমলের ঘরে মটকার পর মটকা জল সাজানো। খাবে তো খাও না! স্বামীর হাতে ডলাইমালাই খেতে খেতে সরযুও গরম শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলতো – যদ্দিন পারবো, তোমাকে জলে চুবিয়ে রাখব। তারপর যা হয় হবে। হবে আবার কী? একেকটা ঘরে লোকের লম্বা লাইন। যা জল আনে, নিজেদেরই কুলোয় না। ওদের ঘরে তো বাড়তি লোকের ঝামেলা নেই। জগমল, সরযূ আর মুন্নি।

– এবার আরেকটা পয়দা কর সরযূ, জলটানার রাস্তায় অনেকেই শলা দিত। হ্যাঁ, তোমাদের মাথা খারাপ হতে পারে; সরযূর হয়নি। আরেকবার পেটবাধানো মানেই নিদেনপক্ষে বছরদেড়েক জলটানা বন্ধ। তাহলে ঘর চলবে কি করে? জগমল বা ওর কথা বাদ দাও, মুন্নির কী হবে? আর সত্যি বলতে কি, ওর এই জল টানতে পারার জন্যই যে জগমল ওকে নিয়ে ডগোমগো হয়ে থাকে, সেটা কি সরযূ জানে না? একবার যদি পেট বাঁধিয়ে শুয়ে পড়ে, তাহলে জগমলকেও নতুন বৌ ঘরে নিয়ে আসতে হবে। নইলে জল আনবে কে?

ফোগেরার অনেক ঘরেই দুটো-তিনটে করে বউ। এ বছর একজন জল টানছে তো পরের বছর অন্যজন। যে ঘরে তিনচার ভাইয়ের বড় সংসার, তাদের অবশ্য এত ঝামেলা নেই। একসাথে চার বউই তো আর পেট ফোলায় না। বল দেখি সরযূরও কি সাধ হয় না, ঐ কটা দিনের শুয়েবসে থাকা একটু পরখ করে দেখে? মুন্নি হবার সময় ঢের শিক্ষা হয়ে গেছে। ওই অবস্থাতেও বাধ্য হয়ে জল টেনেছে ও। তখনো অবশ্য ঝারিকুয়োতে তলানি জল ছিল, যার খবর সরযূ ছাড়া আর কেউ রাখত না। কুয়োটা বাবলাগাছের জঙ্গলটার ভিতরে।  খুব একটা হাঁটতে হতো না। আর এদিককার জঙ্গলে তো আর জানোয়ার কিছু থাকে না। ভয় শুধু এক দুপেয়ে জানোয়ারদের। তারাও অবশ্য ঐ জঙ্গলের দিকে যায় না। আর সরযূ অন্ধকারে মিশে নিজের ঘরের পিছনের মাঠ ধরে ঠিক পৌঁছে যেত। মুন্নি হওয়ার আগেই ও এতটা জল জমিয়েছিল যে জগমলের কোন কষ্টই হয়নি। কিন্তু সে কুয়োও এখন সাফ হয়ে গেছে। ছাড় বাবা, অনেক হয়েছে।

জগমলও কখনো কখনো পাগল হয়ে উঠত। বাচ্চা ভোলানোর মতো করেই সামলাতে হতো সরযূকে। অন্য কোন মেয়ে হলে হয়ত আহ্লাদে গলেই যেত। হুম বাবা, সরযূ অনেক সেয়ানা। বৃষ্টি নামানো খেলাটার শেষে জগমল ক্লান্ত হয়ে মাথা নামানোর পর সরযূ ওর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলতো – আবার যদি মা হই, জল টানবো কোত্থেকে?

– আমি টানবো জল, জগমল গভীর শ্বাস ফেলতে ফেলতে উত্তর দিত।

– মরণ, সরযূ খিলখিল করে হেসে উঠতো লোকটার কথা শুনে। – আমিও পেট ফুলিয়ে ঘরে বসবো, আর তুমিও আরেকটা কচি মেয়ে ধরে এনে ঘরে ঢোকাবে।

কথাটা শুনেই জগমল ফোঁস করে উঠতো – মুন্নির সময়ে কি ছিলাম না?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে সরযূ বলতো – ঝারিকুয়োটা থাকলে আমিও আপত্তি করতাম না। আমারও কি সাধ হয় না, বলো?

