প্যারিসের রাজপথে সাইকেল চালাচ্ছেন পরমব্রত! খুঁজে ফিরছেন ‘হোমল্যান্ড’, বইছেন ‘গঙ্গা’র মতো

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের নতুন সিনেমা মুক্তি পেয়েছে নেটফ্লিক্সে। সিনেমাটি চলছে এখন সেখানে। নাম, ‘হোমল্যান্ড… লা পাত্রি’। এই প্রথম ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে তৈরি ছবিতে অভিনয় করেছেন বাঙালি অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।

    অভিধানে ‘হোমল্যান্ড’ শব্দের সঠিক অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। হোমল্যান্ড মানে কি পিতৃভূমি? না মাতৃভূমি? নাকি শুধুই জন্মভূমি? বাসভূমি কি কখনও হোমল্যান্ড হতে পারে? সঠিক উত্তর নেই। নেই অর্থ। ফরাসি ভাষায় ‘লা পাত্রি’ কথার অর্থ, The Homeland। কিন্তু একটি মানুষের হোমল্যান্ড বলতে কী বোঝানো হয় আদতে? সেই উত্তর এবং শিকড় খুঁজে বের করার গল্পই বলেছে অনিন্দ্যর এই ছবি।

    আসলে, আমাদের সকলেরই জীবন কিছু না কিছু একটা খোঁজের মধ্যে থাকে। সেই খোঁজা থেকেই এই ছবি শুরু।

    আর্মেনিয়া থেকে ফ্রান্সে এসেছেন ছবির নায়িকা অ্যানি। অ্যানি এসেছেন নিজের শিকড়ের সন্ধানে। তাঁর বাবা-মা ফ্রান্সের বাসিন্দা ছিলেন, পরে কর্মসূত্রে চলে যান আর্মেনিয়ায়। সেই ফ্রান্সে নিজের জন্মভূমি খুঁজতে এসে আঘাত পান তরুণী অ্যানি। কারণ তাঁর জানা ও শোনা সেই জায়গার আমূল পরিবর্তন! তিনি কিছুতেই মেলাতে পারেন না তাঁর ভাবনা ও কল্পনার সঙ্গে বাস্তবকে। এমন সময়, এই সন্ধানী জার্নি চলাকালীন ছবির নায়ক গঙ্গার সঙ্গে পরিচয় হয় মেয়েটির।

    পরমব্রতর চরিত্রের নামই ছবিতে ‘গঙ্গা’। গঙ্গা নদী যেমন ভারতের বিভিন্ন জায়গা দিয়ে বয়ে চলেছে তেমনই ছবিতে পরমব্রতর চরিত্রটিও বয়ে চলেছে স্থান থেকে স্থানান্তরে। তিনি কোনও নির্দিষ্ট একটি জন্মভূমিতে বিশ্বাসী নন। সমস্ত পৃথিবীটাকেই জন্মভূমি বা বাসভূমি মনে করেন তিনি। আর তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের পরেই পাল্টে যায় অ্যানির শিকড় সম্পর্কে ধারণা। ছবির ভাষাও তাই ক্রসওভার। বিভিন্ন ভাষা একত্রে ব্যবহৃত হয়েছে ছবিতে।
    অনিন্দ্য ছাড়াও এই ছবির সহ-চিত্রনাট্যকার সোমঋতা ভট্টাচার্য। তিনি থাকেন ফ্রান্সেই।

    পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় জানালেন “ছবিটার শ্যুট করতে চার-পাঁচ বছর সময় লেগেছে। ২০১৪ সালে প্রথম প্যারিসে শ্যুট করি আমি। মাঝে কিছুটা বিরতি থাকলেও কাজ চলছিল ছবি নিয়েই। পরবর্তী কালে ২০১৭ সালে আবার শ্যুট করি প্যারিসেই। ফ্রান্স ও ভারতের চলচ্চিত্র ইউনিট যৌথ ভাবে তৈরি করেছে এই ছবিটি।”
    এ ছবিতে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়কে প্যারিসের রাজপথে দেখা গেছে সাইকেল চালাতে। পরমব্রতর অনবদ্য অভিনয় এ ছবির সম্পদ। এছাড়াও অভিনয় করেছেন আনি হভ্যানিসিআঁ, জনাথন দুমন্তিয়ের, ভারজু, সিলভি দো নেফ প্রমুখ।

