সোমবার, এপ্রিল ২২

বাঙালি হিপোক্রিট, মীরাক্কেলের জনপ্রিয়তাই সেটা বলে দেয়: শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়

বাংলা টেলিভিশনে ননফিকশনের রাজা তিনি। তাঁর হাত দিয়েই বেরিয়েছে দাদাগিরি, মীরাক্কেল, ডান্স বাংলা ডান্সের মতো জনপ্রিয় সব শো। অথচ সেই শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায় কবিতাও লেখেন। পাসোলিনি তাঁর অসম্ভব প্রিয়। এক দুপুরে তাঁর অফিসে ঢুঁ মারলেন শমীক ঘোষ।

শমীক ঘোষ

যিনি মীরাক্কেলের ডিরেক্টর তিনি একজন কবিও। কবিতা আর টেলিভিশন। একটা খুব দীক্ষিত পাঠকের, আরেকটা সবার।

আজকাল আর কবিতা লিখিনা খুব একটা। কবিতা চর্চা করি বলা যেতে পারে। কবিতা চর্চা আর কবিতা লেখার মধ্যে একটা তফাৎ আছে তো। এখনকার কবিতা পড়ে মনে হয় কত ভালো লেখা। কিন্তু আমি নিজে ততটা ভালো লিখতে পারি না। পারার জন্য যতটা পরিশ্রম করা দরকার, সেই সময়টা দিতে পারিনা।

ছোটবেলায় খুব অভ্যেস ছিল কবিতা লেখার। আমরা একটা পত্রিকাও বার করতাম। পদ্যচর্চা। এখন ওটা ওয়েবে বার হয়। আমি খুব ভালো কথা বলতে পারিনা।

আমি আসলে ভালো কথা বলতে পারিনা। হয়ত সেই জন্যই একটু আধটু লিখতে পারি। সেই লেখার সূত্রে আমার এই জগতে আসা। স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসাবে কাজ শুরু করা।

সে সময় বয়স কম ছিল। অনেকেই আমার কথা শুনতে চাইত না। বুঝত না আমি কী বলতে চাই। সেই প্রকাশটাই হয়ত লেখার মাধ্যম দিয়ে করতাম।

টেলিভিশনে এলেন কীভাবে?

কবিতা লিখতে লিখতে লিটল ম্যাগাজিন। কফি হাউজে যাতায়াত। সেইসময় কিছু কেবল চ্যানেল শুরু হয়েছিল। এক দাদা জানালেন, তারা একটা টেলিসিরিজও করতে চায়।

আমি তো তখন নাটকও লিখতাম। দেখা করলাম নিজের লেখা নিয়ে। ওদের পছন্দ হল। এইভাবেই টেলিভিশনের জন্য লেখালেখির শুরু হল।

আপনি নিজে পাসোলিনি দেখেন, ওয়াংকার ওয়াই দেখেন। অথচ যে কাজ করেন সেটা অসম্ভব জনপ্রিয়। কোথাও অসুবিধা হয় না?

আমাকে এই নিয়ে খুব ভালো করে বুঝিয়েছিলেন মিঠুনদা। যে লোকটা মৃগয়া করে প্রথম ন্যাশানাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। সেই কিন্তু পরের পাঁচ বছর কাজ পায়নি। স্ট্রাগল করেছে। সেই আবার পরে ডিস্কোডান্সারের মতো হিটও দিয়েছে।

ডান্স বাংলা ডান্স করার সময় আমার নিজের মধ্যেই এই সংঘাতটা ছিল। একদিকে কবিতার শুভঙ্কর। আরেকদিকে জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের ডিরেক্টর শুভঙ্কর। এই যে তখন নিজের মধ্যে এত প্রশ্ন। মিঠুনদাকে বলেছিলাম একদিন। উনি উত্তরও দিয়েছিলেন।

এই যে কথা বলছি এই অফিসে বসে। আমি এখন ডিরেক্টর-প্রোডিউসার। আমাকে অনেক কিছু ভাবতে হয়। কজন কাজ করছে আমার সঙ্গে। আমার কাজের ওপরেই তো তাদের রুজি রোজগার নির্ভরশীল। আমার শো যদি পর পর তিনবার ফ্লপ করে আমাকে কেউ আর কাজ করতে ডাকবে না। আমি একা ডুবব না। আমার সঙ্গে এতজন সবাই ডুববে। আমার বাবা ছিলেন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক। আমি জানি অর্থনীতি কাকে বলে।

তাহলে বিজনেস ম্যান শুভঙ্করের কাছে হেরে গেলেন কবি শুভঙ্কর?

