সোমবার, মার্চ ২৫

এঁর মাথার দাম ছিল এক কোটি ডলার, মার্কিন সেনা ঘাঁটি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে থাকতেন তালিবান সুপ্রিমো ওমর, টেরই পাননি সেনারা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা সময় ছিলেন তালিবানের মাথা। যাঁর মাথার দামই ছিল এক কোটি ডলার। যাঁর অঙ্গুলি হেলনে নীরবে কাজ করে যেত তালিবান জঙ্গিরা। সন্ত্রাসের আর এক নাম এই মোল্লা ওমরের খোঁজ পেতে একসময় কালঘাম ছুটেছিল মার্কিন দুঁদে গোয়েন্দাদের। পাকিস্তান, আফগানিস্তান নাকি সৌদি দেশ— কোথায় লুকিয়ে ওমর এই চিন্তায় যখন রাতের ঘুম ছুটেছিল গোয়েন্দা ও সেনাদের, তখন আফগানিস্তানের মার্কিন ঘাঁটির ঢিল ছোঁড়া দূরত্বেই বহাল তবিয়তে ছিলেন ওমর। একেবারে মার্কিন সেনাদের নাকের ডগায়। নিজের বইতে এমনটাই লিখেছেন ডাচ সাংবাদিক বেট্টে ড্যাম।

‘সার্চিং ফর অ্যান এনিমি’ নেদারল্যান্ডসের এই সাংবাদিক দীর্ঘ সময় তালিবানদের নিয়ে গবেষণা করেছেন। মোল্লা ওমর ছিলেন তাঁর গবেষণার অন্যতম বিষয়। ৯/১১ ঘটনার পর ২০০১ সালে আফগানিস্তানে যখন তালিবান-নিধন অভিযানে নেমেছিল মার্কিন সেনার বিশেষ বাহিনী সেই সময় আফগানিস্তানেরই গোপন স্থানে ঘাঁটি গেড়েছিলেন ওমর। সর্বক্ষণ তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন তাঁর দেহরক্ষী জাব্বার ওমরি। সাংবাদিক ড্যাম জানিয়েছেন, এই দেহরক্ষীর সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ বছর কাটিয়েছেন তিনি। নানা আলোচনায় উঠে এসেছে ওমর সম্পর্কে অনেক বিস্ফোরক তথ্য।

কে ছিলেন এই মোল্লা ওমর?

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত তালিবানের শীর্ষ পদে ছিলেন ওমর। বলাবাহুল্য তালিবানের মাথাও বলা হতো তাঁকে। ওমরের হাত ধরেই ১৯৯৬ সালের পর থেকে ডালপালা মেলে আফগানিস্তানে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল তালিবান শাসন।

স্বভাবে শান্তশিষ্ট, কিন্তু প্রয়োজনে হিংস্র হয়ে উঠতে পারতেন নাকি ওমর। কথা খুবই বলতেন তিনি। পরিবারের লোকের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় ছিলই না। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল তালিবান শাসনকে আড়ে-বহরে বিরাট করে তোলা। নিজের গোপন তথ্য ডায়রিতে কোনও সাংকেতিক ভাষায় লিখে রাখতেন ওমর। সেই ডায়রি বছরের পর বছর ঘেঁটে ওমর সম্পর্কে প্রয়োজনী তথ্য পেয়েছেন ড্যাম। নিজের ডায়রিতে তৎকালীন আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজায়ির সম্পর্কেও লিখেছেন ওমর।

১৯৮৩ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত রুশদের সঙ্গে লড়াই করার সময়ে ওমরের এক চোখ চলে যায়। তাঁর দেহরক্ষী ওমরির কথায়, এক চোখে দেখলেও পর্যবেক্ষণ শক্তি প্রখর ছিল ওমরের। একটা হাতের কব্জিও ছিল না তাঁর, সেই জায়গায ছিল লোহার রড। আফগানিস্তানের জাবুল প্রদেশে থাকতেন তিনি। মার্কিন সেনাদের টহলদারি থেকে বাঁচতে লুকিয়ে ছিলেন জাবুলেরই কোনও এক ব্যক্তির বাড়িতে। সঙ্গে ছিলেন দেহরক্ষী ওমরি। তালিবান সুপ্রিমোর ডায়রি থেকে জানা গেছে, সেই বাড়ির পাশ দিয়ে হামেশাই টহল দিতেন মার্কিন সেনারা, কিন্তু ঘুণাক্ষরেও টের পাননি বাড়ির গৃহকর্তার আশ্রয়েই বহাল তবিয়তে ছিলেন ওমর।

২০০৪ সালে ফের ডেরা বদল করেন ওমর। তাঁর গোপন আস্তানা থেকে ১০০ মিটার দূরত্বে ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেস বানাতে শুরু করে মার্কিন সেনারা। ফলে আস্তানা বদল করা প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। নতুন ডেরাতেও বেশিদিন টিকতে পারেননি তিনি। কারণ দিনকয়েকের মধ্যেই পেন্টাগন সেখানে সেনাঘাঁটি বানানো শুরু করে। ‘উলভারিন ওপারেটিং বেস’ ঠিকানা ছিল প্রায় ১০০০ খানেক মার্কিন সেনার বাসস্থান। ফলে ফের গা ঢাকা দিতে হয় ওমরকে।

বিবিসি-র সম্প্রচার মন দিয়ে শুনতেন ওমর, এমনটাই সাংবাদিককে জানিয়েছেন তাঁর দেহরক্ষী ওমরি।  লাদেনের মৃত্যু নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্য়থা ছিল না। এমনকি েও জানা গেছে, তালিবানের নানা শাখা সংগঠন নাকি শুধু তাঁর নামেই চলতো।

সাংবাদিক ড্যামের মতে, বার বার ডেরা বদলেই হয়তো একসময় পাকিস্তানে গিয়ে পৌঁছন ওমর। ২০১৩ সালে করাচিতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে দাবি করে আফগান গোয়েন্দারা। যদিও সেই খবরের সত্যতা সম্পর্কে জোরালো কোনও তথ্য ছিল না। কারণ অন্য একটি সূত্র থেকে জানা যায়, ২০১৩-তে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন ওমর। কিন্তু, তিনি চিকিৎসা করাতে রাজি ছিলেন না। ফলে জাবুলেরই কোনও একটি জায়গায় শারীরিক অসুস্থতার কারণে মৃত্যু হয় তাঁর।

Shares

Comments are closed.