শচীন পাইলট কি বিজেপি পজিটিভ? রাজনীতির নবীন প্রজন্ম এত অস্থির কেন!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শঙ্খদীপ দাস

    উনিশের ভোটের পর থেকেই মরুরাজ্যে অস্থিরতার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটের সঙ্গে উপ মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজস্থান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শচীন পাইলটের বনিবনা হচ্ছে না বলে তখন থেকেই গুঞ্জন গোলাপি শহরে। মতান্তরের কারণ কী? ইনিয়ে বিনিয়ে তা সে অনেক রকম। কিন্তু মুখ্য কারণ হল শচীন মুখ্যমন্ত্রী হতে চান।

    রাজনীতিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা অমূলক নয়। উপরি শচীন পরিশ্রমী। চোদ্দোর লোকসভা ভোটে রাজস্থানে প্রবল গেরুয়া ঝড়ে সাবেক কংগ্রেস যখন খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিল, তার পর এই তরুণ নেতার উপরেই আস্থা রেখেছিলেন সনিয়া-রাহুল। রাজস্থান কংগ্রেসের সভাপতি করেছিলেন তাঁকে। আঠেরো সালে বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস রাজস্থান পুনর্দখল করার পর থেকেই গোল বাঁধল। মুখ্যমন্ত্রী পদে কংগ্রেস হাইকম্যান্ড বেছে নেয় বর্ষীয়ান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটকে। শচীনকে করা হয় উপ মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে রাজস্থান প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি পদেও বহাল রাখা হয় তাঁকে।

    কিন্তু একদা রাজীব গান্ধীর বন্ধুস্থানীয় প্রয়াত রাজেশ পাইলটের পুত্র শচীন এতটাই অধৈর্য কে জানতেন! তাঁকে এখনই মুখ্যমন্ত্রী হতে হবে। জাতীয় রাজনীতিতে গত আট বছরের গতিপ্রকৃতি বলছে, এ সব মওকা গেরুয়া বাহিনী হাতছাড়া করে না। ফলে মধ্যপ্রদেশে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে ঠিক যে ভাবে হাতছানি দেওয়া হচ্ছিল, তেমনই নকশা দেখা যাচ্ছিল রাজস্থানেও। উপরি দিল্লির একশ্রেণির সর্বজ্ঞানী সাংবাদিক কুলের আহ্লাদ, আস্কারা তো রয়েছেই। যাঁরা অহোরাত্র বুঝিয়ে গিয়েছেন, রাজস্থানের রাজনীতিতে এমন মেধা গত বিশ বছরে আসেনি। তাঁর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া উচিত।

    সম্ভবত সেই কারণেই মাথা ঘুরে গিয়েছে এই তরুণ গুর্জর নেতার। বলে রাখা ভাল, জাতপাত প্রভাবিত রাজস্থানের রাজনীতিতে গুর্জর কুলের ভোট সীমিত। শচীন যে অবিসংবাদিত গুর্জর নেতা তাও নয়। তা ছাড়া রাজস্থানের রাজনীতিতে অশোক গেহলট দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া নেতা। বহুবারের মুখ্যমন্ত্রী। অভিজ্ঞতাতেও প্রবীণ।

    সে যাক। রাজস্থান এখন অস্থির। আর সেই অস্থিরতার মূল চরিত্র এখন শচীনই। যিনি দাবি করছেন, তাঁর সঙ্গে ত্রিশ জন বিধায়ক রয়েছেন। অর্থাৎ প্রচ্ছন্ন হুমকি এই যে, চাইলে রাজস্থানের গদি উল্টে দিতে পারেন তিনি। বড় কথা হল, রবিবার সারাদিন চেষ্টা করেও শচীনকে ফোনে পাননি কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা। কাল সোমবার রাজস্থানে বিধানসভার কংগ্রেস পরিষদীয় দলের বৈঠক ডাকা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত খবর, সেই বৈঠকে উপস্থিত নাও থাকতে পারেন শচীন।

    প্রশ্ন হল, তা হলে কি জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার মতই বিজেপির পথে শচীন? তিনিও কি বিজেপি পজিটিভ?

    এ ব্যাপারে রাজেশ পাইলট পুত্র নিজে স্পষ্ট করে কিছু উত্তর দেননি। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠরা ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে বলছেন, সেই সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আর বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ঘরোয়া আলোচনায় বলছেন, দলীয় তরফে এখন এ বিষয়ে কিছু বলার পরিস্থিতি আসেনি।

    পরিস্থিতি যখন এমনই, তখন দেখা যাচ্ছে রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় টিভির পর্দা খুব গরম। নয়াদিল্লির এক শ্রেণির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক, যাঁরা মনে করেন দেশের রাজনীতির দিশা ও দশা নির্ধারণের ভার বুঝি তাঁদের উপরেই, যাঁরা পরস্পরের পিঠ চাপড়ে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা রাখতে ব্যস্ত, তাঁরা আলোচনায় বসে সপাটে রায় দিচ্ছেন— শচীনের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। কংগ্রেস হাইকম্যান্ড অবিচার করেছেন এই তরুণ নেতার সঙ্গে। এবং তরুণ নেতৃত্বকে কীভাবে দলে জায়গা করে দেওয়া উচিত সেটাও তাঁরা বাতলে দিতে চাইছেন।

