বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

জ্বলন্ত আমাজনের বুকে প্রতিবাদে জ্বলে উঠেছেন যে আদিবাসী মানুষটি, গর্জে উঠেছেন অরণ্যের অধিকারে

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

হু হু করে জ্বলে যাওয়া বনভূমি ঘিরে তখন রোজ বাড়ছে বিক্ষোভ। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনেতারা পর্যন্ত। এ সবের মধ্যেই নিঃশব্দে পুড়ছে আমাজন অরণ্য। দাউদাউ করে বাড়ছে আগুন। ঝলসে যাচ্ছে পশু, পাখি, গাছ। সমালোচনা থেকে হাহাকার– সবই হচ্ছে, কিন্তু নিভছে না আগুন। এই ভয়াল পরিস্থিতিতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন একটি মানুষ।

তিনি কাদজির কায়াপো।

ব্রাজিলের আমাজন অরণ্যকে কেন্দ্র কে যে সব স্থানীয় উপজাতি জীবনধারণ করে, তাদেরই একটি কায়াপো। সেই আদিবাসী কায়াপো সম্প্রদায়ের নেতা তিনি। বিশ্ব জুড়ে তোলপাড়ের মাঝে নিঃশব্দে এগিয়ে এসেছেন ঘর ছেড়ে। সঙ্গে তাঁর নিজের তরুণ ছেলে এবং আরও কয়েক জন গ্রামবাসী। ভৌগোলিক ভাবে ব্রাজিলের পারা রাজ্যের বাসিন্দা তাঁরা।

কায়াপো আদিবাসীদের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বাস করেন। অরণ্যই তাঁদের ধাত্রী। তাঁরা জানেন, অরণ্য আছে বলেই তাঁরা বেঁচে আছেন। বহির্জগতের কাছে হয়তো তাঁরা ‘অনুন্নত’, ‘অশিক্ষিত’, ‘অসভ্য’। কিন্তু তাঁদের এই শিক্ষাটুকু জীবন শিখিয়ে দিয়েছে, যে প্রকৃতি না থাকলে মানুষও থাকবে না। অরণ্য না থাকলে তাঁরাও থাকবেন না।

তাই অবৈধ কাঠুরেদের অনুপ্রবেশে কড়া নজর রাখছেন তাঁরা। যে সর্বগ্রাসী ভয়াল আগুন লেগে গেছে, তা নেভানো অত সহজ নয়। কিন্তু আগুন যাতে আর না বাড়ে, নতুন করে যাতে আর কেউ কোনও ক্ষতি না করতে পারে, সে জন্য জান লড়িয়ে দিয়েছেন কায়াপো। দিন-রাত এক করে রুখে দিচ্ছেন, আগুন বাড়ানোর চক্রান্ত।

হ্যাঁ, স্থানীয় উপজাতির মানুষগুলোর কাছে এটা চক্রান্তই। তাঁরা মনে করেন, বনজ সম্পদ, চাষের জমি, দামী খনিজ পদার্থের লোভে ইচ্ছে করে আগুন লাগানো হয়েছে আমাজনে। তবে তাঁরা একাই নয়। এই অভিযোগ উঠেছে বিশ্ব জুড়ে। প্রেসিডেন্ট জাইরো বলসোনারো ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাঁর অরণ্য-নীতি সমালোচনার মুখে। সংরক্ষিত এলাকায় চাষজমি খনি খোঁজার ব্যাপারে অনুশাসন আলগা করেছেন তিনি, আর তাতেই মাথা চাড়া দিয়েছে খনিমাফিয়া জমিমাফিয়ারা। অবাধে সাফ হয়ে যাচ্ছে অরণ্য। আর সেই সাফাইয়েরই বড় রূপ এই অগ্নিকাণ্ড। উপগ্রহ চিত্রও বলেছে, এইআগুন প্রাকৃতিক নয়, ম্যানমেড।

এ ভাবে আগুন লাগিয়ে আমাজন উজাড় করা শুরু হয়েছে অগাস্ট মাস থেকেই। তার পর থেকেই নিয়মমাফিক পাহারা দিতে শুরু করেছেন তাঁরা। আমাজনের বিশাল এলাকার আগুনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনার পরেই এই পদক্ষেপ তাঁদের।

