বুধবার, মার্চ ২০

প্রথম দিন থেকেই জানতাম আমাকে নিয়ে আলোচনা হবেই

আদ্যন্ত অন্যরকম তিনি। যেমন অন্যরকম তাঁর গানও। প্রথমে তাঁকে গায়ক বলে মেনে নিতে চাননি অনেকেই। ৯৪ সালের প্রথম অ্যালবাম থেকে দীর্ঘ পঁচিশ বছরের পথ পেরিয়ে এসেছেন শিলাজিৎ। আজ তিনি শুধু গায়ক নন, একই সঙ্গে অভিনেতা, সঙ্গীত পরিচালকও বটে। তাঁর সঙ্গে কথা বললেন মধুরিমা রায়।

‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’তে সঙ্গীত পরিচালনা করলেন। এ বার কি তবে মুম্বাইতে পাড়ি?

জাতীয় স্তরের কাজ করার ইচ্ছে নিশ্চয়ই আছে। তবে সেই আকাঙ্খা খুব যে তাড়া করে বেড়ায় তেমন কিন্তু নয়। অন্যান্য ভাষার গানের এই যে ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে সর্বোচ্চস্তরে পৌঁছে যাওয়ার একটা সহজাত ধরন রয়েছে, বাংলা গানের ক্ষেত্রে তেমন নয়। অর্থনৈতিক বাধা রয়েছে। জনসংখ্যা অনুযায়ী আমাদের বাংলা গান কম হওয়ার কথা নয়। তবু পাঞ্জাবি বা ইংরেজি গান যতটা জনপ্রিয়তা পায়, যতটা ছড়িয়ে পড়ে আমরা সেটা পারি না। তা ছাড়াও আমরা বাঙালিরা বাংলা ভাষাকে বড্ড বেশি অসম্মান করি। এই প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই বাংলা গানকে এগোতে দেয় না।

নয়ের দশকে প্রথম অ্যালবাম। ২৫ বছর পর ফিরে তাকালে কী মনে হয়?

প্রথম অ্যালবাম বাজারে এসেছিল ‘৯৪ সেপ্টেম্বরে। অথচ সেই অ্যালবামের প্রস্তুতি ছিল আরও দশ বছর আগে থেকেই। সেই’৮৪-৮৫ সাল থেকে। তারপর এই এতগুলো বছরে কতটা বদলেছি সেটা জানি না। সেদিন যা ছিল সেটাই আরও বেশি প্রকট হয়েছে। সেটা ভালো নাকি খারাপ বলতে পারব না। বাধ্য হয়ে আমি কিছুই করি না। বলতে পারো, কিছুটা অবাধ্য হয়েই করি। এই পঁচিশ বছর পর নিজেকে গায়ক বা অভিনেতা হিসেবে পরিচয় দিতে একটু হলেও ভরসা পাই। আগে সেই ভরসাটা ছিল না।

কিন্তু সেদিনের শিলাজিৎকে যে লোকে ‘ননসিঙ্গার’ বলত।

আমার গানের ধরনটাই অ্যাকসেপ্ট করতে পারেনি অনেকে। আমার নিজের কিন্তু মনের কথা ব্যক্ত করার জন্য সহজ নোটই ভালো লাগত। মনে হত সেভাবেই কবিতার থেকে সহজ করে বলা যায়। জীবন্ত করে বলা যায়। অনেকে আমার সেই চিন্তাটাকে মেনে নিতে পারেননি। সৃষ্টির ক্ষেত্রে, চিন্তার ক্ষেত্রে অনেক মানুষের সীমাবদ্ধতা থাকে। রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া গান হয় না। বা হয়ত রক ছাড়া অন্য কোনও গান, গান নয়। ভাবতেই পারে না যে তাদের চিন্তার বাইরে কোনও কিছু হতে পারে। তাঁরা খুব স্বাভাবিকভাবে আমার গানকে মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু এখন মানসিকতার বদল ঘটছে।

আর আজকে সঙ্গীত পরিচালক হয়ে গেলেন!  

