শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

দাঁত উপড়ে, ঠোঁট টেনে, মুখে বসানো চাকতি! সৌন্দর্যের নামে এই বর্বর প্রথার শেষ চায় জনজাতি

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

প্রথমে একে একে ভেঙে ফেলা হয় নীচের পাটির সব ক’টি দাঁত। তার পরে মুখের মধ্যে গোল বা চৌকো একটা বড় চাকতি ঢুকিয়ে দেওয়া হয় জোর করে। তার পরে নীচের ঠোঁট জোর করে টেনে, যতটা সম্ভব বড় করে, ঠোঁটের সঙ্গে আটকে দেওয়া হয় সেই চাকতি।

অমানবিক, ভয়ঙ্কর এই পদ্ধতিতে প্রচণ্ড ব্যথা হয় খুব স্বাভাবিক ভাবেই। গোটা মুখ আড়ষ্ট হয়ে যায়। কথা বলতে বা খেতে চরম অসুবিধা হয়, বলাই বাহুল্য। কিন্তু তবু, এই ভয়ঙ্কর বেদনাকে জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছেন ওঁরা। তা-ও আবার সৌন্দর্যের অজুহাতে!

আফ্রিকার দরিদ্র দেশ ইথিওপিয়ার সুরি নামের এক জনজাতি গোষ্ঠীর মধ্য়ে এই প্রথা তথা সংস্কার প্রচলিত বহু দিন ধরে। কিশোর বয়সে পৌঁছলে, মেয়েদের দাঁতগুলি ভেঙে দেওয়া হয় নির্মম ভাবে। রক্তে ভেসে যায় তারা। ওই অবস্থাতেই বসানো হয় তাদের ‘লিপ প্লেট’। মুখে জোর করে গুঁজে দেওয়া খোদাই করা, বা নানা রকম ছবি আঁকা চাকতিটিকে লিপ প্লেটই বলা হয়। যার লিপ প্লেট যত বড় হবে, সে তত সুন্দর বলে গণ্য হবে সুরি সমাজে!

আমাদের জন্য এই দৃশ্য ভয়ংকর, বীভৎস মনে হলেও শত শত বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে সুরি উপজাতির মেয়েদের মধ্যে।কাজটি যত ভয়ঙ্কর ও বেদনাদায়কই হোক না কেন, তা করা হয় রীতিমতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সুরি সমাজে প্রচলিত এই নিয়মে, যে মেয়ের লিপ প্লেট যত বড়, সে তত সুন্দর। তার বিয়ের সময়েও তত বেশি পণ দাবি করা হয় পরিবারের তরফে। পণ হিসেবে পাওয়া যায় অনেক গরু, যা দিয়ে চাষবাসের কাজ আরও সমৃদ্ধ হয়। সেই কারণেই কোনও পরিবারে মেয়ে জন্মালেই, তার কিশোর বয়সে পৌঁছনোর অপেক্ষায় থাকে পরিবার। সময় হলেই দাঁত ভেঙে পরিয়ে দেওয়া হয় ঠোঁটের চাকতি।

ইথিওপিয়ার সুরি উপজাতির এমন খবর ও ছবি ইতিমধ্যে প্রকাশিত সোশ্যাল মিডিয়ায়। নেটিজেনরা তীব্র প্রতিবাদ করেছে এই বর্বর প্রথার। এমনকী সুরি উপজাতির নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরাও এই রীতির বিরোধিতা করছে গত কয়েক বছর ধরে। শরীরকে এ ভাবে কষ্ট দিয়ে আর সৌন্দর্য অর্জন করতে চান না তাঁরা।

তবে কেন এবং কী ভাবে এই প্রথার প্রচলন শুরু হয়েছে, তার সঠিক কোনও কারণ এখনও জানা যায়নি। সুরি মানুষদের মধ্যেও খুব একটা স্পষ্ট ধারণা নেই এই নিয়ে। তবে একটি প্রচলিত তত্ত্ব বলছে, এক সময়ে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হতো সুরি কিশোর-কিশোরীদের। বিক্রি হওয়া থেকে বাঁচতেই এই প্রথা চালু হয় সুরি উপজাতির অন্দরে। যাতে এই দৃশ্য দেখার পরে কিশোর-কিশোরীদের কিনতে না চায় ক্রীতদাস মালিকেরা। 

পরবর্তী কালে এই তত্ত্ব বছরের পর বছর ধরে প্রবাহিত হতে হতে, সৌন্দর্য ও সংস্কারে পরিণত হয়েছে তাঁদের কাছে। কিন্তু আর কত দিন, বইতে হবে এই কষ্টকর প্রথার বোঝা, প্রশ্ন উঠেছে খোদ সুরি সমাজেই।

Comments are closed.