কেন? পাসোলিনি, আমার খুব প্রিয় ডিরেক্টর। তিনিই সালো বানাচ্ছেন। তিনিই আবার ভয়ংকর ঈশ্বর বিশ্বাসী। আমার মনে হয় একটা মানুষের অনেকগুলো দিক থাকা উচিৎ। নইলে চোখ বন্ধ ঘোড়ার মতো একদিকেই দৌঁড়ানো হবে। আমি যখন বাড়িতে থাকি, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে থাকি, তখন আমি নিজের মতো। কিন্তু ফ্লোরে দাঁড়িয়ে ব্যবসার কথা আমাকে ভাবতে হয়। এটা খারাপ কেন হবে?

মীরাক্কেল, একদিকে যেমন জনপ্রিয়, তেমনই ছ্যা ছ্যা তো ছিল।

আমার মনে হয়েছে বাঙালির মধ্যে যে হিপোক্রেসি আছে, যেটা সবাই মনে দেখতে চাইবে কিন্তু সামনে খারাপ বলবে, মীরাক্কেল তার স্পষ্ট প্রমাণ।

আমরা প্রথমে একটা ডামি ফর্ম্যাট শ্যুট করেছিলাম। তারপর দর্শকরা কেমন ভাবে নেবে সেটা বোঝার জন্য কিছু লোককে দেখানোর জন্য আলাদা করে ডাকলাম। ৪০ মিনিটের শো ছিল। ১৫ মিনিট চলতে না চলতেই লোকে ছ্যা ছ্যা করল। এইটা চলবে টেলিভিশনে? এইগুলো বাড়িতে বসে দেখা যাবে না। বলে নস্যাৎ করে সবাই চলে গেল।

আমাদের চ্যানেল থেকে দু’মাস টাইম দেওয়া হয়েছিল। যদি না চলে তাহলে বন্ধ করে দেওয়া হবে। অদ্ভুত ভাবে সেই শোটাই সবাই দেখতে শুরু করল। ওই যে বললাম হিপোক্রেসি।

মীরাক্কেল দেখত অল্প বয়েসিরা ক্লাবে বসে । মানে বাড়িতে সবার সামনে দেখবে না। কিন্তু একা, বা আলাদা হলেই দেখবে।

অনেকে বলেন ভাঁড়ামো।

মীরাক্কেলের সেটে দাঁড়িয়ে একজন তাঁর সমস্যার কথা, পরিবারের সমস্যার কথা বলেছিল। সারা দেশের লোক তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল।

মীরাক্কেল ভাঁড়ামো নয়। বিরবল যেমন আকবরের মর্জি বুঝে অনেক সময় অনেক অপ্রিয় কথা বলে দিতেন, মজার ঢং-এ। মীরাক্কেলও তেমনই। মীরাক্কেল এমন একটা শো যেখানে মানুষ হাসতে হাসতে এমন একটা কিছু উপাদান পেয়ে যেতেন যেখানে তিনি মুভড হন।

সেটাই আমি করতে চেয়েছি। মীরাক্কেল যখন করা হল তখন ন্যাশনাল টেলিভিশনে স্ট্যান্ড আপ কমেডি খুব সাক্সেসফুল। কিন্তু সেগুলো দেখে আমার হাসি পেত না। আমি বুঝেছিলাম বাঙালি দর্শককে ওইভাবে টানা যাবে না। আমি নিজের মতো করে নিয়েছিলাম

মীরের সঙ্গে প্রচণ্ড গণ্ডগোল, অথচ ঋতুপর্ণ এলেন সেটে।

মীর সত্যিই অসম্ভব প্রফেশনাল। টিম ম্যান। নিজের থেকে কাজটাকে বড় করে দেখে। ‘ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি’র সেটে ঋতুপর্ণ ঘোষের আর মীরের সমস্যা হয়েছিল। ঋতুপর্ণ এসে বললেন, মীরের সঙ্গে কথা বলবেন। আমি গিয়ে বললাম। মীর কথা বলল। গোটা শো’তে কোথাও কোনও সমস্যা হয়নি।

আসলে অনেক শিল্পী মনে করেন তিনি শো’এর থেকে বড়। মীর কখনও সেরকম করেনি। সেইজন্যই অত সাক্সেসফুল শোটা।

আর মিঠুন চক্রবর্তী?

