শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

ঝুমকো

প্রমা চৌধুরী

রাত ১২.১টা, ২১/৫/১৮….
আলো জ্বলে উঠলো স্ক্রিনে, প্রতিবছরের মতো এবারেও কয়েকটা বাক্য… “শুভ জন্মদিন ঝুমকো। ভালো থাকার চেষ্টা টা এইভাবেই করে যাস, আজকাল বড্ড আলাদা লাগে, সাজতে শিখেছিস বেশ, যা আগে কোনোকালে পারতি না, আমি দেখি আর অবাক হই…যাকগে আনন্দ কর, ভালোবাসি, আজকের সাজে তোকে ক্যামন লাগছে তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম…টাটা”
ততক্ষণে ফোনে অলরেডি ১০ ১২ টা মিসডকল, হোয়াটস্যাপ, ফেসবুকের নোটিফিকেশনে ফোন উপচে পড়ছে…আর ঝুম ভেবেই চলেছে কি রিপ্লাই দেবে, শুধু “ধন্যবাদ,তুমিও ভালো থেকো” না অন্যকিছু। দুজনের অনন্ত ঘেন্না অনন্ত অদেখা, তবু এই মেসেজ টা না পেলে যেন ঝুমের জন্মদিন শুরুই হয়না…কেবল একটা ‘থ্যাংক ইউ’ লিখে চুপ করে রইল ঝুম, কিন্তু অপেক্ষা করতেই লাগলো যদি আরো একটা মেসেজ আসে, কিন্তু না….
আবার ফোন বেজে উঠলো, এবার ধরলো ঝুম, ওপারে কনফারেন্সে ৫ টা গলার আওয়াজ, তিতির, স্বপ্ন, রেণু, দীপ আর মুক্তক….সকলে হ্যাপি বাড্ডে, শুভ জন্মদিন, ভালো থাক, এই সেই বলছে কিন্তু সবাই কে থামিয়ে দিয়ে মুক্তক বলে উঠলো “১২টা থেকে ফোন করছি, ধরছিলি না যে, তার আগে অবধিও তো কথা হল…কি করছিলি?”
ঝুম রেগে উঠলো,”কি করবো? কি করার থাকতে পারে? এই দিনটাতেও তুই ভালো কিছু হতে দিবিনা বল? সেই তোর মুখ শুনেই শুরু করতে হবে… রাখছি আমি…” ওদিকে স্পষ্ট মুক্তকের গলার আওয়াজ “ঝুম ঝুম, শোন আমি সেভাবে বলিনি একটু শোন”….
ঝুম ফোন বন্ধ করে শুয়ে পড়ল সে রাতে, কিন্তু ভেবে চললো কি করে বুঝলো সহস্র দা? আমার সাজের বদল হয়েছে? কি ভাবে সম্ভব? ওকে যে সমস্ত জায়গা থেকে ব্লক করা, এমনকি বন্ধুদের প্রোফাইল থেকেও…তাহলে কি করে সম্ভব? এই ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়েই গ্যালো ঝুম।
সকালে ঘুম ভাঙতেই ও দেখলো ওর বিছানায় এত্ত বড়ো একটা লাল টেডি, ফ্লোরে বেলুন ভরতি, একটু হেঁটে যেতেই একটা বিশাল ছবি বাঁধানো ওর আর মুক্তকের…
খুশিতে কেঁদে উঠলো ও, কাল রাতে ওমন ব্যবহার করা টা ঠিক হয়নি তা সে ভালোই বুঝেছিল…তারপর সব মিটিয়ে নিয়ে ওরা চললো তিতিরের বাড়িতে ওখানেই বাকিটার আয়োজন…
ঝুম আজ লাল কালো হ্যান্ডলুমে, স্মোকি কাজল, অক্সিডাইজ, আর বড়ো ঝুমকো দুল, হুম ঝুমকো দুল যেই নামে…..যাকগে, কে আর দেখছে তাকে এখন সবটাই তো মুক্তকের জন্য…সমস্তটা শেষ হলে, মুক্তক পৌঁছে দিল ঝুমকে বাড়ি…ঝুম অপলক আয়নার সামনে বসে হাত দিয়ে বাজিয়ে যাচ্ছে কানের ঝুমকো টা…কানে বাজছে ওই কথা গুলো, ‘সাজতে শিখেছিস….’ ‘ অপেক্ষায় রইলাম….’
