রবিবার, অক্টোবর ২০

বিহারে আছে আজব গ্রাম, সরকারি খাতায় যার নাম আজও ‘পাকিস্তান’

রূপাঞ্জন গোস্বামী

চল্লিশ বছর আগে কথা। বিহারের পূর্ণিয়া সদর থেকে এক সরকারি আধিকারিক আসেন শ্রীনগর ব্লক সংলগ্ন গ্রামগুলির অবস্থা জানতে। তখন বর্ষাকাল। কয়েক দিন ধরে পার্ষদ নিয়ে এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরে বিভিন্ন তথ্য নিয়ে ফিরছেন তিনি। অ্যাম্বাসাডরের জানলা দিয়ে নজরে পড়ে নদীর ওপারে, জল জমে থাকা দিগন্ত বিস্তৃত ধান জমির মাঝে একটা গ্রাম বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত দাঁড়িয়ে আছে। বেশ কয়েকটি খড়ে ছাওয়া বাড়ি দেখা যাচ্ছে ঝোপ ঝাড়ের আড়াল দিয়ে।

সরকারি আধিকারিকের হুঙ্কারে থামল অ্যাম্বাসাডর

আধিকারিক ফরমান দিলেন ওই গ্রামে যেতে হবে। কিন্তু তা কেমন করে সম্ভব! প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ছে, এই অবস্থায় নদী পার হতে হবে। সেই সময় নদীর ওপর কোনও ব্রিজ ছিল না। নদী পার হলেও গ্রামে পৌঁছাতে হবে জমির আল ধরে ধরে। আলগুলিও জলে প্রায় ডুবুডুবু! কোনও ওজর আপত্তি না শুনে, গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন বিশাল বপু আধিকারিক।

বললেন নদী পেরিয়ে হেঁটে তিনিই ওই গ্রামে যাবেন। গাড়িতে জুতো মোজা খুলে, ডিঙি নৌকায় নদী পেরিয়ে, গ্রামে যাওয়ার রাস্তা মানে আল ধরলেন নাছোড়বান্দা রাশভারি আধিকারিক। বেজার মুখে বসের সঙ্গ নিলেন পার্ষদরা। ঘেমে, নেয়ে, পা পিছলে, কাদা মেখে, দলটি দেড় ঘন্টার চেষ্টায় উঠল দ্বীপের মতো ভাসতে থাকা গ্রামে।

‘পাকিস্তান’ গ্রামের একটি অংশ

গ্রামটির মানুষদের দেখে অভিজ্ঞ আধিকারিক বুঝলেন এটি আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম। তিনি অবাক হয়েছিলেন এখানে সাঁওতালদের দেখতে পেয়ে। গ্রামটির নাম জিজ্ঞেস করলেন তিনি। উত্তর এলো, ‘পাকিস্তান‘। ‘অ্যাঁ’ চমকে উঠলেন আধিকারিক। তাঁর সঙ্গে মস্করা! আবার জিজ্ঞেস করলেন গ্রামের নাম। এবার উত্তর এলো, ‘পাকিস্তান টোলা“। আধিকারিক জিজ্ঞেস করেছিলেন, “গ্রামটির নাম পাকিস্তান কেন”?

গ্রামবাসীরা বলেছিলেন, তাঁরা জানেন না গ্রামটির নাম কীভাবে পাকিস্তান টোলা হলো। বহু বছর ধরে আশেপাশের গ্রামগুলির সবাই এই গ্রামকে চেনে পাকিস্তান নামে। টোলা শব্দটাও বলে না কেউ। শুধু বলে ‘পাকিস্তান’। একটি বাড়ির বারান্দায় ধপাস করে বসে পড়েছিলেন আধিকারিক। এরা বলে কী! কিন্তু সরল গ্রামবাসীদের মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছে না এরা মিথ্যে বলছে। ভারতের একটা গ্রামের নাম পাকিস্তান! ভারতের চিরশত্রুর নামে গ্রাম! না এ চলবে না। কোনও মতেই না।