বৌয়ের দূরদৃষ্টির কথা শুনে জগমল আবার ওকে জড়িয়ে ধরে নতুন করে জেগে ওঠার চেষ্টা করতো।

না, সুখ বেশিদিন কারো কপালেই সয় না। তাই যে ঘরে জল সাজানো থাকত, তার চালাটা পড়ল ভেঙে, আর মটকাগুলো ভেঙে চৌচির। গ্রামের মেয়েমরদ সব দৌড়ে এল সেই বানের টান দেখতে। জগমলের উঠোন ভেসে যাচ্ছে জলে। দুয়েকটা বাচ্চা সেই জলেই লাফ দিয়ে নেমে পড়ল শরীর ভেজাবে বলে।

– কোনো হারামির বাচ্চা চালাটা ভেঙে দিয়েছে। রাতে জগমল ফিসফিস করে বলেছিল। সারারাত ওরা দুজনেই শোয়নি। আজ খাওয়াও হয়নি। মুন্নি দুমুঠো পাকা মকাইয়ের দানা চিবিয়েছে শুধু। সেও মরার মতো ঘুমোচ্ছে। সরযূ মনেমনে শুধু হিসাব কষছিল, আর কটা মটকা বেশি নিলে কতদিনে জলের এই ঘাটতিটা ও মেটাতে পারবে। না, জলখরচায় এবার রাশ টানতেই হবে।

– কাল আরো দুটো মটকা এনে দিও। আর হ্যাঁ, এবার থেকে জল একটু বুঝেশুঝে খরচা করতে হবে।

জগমল কোন উত্তর দেয়নি। কিন্তু চারদিনেই কেমন যেন তিরিক্ষে হয়ে বলে উঠল – তুই দেখছি জল-জল করে পাগল হয়ে উঠলি।

সরযূ উত্তর দেয়নি। ঘরে জল না থাকলে কী হতে পারে, ওর থেকে ভালো আর কেউ জানে না। তাই কথা না বাড়িয়ে ও ঘরের নতুন জালাগুলোর উপর কাঠের পাটাতনটা কতটা শক্ত হয়েছে, সেটাই টেনেটেনে দেখতে শুরু করে। আচমকা জগমল ওর হাতে একটা টান দিয়ে বলে উঠল – কথাগুলো কানে যাচ্ছে না তোর?

যে কথা কানে নিয়েও কোন উত্তর খুঁজে পাওয়ার সুযোগ নেই, সেটা নিয়ে মাথা খারাপ করার কোন মানে হয় না। কাজেই সরযূও মাথা ঘামায়নি। সেদিন রাতেই জগমল প্রথমবারের মতো ভবানীমন্দিরের সমাজে পা রাখল। সরযূ অবাক হয়নি। জলে টান পড়লে এমনটাই হয়। রাতে কড়কে দিতে হবে। আরে, তোর ঘরে সরযূর মতো বউ রয়েছে। পারবে কেউ ওর সাথে জলের পাল্লা লাগাতে? এখন তুই ব্যাটা দ্যাখ, জল চাই, নাকি ফুর্তি।

রাতে জগমলই কথাটা পেড়েছিল। তার আগে অবশ্য সমাজে যাবার জন্য সরযূকে জড়িয়ে ধরে মাপটাপ চেয়ে নিয়েছে। সরযূও মেনে নিয়েছিল। মরদকে বেশি টেনে রাখতে নেই। নিজের মর্জিতে যতটুকু আছে, সেটাকেই একটু লোভ জাগিয়ে চাগিয়ে রাখতে হয়। বেশি টানতে গেলেই দড়ি ছিঁড়ে যায়। সরযূর বুকের উপর মুখটা রেখে জগমল বলল – এখান থেকে চলে যাই চল সরযূ।

এইবারে সরযূ সত্যিই অবাক হয়ে যায়। এই কদিনেই মাথাটা বিগড়ে গেল নাকি? তাই জগমলের মাথাটা উঁচু করে তুলে জিজ্ঞেস করল – কোথায় যাবে? থাকবে কোথায়? খাবে কী?

– যেখানে খুশি; বারমের হোক, জয়সলমীর হোক, কিংবা যোধপুর। যেখানে জল নিয়ে মারামারি করতে হয় না।

জল নিয়ে মারামারি হয় না, এমন জায়গা রেগিস্তানে আছে নাকি! – তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। যেখানেই যাও, মাথা গুঁজবে কোথায়?

– যেখানে হোক। দরকার হলে রাস্তায় পড়ে থাকব। শুধু একবার হ্যাঁ বল।

সরযূ ঠিক বুঝে ফেলে জগমলের মাথায় কোনো পেত্নী ভর করেছে। জল টানতে পারে বলেই না মেয়েছেলের কদর। আর জগমল কিনা সেই রাস্তাটাই বন্ধ করে দিতে চায়! নিজেকে সরিয়ে নিতে নিতে সরযূ তাই স্পষ্ট ভাষায় বলে দেয় – তুমি যেখানে খুশি যাও; আমি এখান থেকে নড়ব না।

না, জগমল আর কোনদিন কথা বাড়ায়নি। সমাজেও যেত না। আবার সরযূকে জড়িয়ে রাতটা পারও করতো না। শেষরাতে উঠে পড়ার সময় সরযূ খেয়াল করতো দেয়ালের উল্টোদিকের কোনায় জগমল গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। দেখে একেকবার ইচ্ছে হতো, লোকটার মুখেবুকে হাত বুলিয়ে দেয়। পরক্ষণেই খেয়াল পড়ে যেত, সামান্য দেরি হলেই কুয়োতে লম্বা লাইন লেগে যাবে।

জল টানতে টানতেই সরযূ খেয়াল করে জগমলের মুখটা যেন শুকিয়ে আসছে। কখনো কখনো কিসব যেন বিড়বিড় করে। পেত্নীই ভর করেছে নির্ঘাত।

ভবানীমন্দিরের বুড়ো পুজারী বিড়বিড় করে বলেছিল – তোরা কেউ ঠাকুর-দেবতা মানিস না; মন থেকে নৈবেদ্য দিস না। সেই পাপে এমন হয়ে যাচ্ছে তোর মরদ।

হাতজোড় করে মন্দিরের সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে সরযূ জিজ্ঞেস করে – কী করব বাবা?