আদিবাসী নেতা কাদজির কায়াপো পারা জেলার ক্রিমেজ গ্রামের প্রধান। মাথায় ঐতিহ্যবাহী পালকের মুকুট তাঁর। গলায় দীর্ঘ নেকলেন। সারা গায়ে ফালা ফালা দাগ। মুখে-কপালে লাল রঙ। নিজের গ্রামের সকলের সুখ-দুঃখের সঙ্গী তিনি। কেউ বিপদে পড়লেই ছুটে যান যখন-তখন। খ্রিস্টান ধর্মের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক না থাকলেও স্থানী কায়াপো ভাষায় তিনি পরিচিত ‘যিশুখ্রিস্ট’ নামে।

এমন মানুষ যে তাঁর মায়ের বিপদে ঘরে বসে থাকতে পারবেন না, সেটাই তো স্বাভাবিক। আর অরণ্যের চেয়ে বেশি মাতৃত্ব যে আর কোথাও নেই, তা খুব ভাল করে জানেন এই জল-জঙ্গলের মানুষগুলো। তাই তো গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন কাদজির। পরিচালনা করছেন নজরদারি অভিযান। তাঁরা বুঝেছেন, আদিবাসী ভূখণ্ডে বহিরাগতদের ঢোকা বন্ধ  করতে না পারলে, এই আগুন বাড়তেই থাকবে।

কাদজির কায়াপো বলেছেন, “এটা আমাদের অরণ্য। কারণ আমরা এখানে বাঁচি, আমরা একে বাঁচাই। আমরা অরণ্য রক্ষা করি। এই অরণ্যের ক্ষতি করবে, এমন কাউকে আর আমরা ঢুকতে দেব না। এত দিন যে ঢুকতে দিয়ে ভুল করেছি, তা বুঝতে পারছি এখন। স্বপ্নেও ভাবিনি, অরণ্যের এত বড় ক্ষতি কেউ করতে পারে!”

দেখুন কাদজির কায়াপোর ভিডিও।

কায়াপোদের প্রচেষ্টা বিফলে যায়নি। আমাজনের আগুন আর বাড়েনি। কয়েক দিন আগেও সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে ছিল যে জ্বলন্ত আমাজন, তার আগুন স্তিমিত হচ্ছে ক্রমে। কিন্তু তার আগেই পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে অসংখ্য গাছ, পশু, পাখি।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইরো বলসোনারো অবশ্য এখনও দায় নেননি এই বিপর্যয়ের। বিচলিতও হননি বিশেষ। অগ্নিকাণ্ডের একটা পর্যায়ে কেবল সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিলেন আমাজনে। এখনও তাঁর বক্তব্য, অতীতে আমাজনের রেনফরেস্টে আদিবাসীদের যে ভূমি বরাদ্দ হয়েছিল, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। ব্রাজিলের ১৪ ভাগই এখন আদিবাসী ভূমি। আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির তুলনায়, অনেক কম সংখ্যক মানুষের জন্য এটা বিশাল এলাকা।

কায়াপো-রা অবশ্য এই দাবি শুনে ক্ষোভে জ্বলে উঠেছেন। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের জমিতে একমাত্র অধিকার তাঁদেরই থাকবে। তাঁরা অরণ্যের গুরুত্ব বোঝেন, তাই তাঁরাই বাঁচাবেন অরণ্য। প্রয়োজনে আরও বড় লড়াইয়ে নামবেন বলে জানান কাদজির কায়াপো। বুঝিয়ে দেন, অরণ্যের অধিকার ছাড়বেন না তাঁরা, কোনও কিছুর বিনিময়েই।

কায়াপোর জেদি সুরে যেন বেজে ওঠে এ দেশেরই সেই বহু পরিচিত গণসঙ্গীত, “গাঁও ছোড়ব নাহি, জঙ্গল ছোড়ব নাহি, মায়ে-মাটি ছোড়ব নাহি, লড়াই ছোড়ব নাহি”…

Comments are closed.