মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৫

নার্ভের সমস্যা জিতে নতুন করে বেঁচে ওঠার নাম ‘নিউরোরিহ্যাব’

নার্ভের সমস্যা বা স্ট্রোক মানেই অনেক দিন পর্যন্ত একটা ধারণা ছিল, বহুদিন হয় তো শয্যাশায়ী হয়েই কাটাতে হবে।কিন্তু বিছানা নয়, নতুন করে বেঁচে ওঠার নামই ‘নিউরোরিহ্যাব’।  তা নিয়েই কথা বললেন, বিশিষ্ট ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ ডাঃ মৌলিমাধব ঘটক।

প্রশ্নঃ প্রায়ই শুনি নার্ভের নানা অসুখে ‘নিউরো রিহ্যাবিলিটেশন’ খুবই জরুরি।  সেটা কী?

উত্তরঃ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে আমরা নানা অসুখে ভুগি।  যার প্রভাব পড়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়।  কাজ-কর্মের খুবই ব্যাঘাত ঘটে।  মন মেজাজও তিরিক্ষে হয়ে থাকে।  বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ওষুধ দিয়ে, অপারেশন করেও এই ভোগান্তি থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না।  অনেক সময় রোগী ‘নিউরো-রিহ্যাব’ সেন্টারে এসে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে চান।  প্রথমেই একজন মেডিকেল রিহ্যাবিলিটেশন-এর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নেতৃত্বে রোগীর সমস্যাগুলোর উৎস এবং সেই সমস্যার গভীরতা মেপে দেখা হয়।  যে সমস্যার জন্য যে রকম প্রয়োজন, সেই মতো রোগীকে নানারকম ওষুধ প্রেসক্রাইব করা হয়।  আবার পাশাপাশি বিভিন্ন রকম থেরাপিও চালু করে দেওয়া হয়।  এ সবই ‘নিউরোরিহ্যাবিলিটেশন’-এর মধ্যে পড়ে।

প্রশ্নঃ ঠিক কী কী কারণে নার্ভের অসুখ হয় ?
উত্তরঃ নার্ভের অসুখ একটি নয়, অসংখ্য কারণে হয়।  তবে তার মধ্যে প্রধান যেসব কারণগুলো সেগুলিই বলছি।
প্রথম কারণ, রক্তের সংবহনের সমস্যা থেকে ব্রেন স্ট্রোক হতে পারে।
দ্বিতীয় কারণ, এক ধরণের সংক্রমণের কারণে একদিকে যেমন মেনিনজাইটিস, এনকেফেলাইটিসের মতো মস্তিষ্কের রোগ হয়, তেমনই শিরদাঁড়া এবং যক্ষ্মা বা টিবি’র মতো সংক্রামক রোগও হতে পারে।
তৃতীয় কারণটি একটু অন্য ধরণের।শিরদাঁড়া এবং পেরিফেরাল নার্ভের আঘাত থেকেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। চতুর্থত, বয়সজনিত এবং অন্যান্য কিছু কারণে পারকিনসনস ডিজিজের মতো নার্ভের রোগও হতে দেখা দিতে পারে। এর পরের কারণ বিপাক-জনিত সমস্যা।এই সমস্যার কারণে ডায়াবিটিসের মতো কিছু রোগ থেকেও নার্ভের অসুখ হতে পারে।এছাড়াও জিনগত ও অন্যান্য কারণে বাচ্চাদের মধ্যে সেরিব্রাল পলসি ও অন্যান্য বংশগত নার্ভের অসুখ দেখা দিতে পারে।

প্রশ্নঃ বাচ্চাদেরও সেরিব্রাল পালসি?
উত্তরঃ সেই জন্যই যখন বাচ্চাদের আনা হয়, আমরা প্রথমেই জিনগত কিছু কারণ খতিয়ে দেখি বা বংশগত নার্ভের অসুখের ইতিহাস পর্যালোচনা করি।  অনেক ক্ষেত্রে চট করে সূত্র মিলেও যায় বা পরবর্তী চিকিৎসার পদ্ধতিটা সহজ হয়ে যায়।

প্রশ্নঃ নার্ভের অসুখ হলে রোগীর ঠিক কী ধরণের সমস্যা দেখা দেয়?
উত্তরঃ এই অসুখ হলে রোগীর অনেক সমস্যা হাজির হয়।  কিন্তু এ সবের মধ্যে প্রধান যে সব সমস্যা আছে এবং যেখানে নিউরো রিহ্যাবিলিটেশনের একটা বড় ভূমিকা আছে সেগুলোর দিকেই বেশি নজর দিতে হয়।