এবার সমস্ত টা বদলে ফোনটা নিয়ে বসল ঝুম, আবার একটা মেসেজ,”পছন্দ হয়েছে? উপহার টা?”
ঝুম উঠে বসলো এবার, মানে? উপহার? কিসের উপহার? ভাবতে ভাবতেই মুক্তকের ফোন। ও ফোন করেছে অন্য কারণে-
-চেঞ্জ করেছিস?
– হুম করেছি…
– বলছি দেখিস তো তোর কাছে আমার হেডফোন টা আছে কিনা, কোথায় রেখেছি মনে পড়ছেনা।
ঝুম ব্যাগটা খুলতেই একটা খাম তাতে লাল পাথর বসানো একটা বড়ো ঝুমকো, কিছু বকুল ফুল, আর একটা নোলক…
ওদিকে মুক্তক “কি রে পেলি হেডফোন টা? দ্যাখ না আমার নতুন হেডফোন, এই কদিন আগে কিনলাম দ্যাখ না বাবু, ওই…”
ঝুম বললো ” রাখছি!”
তিন বছর হলো সহস্র দার সাথে ওর সম্পর্ক নেই, গত দুবার আমাজন, ফ্লিপকার্ট থেকে ডেলিভারি এসেছে দুটো ঝুমকো,আর বই বা অন্যকিছু। কিন্তু এভাবে তো কোনদিন আসেনি, আর পেলাম কিনা তাও কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি সে, রাত ১২টার মেসেজ টার পর আবার ওদের কথা হত ডিসেম্বরের ৭ তারিখে রাত ১২টায়। সেবার মেসেজ টা ঝুম আগে করতো, সহস্র দার জন্মদিনে…তার মাঝে কখনো ভুলেও কেউ কাউকে কোনোভাবে যোগাযোগ করতো না…
এবারের ঘটনা টা খানিক অবাক করা…
একথা মুক্তককেও জানাতে পারেনি ঝুম কোনোদিন। ঝুমকোটা ঝুমের উইশলিস্ট করা ছিল…তারপর যতবার পড়েছে মুক্তক জিজ্ঞেস করেছে, ঝুমকোতে তোকে দারুণ মানায় কবে কিনলি? কোথা থেকে কিনলি?ঝুম উত্তর করেছে মা এনেছে…
বেশ কয়েকদিন বাদে, ঝুমের ফোন থেকে ফোন যাচ্ছেনা তাই মুক্তকের ফোন টা ব্যবহার করবে বলে ও মুক্তকের ফোন টা ন্যায়, তারপর হোয়াটস্যাপ টা খোলে তিতির কে একটা মেসেজ করবে বলে, খানিক টা স্ক্রল করতেই ঝুম খানিকক্ষণের জন্য চুপ, বাঁদিকের গোলে নীল পাঞ্জাবী পরা একটা লোকের ছবি, বুক টা ছ্যাঁত করে ওঠে ওর! চ্যাটটা ওপেন করতেই ঝুমের ছবি ভর্তি, এমন কি এই খানিক আগে তোলা ছবিটাও, জন্মদিনের ছবি, শাড়ি পড়া ছবি, সব ছবি…ঝুমের উইশলিস্টের ঝুমকোটার লিংক মুক্তকই সহস্র দাকে পাঠিয়েছিল… সহস্র দা এখন চেন্নাইতে, দেড় বছরের বিবাহিত জীবন… ওদের কথা হয় ওই দুটো দিন, মে এর ২১, আর ডিসেম্বরের ৭….বারংবার সিমে সমস্যা হওয়া সত্ত্বেও দুজনেই কেউ নাম্বার টা চেঞ্জ করেনি… আসলে কিছু জিনিস বদলালে অনেক কিছু মুছে যায় জীবন থেকে… মুক্তকের সাথে আগামী ১৯ শের বৈশাখে বিয়ে ঠিক হয়েছে ঝুমের…মুক্তক একটা সোনার ঝুমকো বানিয়েছে ঝুমের জন্য বিয়ের উপহার হিসেবে…মুক্তকও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে ঝুমকো তে ঝুম কে বেশ মানায়…

Shares

Leave A Reply