যারা আজকে আমাকে মিউজিক করার দায়িত্ব দিচ্ছেন, তারা পঁচিশ বছর আগেও আমাকে গায়ক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সেই জন্যই আজকে তাঁরা এই দায়িত্বটা দিচ্ছেন। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় সেই পঁচিশ বছর আগেই আমাকে ‘অ্যান্টিসোশ্যাল ব্যাংগেল অব মিউজিক’ বলে ব্যাখা করেছিলেন। আমার গানের ফর্ম বা ফর্ম্যাটকে সেই সময় অনেকে হয়ত মেনে নিতে পারেননি। আজ এসে করছেন। কিন্তু অনিন্দ্যর মতো শিল্পীরা সেই সময়েই বুঝতে পেরেছিলেন যে আমার গানের ফর্মটা আনকোরা নতুন একটা ফর্ম বা ফর্ম্যাট।

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় খুব বুদ্ধিমান ছেলে। ও মিউজিক বোঝে। ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’র সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব আমায় দিয়েছে। ওটাতো চন্দ্রবিন্দুর বাঁ হাতের কাজ ছিল। তবু তো আমায় ভরসা করেছে। বিশ্বাস করেছে। আমি নিজেও আমাকে এক্ষেত্রে বেশি নম্বর দিতে পারিনি। এই প্রথম কাজ করলাম। পরের বার চেষ্টা করব নিশ্চয়ই আরও ভালো করতে।

কিন্তু মনে হয় না, আপনাকে ঠিক ভাবে ব্যবহার করা হয়নি?

না। কখনওই না। আমায় বুঝতে পারেনি। তাই ব্যবহার করতে পারেনি। আমার কিচ্ছু হারায়নি। পঁচিশ বছর ধরে আমাকে ব্যবহার করতে না পেরে তারাই অনেক কিছু হারিয়েছে।

এমন অনেক সুরকার আছেন, যাঁদের সঙ্গে প্রথমদিকে একদম বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছি। অনেকের অনুরোধে অনেক জায়গায় গিয়েছি। প্রোগ্রাম করেছি। কখনও বিনা পয়সায়, কখনও বা কম পারিশ্রমিকে। এখন তাঁদের অনেক টাকাপয়সা হয়েছে। কিন্তু যখন দেখি তাঁদের ধারণা, যে আমাকে এখনও সেই রকম কম টাকাতেই পাওয়া যাবে, এটাই হাস্যকর।

কর্পোরেট জগতেও তো সফল কেরিয়ার ছিল। আজ আক্ষেপ হয় না? মনে হয় না সেটাই ভালো ছিল? 

শিল্পী শিলাজিৎ না হয়ে কর্পোরেট শিলাজিৎ হলে কী করতাম, সে কথা কখনও ভাবিনি। আমার কাছে যখন যেমন, তখন তেমন।

সত্যি বলতে, আমার আর অন্য কোনও উপায় ছিল না। আর কোনও রাস্তা ছিল না। শুরুর পর সবাইকেই বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছতে হয়। আমিও তেমন ভাবেই পৌঁছেছি। টানাপড়েন জীবনে থাকেই। তারপরও একটা দিককে বেছে নিতে হয়, এগোতে হয়।

সেদিন কোনও পরিচিতির স্বপ্ন ছিল না?

এভাবে ভাবিনি। তবে ত্রিশ বছর আগেও জানতাম যাঁরা আমার গান অপছন্দ করবেন, তাঁরাও কিন্তু সামনে এসে কথা বলে যাবেন। অবজ্ঞা করতে পারবেন না। আমার পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া সহজ নয়।আমি শিলাজিৎ হয়ে যাওয়ার আগেও আমার জামাকাপড়ের স্টাইল বা চুলের ছাঁট জোড়াবাগানে আমার পাড়ায় ছেলেদের মধ্যে প্রভাব ফেলত। তাই আমি জানতাম আমি আলোচ্য হবই।

সেদিনের উত্তর কলকাতার জোড়াবাগানের বাড়ি থেকে দক্ষিণ কলকাতার অ্যান্টেনার শিলাজিৎ, সত্যিই কি আলাদা?