পূজারী দাঁত বের করে বলে – মায়ের জন্য রোজ জলের বরাদ্দ করে দে বেটি; দেখবি তোর মরদ আবার ঠিক হয়ে যাবে।

একটা ছোট মটকা জল পাঠিয়ে দিলে জগমল যদি ঠিক হয়ে যায়, ওর আর আপত্তি কী? এই যে সরযূ রোজ মাথায় মটকার উপর মটকা সাজিয়ে জল নিয়ে আসে, সে কার জন্য? জগমলই যদি বিবাগী হয়ে যায়, তাহলে জল টেনে ওর কী লাভ? কিন্তু দু সপ্তাহেও হালগতি ফেরে না দেখে সরযূ আর মাথা ঠিক রাখতে পারল না। কুয়ো থেকে ফিরে সোজা চলে গেল মন্দিরে।

– জল এনেছিস বেটি? পূজারী একগাল হেসে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করে।

– আর জল হবে না। দু হপ্তা জল দিয়ে যাচ্ছি; লোকটা যেমন ছিল, সেই তেমন। জল কি মাগনায় আসে নাকি?

– আরে, এত জলদিবাজি করলে চলে? এত বছরের দোষ; কাটাতে সময় লাগবে না? মা ভবানী সব দেখছেন; ভক্তিভরে জল দিয়ে যা। সবকিছু আবার আগের মতো করে দেবেন।

– ধান্দাবাজি রাখো। আর জল পাবে না, বলে গেলাম। সরযূ হনহন করে হাঁটা লাগায়। কিন্তু সেইসময়েই মন্দিরচত্ত্বরে আরো কেউ যে ছিল, এবং মন্দিরে ওর জল দেবার রহস্য নিয়ে যে পূজারীর সাথে আর কারো আলাপ হয়েছে, সেটা টের পাওয়া গেল সেই রাতেই, আবার জল আনার রাস্তায়।

যথারীতি মাথায় মটকার উপর মটকা সাজিয়ে সরযূ যখন বেরিয়ে পড়ল, গোটা গ্রাম তখনো ঘুমে। বাকি মেয়েদের বেরোতে নিদেনপক্ষে আরো ঘন্টাদুই। ততক্ষণে সরযূর জলভরা সারা। ও যখন ফিরে আসে, রোদটা তখনো ভালো করে হাতপা মেলতে পারে না। ওর অবশ্য একটা সুবিধে আছে। অন্যদের মতো এসেই চুলা ধরাতে হয় না। খানিকক্ষণ শুয়ে থাকতে পারে। সে অবশ্য জগমলেরই বন্দোবস্ত। মেয়ে যদি উঠে পড়ে, ওই সামলে নেয়। নাহলে সরযূও পারতো নাকি, রাত থাকতে উঠে একাই হাঁটা লাগাতে?

ঘর থেকে বেরিয়ে ডানদিকে ঘুরে খানিকটা হাঁটলে একটানা বালির ঢিবি। ওটার মাথায় উঠে আবার সোজা নেমে এলে আর গ্রামের ঠিকানা দেখা যাবে না। ঢিবি থেকে নামবার সময় খুব সাবধান থাকতে হয়। পা হড়কে গেলেই সব শেষ। রোজকার মতই সরযূ পা টিপে টিপে নামছিল। ঢিবির একদম নিচের মাথায় যখন চলে এসেছে, তখন পিছন থেকে একটা মরদের গলা ফিসফিস করে বলে উঠল – সরযূ।

সরযূ চমকে উঠেছিল। কোন শুয়োরের বাচ্চা? শেষরাতে বেড়িয়ে এসেছে স্রেফ ওকেই পাকড়াবে বলে। অন্ধকারে ভালো করে বোঝাও যাচ্ছে না। তার উপর পাগড়ির শেষপ্রান্তটা মুখের উপর ফেলে রেখেছে। হতচ্ছাড়ার বাই চেপেছে, বোঝা যাচ্ছে। সরযূ দাঁড়িয়ে যায়। বাহাতে মটকাগুলো ছুঁয়ে ডানহাতটা ও কোমরে কাপড়ের বাঁধনের কাছে নিয়ে যায়। একটা খঞ্জর ও সবসময় রাখে। জগমলই এনে দিয়েছিল বিকানির থেকে।

খঞ্জরের হাতলটা নাগালে চলে আসতেই সরযূ আবার যেন সাহস ফিরে পায়। যে মেয়ে জল টেনে সংসার ভিজিয়ে রাখতে পারে, তার আবার ভয় কিসের? – কী চাই?

