বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

মাঝরাতে গ্রিন করিডর, শহরের দু’প্রান্তে প্রতিস্থাপিত হল দু’টি কিডনি! অঙ্গদানে এগোচ্ছে রাজ্য

দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুক্রবার মধ্যরাতে, সারা শহরের বেশির ভাগ মানুষ যখন সপ্তাহান্তের দিনে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, দেরি করে ঘুমোতে যাওয়া মানুষেরাও যখন জেগে নেই, তখনই এক চরম ত্রস্ততার প্রহর গুনেছে এই শহরেরই একটি অংশ। পুলিশি তৎপরতার সঙ্গে চিকিৎসকদের দক্ষতার মিশেলে, এক ব্যক্তির কিডনি-তে ফের প্রাণ ফিরে পেলেন দু’জন। ফের অঙ্গদানের নজির দেখল শহর।

এবার আর দিনের আলোয় নয়, গ্রিন করিডর তৈরি হল মধ্য রাতেই। পুলিশি তৎপরতায় রাত সওয়া একটা নাগাদ বাইপাসের ধারের আর এন টেগোর হাসপাতাল থেকে এক ব্যক্তির কিডনি নিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স রওনা দেয় ভবানীপুরের এসএসকেএম হাসপাতালে। রাতেই অস্ত্রোপচার করলেন চিকিৎসকেরা। ৬৩ বছরের এক ব্যক্তির শরীরে বসেছে ওই কিডনি। আরএন টেগোরেও সফল ভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে আরও একটি কিডনি।

আপাতত দু’টি অস্ত্রোপচারই সফল হলেও, নির্দিষ্ট সময় না পেরোনো পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করতে রাজি নন চিকিৎসকেরা। জানা যায়নি গ্রহীতাদের নামও।

মস্তিষ্কে মারাত্মক রক্তক্ষরণ নিয়ে ১ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন বারুইপুরের বাসিন্দা, ৬০ বছরের মহাদেব মণ্ডল। কোমায় চলে যান তিনি। নিউরোসার্জারি বিভাগের সিসিইউ-তে ভর্তি ছিলেন তিনি, দক্ষ চিকিৎসকদের অধীনে চলছিল চিকিৎসা। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পরেও মস্তিষ্কে সাড় ফেরেনি তাঁর। বৃহস্পতিবার চিকিৎসকেরা ঘোষণা করেন ব্রেন ডেথ।

এর পরেই মহাদেব বাবুর পরিবারের কাছে অঙ্গদানের প্রস্তাব রাখেন চিকিৎসকেরা। প্রথমে নিমরাজি হলেও, একটু বোঝানোর পরেই রাজি হয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য দফতরে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সারতে শুরু করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সিদ্ধান্ত হয়, রাতেই সংগ্রহ করা হবে অঙ্গগুলি। এবং সেই মতো প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতিও শুরু হয় যত দ্রুত সম্ভব।

মহাদেববাবুর হার্টে বয়সজনিত সমস্যা থাকায়, তা সংগ্রহ করা যায়নি বলে জানিয়েছেন আরএন টেগোর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। লিভার ভাল অবস্থায় থাকলেও, প্রতিস্থাপনের জন্য কোনও গ্রহীতা এই মুহূর্তে মেলেনি। দু’টি কিডনি সংগ্রহ করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, একটি কিডনি আরএন টেগোর হাসপাতালেই ভর্তি থাকা এক রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। অন্যটি নিয়ে যাওয়া হয় এসএসকেএম-এ। সংগ্রহ করা হয়েছে মহাদেববাবুর চোখও। সল্টলেকের নারায়ণা নেত্রালয়ে রংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে দু’টি চোখ।

এই সপ্তাহে এই নিয়ে দু’টি অঙ্গদানের ঘটনা ঘটল শহরে। মঙ্গলবারই জোকার বাসিন্দা অঞ্জনা ভৌমিকের ব্রেন ডেথের পরে তাঁর পরিবারের লোকেরা সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর অঙ্গদান করবেন। সেই মতো তাঁর হার্ট, দু’টি কিডনি, লিভার, চোখ ও ত্বক দান করা হয়। আন্দুলের নারায়ণা হাসপাতাল থেকে এসএসকেএম-এ এসে পৌঁছয় অঙ্গগুলি। অঞ্জনাদেবীর অঙ্গে প্রাণ ফিরে পান চার জন। এসএসকেএম সূত্রের খবর, গ্রহীতারা সকলেই সুস্থ আছেন।

ঘটনার দু’দিন পরেই ফের অঙ্গদানের ঘটনা ঘটল এ শহরেই। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, সচেতনতাই হোক বা অনুপ্রেরণা, এ শহরে তথা রাজ্যে কারও অকালমৃত্যুু হলে অঙ্গদানের প্রবণতা বাড়ছে। এটা খুবই ইতিবাচক একটা লক্ষ্মণ। তথ্য বলছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮-তে রাজ্যে মরণোত্তর অঙ্গদানের হার বেড়েছিল৷ ২০১৮-তে ৩৮টি ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা মরণোত্তর অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে৷ সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এই নিয়ে মোট আটটা সফল হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করে, এই রাজ্য এক নয়া দিগন্তের সূচনা করেছে৷

চিকিৎসকেরা বলছেন, ‘‘গণমাধ্যম অঙ্গদানের ব্যাপারে সচেতনতা যথেষ্ট বাড়িয়েছে৷ ব্রেন ডেথ রোগীর পরিবার এখন অনেক সচেতন৷ আমরা কোনও পরিবারকে অঙ্গদানের জন্য জোর করতে পারি না, কেবল বলতেই পারি৷ তাই সচেতনতা বাড়ানো জরুরি৷”

আরও পড়ুন…

এক মহিলার অঙ্গদানে জীবন ফিরে পেলেন চার গ্রহীতা! নয়া নজির এসএসকেএম-এ

Comments are closed.