    নিঃসন্দেহে বলে দেওয়া যায়, এই আলোচনা ও মতবাদ একপেশে। অন্য দিকটা এখানে অমিল। সে কথা আলোচনার জন্য অনেকটা পিছনে হেঁটে যেতে হয়। তা করলে দেখা যায়, ভারতীয় বায়ুসেনার পাইলট রাজেশ্বর প্রসাদকে হাত ধরে কংগ্রেস রাজনীতিতে নিয়ে আসছেন রাজীব গান্ধী। তার লোকসভা ভোটে জেতা এবং প্রথমে কেন্দ্রে ভূতল পরিবহণ মন্ত্রী হওয়া ও পরে টেলি যোগাযোগ মন্ত্রকের দায়িত্ব পাওয়া— কংগ্রেসের রাজনীতিতে রাজেশের উত্থান উল্কার মতই হয়েছে। পরে ২০০০ সালে জয়পুরের কাছে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় রাজেশের মৃত্যু হয়।

    রাজেশের মৃত্যুর ঠিক তিন বছর পর ২০০৩ সালে রাজস্থান বিধানসভা ভোটে ঝালওয়ার আসন থেকে তাঁর স্ত্রী রমা পাইলটকে প্রার্থী করে কংগ্রেস। শচীনের রাজনীতিতে হাতেখড়ি তখন থেকেই। মায়ের হয়ে প্রচারে নেমেছিলেন তিনি। বয়স তখন মাত্র ২৫ বছর। পরের বছর ২০০৪ সালে রাজস্থানের দৌসা লোকসভা কেন্দ্র থেকে তাঁকে প্রার্থী করেন সনিয়া গান্ধী। সে বার দৌসায় পড়ে থেকে তাঁর জন্য প্রচার করেছিলেন গেহলট। ড্যাংড্যাং করে জিতে যান শচীন। পাঁচ বছর পর ফের দৌসা থেকে নির্বাচিত হন তিনি। এবং মাত্র ৩২ বছর বয়সেই তাঁকে মনমোহন মন্ত্রিসভায় টেলি যোগাযোগ দফতরের প্রতি মন্ত্রী পদের দায়িত্ব দেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। তিন বছরের মধ্যেই মন্ত্রিসভায় পদোন্নতি হয় সচিনের। ২০১২ সালে তাঁকে কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রকেরও স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী করা হয়।

    বর্তমান আলোচনার জন্য এটুকু তথ্যই যথেষ্ট। কেন না সনিয়া-রাহুলের নেতৃত্বে কংগ্রেসে যে নতুন প্রজন্ম সুযোগ পায়নি সেই ভ্রম ও ধারণা এতেই ভেঙে যাওয়ার কথা। শুধু তা নয়, রাজেশের মৃত্যুর পর দশ নম্বর জনপথ এবং মনমোহন-প্রণবদের থেকে পর্যাপ্ত স্নেহ ও উৎসাহও পেয়েছেন শচীন।

    প্রশ্ন হল, এত কিছু পাওয়ার পরেও মাত্র ৪২ বছর বয়সে কোনও তরুণ নেতার এতটাই অধৈর্য হয়ে ওঠা কতটা সঙ্গত? রাজস্থানে যদি দু’জন সচিন পাইলট থাকতেন, অর্থাৎ তাঁর সমতুল যোগ্যতার কোনও নেতা থাকতেন তা হলে কী করতেন রাজেশ-পুত্র? এটাই যদি নিয়ম হয়, তা হলে একজন পদ পেলেই তো অন্যজন দল ছাড়বে বা বিদ্রোহ করবে। পাইলটের অনুগামীরা বলতেই পারেন, শচীনের যোগ্যতা রয়েছে বলেই তাঁর উত্থান হয়েছে। কিন্তু তার পাল্টা তর্ক ও যুক্তিও তো কংগ্রেসে রয়েছে। শচীনের সমান বা বেশি যোগ্যতার অনেক নেতাও তো কংগ্রেসে রয়েছেন। যাঁরা পরিশ্রম করা সত্ত্বেও এতটা মর্যাদাও পাননি। তা হলে কি সবাই বিদ্রোহ করেছে, নাকি কংগ্রেস ছেড়ে দিয়েছে?

    সর্বোপরি একটা প্রশ্ন থেকে যায়। তা হল রাজনৈতিক মতাদর্শগত ফারাক। আপাত ভাবে কংগ্রেস আর বিজেপির মধ্যে অর্থনৈতিক দর্শন ও বিদেশ নীতিতে বড় মতান্তর নেই। মূল ফারাক হল রাজনৈতিক মতাদর্শের। ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রবাদের তথা হিন্দুত্বের রাজনীতির। কংগ্রেসের কোনও তরুণ নেতা স্রেফ মুখ্যমন্ত্রীর পদ পাননি বলেই যদি বিজেপি-র দিকে পা বাড়ান বা বিজেপির কোনও নেতা মুখ্যমন্ত্রী হতে না পেরে রাতারাতি কংগ্রেসে যোগ দেন, তা হলে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা রইল কই। এই তরুণ প্রজন্মের নিজ নিজ রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি এটুকু নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা না থাকলে ভবিষ্যতের ভারতের জন্য এঁরা কতটা উপযুক্ত।

    যে নেতা কংগ্রেস নেতৃত্বের বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে পারেননি, তিনি অন্য দলে গিয়ে সেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিশ্বাসভাজন হয়ে থাকতে পারবেন তো! নাকি আরও বড় কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য কোনও দিন সেই দলও ছেড়ে দেবেন!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More