প্রশ্নঃ যেমন?
উত্তরঃ আমাদের দেশে অতি প্রচলিত একটা সমস্যা হল ব্রেন স্ট্রোক ।শরীরের একটা দিক পক্ষাঘাত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এতে। এই অবস্থাকে আমরা ডাক্তারি ভাষায় বলে থাকি ‘হেমিপ্লেজিয়া’।  বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগী ঠিক ভাবে হাত-পা নাড়তে পারেন না।  কোনও জিনিস হাত দিয়ে ঠিক ভাবে ধরতে পারেন না।  হাঁটাচলাতেও প্রভাব পড়ে।স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সেই রোগী হাঁটতে পারেন না।  অনেক রোগী আবার পরিষ্কার বা শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারেন না। কথা বলার সময় তা জড়িয়ে যায় অনেক সময়ে।  কারও কারও তো পুরোপুরি বাকশক্তি হারিয়ে যায়। অনেক রোগীর আবার চিন্তাশক্তি লোপ পায়।  জীবনযাত্রা অসংলগ্ন হয়ে পড়ে।  মল-মূত্র ত্যাগের ক্ষেত্রেও ভীষণ সমস্যা দেখা দেয়। এর উপর আবার যে সব রোগী পারকিনসন রোগের শিকার, তাঁদের হাত-পা কাঁপে, হাঁটতে গেলে কোনও ভারসাম্য থাকে না। (দেখা যায় রোগী দুটি পা অনেক বেশি ফাঁক করে ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটছেন)।  কারও কারও হাত-পা অবশ লাগে, কখনও ঝিনঝিন করে।  এছাড়াও মেরুদন্ডের পেরিফেরাল নার্ভে (যেমন হাত-পা মুখ প্রভৃতি শরীরের বাইরের দিকের নার্ভ) কোনও চোট, আঘাত লাগলে বা জীবাণুর সংক্রমণ ঘটলে রোগীর শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়।  যেমন শরীরে ব্যথা, হাত-পা ঝিনঝিন করা।  কারও যদি ঘাড়ে চোট লাগে তাঁর দু’হাত, দু’পা জুড়ে যন্ত্রণা শুরু হতে পারে।  অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, আঘাতের পরিমাণ বেশি হলে হাত-পা পুরোপুরি অসাড় হয়ে গেছে।  একে আমাদের ভাষায় বলে ‘কোয়াড্রপ্লেজিয়া’।  যে রোগীর কোমরে চোট লাগে তাঁর আবার দুটো পা একসঙ্গে অসাড় হয়ে যেতে পারে।  এই সমস্যাকে বলা হয় ‘প্যারাপ্লেজিয়া’।

প্রশ্নঃ আপনারা কোন পদ্ধতিতে ‘নিউরোরিহ্যাবিলিটেশন’ শুরু করেনযেখানে রোগী তাঁর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায়?

উত্তরঃ শুরুতেই বলেছি ‘নিউরো-রিহ্যাব’-এ প্রথম এবং প্রধান ভূমিকা থাকে মেডিক্যাল রিহ্যাবিলিটেশনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের।তিনি বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর সমস্যাগুলোর সঠিক কারণ এবং সমস্যাগুলো ঠিক কতটা গভীরে রয়েছে তা নির্ধারণ করেন।  এসব জানার পর সেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি কোন পথে এগোবেন। যেমন সমস্যা, তেমন পথেই প্রতিকার।  কারও সমস্যার জন্য ওষুধ প্রয়োগ, কারও সমস্যার জন্য থেরাপি প্রয়োগ। সুতরাং ‘নিউরো-রিহ্যাব’ হল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং বিভিন্ন থেরাপিস্টদের সমন্বয়ে চলা একটা যৌথ প্রক্রিয়া।

প্রশ্নঃ ঠিক কোন ধরণের থেরাপি?
উত্তরঃ এর মধ্যে যে সব থেরাপির ব্যবহার হয়ে থাকে সেগুলোর কথাই বলি।  অকুপেশনাল অ্যন্ড ফাংশন্যাল থেরাপির কাজ হল, রোগীকে তার দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্মগুলো করার জন্য স্বাবলম্বী করে দেওয়া।  যেমন নিজের জামার বোতাম লাগানো, নিজের হাতে চুল আঁচড়ানো, নিজের হাতে পেন বা পেনসিল ধরা এবং তা দিয়ে লেখা।  আবার যখন অবশ হয়ে যাওয়া মাংসপেশি শক্ত হয়ে গিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো অকেজো হয়ে যায় (স্প্যাস্টিক), তখন এর জন্য রয়েছে অ্যান্টি-স্প্যাস্টিক থেরাপি।  এক্ষেত্রে শরীরের স্প্যাস্টিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে আমরা একটানা কিছুক্ষণ টানটান ভাবে রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকি।  এটা রোগী যেমন নিজে করতে পারবেন, তেমনই ফিজিওথেরাপিস্টের সাহায্য নিয়েও তা করা যেতে পারে। তবে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাংসপেশির শক্তভাবও দূর করা যায়।  অন্যদিকে যে সব রোগী স্ট্রোকজনিত কারণে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তাঁদের স্পিচ থেরাপির মাধ্যমে বাকশক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।  এর মাধ্যমে যাঁদের কথা ইতিমধ্যেই জড়িয়ে গেছে তাঁদেরও স্পষ্টভাবে কথা বলানোর চেষ্টা হয়।  কিন্তু এর আগে দেখতে হয়, কথা বলার ঠিক কোন ধাপে তাঁর অসুবিধে হচ্ছে।  সেজন্য স্পিচ থেরাপিস্টকে মনস্তত্ববিদের সঙ্গে বসে রোগীর সমস্যার সমাধান করতে হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয়, ‘সাইকো কগনিটিভ অ্যান্ড রিহ্যাব’।

যোগাযোগঃ ৯৮৩০০৪১৯৪৮

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেনঃ বিপ্লবকুমার ঘোষ

Comments are closed.