চুল কমেছে, দাড়ি পেকেছে, আর কিছু না। বাকি সব একই আছে। অমানুষ বলে কোনও শব্দ আমার ডিকশিনারিতে নেই। মানুষের বাচ্চা সবচেয়ে বড় গালাগাল আমার কাছে। সেদিনও ছিল, আজও আছে।

ঝিন্টি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস সত্যি বলতে গেলে প্রেমের সম্পর্কে ‘তুই’ বলাটা সেই সময়ে এখনকার মতো এত জলভাত হয়ে যায়নি। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ‘তুই’ শব্দটা ব্যবহার করাও কি এই কনফিডেন্স থেকেই? 

ইলিনার সঙ্গে সম্পর্ক কলেজে পড়ার সময় থেকে। সেই সময় একে অপরকে তুইই বলতাম আমরা। লোকজনের অস্বস্তি হত। কেউ কেউ মজা করে বলতেন সাঁওতালি স্টাইল আমাদের। বিয়ের পরও তুমি বলতে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। আসলে সহজে যা আসে,তাতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য। এই যে আজকাল দেখি ইন্টারভিউ নেওয়ার সময়েই অনেকে কনফিউজড হয়ে যান। তুমি বলবেন না আপনি বলবেন। আমার দু’রকম হয় না। সহজাত ভাবে যা আসবে তাই বলব। আজকাল তুই বলা সহজ স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। একসময় আপনি শব্দটাকে লোকে ‘আপওনি’ বলে উচ্চারণ করত। আজকাল দেখি অনেকেই তুই বলেন। প্রেমের সম্পর্কে যেমন, তেমনি রেডিও বা টেলিভিশনের অ্যাঙ্করিং-এর সময়েও।

আমার মনে হয় এটা বেশ ভালোই। আন্তরিকতা প্রকাশ পাচ্ছে। পৃথিবীতে আমাদের সব থেকে কাছের যে দু’জন মানুষ, আমাদের মা আর বাবা, তাদের কি আমরা আপনি বলি না তুমি বলি? তুমি বললে মোটেও অসম্মান করা হয় না। এমনকি কাছের সম্পর্কে তুই বললেও অসম্মান করা হয় না।

আমি সেই সময় দাঁড়িয়ে যেটা ভেবেছিলাম, সেটা আজকে এত সহজ স্বাভাবিক হয়ে গেছে দেখে ভালোই লাগে।

অভিনেতা হিসেবে ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে কাজ করেছেনওঁকে  মিস করেন, মনে হয় থাকলে ভালো হত?

ঋতুপর্ণকে আমি মিস করি না। ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম ছবি ‘নতুন বাড়ি’। তারপর ‘অভিনয়’। এ ছাড়াও ‘অসুখ’। ওঁর পছন্দ হয়েছিল, প্রথম দিকে তাই আমায় নিয়েছিল। পরের দিকে আমাকে অনেক গল্প বলত, আমায় ভেবে অনেক চরিত্র লিখত, সেগুলো আমায় শোনাতো, পরে বুঝতাম মিথ্যে কথা বলত। আমাকে আর কখনওই কোনও কাজে নেয়নি। বলেছিল ‘সন্ন্যাসীরাজা’ করবে। সেটায়ডাক্তারের চরিত্রে আমাকে অভিনয় করাবে। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। আমায় ভেবে লিখতো বলে যে সমস্ত রোল বলত সেগুলো অন্য কাউকে দিয়ে করাত এবং কারণ হিসেবে যে ব্যাখ্যাগুলো দিত সেগুলো আমি বলব না। কারণ সেগুলো অত্যন্ত ব্যক্তিগত। আই ডোন্ট মিস ঋতু।

