নিস্পৃহতা ও নিজস্বী

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    যৎপরোনাস্তি বিস্ময় ও বিরক্তি প্রকাশ করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

    অরাজক জনতার পাশবিকতা আজ এখানে তো কাল সেখানে দেশের সহনশীলতার যাবতীয় আদর্শকে এ ভাবে তছনছ করে দেবে, আর আমরা গোটা জাতি, সরকার এবং দেশের আইনের অভিভাবক সংসদ সেটাকে চুপচাপ মেনে নেব! যাকে তাকে ইচ্ছে হলেই পিটিয়ে মেরে দেব! এমনকী পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধাও বাদ পড়ছে না! কাউকে বলব ছেলেধরা, তো কেউ আবার গরুচোর–একটা তকমা লাগিয়ে দিয়ে সকলে মিলে পেটাও। মার খাওয়া ব্যক্তি কাকুতি মিনতি করলেও, প্রাণভিক্ষা চাইলেও পিটিয়ে যাও। যতক্ষণ না মরে।
    সে দিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তিন বিচারপতির বেঞ্চ যা বলল, তার মর্মার্থ, ওহে জনগণ ও তাঁদের নেতারা, কান খুলে শুনে নাও, এ সব চলবে না। কেউ অপরাধ করেছে ধরে নিয়ে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। কারও না। আইন করে হয়তো কেউ কাউকে ভালবাসাতে পারে না, কিন্তু আইন অবশ্যই এই প্রহার ব্যাধি রুখতে সক্রিয় হতে পারে। সেই উদ্দেশ্যে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে বলা হয়েছে চার সপ্তাহের মধ্যে জানাতে হবে কী কী ভাবে এই ‘টাইফুন সদৃশ দৈত্য’ কে কোতল করা যায়।
    অরাজক ভিড়তন্ত্রে সামিল হওয়া দুষ্কৃতীদের তো শায়েস্তা করতেই হবে, কিন্তু পঁয়তাল্লিশ পাতার রায়ে একটি অনুচ্ছেদ সামগ্রিক ভাবে নাগরিক সমাজের ন্যূনতম সভ্যতা, ভব্যতা, বিবেক ও দায়িত্ববোধ নিয়েও বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয়। খুব হতাশা ও অনাস্থার জন্ম দেয়।

    প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, আমাদের এই ভারতবর্ষে ক্রমশ বেড়ে চলা ভয়ঙ্কর জন-হিংসা, গণপ্রহারের হৃদয়বিদারক দৃশ্যের পাশাপাশি আর একটা ছবিও ফুটে উঠছে, যা কম আতঙ্ক বা উদ্বেগের নয়। কিছু লোক যখন পেটায় তখন বাকিরা দেখান বিবেকহীন নিস্পৃহতা, তাঁরা নির্বাক দর্শক। পুলিশ নীরব ও কার্যত নিষ্ক্রিয়। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার ঘটনা, নিরীহ মানুষকে অযথা কলঙ্কিত করে পিটিয়ে মারার এই কাজটাকে মহান কৃতিত্ব হিসেবে দেখিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢাক পেটাচ্ছে স্বয়ং অপরাধীরা।
    সর্বোচ্চ আদালতের এই শোকগাথা থেকে একটা ধ্রুবসত্য নিঃসৃত হয়। সুশীল নাগরিক সমাজ আসলে খুব আত্মকেন্দ্রিক। নিজেকে ছাড়া কাউকে চেনে না। প্রায় কোমায় চলে যাওয়া মোমবাতি-শিল্পকে একটু আধটু অক্সিজেন জোগাতে মাঝে মাঝে গোধূলি বেলায় গোষ্ঠী-পদচারণা হয় বটে, কিন্তু ময়দানে নেমে অন্যায় অপরাধকে রুখে দেওয়ার অঙ্গীকার কোথায় ভাই? নেই। ঝামেলায় জড়ানোর বড় ভয়। বরং দু দান তাস বা দু ছিলিম তামাকু সেবনের কায়দায় দু তিনটে সেলফি হয়ে যাক! মানুষ মার খাচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে, মরে যাচ্ছে, তাকে ফ্রেমে রেখেই নিজস্বী হলে কত থ্রিল, তাই না?
    ওটাই তো আমাদের নিজস্ব জগৎ। ঝুটঝামেলাবিহীন!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More