শনিবার, নভেম্বর ১৬

বিস্ময়-শিশু অস্কার! যার ক্যানসার চিকিৎসায় স্টেমসেল ডোনেট করতে চেয়ে লাইন দেন ৫ হাজার মানুষ

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ঘটনা এক: একটি সদ্যোজাত শিশুর জন্মের পরেই প্রয়োজন হয়েছে জটিল অস্ত্রোপচারের। প্রয়োজন রক্তের। বিরল গ্রুপের রক্ত মিলছে না ব্লাডব্যাঙ্কে। স্বেচ্ছাসেবকেরা বারবার রক্তদাতার খোঁজে আবেদন করলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, মিলল না সাড়া। রক্তের অভাবে মারা গেল শিশুটি।

ঘটনা দুই: চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করলে বেঁচে যাবে জটিল অসুখে ভোগা কিশোরী মেয়েটি। স্বাস্থ্য দফতরে আবেদন জানিয়ে হাপিত্যেশ করে বসেছিল পরিবার। এক রোগীর ব্রেন ডেথ হওয়ার খবর এল, মাপকাঠি মিলেও গেল। কিন্তু অঙ্গদানে রাজি হল না সেই রোগীর পরিবার। কিছু দিন পরে মারা যায় কিশোরী।

দু’টি ঘটনাই পরিচিত। রোজ না হলেও, কম-বেশি ঘটেই থাকে আমাদেরই আশপাশে। আমরা প্রায়ই দেখি, সোশ্যাল মিডিয়ায় এ ধরনের বিভিন্ন আবেদনের কথা পোস্ট করছেন অনেকেই। সব আবেদনের শেষে কী হয়, জানতে পারি না সব সময়। তবে রক্তের অভাবে বা অঙ্গের অভাবে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই সামনে আসে।

মানবিকতার দৃষ্টান্ত

কিন্তু এই পরিচিত ঘটনাগুলিকেই ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছে অস্কার স্যাক্সেলবি লি-এর কাহিনি। ইংল্যান্ডের উরসেস্টার শহরের ছোট্ট অস্কারের ঘটনা এই সময়ের সব চেয়ে বড় মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মধ্যে। যা কখনও ভাবা যায় না, তা-ই ঘটেছে অস্কারের সঙ্গে। পাঁচ হাজার মানুষ এসে বৃষ্টিতে ভিজে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করেছেন, অস্কারকে স্টেম সেল দেবেন বলে।

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ক্যানসার ধরা পড়ে পাঁচ বছরের অস্কারের। চিকিৎসা পরিভাষায় এ ক্যানসারের নাম টি-সেল অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকোমিয়া। জটিল এই মারণ অসুখ অনেকটা ছড়িয়ে গিয়েছে ছোট্ট শরীরে। হু হু করে বেড়ে চলেছে শ্বেত রক্তকণিকা।

তিন মাসের মধ্যেই প্রতিস্থাপন প্রয়োজন

মাস তিনেক চলে চিকিৎসা। তত দিনে অস্কারের পরিবারের তরফে একটি ফেসবুক পেজ খুলে শুরু হয়েছে ক্রাউড ফান্ডিং। অস্কারের চিকিৎসার বিশাল খরচ বহন করার জন্য চাঁদা তুলছিলেন তাঁরা। ফেব্রুয়ারি মাসে চিকিৎসকেরা নিদান দিলেন, পরিস্থিতি ক্রমে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিন মাসের মধ্যে স্টেম সেল প্রতিস্থাপন করতে হবে। একমাত্র তাতেই প্রাণ বাঁচতে পারে ছোট্ট অস্কারের।

ফের অথৈ জলে পড়ে অস্কারের পরিবার। কোথা থেকে পাবে তারা স্টেম সেল! চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, রক্তের গ্রুপ ও অন্য কিছু মাপকাঠি মিললে, কেউ ডোনেট করতে পারেন স্টেম সেল। ডোনার খুঁজে পাওয়া জরুরি। কিন্তু সব মাপকাঠি মিলিয়ে ডোনার খুঁজে পাওয়া কি অতই সহজ! কে এগিয়ে আসবেন চট করে এই কাজে!

এত মানুষ, কেউ তো এগিয়ে আসবেন!