কিউয়ের সঙ্গেও কাজ করেছেন

কিউ আমাকে ব্যবহার করেছে গাণ্ডুতে। অনেকেই ওই রোলটা করতে চাইত না। আমার মধ্যে প্রিটেনশন নেই তাই আমি করেছি। তবে আমাকে পয়সা দিলে আমি যে কোনও কিছু করতে পারি। আমি ভালো, মন্দ বিচার করতে চাই না, স্ক্রিপ্ট পড়তে চাই না। আমাকে যদি পয়সা দাও আমি কাজ করব। ডিরেক্টর হিসেবে ভুল না ঠিক আমি দেখে কী করব? আমার সংসার চললেই হল।

আর অ্যান্টেনা?

এই যে মানুষের ভাবনার সীমাবদ্ধতার কথা বলছিলাম। সেই সীমাবদ্ধতার বাইরে বেরিয়ে যে ভাবনার জায়গা সেটারই নাম‘অ্যান্টেনা দ্য থিঙ্কিং ক্লাব’। এটা এমন একটা জায়গা যেখানে মানুষ অকারণে ভাবেন। বলা চলে, ভাবতে চেয়ে ভাবেন। কেউ কোনও কারণে ভাবছেন। কেউ আবার শুধু ভাববেন বলেই ভাবছেন।

কিন্তু এখানে সবার ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমি যেটা মনে করি, সেটাই ঠিক, সেটাই সবাইকে কান ধরে ভাবানো হবে, এমন চিন্তা এখানে নেই। অন্য সব কিছু থেকে এইখানেই আলাদা‘অ্যান্টেনা’। একদম আলাদা।

চারপেয়েরা অ্যান্টেনাতে এত সহজে থাকে কী করে?

কানুদা, গুন্ডা, কানঝোলা, কটকটি এরকম ছ’জন আছে। এদের খাওয়া, স্নান, ঘুম, ভ্যাকসিন অপারেশন সবই করাই। এদের নিয়ে ভালো থাকি। আনন্দে থাকি। একা ভালো থাকতে পারি না, এদের সকলের মাঝেই ভালো থাকি।

আর ধী? কী বলবেন ওঁকে নিয়ে বাবা হিসেবে, শিল্পী হিসেবে?

সবদিক থেকেই ধী খুব ভালো। শিল্পী বলি বা ছেলে হিসেবে বলি। আসলে কেউ যদি নিজের ট্যালেন্ট ব্যবহার না করে, তাহলে তার বিচার করা যায় না। ট্যালেন্টের চর্চা সবসময় করতে হয়। যে সবসময় চর্চায় থাকে সে সবকিছুতে ভালো থাকে। আমার ধী সেরকমই।

এই যে এত কিছু এক সঙ্গে – স্ক্রিপ্ট লেখা, সঙ্গীত পরিচালনা,অভিনয়,গান আবার অ্যান্টেনা, এত সব একসঙ্গে সামলান কী ভাবে?

আমরা সবাই সকাল থেকে রাত অবধি যা যা করি সব কিছুরই কোনও না কোনও উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু সবারই মূল উদ্দেশ্য হয়ে যায় সংসার চালানো। তাই আমরা যে যেটা পারি, সেটাই বিক্রি করার চেষ্টা করি। অনেকে আবার অনেক কিছুই পারেন। কিন্তু সবটা বিক্রি করেন না। হয়ত আনন্দটা খুঁজে পান না, তাই করেন না। আমি কিন্তু সকাল থেকে রাত অবধি যা যা করি সব কিছুতেই আনন্দ খুঁজে পাই।

জীবনে আপস অ্যান্ড ডাউনস এলে?