– সরযূ, লোকটা আরেকটু এগিয়ে আসে, – শুনলাম, জগমল নাকি তোকে ছেড়ে দিতে চাইছে। কোন চিন্তা নেই তোর। আমি তোকে শাদি করে নেব।

সরযূ অবাক হয়ে যায়। জগমল ওকে ছেড়ে দিতে চাইছে! হ্যাঁ, মাসখানেক লোকটার একটু উদাসউদাস ভাব। কিন্তু সরযূ ছাড়াও তো লোকটার চলে না।

– কোন হারামির বাচ্চা একথা রটাচ্ছে? সরযূর দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে।

– আরে রটাবে কেন? লোকটা আরেকটু কাছে এগিয়ে এল। – তুই রোজ ভবানীমন্দিরে জল দিস কেন, কেউ জানে না বুঝি? আমার কপাল খারাপ। নইলে তোর তো আমার সাথেই শাদি হবার কথা। তাহলে তোকে মাথায় করে রাখতাম রে।

হুম, হরমন। জানোয়ারের বাচ্চা। ঘরে দুটো বউ; আরেকটা চাই। এগুলো ঠিক তক্কে তক্কে থাকে। টের পেলেই ঘাই মেরে বসে।

– এটা দেখেছিস? কাপড়ের নিচ থেকে খঞ্জরটা বের করে সরযূ জিজ্ঞেস করে। – একটা কোপ লাগাব, আর তোর নলি দুটুকরো হয়ে যাবে শুয়োরের বাচ্চা। শাদি করার বাই চেগেছে না? তোর যন্তরটা কেটে হাতে ধরিয়ে দেব।

হরমন যে ঘাবড়ে গেছে বোঝা যাচ্ছে। দু পা পিছিয়ে গিয়ে বলল – আরে, একটা ভালো কথা বলতে এলাম; আর তুই কিনা খঞ্জর দেখাচ্ছিস! যাকগে। শোন, জগমল যদি তোকে ছেড়ে দেয়, আমি আছি, এটুকু মাথায় রাখিস। তোকে তো রাণী করে রাখব রে। কথাগুলো শেষ করতে করতেই হরমন দৌড় লাগায়।

সেদিন জল নিয়ে ফিরে এসে সরযূ দেখে রোজকার মতই জগমল ঘুমোচ্ছে। মুখটা হা হয়ে আছে। মটকাগুলো সাজিয়ে রেখেই সরযূ সোজা জগমলের গালে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দেয়। আকস্মিক আঘাতে জগমলের ঘুম ভেঙে গেলেও ঠিক বুজে উঠতে পারে না ব্যাপারটা কী হলো। তাই ঘুমজড়ানো চোখেই জজ্ঞেস করে – কী হলো আবার?

– হারামি, তুই আমাকে ছেড়ে দিবি বলেছিস?

জগমল যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। হাতের ভর দিয়ে শরীরটা খানিকটা তুলে আবার জিজ্ঞেস করল – তোকে ছেড়ে দেব? কে বলেছে এসব ফালতু কথা?

এবার আর সরযূ সামলাতে পারে না; হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে। ওর মুখটা জগমল নিজের বুকে চেপে ধরে। চোখের জলে ভাসতে ভাসতেই সেই খৈনির কড়া গন্ধটার সাথে সরযূ লেপটে যেতে থাকে। আর সেইসাথেই মনে হয়, আগেই যদি এমনটা করত, তাহলে আর ফালতু পূজারীকে জল দিতে হতো না।

– কিন্তু এভাবেও আমার আর ভাল লাগে না রে। সরযূর শরীরে তখন আবার জগমলের আঙুল তাল তুলে যাচ্ছে। – জল তুলেই তোর দিন চলে গেল। মুন্নিরও কি কপালে এটাই লেখা আছে?

সরযূ কোন জবাব দিতে পারে না। সত্যিই তো, মুন্নির কথা ওর মাথাতেই আসে না। চুপ করে ও জগমলের পিঠে আঙুল বুলিয়ে চলে।

তিনদিন পরে জগমলদের গাওনা ছিল রামসরে। দুদিনের গাওনা। রামসর এ চত্ত্বরের একমাত্র রেল স্টেশন। মাইলবিশেক দূর। সরযূ অবশ্য কোনদিন রেলগাড়ি দেখেনি। রেলগাড়ি বাদ দাও, এই যে বারমের শহর, সেটাও কি দেখেছে নাকি? ও শুধু চেনে আকালির কুয়ো। ঘর ছেড়ে যদি একদিনের জন্যও চলে যায়, তাহলে সেদিনের জল যে বরবাদ হয়ে যাবে। আর তারপর যদি ফিরে এসে দেখে সে কুয়োও সাফা হয়ে গেছে ঝারিকুয়োর মতই? না বাবা, জল না টানতে পারলে দিন চলে নাকি? রেলগাড়ি কি জয়শলমীরের গপ্পো ও জগমলের মুখ থেকেই শোনে।

