মেলাব-ই মেলা বই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

গৌতমকুমার দে

ধ্রুপদী খেয়ালের বন্দিশেই হোক কিংবা আধুনিক বাংলা গানের লিরিক– সেখানে যেমন কোকিল ছিল আছে থাকবে; তেমনই চিরভাস্বর থাকবে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা তার অনেক ঘাটতি-তাপ্পি, উচিত-অনুচিত, সম্ভাব্য হয়ে ওঠা না-পারা… এই সবের কোলাজে। এ নিয়ে কারও খেদ আছে, ক্ষোভ আছে, আছে প্রতিবাদ, রয়েছে অভিমান-রাগ-হতাশা– কিন্তু ওঁরা যে আসলে বুকে ধরে বইমেলাকে ভালবাসেন, সে নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই।

তাই বৃষ্টিতে যখন অনেক ছোট-ছোট প্রকাশক এবং লিটল ম্যাগাজিনের এক-একজনের কয়েক হাজার টাকার বই ভিজে গিয়েছে, ওঁদের পুঞ্জীভূত রাগ-ক্ষোভ অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে ‘প্রতিক্ষণ’-এর শুদ্ধব্রত দেবের একটি পোস্ট-এ। তাঁদের দিকে শুদ্ধব্রতবাবু বাড়িয়ে দিয়েছেন সহমর্মী হাত। জানিয়েছেন, যাঁদের রাতে বই-পত্রিকা রেখে যাওয়ার সুরক্ষিত জায়গা নেই, তাঁদের জন্য ৩১০ নম্বর স্টল (প্রতিক্ষণ) অবারিত। আশ্বাস দিয়েছেন, কোনও বই/ পত্রিকার অযত্ন/ ক্ষতি হবে না। যতক্ষণ পরিসর আছে, ততক্ষণ এই ধারা বজায় থাকবে।

ইভটিজিং রুখতে মেলার মাঠে দেখা গেল মহিলা পুলিশের বিশেষ বাহিনীকে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে চারটে জোনে ভাগ করা হয়েছে বইমেলাকে। প্রতিটি জোনের দায়িত্বে রয়েছেন একজন উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তা। পুরো বইমেলা প্রাঙ্গণের দায়িত্বে আছেন ডেপুটি পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার আধিকারিক। পুলিশের দুটো বিশেষ বাহিনী আছে বইমেলার ভিতরে বিক্ষোভ-মিছিল সামলাতে, পকেটমারদের পকেটসাফাই ঠেকাতে। এদের ব্যাকআপ হিসেবে আছে আরও দুটো বাহিনী।

আজ সন্ধ্যায় হল নম্বর ২-এর কাছে জনৈক পকেটমার হাতসাফাইয়ের মুহূর্তে ধরা পড়ল। সম্ভবত কাঙ্ক্ষিত বই একটু আগে পেয়ে যাওয়ার আনন্দের ঘোরে যাঁর পকেটে সিঁধকাটা হয়েছিল, সেই বাবু দয়াপরবশ হয়ে পকেটমারকে মেলার গেট পার করিয়েই ক্ষান্ত হলেন। নাম শুধালে শুধু বললেন, তিনি একটি বেসরকারি সংস্থায় হিসাব বিভাগের বড়বাবু। ওনার ব্যাগে অনেক বইয়ের মধ্যে দু’টি ছিল: Anne Fadiman-এর ‘Ex Libris’ এবং ড. পুরীপ্রিয়া কুণ্ডুর ‘চৌর্যসমীক্ষা’। জানি না, বাবুটির অমন করুণা ভাল বইয়ের মহানুভবতার স্পর্শজনিত কি না!

ব্লেজার পুলিশ! না না, এটা কোনও বইয়ের নাম নয়। বইমেলায় আগত আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথি, ভিআইপি বা ভিভিআইপিদের দায়িত্বে যে এসকর্ট বাহিনী রয়েছে, তারা ব্লেজার পরে থাকছেন। সেই থেকে ওদের গায়ে সেঁটে গিয়েছে এই অদৃশ্য লোকনাম-এর তকমা। নামটা কানে যেতে ওদের মধ্যে কেউ কেউ সেটা আবার তারিয়ে তারিয়ে উপভোগও করছেন দেখা গেল।

চারিদিকে বই শুধু বই, দেখে দেখে যদি কেউ ন্যূনতম ক্লান্তিবোধ করেন, তবে আরাম পেতে বইমেলা ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। সোজা চলে যান সেনসিটিভ ক্রিয়েশন-এর স্টলে। সেখানে পাবেন হরেক ডিজাইনের শো-পিস, ওয়াল হ্যাঙ্গিং সহ হস্তশিল্পের নানান নমুনা। সাজানো রয়েছে থরে-বিথরে। সেখান থেকে একটা ছোট্ট ইউ-টার্ন নিন। পৌঁছে যাবেন গরমাগরম ফুলকো লুচি, রেশমি কাবাব, ডায়মন্ড ফিশ-এর আড়ত ‘মা তারা রেস্টুরেন্ট’-এ। তবে রেটটা একটু ওপরের দিকেই। ওদের নজরটা একটু উঁচু বলেই বোধহয়!