গল্প তো আমরা সবাই লিখতে পারি না। কিন্তু খাতায় অক্ষর লিখে রাখতে সবাই পারি।যে সময় ডিস্ট্র্যাকটেড থাকবে, আপসেট থাকবে, ছবি আঁকার দরকার নেই, রঙ করে যাও। আমার দেওয়াল জুড়ে রঙ করা থাকে। যখন যেমন মনে হয় তাই করি। ছবি হতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধ্যকতা নেই। দরকার শুধু রঙ। আমি মনে করি, মন আসলে শরীরেরই একটা অংশ। শরীর খারাপ হলে যেমন চিন্তায় পড়ে যাই, মন খারাপ হলেও তাই। মন ভালো রাখা খুব দরকারি।

দেওয়ালের রঙের কথা বলছেন! এদিকে চুলেও রঙ করেছেন। মহিলা ফ্যানের সংখ্যাও ঊর্ধ্বমুখী। রহস্য কি তাহলে শুধুই রঙ?

মহিলারা কিন্তু মোটেই আমার গানের ফ্যান নয়। আমার সঙ্গে কথা বলতে, আড্ডা দিতে ভালবাসেন অনেকেই। কিন্তু আমার গান শোনেন খুব কম মহিলা। রিসার্চ ডেটা আছে। আমার ৯৭ শতাংশ ভিউয়ার হচ্ছেন পুরুষ। মাত্র ৩ শতাংশ মহিলা। তবে শিলাজিৎ মজুমদার এই দেশের একমাত্র ব্যক্তি যিনি সোশ্যাল নেটওয়ার্কে একটা প্রোফাইল খুলে রেখেছেন শুধুমাত্র আর শুধুমাত্র বান্ধবীদের জন্য। সেখানে সংখ্যা কিন্তু প্রচুর! অবাক হই তারা আমার ইউটিউব চ্যানেল না দেখে আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট বাড়ায়। হতে পারে পুরুষ হিসেবে আমাকে তাঁদের পছন্দ বেশি, গায়ক হিসেবে নয়। যদিও তাতে কোনও আফশোস নেই আমার। পুরুষ শিলাজিৎকে যে পছন্দ করেন তারা, এটাই যথেষ্ট।

আমার এখনও ৯৭% মেয়ে শ্রোতাকে এক্সপ্লোর করতে হবে, এটাই আপাতত সামনে দেখছি।

লোকে চাইলেই এখন এমপিথ্রি ডাউনলোড করে নিতে পারে। ইউটিউব, ইন্টারনেটের এই যুগে শিল্পী রোজগার করবেন কী করে?

আমার কোনও অসুবিধা নেই তাতে। শুরু করেছিলাম ‘এক্স=প্রেম’দিয়ে। তারপরে ‘এক্স= ম্যাজিক’ বলে একটা করব ভেবেছিলাম।কিন্তু শেষ পর্যন্ত, তার বদলে আমি ‘ফিসফিস’ করেছি। তারপরে ফোক ওরিয়েন্টেড একটা বেসিক অ্যালবাম করেছিলাম ‘লাল মাটির সরানে’। আমার শেষ বেসিক অ্যালবাম বেরিয়েছে ১২ বছর আগে।যেটার নাম ‘সর্বনাশ’। কিন্তু ২০০৬ সালে ‘সর্বনাশ’ বেরোনোর পর এখনও পর্যন্ত আমি আর কোনও অ্যালবাম বের করিনি। কারণ আমার ৯০টা গানের মধ্যে লোকে ১০টা গান শুনেছে, তাই আমি চাই বাকি গানগুলো মানুষ শুনুক। তাদের সময় দিতে হবে।জোড়াবাগানের বাড়িতে থাকতে আমি যেদিন প্রথম গানটা লিখেছিলাম সেটা এমনি লিখেছিলাম। সেদিনও এত ভাবিনি। এখন বহু গান লিখে ফেলেছি কিন্তু মানুষ সব গান শোনেনি। সেই সব অ্যালবাম করছে কী করছে না, তাতে আমার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। আমি যা তৈরি করেছি সেগুলো মানুষ শুনুক, জানুক। এখনও‘পাগল’, ‘সজনী’ এই গান শোনেনি যারা তারা শুনুক। আমি চাই আমি মরে গেলেও মানুষ আমার গান শুনুক।

ব্যান্ড ভাঙ্গা-গড়ার অস্থির সময়েও কিন্তু শিলাজিৎ এর সঙ্গে খ্যাঁদা, স্যান্ডি, ধী একইভাবে রয়ে গেছে, রহস্যটা কি?