পাকিস্তান টোলার এক সাঁওতাল পরিবারের বাড়ি

হুঙ্কার ছাড়লেন আধিকারিক। গ্রামের নাম পাল্টাতে হবে। পাল্টাতেই হবে। বসে বসে তিনি ভেবে ফেললেন গ্রামের একটা নাম। সেটা চেঁচিয়ে ঘোষণা করেও দিলেন। সবাইকে আজ থেকে গ্রামের এই নামটা বলতে হবে। সরকারি সঙ্গীদের বললেন। কাগজে কলমে গ্রামের নাম এটাই লিখতে হবে। কিন্তু কী নামটা বলেছিলেন সেটাই আজ আর কারও মনে নেই। কারণ নতুন নামটা সরকারি খাতাতে ওঠেনি। কারণ উনি বদলি হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে ‘পাকিস্তান টোলা’ রয়ে গেছে পাকিস্তান নামটি নিয়েই। এমনকি সরকারি খাতাতেও। আজও।

কেন হলো এমন  আজব নাম!

বিহারের পূর্ণিয়া জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে শ্রীনগর ব্লক। সেই ব্লকের সিঙ্ঘিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে আছে এই গ্রাম ‘পাকিস্তান টোলা”। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে এই গ্রামে বাস করত বহু মুসলিম পরিবার। গ্রামটির আশেপাশের জমিগুলিও ছিল তাদের। কিন্তু দেশভাগের পর পূর্ণিয়া জেলাটি পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশের গায়ে পড়ে যাওয়ার জন্য, এই গ্রামের সবকটি মুসলিম পরিবার চলে যায় বাংলাদেশ বা পূর্ব পাকিস্তানে।

এই গ্রামটি থেকে পূর্ব-পাকিস্তানে চলে যাওয়া মুসলিম পরিবারগুলির সঙ্গে ও পূর্ব-পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা হিন্দুদের মধ্যে সম্পত্তি বদলাবদলি হয়। এই গ্রামে এসে ওঠেন বহু সাঁওতাল পরিবার। যেহেতু এই গ্রামের সাবেক অধিবাসীরা পাকিস্তান (পূর্ব) চলে গেছেন। তাই এই গ্রামের নাম হয়ে যায় ‘পাকিস্তান টোলা’। সরকারি খাতাতেও। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এটা সত্যি, গ্রামটির নাম পরিবর্তনের কোনও চেষ্টা হয়নি কোনও দিন।

স্বাধীনতার এত বছর পরেও উন্নয়নের অভাবে ধুঁকছে বিহারের পাকিস্তান

আধিকারিক সাহেব যে ছোট নদী নৌকাতে পেরিয়েছিলেন, তার ওপর একটি ব্রিজ হয়েছে বটে। কিন্তু বিহার সরকারের উন্নয়নের রথ পাকা রাস্তা দিয়ে সিঙ্ঘিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে ঢুকে পাকিস্তান টোলার কাছে এসে থমকে গেছে। সংকীর্ণ একটি কাঁচা রাস্তা এগিয়েছে পাকিস্তানের দিকে। যে রাস্তায় সামান্য অসতর্ক হলেই দুর্ঘটনা অনিবার্য।

গ্রামের একমাত্র দর্শনীয় বস্তু চার দশকের পুরোনো এই টিউবওয়েল

১৯৪৭ সালের পরে এই গ্রামে একঘরও মুসলিম নেই।যাঁরা আছেন তাঁরা সবাই হিন্দু। সবাই সাঁওতাল। জনসংখ্যা ৩০০। অত্যন্ত গরিব গ্রাম। ন্যূনতম সুবিধা নেই। বিদ্যুৎ, পানীয় জল, রাস্তা, স্কুল হাসপাতাল দূরের কথা, শিক্ষার হার মাত্র ৩৫.৫১%। আজও এই গ্রামে একটিও টেলিভিশন সেট নেই। কারও মোবাইল নেই। বর্ষার সময় গ্রামটি আজও সভ্যতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