মিঠুনদাও অসম্ভব প্রফেশনাল। স্ক্রিপ্ট নিয়ে বার বার প্রশ্ন করতেন। আমাকে বসতে হত। দেখ একটা স্ক্রিপ্ট তো শুধু শুরু আর শেষ দিয়ে হয় না। মাঝেও ওঠা পড়া দরকার। মিঠুনদা ওটা খুব ভালো বুঝতেন। আমিও অনেক শিখেছি ওঁর থেকে।

অসম্ভব টিম ম্যানও মিঠুনদা। একবার মুম্বাই থেকে একজন এলেন। তাঁর একটা বড় মেক আপ রুম লাগবে। সেটে মিঠুনদা ছাড়া কারো বড় মেক আপ রুম নেই। মিঠুনদা নিজেই নিজের ঘর ছেড়ে দিলেন। ভাবা যাবে না। এতটাই ডেডিকেটেড শোয়ের জন্য।

নাচের শো হল বাংলা টেলিভিশনে। সেটা পরে ন্যাশানাল টেলিভিশনে এল।

আমার এখনও বিশ্বাস বাংলার দর্শক যাঁরা নাচের শো দেখেন, তাঁরা আসলে নাচ দেখেন না। দেখেন সুন্দর সুন্দর মুখে বাচ্চাদের। সুন্দর পোশাকগুলো। আর তার থেকেও বেশি কতটা মজা আছে। কতটা হাসি-আনন্দের উপাদান আছে সেটা।

আমি নিজে বিসর্জনেও ভালো করে নাচতে পারিনা। নাচ ব্যাপারটাই আমি বুঝি না। জানি না। সেইগুলো তো কোরিওগ্রাফার দেখতেন।

আমার কাজ ছিল অরিত্রের মতো একটা চরিত্রকে এনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। মানুষ যাকে দেখতে চাইবেন। আমার কাজ ছিল একটা ভুতকে এনে দেওয়া। আমার কাজ ছিল শো’টাকে কী করে আরো এন্টারটেনিং করে ফেলা যায় সেটা দেখা।

ভূতটা এল কীভাবে?

মিঠুনদার বিখ্যাত ডায়লগ, মারব এইখানে লাশ পড়বে শশ্মানে। এখন এই যে এত লাশ, সেইগুলো মরে ভূত হয়ে যেতে পারে তো। সেইভাবেই কিন্তু ভূতটা এল ডান্স বাংলা ডান্সে। মিঠুন চক্রবর্তী একদিকে একজন নায়ক। অন্যদিকে তিনিই একজন ভিলেন। এটাই মানুষ কিন্তু নিয়ে নিল।

সৌরভ গাঙ্গুলি?

প্রথমদিকে খুব ক্যামেরা শাই ছিলেন। কিন্তু দাদা তো পার্ফেকশনিস্ট। নিজেই নিজেকে ডেভেলপ করেছেন। সেই সময় অমিতাভ বচ্চনের কৌন বনেগা ক্রোড়পতি দেখেছেন। অন্য গেম শো দেখেছেন। বার বার আমাদের জিজ্ঞাসা করতেন, এটা ঠিক হল তো? বা কী করলে আরও ভালো হবে।

কুইজই কিন্তু অন্য মোড়কে।

ঠিক। কুইজ শো মানেই যে শুধু শিক্ষিত মানুষ দেখবেন। তাঁরাই উপভোগ করবেন সেটা কিন্তু টেলিভিশনের দাবি নয়। আমাদের প্রথম থেকেই উদ্দেশ্য ছিল যত বেশি সম্ভব মানুষকে ইনভলব করা। সেই জন্য আমরা জেলার সঙ্গে জেলার লড়াই করিয়েছি। দ্বিতীয়ত, এমন কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা যেটা মানুষ প্রতিদিনের জীবনে দেখতে অভ্যস্ত। একটা ছবি আছে। যেমন ধরা যাক, মঙ্গলযানের ছবি কত টাকার নোটে থাকে। এটা মানুষকে ছুঁয়ে ফেলছে খুব সহজেই।

সেই চিন্তাশীল শুভঙ্কর?

চিন্তাশীল কিনা জানি না। কিন্তু অনেক মানুষ দেখেছিল। একবার মন্দারমনিতে গিয়েছি দাদাগিরি টিমের সঙ্গে। নৌকায় উঠেছি একটা অল্প বয়েসি ছেলে মাঝি। ওর বাবা মাছ ধরেন। ছেলেটিকে দেখেই বোঝা যায় খুব গরিব। সেই ছেলেটি কথায় কথায় জানাল সে টিভিতে দাদাগিরি দেখে। ছেলেটা কোনওদিন স্কুলে যায়নি। বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে কিছুই প্রায় জানে না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেন দেখে দাদাগিরি। বলেছিল, কত কিছু আছে পৃথিবীতে জানি না। সেইগুলো জানতে পারি।