দূর থেকে দেখলে মনে হয় এরকম। আসলে এরা সকলে নিজেদের কাজেও ব্যস্ত থাকে। তবে আমার সঙ্গে অনেকেই কাজ করতে চায়। আবার বহু পুরনো যারা, তারা এলেও আমরা একসঙ্গেই কাজ করি।আসলে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য বদলালে ভেঙে যায় ব্যান্ড। আর গানগুলো থেকেই যায়। মুরোদ নেই যাদের তারা হারিয়ে যাবে।

 শিল্পীদের মধ্যে থেকে প্রথম তিনজন আর নতুনদের মধ্যে থেকে প্রথম তিনজনকে যদি বেছে নিতে বলি, কার কার কথা বলবেন?

রূপঙ্কর, অনুপম আর রাঘব। খুব পছন্দের আমার। তবে নতুন যারা তাদের বেশ কিছু সমস্যা আছে। কম্পোজার ব্যাকআপ তারা পাচ্ছে না। এছাড়াও প্রচুর সমস্যা। যারা নতুন,যেখানেই আসছেন ফ্ল্যাশ বাল্বের ঝলকানি তাদের উপরেই থাকছে। প্রোগ্রাম করতে চলে যাচ্ছে। টাকা আসছে খুব সহজেই। ফলে নতুন কম্পোজিশন নিয়ে আর মাথা ঘামাচ্ছে না। পুরনো কম্পোজিশনের বহু গান তো তাদের ঝোলায় আছে, ভাবছে অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু নতুন কিছু করা নিয়ে ভাবছে না বলে সহজেই হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ বুদ্ধিমান ছেলেদের দল চন্দ্রবিন্দু। ওরা কিন্তু এত বছর ধরে এগিয়ে চলেছে।

ভাঙা গড়ার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন ফরমেশনে রয়ে গেছে ফসিলস অথবা শিলাজিৎ। যারা ভেঙে বেরিয়ে আসছে এবং নিজস্ব জায়গা তৈরি করেছে তাদের মধ্যে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য পটা।

নতুন যারা কাজ করতে আসছেন তাদের আরও বেশি করে কম্পোজিশনের দিকে নজর দেওয়া উচিত।

অনুপম রায়ের কথা বললেন। অনুপম মুম্বইতে গেছেন ভালো গায়কও। আর কী বলবেন ওঁকে?

অনুপম এখনও প্রাথমিক স্তরে আছে। তবে আরও চেষ্টা করতে হবে ওকে। ওর থেকে অনেক বেশি চাহিদা আছে আমার। অনুপম বদলায়নি এখনও। মানুষ হিসেবে বেশ ভালো। আমাদের প্রথম আলাপ সহজেই মনে রেখেছে। আমি কিন্তু ভুলে গেছি।

অনেকেই আছেন মনে রাখেন না। সৃজিতের সঙ্গে তো একসময় আমার খুব আড্ডা হতো। এখন সৃজিত বাবু হয়ে গেছে। আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চরিত্রের অনেকগুলো দিক খুলে খুলে বেরিয়ে আসে।

চারপাশে অস্থির সময় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া?