পাশে দাঁড়ায় অস্কারের স্কুল। অস্কারের জন্য একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফেলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য,অস্কারের জন্য স্টেম-সেল ডোনার খুঁজে বার করা। “আমরা ঠিক করেছিলাম, অস্কারকে বাঁচাতে যত দূর যেতে হয় যাব। এত এত মানুষের মধ্যে কারও প্যারামিটার অস্কারের সঙ্গে মিলবে না, তা হতে পারে না। আমাদের কেবল খুঁজতে হবে। চেষ্টা করতে ক্ষতি কী!”– বলছিলেন স্যু ব্ল্যাডেন, অস্কারের স্কুলের মুখপাত্র।

এই ভেবেই, অস্কারের চিকিৎসায় টাকা তোলার জন্য খোলা সেই ফেসবুক পেজ থেকেই আহ্বান জানানো হয় একটি ইভেন্টের। জানানো হয়, ১৭ থেকে ৫৫ বছর বয়সি স্টেমসেল ডোনার লাগবে। রক্তের গ্রুপ উল্লেখ করা হয়। বলে দেওযা হয় অন্যান্য যোগ্যতাও। মার্চ মাসের একটি শনি-রবিবারে আয়োজিত এই ইভেন্টে ধারণা করা হয়েছিল, খুব বেশি হলে কত আর মানুষ আসবেন, বড় জোর ৫০০! সেই মতো স্বেচ্ছাসেবকও মোতায়েন করা হয়েছিল ইভেন্টে। তবে শনিবার সকাল থেকে যখন বৃষ্টি শুরু হল, তখন অনেকেই ভেঙে পড়েন। আশা ছেড়ে দেন, ডোনার খুঁজে পাওয়ার।

বৃষ্টি মাথায় কাতারে কাতারে মানুষ

কিন্তু একটু বেলা বাড়তেই, কিছু মানুষ আসতে শুরু করেন। তার পরে আরও, তার পরে আরও অনেকে! ১৮০০ মানুষ নাম লেখান অস্কারের জন্য স্টেম সেল দিতে ইচ্ছুক মানুষের তালিকায়! এত মানুষ সামাল দিতে নাজেহাল দশা হয় স্বেচ্ছাসেবকদের। রবিবার তো বিস্ময়ের পারদ মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। হাজির হন হাজার তিনেক মানুষ। সপ্তাহান্তের ছুটি ছেড়ে, বৃষ্টিতে আটকে না গিয়ে, দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন এত মানুষ! শুধু অস্কারের জন্য!

ব্ল্যাডেন বলেন, “সকলে লাইনের পর লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে। কারও কোনও বিরক্তি নেই, কারও কোনও অভিযোগ নেই। কেউ কাউকে তাড়াও দিচ্ছেন না, কেউ চলেও যাচ্ছেন না। কাতারে কাতারে মানুষ ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন নাম লেখানোর জন্য। মানবিকতার এই অভূতপূর্ব জমায়েত যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না আমরা! একটা অচেনা শিশুর অসুখ এত মানুষকে ছুঁয়ে যায় আজও!”

বিপদ কাটল

ছ’সপ্তাহ সময় লেগেছিল অত মানুষের নামের তালিকা থেকে সঠিক ডোনারকে খুঁজে বার করতে। চিকিৎসকদের বক্তব্য ছিল, অসংখ্য প্যারামিটার মেলাতে হয়। সকলেই এসে রক্তপরীক্ষা করে এবং নিজের ইচ্ছের কথা জানিয়ে গেছেন, এর পরে তাঁদের মধ্যে থেকে ঠিক মানুষটিকে খুঁজে নিয়েই শুরু করা হবে প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি। সব ঠিক থাকলে আগামী তিন মাসের মধ্যেই বিপন্মুক্ত হবে ছোট্ট অস্কার।

তাই হয়েছিল। জুলাই মাসের মধ্যেই স্টেম সেল প্রতিস্থাপন করা গিয়েছিল তার। নির্মূল হয়েছিল ক্যানসার। পুরোপুরি সুস্থ সে হয়নি, হওয়া সম্ভবও নয়। কিন্তু মৃত্যুর বিপদ কাটিয়ে বাবা-মায়ের কোলে ফিরে গিয়েছিল আদরের সন্তান।

কুর্নিশ সে দিনের মানুষগুলোকে

কিন্তু সে তো পরের কথা। তার আগেই যে মানবিকতার নিদর্শন গোটা ইংল্যান্ডের মানুষ দেখেছিলেন, তাকেই কুর্নিশ করেছে নেট-দুনিয়া। বলেছে, মানুষের বিপদে এ ভাবে যদি সকলে জোট বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তা হলে সব রকম বিপদেই কোনও না কোনও পথ বেরোতে পারে।

Comments are closed.