সুন্দরবনে একবার গিয়েছি। একজন গাইড গাছপালা চেনাচ্ছেন। তিনি হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, বলুন তো, বাঘে ছুলে আঠেরো ঘা কেন বলে? আমি জানতাম না। তিনিই বললেন, বাঘের সামনের পায়ে পাঁচটা করে আঙুল। পেছনের পায়ে চারটে করে। তাই আঠারোটা নখ। সেইখান থেকে আঠারো ঘা কথাটা এসেছে।

আসলে এরা এসে শো’টাকে সমৃদ্ধ করেছেন। আমরাও চেষ্টা করেছি এদের আরও নতুন কিছু দিতে।

বাংলা নন-ফিকশন মানেই শুভঙ্কর। কেমন লাগে?

একটা শো’তে বোধহয় জাতীয় পতাকা উল্টো করে রাখা ছিল। আমাকে অনেকে ফোন করলেন। আমি বললাম, আরে ওটা আমার শো নয়। এটা অনেক সময়েই হয়। লোকে ধরে নেয় নন ফিকশন মানেই আমি।

তবে মিরাক্কেল যখন হচ্ছে তখন তো কম্পিটিশন ছিল না এত। এখন তো এমনও হয়, যে দুটো প্রতিপক্ষ চ্যানেলে আমারই দুটো শো চলছে। মানে আমি নিজেই নিজের সঙ্গে কম্পিট করছি। এটা খুব হাস্যকর এবং কষ্টকর আমার জন্য।

কিন্তু নন-ফিকশনের রাজা শুভঙ্কর ফিকশনে তেমন দাগ কাটলেন না।

দেখ আমি রাজা আর গজারও প্রোডিউসার ছিলাম। মিরাক্কেলেরও প্রোডিউসার ছিলাম। একটা ফিকশন একটা নন ফিকশন। দুটোই কিন্তু রেটিং-এ একনম্বরে। তখন মনে হল আর কী করব? তখনই তো চাকরি ছেড়ে দিলাম।

বাংলা টেলিভিশনে ফিকশনের একটা নিজস্ব ফর্ম্যাট আছে। অন্তত দু’বছরের মতো গল্প ভাবতে হবে। তারপর বাকি সব কিছু। ননফিকশনে কিন্তু ৪-৫ মাস অন্তর অন্তরই বদলাতে হয় ফর্ম্যাটটা। আমি বোধহয় ফিকশনে কাজ করতে ততটা পছন্দ করিনি কোনওদিনও।

প্রথম ছবিটা কিন্তু ভালো হল না তেমন।

ছবিটা বানানোটা একদম ভালো হয়নি। আমি আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু বলব না। সম্পূর্ণ আমার ব্যর্থতা। আমার মনে হয়েছে আমার আরও অনেক অভিজ্ঞতা দরকার। আরও অনেক পড়াশুনো বোঝা দরকার। এই প্রসেসটাই তো এখন চলছে। ছবি করলে এইবার একদম আমার মতো করে বানাব।

ওয়েবসিরিজ এসেছে, শর্ট ফিল্মের রমরমা। লোকে মোবাইলে ল্যাপটপে দেখছে। টেলিভিশন কি কেউ দেখবে না আর?

ওয়েব সিরিজ বা শর্ট ফিল্ম আসার পর নিশ্চয় অন্যরকম কনটেন্ট হচ্ছে। অনেকেই দেখছেন। টেলিভিশনের রেটিং-এ দর্শককের বাছার পদ্ধতিটাও বদলে গিয়েছে। আগে গ্র্যাজুয়েট হলে সেকশন এ অডিয়েন্স ধরা হত। এখন নতুন নিয়মে পাঁচটা ইলেক্ট্রনিক গুডস থাকলেই হল। সেতো এখন সবার ঘরে ঘরে। ফলে অডিয়েন্স বদলে গিয়েছে। হয়ত সেই অডিয়েন্সকে ধরার জন্য এখন অন্যরকম কাজ হচ্ছে। আমরা নিজেরা যেমন কাজ দেখে এসেছি টেলিভিশনে তেমন নয়। আমাদের হয়ত স্থূল লাগছে কোথাও।

কিন্তু অনুপম রায়ের ওই গানটা, ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’, ওটা রিকশাচালকের মোবাইলের কলার টিউন আবার আই টি প্রফেশনালেরও। আমার মনে হয় সেইরকম কনটেন্ট তৈরি করতে হবে যেটা সবাই দেখবে। হয়ত এখন একটা শূন্যতা আছে। কিন্তু সেটাও কেটে যাবে বলেই মনে করি আমি।

Shares

Leave A Reply