পশ্চিমবঙ্গ শিশুসুরক্ষা আয়োগের স্টলের সামনে প্রতিদিনই আয়োজন করা হচ্ছে শিশুদের জন্য নানান অনুষ্ঠান। সেখানে ছোটরা যেমন অংশগ্রহণ করছে, তেমনই তাদের জন্য গল্প পড়ে শোনাচ্ছেন বড়রাও। রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্যদের স্টল থেকে প্রচার চালানো হচ্ছে, প্লাস্টিকের অপকারিতা ও দূষণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার জন্য।

এদিকে, অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হলেও ইন্টারনেট পরিষেবা যে তিমিরে ছিল, সেখানেই রয়ে গিয়েছে। মন্দের ভাল ভোডাফোন। করুণাময়ী বাসস্ট্যান্ডে জিও-র টাওয়ার থাকলেও, সেও সম্ভবত বইমেলায় এত জনসমাগম দেখেই হয়তো বোমকে গিয়েছে। ‘আরে পাগলা, সার্ভিস প্রোভাইড করবি কী, দেখেই থ মেরে যাবি!’ ভিড়ের মধ্যে থেকে ভেসে এল এই উক্তি।

নতুন বই বেরতে শুরু করলেও অবস্থাটা যেন বিকেলে ভোরের ফুল। সদ্যপ্রকাশিত বই: বাংলার মুখ থেকে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বিতাড়নের মর্মন্তুদ উপন্যাস দেবশ্রী চক্রবর্তীর ‘লাল চিনার পাতা’, ননীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ঋগ্বেদ রত্নমঞ্জুষা’ (দ্বিতীয় খণ্ড), স্বপন বসুর বিদ্যাসাগরের জীবন অবলম্বনে ৩ খণ্ডের উপন্যাসের ‘সমকালে বিদ্যাসাগর’-এর প্রথম খণ্ড, মিত্র ও ঘোষ থেকে সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের দুই শতাব্দীর আখ্যানধর্মী সুবৃহৎ উপন্যাস ‘চিত্রপট’, দে’জ পাবলিশিং থেকে সমৃদ্ধ দত্তর ‘ব্ল্যাক করিডর’ (দ্বিতীয় খণ্ড), জয়ন্ত দের অন্য উপলব্ধিপ্রাণিত ‘পাঁচটি ভৌতিক নভেলেট’, দেব সাহিত্য কুটির থেকে বিভিন্ন বিখ্যাতজনের আত্মকথার সংকলন ‘আত্মকথায় সেলিব্রিটি’ প্রভৃতি। অন্যধারার বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা শুভেন্দু দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘বাংলা পোস্টার: দুই বাংলার লেখা ও ছবি’ (মনফকিরা)। বাংলা পোস্টারের ইতিহাস অনেকটাই স্পষ্ট হবে এই বইটি পড়লে।

গাঙচিল-এর স্টলে দেখা গেল ভিন্ন ধারার সাহিত্য আন্দোলন নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন দুই সাহিত্যিক চিরঞ্জয় চক্রবর্তী ও সাত্যকি হালদার। প্রসঙ্গত, রামায়ণে বুৎপত্তির পাশাপাশি গাণিতিক সাহিত্য আন্দোলনের মূলপ্রবক্তা হিসাবেও জার্মান ভাষাবিদ চিরঞ্জয়ের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে।

আরেক সাহিত্যিক অরিন্দম বসুকে দেখা গেল, মেয়ে দিঘিকে বোঝাচ্ছেন বইমেলার ধরনধারণ সম্পর্কে। কারাগারের অভিজ্ঞতা-সমৃদ্ধ জনৈক শুটেড-বুটেড তথাকথিত সাংবাদিককে দেখা গেল পরনের ব্র‌্যান্ড সম্পর্কে বাকবিভূতি ছড়াতে ব্যস্ত। জেলের সঙ্গে মেলে হাঁড়ির মতন আগুপিছু তাঁর সঙ্গে রয়েছেন চার আনা-ফুটো পয়সা-আধুলি আরও কিছু।

এখানেই বইমেলার মাহাত্ম্য। যে পাঠক-দর্শকের মধ্যে বিভাজন করে না। এনআরসি, সিএএ নিয়ে তার নিজের মাথাব্যথা নেই। ক্রেতা লক্ষ্মী নিঃসন্দেহে, তা বলে মেলায় স্বাগত সকলে। মেলা বই বলে শুধু মেলাব-ই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More