দুঃখের বারমাস্যা

পাকিস্তান টোলার বাসিন্দা গুরু বেসরা, ঘুটের মর্মু, দুল্লা টুডু, সুফল হাঁসদা, জাড্ডু টুডু, সীতা দেবীরা গ্রামে উপস্থিত হওয়া সংবাদমাধ্যমদেরকে জানিয়েছিলেন, তাঁদের ছেলে মেয়েরা পড়তে চায় কিন্তু উপায় নেই। তাই আজও বেশিরভাগ গ্রামবাসীই অশিক্ষিত। কারণ কাছাকাছি কোনও স্কুল নেই। আড়াই কিলোমিটার দূরে সিঙ্ঘিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের সেকেন্ডারি স্কুল। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশুনা হয় সেই স্কুলে। স্কুলে যাওয়ার রাস্তাটি রীতিমতো বিপজ্জনক। ক্লাস এইটের পর পড়াশুনো করলে যেতে হবে ১২ কিমি দূরে, শ্রীনগর টাউনে। তাই পড়াশুনায় ইতি হয় কয়েক ক্লাসের পরেই।

সংবাদমাধ্যমকে দেখলেই মুখে ফুটে ওঠে বিরক্তির চিনহ

সেই গ্রামের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ ১৫ বছরের এক কিশোরী। নাম তার দেসিকা হাঁসদা। পঞ্চম শ্রেণীতেই পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে। সে হিন্দি লিখতে ও বলতে পারে। যখন দেশে বড় কিছু ঘটে বলে গ্রামবাসীরা খবর পান গ্রামের কেউ শহরে গিয়ে হিন্দি কাগজ কিনে আনেন। দেসিকা কাগজ পড়ে বিষয়টা তার কল্পনা মতো ব্যাখ্যা করে দেয়।

কাছাকাছি কোনও হাসপাতাল বা প্রাইমারি হেলথ সেন্টার না থাকাও পাকিস্তান টোলার আরেকটি বড় সমস্যা। যদি কেউ মাঝরাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন, সকাল পর্যন্ত গ্রামবাসীদের অপেক্ষা করতে হয় শহরে পাঠানোর জন্য। তাতেও হয় সমস্যা। কারণ গ্রামে গাড়ি যাওয়া আসার রাস্তাই নেই। গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে খারাপ রাস্তার জন্য অটোওয়ালারা গ্রামে আসতে চান না।

রাস্তার প্রকল্প উদ্বোধন হয়ে থমকে আছে গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দূরে

কৃষিই এই গ্রামের আয়ের একমাত্র পথ। তবুও কৃষিতে সরকারি সাহায্য মেলে না। বীজ, সার বাজার দরে কিনতে হয়। যেটা গ্রামবাসীরা ব্লক থেকেই পেতে পারতেন ভর্তুকি দেওয়া দামে। ধান, গম, ভুট্টা ফলান পাকিস্তান টোলার বাসিন্দারা। নিজেদের খাওয়ার জন্য রেখে বাকিটা বিক্রি করেন। যা ফসল ফলান তা বাধ্যতামূলক ভাবে বেচতে হয় ব্যবসায়ীদের। তারা ঘোড়ায় টানা গাড়ি নিয়ে আসে। ফসল জলের দরে কিনে নিয়ে যায়। সেই ফসল পূর্ণিয়ার হোলসেল মার্কেট  গুলাববাগ মাণ্ডিতে বেচে। গুলাববাগ মাণ্ডিতে গিয়ে সরাসরি ফসল বেচার ক্ষমতা নেই গ্রামবাসীদের।

নিজের দেশে পরদেশী হয়ে বাঁচছেন এই মানুষগুলি

তাই আজও পাকিস্তান টোলার ছিটেবেড়ার বাড়িগুলিতে রাতে টিম টিম করে জ্বলে কেরোসিনের বাতি। আজও পাকিস্তান টোলার বাসিন্দারা কাঠ পাতা কুড়িয়ে তা দিয়ে রান্না করেন মাটির উনুনে। বিহারের ভয়ঙ্কর গ্রীষ্ম কাটান এক চিলতে দখিনা বাতাসের আশায়। বেঁচে থাকেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের যুথবদ্ধ আদিম মানবদের মতো।

দেশে সরকার পাল্টায়। রাজ্যে সরকার পালটায়। যুগের পর যুগ দিনের বেলাতেই অন্ধকারে ডুবে থাকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো  গ্রাম,’পাকিস্তান টোলা’। পাকিস্তান নামেই কি আছে অভিশাপ, যার খেসারত দিচ্ছেন ৩০০ উপেক্ষিত ভারতীয়!

Comments are closed.