উটেটানা লগবগে চাকালাগানো গাড়িটায় চেপে ওরা চলে গেল। ফোগেরা গ্রামের মোটামুটি সবকটা মরদই গেছে। বড় গাওনা। হাতে যে টাকা আসবে, সেই দিয়ে ওরা যে যার বাজার সেরে ফিরবে। ফোগেরাতে কোন বাজার বসে না; দোকান বলতে একটাই, মুখিয়ার। সেখানেও এমনকিছুই থাকে না। আর আছে বটে একটা মদের চালা। জগমল অবশ্য সেখানে যায় না। গাওনায় গেলে হয়তো খায়; সে অবশ্য সরযূ কোনদিন খোঁজ করেনি। যাই করুকগে, আসবে যখন মুন্নি আর ওর জন্য একজোড়া করে কাচের চুড়ি তো নিয়ে আসবে। তাহলেই হলো।

যেদিন ওদের ফেরার কথা সেদিনই হঠাৎ সকাল থেকেই মুন্নির ধুম জ্বর। কাপড়ে জল ভিজিয়ে কপাল আর হাতপা মুছেই সরযূর সময় চলে গেল। মুন্নি একটু ঘুমোলে চুলা ধরাবে ভেবেছিল। এমনই কপাল, মুন্নি আর ঘুমোতেই চায় না। ওকে জড়িয়ে ধরে সরযূও শুয়ে পড়েছিল। কি তাপ রে বাবা গায়ে; বাইরের হলকাকেও যেন হার মানিয়ে দেবে।

চোখটা যে কখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সরযূ আর টের পায়নি। ঘুম ভাঙল বাইরের আওয়াজে। জগমলের নাম ধরে কে যেন ডাকছে।

সরযূ ধড়মড় করে ঊঠে বসে। মুখিয়াজী। সরযূ কপালের ঘোমটাটা আরো নামিয়ে বেরিয়ে আসে – সে তো আপনাদের সঙ্গেই গেল। ঘরে তো আসেনি।

– আসেনি মানে? মুখিয়াজী যে খুব অবাক হয়ে গেছে টের পেতে সরযূর সমস্যা হলো না। – জগমল তো কালকেই চলে এল। টাকাও নিল না। তাই তো আমি এলাম।

লোকটা সত্যি সত্যিই হাওয়া হয়ে গেল। একবার মনে হয়েছিল, যে জীবনটা আর ভালো লাগছে না, সেখান থেকে পালিয়ে গেল একাই। আবার পরমুহূর্তে মনে হয়, যে একা পালাবে বলে ঠিক করে রেখেছে, সে আগের দিন বৌকে জড়িয়ে এমন পাগলামো করে নাকি!

গ্রামের আর সবাই মানা করলেও সরযূ একাই গিয়েছিল থানায়। শেওয়ের থানাবাবুরা জিপে ওকে বসিয়ে গ্রামেও এসেছিল। কিন্তু প্রথম রাতের গাওনার শেষে মদের ঝোঁকে হরমনের সাথে কথাকাটাকাটি ছাড়া অন্য কোন কিছু জানা গেল না। তারপরই গোঁ ধরে বসল ফিরে আসবে। মুখিয়া অনেক বুঝিয়েছিল। হরমন তো এমন কিছু বাজে কথা বলেনি। এটা তো ঘটনা, সরযূর মতো জল টানতে অন্য কোন মেয়েছেলে পারে না। তাহলে কেউ যদি একটু ঠাট্টা করে বলেই যে বৌয়ের পেচ্ছাপ খেয়েই জগমলের দিন চলে, তাহলে কি খুব অন্যায় কিছু হলো?

পুলিশ আশপাশে খোঁজও করেছিল। বালিয়াড়িতে কিছুই মেলেনি। লজ্জার মাথা খেয়ে সরযু থানাদারকে বলেই ফেলেছিল হরমনের ঘটনাটা। পুলিশ হরমনকে তুলেও নিয়ে যায়। না, কোন খবর পাওয়া গেল না। রাত কাটার আগেই অভ্যাসের বশে সরযূ আবার বেরিয়ে পড়েছিল। জল না আনলে চলবে! মুন্নিরও সেটাই শুরু। কিন্তু জল নাহয় তুলে আনা গেল; খাবে কী? যে জগমলের গাওনার টাকার ভরসায় সংসার চলতো, সেই তো লাপাতা। ঘরে যা ছিল, তা দিয়ে দিনতিনেক চলে গেল। তারপর? একটা দিন মা-মেয়ের পেট ফাঁকাই থেকে গেল। কী করবে, সরযূ যখন ভেবে পাচ্ছে না, ঠিক সেদিনই হাজির হলো ছোড়েনদাসের মেজবউ। ঘরে জল নেই; সরযূ একটু দিতে পারবে কিনা।