ছোট থেকে জ্ঞান হওয়া পর্যন্ত শুনে গেছি, ‘বাজার খুব খারাপ’, ‘টাকা পয়সা হাতে নেই’। এগুলোর কোনও পরিবর্তন আমি শুনিনি। সবার মতে, কোনও দিনই দেশ ভালো করে চলেনি, কোনও দিনই খারাপ সময় কাটেনি। সমালোচনা থেকেই যায়। ৫০ বছর বয়স পেরিয়েছি।বহু সরকার দেখলাম। আগের সরকারের সময়েও বহু কিছু আমরা দেখেছি। সেইগুলো এখনও দেখতে পাচ্ছি। কিছু ক্ষেত্রে সেইগুলো দ্রুত ঘটছে। তবে হ্যাটস অফ গত তিন-চার বছর ধরে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টকে। এত চাপের মধ্যেও সমস্ত কিছু সুস্থভাবে সামলানো হয়। এছাড়াও কলকাতার সৌন্দর্যায়ন, ভালো লাগে সবসময় আলো জ্বলছে, উৎসব হচ্ছে,পার্ক হচ্ছে। আমার দর্শনে আমার শিল্পজগতের তিনটি লোক কাজ পাচ্ছে, শিল্পীরা কাজ পাচ্ছে। তাই আমি খুশি। কারা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রিয় তা নিয়ে আমার কোন হিংসা নেই। রাজনীতিতে কে কী দল করছে আমার তাতে বয়ে যায়। বাবুল সুপ্রিয়, ইন্দ্রনীল সেন, ব্রাত্য বসু— আমার ভালো লাগে শিল্পীরা এগিয়ে গেছেন।

মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহ তো অনেক শিল্পীই পেয়েছেন কখনও কথা হয়েছে ওঁর সঙ্গে?

২০১৬-এর  জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতেই ল্যান্ডলাইনে ফোন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে আমাদের কথা হয়নি। পরে একই মঞ্চে ওর সঙ্গে আর দাঁড়ানোর সুযোগ হয়নি। অনেক সঙ্গীত শিল্পীদেরই দেখি তাঁরা ওঁর সঙ্গে অনুষ্ঠান করেন, একই মঞ্চে আসেন, তবে আমার সেটা এখনও করা হয়নি। আমার কোনও সমস্যাও হয়নি তাতে।

নিজে কখনও রাজনীতিতে আসার কথা ভেবেছেন?

আমায় রাজনীতির লোকেরা খুব একটা বিশ্বাস করে না। আমার অনেস্টিটাকে রাজনীতির জগত মেনে নিতে পারে না হয়ত। অন্য কোনও কারণ হতে পারে। ঠিক করে বলতে পারব না। তবে আমি এতে পিছিয়ে পড়ছি বলে আমি মনে করি না। আমার গ্রামের সমস্ত রকম ক্ষেত্রে অর্থাৎ সমান্তরালে রাজনীতিতে আমি আছি। আমার বাবা, দাদুর মত আমিও গ্রামবাসীদের পাশে এখনও রয়েছি। ওখানে হাসপাতাল থেকে হাইস্কুল, প্রাইমারি স্কুল সব আছে আমাদেরই বংশের লোকজনের নামে। আমাদের বংশপরম্পরা অনুযায়ী বীরভূমের গ্রামকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করি। প্রয়োজনে গ্রামবাসীদের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়ে তদ্বির করতেও পারি।তাতে আমার কোনও অসুবিধা নেই।

এত বছর ধরে দৌড়োতে দৌড়োতে কখনও ক্লান্তি আসেনি,থেমে যেতে ইচ্ছে করেনি? কী ভাবে নিজেকে তখন চার্জআপ করেছেন?

মাঝেমধ্যে ক্লান্তি আসে সকালে ঘুম থেকে উঠে। খুব ক্লান্ত হয়ে যাই,তখন মনে হয় থেমে যাই। কিন্তু তারপরেই মনে হয় ৩০-৪০টা বান্ধবী ,দায়িত্ব আছে আমার উপর। আমার ছেলের দায়িত্ব আছে,এতগুলো কুকুর রয়েছে, ব্যান্ড রয়েছে সবাইকে সামলাতে হবে, ভালোভাবে চলতে হবে। এদের কথা ভাবলে আমি আবার উঠে পড়ি, আবার দৌড়োই। আর ক্লান্তি আসে না।

Shares

Comments are closed.