লন্ডন পুলিশের বাঙালি অফিসার, উড়িয়ে দিয়েছেন জঙ্গিকে, তাঁকেও সহ্য করতে হয়েছে বর্ণবিদ্বেষের যন্ত্রণা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: অনিলকান্তি বসু। নামটা শুনে যতই উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির নাম মনে হোক, ইনিই এখন লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের সবেচেয়ে আলোচনায় থাকা অফিসার। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্থাৎ সেই কিংবদন্তী স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। তারই কাউন্টার টেরোরিজম স্কোয়াড তথা সন্ত্রাসদমন শাখার শীর্ষ কর্তা এই অ্যাসিস্টেন্ট পুলিশ কমিশনার। লন্ডন ব্রিজে দু’দিন আগে যে জঙ্গি হামলা চালিয়েছিল, সেই ওসমান খানকে গুলি করে খতম করেছে এই দুঁদে অফিসারের নেতৃত্বে টিমই। শরীরে বোমা বাঁধা থাকতে পারে আন্দাজ করেও অদম্য সাহসের সঙ্গে ঝুঁকি নিতে পিছপা হননি সেদিন।

বিলেতে জন্মানো এই বাঙালি এখন নীল বসু নামেই পরিচিত। ওসমানকে নিরস্ত করার পর বিলেতে সোশাল মিডিয়া জুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছে। প্রশংসিত হয়েছেন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও। অথচ এও বাস্তব যে একদা এই বিলেতেই তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে চরম বর্ণবিদ্বেষের শিকার হতে হয়েছিল। নিজেই একটি সাক্ষাৎকারে সেকথা জানিয়েছেন নীল।

নীল বসুর বাবা পঙ্কজ বসু ছিলেন পেশায় ডাক্তার। ১৯৬১ সালে কলকাতা থেকে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মা ওয়েলসের মহিলা। নীল জানিয়েছেন, তাঁর মা পুলিশ হাসপাতালের নার্স ছিলেন। আর পঙ্কজবাবুও চিকিৎসা করতেন লন্ডন পুলিশের হাসপাতালেই। বাবা-মা মিলে নব্বই বছর পরিষেবা দিয়েছেন পুলিশ হাসপাতালে। ওই সাক্ষাৎকারেই লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (সন্ত্রাস দমন) জানিয়েছেন, ষাটের দশকের বিলেতে শ্বেতাঙ্গ নার্সের সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ চিকিৎসকের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি অনেকে। শিউরে ওঠার মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁর বাবা-মাকে। তিনি জানিয়েছেন, “আমার বাবা-মায়ের তখন বিয়ে হয়নি। তাঁরা হাত ধরে ওয়েলসের ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছিলেন। উগ্র শ্বেতাঙ্গরা পাথর ছুড়েছিল আমার বাবা-মায়ের দিকে।”

নীল জানিয়েছেন, পরবর্তীকালে তাঁকে এবং তাঁর দুই দাদাকেও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। এমনকী গত বছর ব্রিটিশ সংসদে স্বরাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিতে ভাষণ দিতে গিয়েও তিনি বর্ণবিদ্বেষের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তাঁর কথায়, “এখানকার অনেক লোক ইসলাম ফোবিয়ায় ভোগে। আমাকে এবং আমার দাদাদের বারবার প্রমাণ দিতে হয়েছে যে, আমরা মুসলমান নই।”

https://twitter.com/KTHopkins/status/1200727290218532864

সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের কথাও বলেছেন নীল। জানিয়েছেন, তাঁর বাবা চাইতেন ছেলে ব্যাঙ্কার হোক বা আইনজীবী। নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি নিয়ে স্নাতক হওয়ার পর বার্কলে ব্যাঙ্কে চাকরিতে ঢুকেছিলেন নীল। তারপর সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে লন্ডন পুলিশের চাকরিতে যোগ দেন। তখন বয়স চব্বিশ। তার পর খুব তাড়াতাড়িই বিক্সটনের সার্জেন্ট পদে পদোন্নতি হয় তাঁর। পঙ্কজ বসু প্রয়াত হন ২০১৫ সালে। ততদিনে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার হয়ে গিয়েছিলেন নীল। ছেলেকে নিয়ে গর্ব ছিল পঙ্কজবাবুর। পরে ক্যুইনস পুলিশ মেডেল পান নীল। আর এখন এও জল্পনা রয়েছে বিলেতে যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের চিফ হতে পারেন জন্মসূত্রে এই বাঙালি অফিসার।

নীল জানিয়েছেন, এমনিতে লন্ডনের মানুষের মধ্যে বর্ণিবিদ্বেষের প্রবণতা ছিলই। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর ঘটনার পর ইসলাম ফোবিয়া বাড়তে শুরু করে। ব্যক্তিগত ভাবে নীল মনে করেন, সন্ত্রাসদমনের পথ নিয়ে নতুন ভাবে ভাববার সময় আসন্ন। গত কয়েক বছরে ব্রিটেনে যে সব সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে তার নেপথ্যে অধিকাংশ জঙ্গিই ব্রিটিশ। তারা জন্মেছে ও বড় হয়েছে বিলেতেই। সুতরাং কোথাও হয়তো মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক সমস্যা রয়েছে। তাই সোশিওলজিস্ট ও ক্রিমিনোলজিস্টদের পরামর্শ নিয়ে চলতে হবে পুলিশকে।তবে লন্ডন ব্রিজে হামলাকারী আইসিস মনোভাবাপন্ন জঙ্গিকে খতম করার পর, নীল বসুর নাম এখন ঘুরছে ব্রিটিশ নাগরিকদের মুখে মুখে।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.