ব্যাস, নতুন ধান্দার সূত্রপাত হয়ে গেল। সরযূ এখন কলাকার গাওনাদারের বৌ নয়; সরযূ এখন পানিদার, নিজেই নিজের মালিক। যার ঘরে জলের টান সেই দাঁড়ায় এসে; কেউ টাকা নিয়ে আসে, কেউ বাজরা বা মকাই। না, জেল থেকে বেরিয়ে হরমন আর পিছনে লাগার সাহস করেনি। সাধারণভাবে বয়েস থাকলে এই গ্রামে কোন বিধবা বা স্বামী পালিয়ে যাওয়া মেয়ে বেশিদিন একা থাকে না। জলটানার কাজে লাগে বলে কেউ না কেউ ঠিক তুলে নিয়ে যায়। তবে সরযূকে কেউ প্রস্তাব দেবার সাহস পায়নি। যে মেয়ে নিজেই নিজের সংসার টেনে নেয়, সে আবার মরদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে কেন?

মুখিয়ার বড়বৌও নিশ্চয়ই জলের খোঁজেই এসেছে। মুখিয়া লোকটা এমনিতে খারাপ না। হরমনের ঘটনাটা জানাজানি হবার পর মুখিয়া নিজেই সমাজে বলে দিয়েছিল, কেউ যেন সরযূর দিকে খারাপ চোখে না তাকায়। আজ নিশ্চয়ই মুখিয়ার ঘরেও জলের টান লেগেছে। এমনিতে মুখিয়ার দুই বউ। বড় বউয়ের বয়েস হয়েছে; সংসার সামলায়। ছোটবউই জল টানে। তার আবার দেমাকের শেষ নেই। অবশ্য হবে নাই বা কেন? মুখিয়ার বউ বলে কথা। তার নাকি আবার পায়ে মোচড় লেগেছে কালকে। সরযূ অবশ্য দেখেনি। আজ ফেরার সময় শুনেছে। সাধে কি আর দৌড়ে এসেছে? হুহু বাবা, জলের টান, বড় টান।

– মুন্নি ঘুমোচ্ছে?

– হ্যাঁ, সরযূ উত্তর দেয়।

– তোর কথা ভাবলে রাতের ঘুম উড়ে যায় আমার। মুখিয়ার বৌ  দাওয়ায় বসে পড়ে। – আরে বোস না।

কথা না বাড়িয়ে সরযূ পাশে বসে। মুখিয়ার বউ আবার শুরু করে – আমার কিন্তু মনে হয় জগমল পালিয়েই গেছে রে। নাহলে দেড় বছরেও কোন খবর নেই!

সরযূর বিরক্তি লাগে। জল নিতে এসেছ, নিয়ে যাও। এত গাওনা কিসের আবার? বুঝেছি, তুমি দাম দেবে না। হ্যাঁ, মুখিয়ার কথা ভেবে এক মটকা না হয় এমনিই দেওয়া যায়। কিন্তু কেউ যদি ভাবে সেটাই বাঁধা বন্দোবস্ত হয়ে যাবে, তাহলেই মুশকিল। এত খাতির সরযূ কাউকে করে না।

– তোকে একটা কথা চুপিচুপি বলি। মুখিয়ার বড়বৌ খানিকটা কাছে ঘেঁষে আসে। তারপর ফিসফিস করে বলে – কাল রাতে ছোটবউয়ের দাদা এসেছিল। সে নাকি জগমলকে বারমের টাউনে দেখেছে। একটা পাকাবাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে। বোঝ তাহলে।

সরযূর বিশ্বাস হয় না। যে লোকটা বউ ছাড়া কিচ্ছু চিনত না, বউ গ্রাম থেকে চলে যেতে রাজি নয় বলে মনমরা হয়ে পড়ে থাকতো, সে একাই বারমের চলে যাবে? অসম্ভব। সরযূ চুপ করেই থাকে। কিন্তু মুখিয়ার বউ যেন কিছুতেই না বুঝিয়ে ছাড়বে না। – তোদের মুখিয়াজী তো শুনেই ক্ষেপে উঠল। ছোটবউয়ের দাদাকে বলে কিনা, চলো, কালই বারমের যাব; হারামজাদাকে কান পাকড়ে নিয়ে আসবো। এমন বউ ফেলে কিনা বারমেরে ভিক্ষে করতে গেছে? আর বউটা জল টেনেটেনে নাকাল হয়ে গেল!

– সে যদি সত্যিই নিজের ইচ্ছেয় চলে গিয়ে থাকে, আমার কী বলবার আছে? সরযূ দায়সারা ঢঙে উত্তর দেয়।

– ঠিকই তো। সে যদি নিজের কথা ভেবে পালিয়ে যেতে পারে, তুইই বা পুড়ে মরবি কেন?