    পরমব্রতকেই কেন গঙ্গার চরিত্রে নিলেন পরিচালক? অনিন্দ্য জানালেন, বাঙালির যে স্মার্টনেসের কথা আমরা সবসময় শুনে এসেছি, যে স্বতঃস্ফূর্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত মনোভাব দিয়ে বাঙালি অনেক কিছু জয় করতে পারে, সেই স্মার্টনেস একমাত্র আছে বাঙালি অভিনেতা পরমব্রতর মধ্যেই। গঙ্গা নামের যে ভারতীয় চরিত্রটি ছবিতে আছে, সে ভিসা বা পার্সপোট ছাড়াই নিজের দেশের বাইরে ফ্রান্সে চলে এসছে, সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে গঙ্গা নদীর মতোই বহমান, শিকড়হীন। এরকম একটা চরিত্রের জন্য পরম পারফেক্ট।

    পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় নিজেও একজন অভিনেতার পাশাপাশি পরিচালকও। ফলে এমন একটি প্রথাবর্হিভূত ছবিতে তাঁর সঙ্গে কাজ করার দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে অনিন্দ্যর। তবে এরকম একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি শ্যুট করতে গিয়ে যে সব পরিস্থিতি খুব সুখকর হয়, এমনটা তো নয়। কিন্তু সে যখ যাই হোক না কেন, এমন একটি কম বাজেটের ছবিতে পরমব্রত নিজে একজন তারকা অভিনেতা হয়েও সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন।

    “কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমনও ঘটনা ঘটেছে, যে পরিচালক হিসেবে আমি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে, যে শ্যুটিং চলার সময়ে ক্ল্যাপ দিতে পারছি না প্রয়োজন মতো। সেখানে পরমব্রত নিজে ক্ল্যাপ দিয়ে যাচ্ছেন। আমার ধারণা, আমাদের দুজনের তরফ থেকেই খুব ইন্টারেস্টিং অভিজ্ঞতা হয়েছে।”– বলছিলেন অনিন্দ্য।

    পরমব্রত বললেন “সচরাচর আমরা যেরকম কাজ করে থাকি এই ছবিটা সেরকম নয়। এটি পরীক্ষামূলক কাজ। আর ছবিটি যে বার্তা দিতে চায় তার সঙ্গে আমি একাত্ম হতে পেরেছি।”

    শ্যুটিংয়ের অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নিলেন পরম। “প্রবল ঠান্ডা ছিল তখন। অত শীতে আমি কখনও প্যারিস যাইনি। জানুয়ারি মাসে অত ঠান্ডায় শ্যুট! এরকম ঠান্ডায় বিদেশে থেকেছি পড়ার সময়ে, কিন্তু তখন ঘরের ভিতরে থাকতাম। রাস্তায় নেমে কাজ করতে হত না। ছবিটা করে বুঝলাম, এখানে যেমন চুড়ান্ত গরমে কষ্ট পাই আমরা, সেরকম চুড়ান্ত ঠান্ডাতেও একই রকম কষ্ট হয় ওদেশেও। আর সামগ্রিক ভাবে ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা খুব ভালো। এমন ছবি হয় না অন্তত আমাদের দেশে।”– বললেন তিনি।

    এই বহুভাষী ছবিটি প্রযোজনা করেছে এমকে মিডিয়া। অলকনন্দা দাশগুপ্তের তৈরি আবহ এবং আইজ্যাক টুদিলু পাওলো, নিকোলাস ভার্ট ও আলম খানের দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি। ছবির কিছু দৃশ্য অনিন্দ্যসুন্দর। অগ্নিমিত্রা পলের পোশাক পরিকল্পনাও ছবির চরিত্রগুলিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। অমিতাভ দাশগুপ্তের সম্পাদনা যথাযথ।

    পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর কেরিয়ারের শুরু শর্টফিল্ম ও টেলিফিল্ম তৈরির মাধ্যমে। তারা টিভি-তে অনিন্দ্যর পরিচালিত ও মনোজ মিত্র অভিনীত ‘সুধাময়বাবুর অদ্ভুত গল্প’ টেলিফিল্মটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ‘জয়পুর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এ অনিন্দ্যর আইফোনে তৈরি ছবি ‘লেবারারস’ সমাদৃত হয়েছে। ২০১৫ সালে অনিন্দ্যর ‘ঝুমুরা’ ছবি মুক্তি পেয়েছিল। অভিনয়ে ছিলেন সমদর্শী দত্ত, সোহিনী সরকার এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়।

    ‘হোমল্যান্ড … লা পাত্রি’ ছবিটি ২০১৮ সালে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আন্তর্জাতিক বিভাগে দেখানো হয়েছিল। এছাড়াও ছবিটি দাদাসাহেব ফালকে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০১৯-এ পুরস্কৃত হয় দিল্লিতে। হায়দ্রাবাদ ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২০-তেও পুরস্কার পায় ছবিটি।

    এই বিশ্বায়নের যুগে শিকড়ের টানে ঘরের ফেরার গল্প বলছে অনিন্দ্যর ফরাসি-ভারতীয় ছবি ‘হোমল্যান্ড … লা পাত্রি’। দেখুন ট্রেলর।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More