সরযূ আবার পুড়ে মরছে কোথায়? ও তো জলে ভাসছে। কাজেই সরযূ কোন উত্তর দেয় না।

– কী চেহারা হয়েছে তোর এই ক’দিনে! মুখিয়ার বৌ ওর হাত চেপে ধরে। – একটু নিজের দিকে তাকা। এরপর কেউ কি তোর দিকে ফিরে তাকাবে?

ওর দিকে আবার ফিরে তাকানোর কী আছে? ওকি বিয়ের কনে যে সবাই ওকেই দেখবে? আর বছর আটদশ চালাতে পারলে মুন্নিটার হিল্লে হয়ে যাবে। তারপর আর ওকে পায় কে?

– বুঝিস না! গোটা গ্রামে তোর মতো আর একটাও কেউ আছে? তোর থেকে বুড়িরাও ঘর পেয়ে গেছে। মুখিয়ার বউ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে চলে – শুধু তোর দিকেই কেউ তাকায় না। বুঝেছিস কিছু? এখনো সময় আছে। নইলে পরে কিন্তু হাত কামড়াতে হবে।

– আমি বেশ আছি, সরযূ মুখ ঘুরিয়ে নেয়। – জল টেনে নিজে রোজগার করছি। আবার শাদি করলে তো বিনেপয়সায় জল টানতে হবে।

– দূর হতভাগী। এমনভাবে জল কতদিন টানতে পারবি? তখন? মুখিয়ার বউ যে রেগে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল, সরযূ বেশ বুঝতে পারে।

– সে তখন দেখা যাবে, সরযূ উঠে পড়বে ভাবে। এইসব ফালতু কথায় সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়! এর থেকে আরেকটূ শুয়ে থাকতে পারলে পাদুটো আরাম পেত।

– বড় দেমাক হয়েছে তোর না? মুখিয়ার বউ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর গম্ভীর গলায় বলে – ধর মুখিয়াজী আর সমাজ যদি ফরমান দেয়, যে ঘরের মরদ লাপাতা, সেই ঘরের মেয়েছেলে কুয়ো ছুঁতে পারবে না, তখন?

কথাটা শুনেই সরযূর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। তাহলে কি এমন কথা উঠেছে নাকি? ফোগেরা গ্রামের সমাজে উঠতে পারে না, এমন কোন কথা নেই। কিন্তু যদি সত্যিসত্যিই এমন হুকুম দেয় সমাজ? মেয়ে নিয়ে ও কোথায় যাবে? সরযূর মনে হল জগমলের বাপমা তুলে মনের সুখে গাল পাড়ে। মরেই যাক, আর ভেগেই যাক; আজ সেই জগমলের জন্যই সরযূকে এমন কথা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু তাকেই বা গালিগালাজ করে কী লাভ?  স্রেফ গায়ের জ্বালা মিটতে পারে, এই যা। না, সরযূ ফালতু কাজ করে না। তাই মুখিয়ার বৌয়ের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল – যে হারামি এমন হুকুম দেবে, তার গলার নলি কেটে ফেলে দেব।

মুখিয়ার বউ যেন চমকে উঠল। পরক্ষণেই দাওয়াতে বসে ওর হাত টেনে নিয়ে বলল – কজনের  নলি কাটবি? গোটা গাঁওয়ের সবকটা মরদের নলি কাটতে পারবি? গাঁওয়ে পুলিশ ঢুকিয়েছিলি তুই, ভুলে যাস না। অন্য যে কেউই কিন্তু আবার পুলিশ ডাকতে পারে।

– ডাকুক, সরযূ আবার গর্জে ওঠে।

– আমার কথা শোন সরযূ, মুখিয়ার বউ যেন মিনতি করে বলে, – মাথা ঠাণ্ডা রাখ। মেয়েটাও তো আছে নাকি! তুই নয় জেলে চলে গেলি; মেয়েটা কোথায় যাবে? নে, একটু জল দে দেখি; কথা বলে বলে গলাটা শুকিয়ে গেল।

রাস্তায় এসো বাপ, সরযূ মনেমনে বলে। একটু জল খাবে, বিনপয়সায়, তারজন্য এত বাহানা লাগে নাকি? ঘটিতে করে ও জল নিয়ে আসে। মুখিয়ার বউ হাতে ঘটিটা নিয়ে হাসতেহাসতে বলে – তোর জল এই প্রথম খাচ্ছি রে সরযূ। আরে, বোস না আমার পাশে। কেন, আমি কি অচ্ছুৎ নাকি?

সরযূ বাধ্য হয়ে মুখিয়ার বউয়ের পাশে বসে। হাতের ঘটিটা তুলতে তুলতে হাতটা হঠাৎ যেন আটকে গেল। তারপর ফিসফিস করে বলল – মুখাইন হবি নাকি রে সরযূ?

সরযূ চমকে গেল। এ কী কথা বলছে মুখিয়ার বউ! একটা দাঁতনড়া বুড়োর হয়ে সম্বন্ধ পাকাতে এসেছে কিনা তারই বড়বউ!!

– সরযূ, আমার বড় বিপদ রে, মুখিয়ার বউ যেন কেঁদেই ফেলবে, – ছুটকির পা ভেঙেছে। আর উঠতেই পারবে না কয়েকমাস। তাহলে জল টানবে কে? আমিও পারবো না; শরীরে নেবে না। তাহলে মেয়েদুটোকেই পাঠাতে হবে। সরযূ, তার থেকে আমার মরে যাওয়া ভালো।

এ কথার কী উত্তর দেবে সরযূ? কার বাড়িতে কে জল টানবে, সেটাও কি ওর দায়িত্ব নাকি? জল যদি টানতে নাই পারো, সরযূর থেকে কিনে নিয়ে যাও। ও তো দোকান সাজিয়ে বসেই আছে। কাজেই সরযূ কোন উত্তর দেয় না।

– আমায় বাঁচা সরযূ! তোর পায়ে পড়ছি। আমি যদি জল টানতে না পারি, মুখিয়া আরেকটা শাদি করে বসবে। ছুটকির বাচ্চাকাচ্চা নেই। কিন্তু তারও যে হবে না, সেটা কে বলে দেবে? তাহলে আমার মেয়েদুটো জলে পড়ে যাবে। মুখিয়ার বৌয়ের চোখ দিয়ে নেমে আসা জলের ধারাদুটো সরযূ স্পষ্ট দেখতে পায়। কী বলবে ও? মেনে নেবার কোন কারণ তো এমনিতে নেই। কিন্তু এই অসহায় বউটাকে কিভাবে না বলবে ও? এমন সধবা হবার থেকে ওর মতো স্বামীছাড়া থাকাও যে অনেক ভালো।

– সরযূ, মুখিয়ার বউয়ের গলাটা যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে মনে হলো, – তুই যদি মুখাইন হয়ে আসিস, আমার কোন ভয় নেই। তোকে আমি খুব ভালো করেই জানি। মুন্নির ক্ষতি হবে, এমন কিচ্ছু তুই করবি না। কিন্তু অন্য কেউ এলে … গলাটা কান্নায় বন্ধ হয়ে আসে।

বাইরের কথায় মুন্নির ঘুম ভেঙে গেছে। ঘর থেকেই ওর আওয়াজ ভেসে আসে – মাঈ!

নিজেকে সামলে নিয়ে মুখিয়ার বউ একটু জোরেই বলে – আয় মুন্নি, এখানে আয়। সেই ডাকে মুন্নিও বাইরে বেরিয়ে আসে। ওকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে মুখিয়ার বউ সরযূকে লক্ষ্য করে বলে – মেয়েটাও বেঁচে যাবে সরযূ। ওর কথা ভেবে একবার হ্যাঁ বল। জল না এলে আমার মেয়েগুলোও ভেসে যাবে রে। দয়া কর সরযূ। জল না এলে আমরা সবাই শেষ হয়ে যাব।

সরযূ কোন উত্তর দেয় না। শুধু মুখিয়ার বউয়ের হাতে ধরা ঘটিটার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। এই জলের জন্য একটা বউ তার স্বামীর হয়ে ঘটকালী করতে এসেছে!

– সরযূ, কিছু তো বল! মুখিয়ার বউ আবার কাঁদতে শুরু করে। হাতের ঘটিটা থরথর করে কাঁপছে। অন্যহাতে মুন্নিকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। কান্না ব্যাপারটাই খুব ছোঁয়াচে। তাই আদ্যোপান্ত কিছু না বুঝেই মুন্নিও হঠাৎই মাঈঈ বলে কেঁদে উঠল।

মুখিয়ার বউয়ের হাতেধরা ঘটিটা বেশ ভালো মতই কাঁপতে শুরু করেছে। মুখিয়ার বউ কাঁদছে; মুন্নিও। হাতের ঘটিটা উপচে যে জল বেরিয়ে আসতে পারে বোধহয় মুখিয়ার বউয়ের মাথাতেও আর আসছে না। বাইরের জল শুকিয়ে আসার সম্ভাবনা দেখা দিলে চোখের জলই তো একমাত্র ভরসা। তাতে সুরাহা না হোক, খানিকক্ষণের স্বস্তি তো মেলে।

ঘটির থেকে একফোঁটা- দুফোটা করে জল বেরিয়ে আসছে দেখতে দেখতে সরযূও টের পেল ওর চোখের কোলদুটো ভিজে যাচ্ছে। আহা, কতদিন কাঁদেনি গো ও! শুধু বাইরের জল টেনেই সব কান্না ভাসিয়ে দেবে বলে লড়ে যাচ্ছিল। এত ঠান্ডা হয় নাকি চোখের জল! ভাবতে ভাবতে সরযূও নিজেকে মিশিয়ে দিল জল-মহোৎসবের আসরে।

(সুজন ভট্টাচার্য্য গল্পকার হলেও প্রায় সমস্ত ধরণের লেখাই লেখেন। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘গগন ঢাকিরর রক্ত’ ও ‘উত্তরাধিকারী’)

 

Shares

Leave A Reply